• Colors: Blue Color

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে ভারত। আজ শুক্রবার দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।

ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নয়াদিল্লি সফরে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানোর কথা উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার কথা উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চান।

জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ চলমান বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাব।’ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সব ঘটনা খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নিয়ে আর কথা না বলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে ভারতের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন জয়সোয়াল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হওয়ার এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে ভারতের ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। প্রাসঙ্গিক দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর (মেকানিজম) মাধ্যমে অংশীদারত্ব আরও গভীর করার প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। খুব শিগগির পরবর্তী আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তা ছাড়া উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়ে মতবিনিময় করেছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত নিজেদের প্রয়োজনীয়তা ও মজুতের পরিমাণ বিবেচনায় রেখে প্রতিবেশী দেশগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ করছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, গত মার্চ মাসে ভারত বাংলাদেশে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করেছে এবং চলতি মাসেও এই সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

প্রায় ৪০টি দেশের নেতাদের নিয়ে শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের আয়োজন করেছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালুর উদ্যোগ নিয়ে এই বৈঠকে আলোচনা হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান নিজেদের ছাড়া অন্যান্য জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন গত সোমবার ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে।

যুক্তরাজ্য–ফ্রান্স আয়োজিত বৈঠকে প্রায় ৪০টি দেশের নেতারা ইরানের যুদ্ধবিরতি সমর্থনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বনেতারা প্রণালিটি আবার চালু করতে একটি আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের উদ্যোগ নেবেন। সূত্র: সিএনএন

 

ইরান যুদ্ধে এশিয়ার অনেক দেশের অর্থনীতি যখন জ্বালানিসংকটে ধুঁকছে তখন চীনের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।

দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) বা প্রথম প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। অথচ অর্থনীতিবিদেরা আগে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তার মানে, পূর্বাভাসের চেয়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। ইরানও ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। ফলে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানিসংকটে পড়েছে।

চীনের প্রথম প্রান্তিকের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানটি এমন সময়ে, যখন বেইজিং গত মাসেই তাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। যা কিনা ১৯৯১ সালের পর সবচেয়ে কম লক্ষ্যমাত্রা। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে সাড়ে চার শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর গত প্রান্তিকে উৎপাদন খাতের কল্যাণে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় চীনের অর্থনীতি এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক কাইল চ্যান বলেছেন, গাড়ি ও অন্যান্য রপ্তানি এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে বেশি সহায়তা করেছে। তিনি আরও বলেন, ইরান যুদ্ধের পূর্ণ প্রভাব এখনো দেখা যায়নি। বাণিজ্য বিঘ্নের কারণে আগামী প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমতে পারে।

গত মার্চে চীনের নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় জিডিপির লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ঘোষণা করা হয়। বেইজিং উচ্চপ্রযুক্তি খাত, উদ্ভাবন ও অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়াতে বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

দেশটির শাসক দল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তার কারণ দেশটি দুর্বল ভোগ, জনসংখ্যা হ্রাস ও দীর্ঘস্থায়ী আবাসনসংকটসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনকে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট ও বাণিজ্যিক অস্থিরতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার মধ্যে ট্রাম্পের পাল্টাশুল্কও রয়েছে।

বর্তমানে চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা আছে। যদিও মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, জুলাইয়ের শুরুতে এই শুল্ক আবার আগের উচ্চ স্তরে ফিরে যেতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং মে মাসে চীনে বৈঠক করবেন।

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত মার্চ মাসের পণ্য রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় পণ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেশ কমেছে। গত মাসে চীনের রপ্তানি আড়াই শতাংশ কমেছে, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দেশটির রপ্তানি ২০ শতাংশ বেড়েছিল। মূলত ইলেকট্রনিকস ও উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়।

লুনার নিউ ইয়ারের তারিখ পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর প্রথম দুই মাসের বাণিজ্য তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করে চীন।

অন্যদিকে গত মার্চে দেশটির পণ্য আমদানি প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। ফলে মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত (পণ্য রপ্তানি ও আমদানির মধ্যকার ব্যবধান) নেমে এসেছে ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

অর্থনীতিবিদ ই-শিয়াও ঝৌয়ের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক ব্যয় বেড়ে যাওয়াই আমদানির মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত তেল ও প্লাস্টিকসহ তেলজাত পণ্যের দাম বেড়েছে। যদিও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায় উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর চীনের নির্ভরতা কম, তবু দেশে জ্বালানির দাম বাড়ছে। কিছু চীনা এয়ারলাইন জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির কারণে ফ্লাইটও কমিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিকভাবে দাম বাড়ার কারণে ভোক্তারা যদি কম খরচ করে, তাহলে চীনের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ই-শিয়াও ঝৌ বলেন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত আপনার বাণিজ্য অংশীদারদের অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে। খুব বেশি হারে এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে রাখা কঠিন।

বিবিসি

রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে নতুন করে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের অস্থিরতার মাঝে এটি বাংলাদেশের ওপর থাকা জ্বালানি সরবরাহের চাপ সাময়িকভাবে লাঘব করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই ছাড়ের মেয়াদ আগামী ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে।

গত ১১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।

এর আগে, গত ১২ মার্চ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রুশ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য-সংক্রান্ত লেনদেনে ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ১১ এপ্রিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতি বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে কার্যকর হবে।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে চমৎকার আলোচনা করেছি। তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।’

গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। যুদ্ধবিরতির আওতায় ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা বন্ধ রেখেছে। কিন্তু লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে।

সূত্র: সিএনএন।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার পর জয়-পরাজয়ের প্রশ্নটি এখন মূলধারার গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ইরানি রাজনীতিবিদ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা—উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত, যারা কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে ছিল এবং কোনো হামলায় অংশ নেয়নি, তারাও বিজয় দাবি করেছে।

তাহলে এই যুদ্ধে আসলে জিতছে কে? প্রশ্নটি যতটা সহজ মনে হয়, তার চেয়েও বেশ জটিল।

সমকালীন যুদ্ধগুলো কোনো পক্ষকে বিজয়ী বা পরাজিত হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। ঐতিহাসিক যুদ্ধগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রের স্পষ্ট জয়কে রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর করা যেত; কিন্তু সমকালীন যুদ্ধগুলোর ফলাফল প্রায়ই অস্পষ্ট থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা ‘মানবাধিকার’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের’ মতো উদার গণতান্ত্রিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠায় জয় ও পরাজয়ের মানদণ্ড বদলে গেছে। এই জটিলতা থেকেই ‘মানুষের হৃদয় জয় করার’ ধারণার উদ্ভব ঘটে, যা প্রথম দেখা যায় ভিয়েতনাম যুদ্ধে এবং পরে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে নাইন-ইলেভেন (৯/১১) পরবর্তী ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে।

জয় ও পরাজয়ের ধারণা এখন ‘প্রোপাগান্ডা’, নিজস্ব ব্যাখ্যা এবং ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ (অসম প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে যুদ্ধ) ওপর নির্ভরশীল। ফলাফলের এই অস্পষ্টতা প্রতিটি পক্ষকেই বিজয়ের দাবি করার সুযোগ করে দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দাবি ভোটারদের কাছে ক্ষমতাসীন দলকে আরও জনপ্রিয় করতে সাহায্য করে আর একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনসমর্থন ও বৈধতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।

সমকালীন যুদ্ধে ‘জয়’ শব্দটির পরিভাষাগত অস্পষ্টতা বা নিজস্ব ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি নাগরিকেরা ইরানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং পারমাণবিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনছেন। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ‘কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল’ সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে; পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।

এ ছাড়া ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ ধারণা কোনো দুর্বল পক্ষকে বিজয়ের দাবি করার সুযোগ দেয়, সেই পক্ষ কোনো দেশ হোক বা কোনো সংগঠন; যদি তারা পুরোপুরি ভেঙে পড়া এড়াতে পারে এবং তাদের প্রতিরোধের আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে পারে। সাধারণত একটি শক্তিশালী পক্ষের তুলনায় দুর্বল পক্ষটি যুদ্ধে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে; কারণ, তারা এই লড়াইকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখে।

জয় থেকে পরাজয়

সমকালীন যুদ্ধগুলোতে সামরিক বিজয় সব সময় রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর হয় না। ভিয়েতনাম যুদ্ধ এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেই যুদ্ধে ‘টেট অফেনসিভ’-এ যুক্তরাষ্ট্র ও তার দক্ষিণ ভিয়েতনামি মিত্রদের সামরিক বিজয় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরাজয়ে পর্যবসিত হয়েছিল; যা ভিয়েতকংদের নতুন সদস্য সংগ্রহে সহায়তা করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকে উসকে দিয়েছিল।

যুদ্ধ যখন চলমান থাকে, তখন এর সামরিক বা রাজনৈতিক বিজয় নিরূপণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং সাদ্দাম হোসেনের পতনকে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই তা পরাজয়ে রূপ নেয় এবং সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাকে ইরানকে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পতনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘বিজয়’ দৃশ্যমান হয়েছিল, তা মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে চূড়ান্ত পরাজয়ে রূপ নেওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না উপাসনালয়ও। হামলায় বিধ্বস্ত ইহুদিদের একটি সিনাগগের ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা। তেহরান, ইরান; ৭ এপ্রিল ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না উপাসনালয়ও। হামলায় বিধ্বস্ত ইহুদিদের একটি সিনাগগের ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা। তেহরান, ইরান; ৭ এপ্রিল ২০২৬, ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ একটি অপ্রতিসম ও চলমান সংঘাত হওয়ায় এখানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা বিশেষভাবে কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত কিছু সাফল্য রয়েছে। তারা ইরানের কয়েক ডজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করেছে এবং দেশটির অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।

তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির আগপর্যন্ত ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছিল।

সমকালীন যুদ্ধে ‘জয়’ শব্দটির পরিভাষাগত অস্পষ্টতা বা নিজস্ব ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। মার্কিন ও ইসরায়েলের নাগরিকেরা ইরানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং পারমাণবিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ‘কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল’ সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে; পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।

প্রকৃতপক্ষে উভয় পক্ষেরই নিজ নিজ জনগণের কাছে বিজয় ‘বিক্রি’ করার মতো ভিত্তি ও কারণ রয়েছে। কারণ, উভয় পক্ষই বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বেশ কিছু কৌশলগত জয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা

রাজনৈতিক বিজয় কার হয়েছে—সেই মাপকাঠিতে বিচার করলে ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে যায় না। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো ছিল ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ (রেজিম চেঞ্জ) ঘটানো, একটি গণ-অভ্যুত্থান উসকে দেওয়া, সশস্ত্র কুর্দি বাহিনীকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা এবং ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া, যার প্রতিটিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

সামরিক সক্ষমতার বিশাল ব্যবধানের কারণে কিছু কৌশলগত জয় পাওয়া গেলেও যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার একটিও অর্জিত হয়নি। উল্টো ইরান সফলভাবে এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুকে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলের নিরাপত্তার দিকে সরিয়ে নিতে পেরেছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে ইরান আলোচনার টেবিলে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। পাকিস্তানে হওয়া আলোচনায় ইরান ১০ দফার একটি পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয়; যেখানে প্রণালির ওপর তাদের প্রভাবের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের প্রস্তাব ছিল।

ওমানের মুসান্দাম প্রদেশের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত একটি জাহাজ। ১২ এপ্রিল ২০২৬
ওমানের মুসান্দাম প্রদেশের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত একটি জাহাজ। ১২ এপ্রিল ২০২৬, ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে এই পরিকল্পনার প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিলেও পরে তা থেকে সরে আসে, যার ফলে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে যায়।

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এমনকি তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করে এতে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বেআইনি যুদ্ধ শুরু করা; বালিকা বিদ্যালয়সহ বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে অসংখ্য শিশু হত্যা; একটি সার্বভৌম দেশের বৈধ নেতাকে হত্যা এবং একটি গোটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ‘মানুষের হৃদয় জয়ের লড়াইয়ে’ হেরে যেতে পারে।

অন্যদিকে ইরানও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর ফলে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা বেড়েছে। এই দেশগুলো এসব ঘটনাকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে, যা ভবিষ্যতে ইরানের জন্য সম্পর্ক মেরামতের পথ কঠিন করে তুলবে।

সামগ্রিকভাবে এই যুদ্ধের জয়ী বা পরাজিত কারা তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। তবে সমকালীন যুদ্ধের বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনা করলে এটি বলা সমীচীন হবে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একটি কৌশলগত সামরিক বিজয় অর্জন করলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ে তারা হেরে যাচ্ছে।

আরাবি ২১ নিউজ ওয়েবসাইটের এডিটর-ইন-চিফ ফিরাস আবু হেলালের মতামত কলামটি মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত হয়েছে।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব