২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ইরানে যৌথভাবে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' লঞ্চ করে যুক্তরাষ্ট্র  ও দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল। এই হামলার মধ্য দিয়ে 'অফিসিয়ালি' শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র- ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ। 

এই যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিলেন, ক্ষমতায় আসলেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই অ্যাপ্লাই করলেন নিউটনের ৩য় সূত্র। তবে, একটু উল্টো দিয়েছেন নিউটনের ল'। যেমন: শুল্ক আরোপ করেছেন, কোভিড পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতি বিবেচনা না করে। যে দেশই আপত্তি জানিয়েছে, সেসব রাষ্ট্রে আরোপ করেছেন একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। শুধু তাই নয়, নিষেধাজ্ঞা না মানলে আবার নিষেধাজ্ঞা। এরপর গ্রিনল্যান্ড কেনার ভীমরতি ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। না মানায়, ডেনমার্ককে দিয়েছেন সামরিক হামলার হুমকিও। এরপর নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে, হতাশায় বলেছেন, কতগুলো যুদ্ধ থামিয়েছি, তারপরও পুরস্কার পাইনি। শান্তি বজায় রাখার একতরফা দায়িত্ব শুধু তিনি নেননি। এরপর হুমকিও দিয়েছেন, এখন থেকে আর 'মিস্টার নাইস গায়' থাকবেন না। 

যেমন কথা, তেমন কাজ। হঠাৎ করেই একজন প্রেসিডেন্টকে ঘুমন্ত অবস্থায় তার স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে আসলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এমনকি, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে নাইকের 'ট্র্যাক সুট'টিও পরিবর্তন করার সময় দেননি। এরপর টার্গেট করলেন ইরান। এসব পরিস্থিতি দূর থেকে একটি দেশ পর্যবেক্ষণ করছেন নিবিড়ভাবে। চীন।

চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রণকৌশল পর্যবেক্ষণ কোন সখের বসে করা নয়। একদিকে, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের 'কোল্ড ট্রেড-ওয়ার'। অপরদিকে, তাইওয়ান, যে দেশটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে বারবার বিবৃতি দিয়েছে চীন। একইসঙ্গে সতর্কও করেছে, যে রাষ্ট্রই চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে, পরিণতি হবে 'ভয়াবহ'।

এমনকি, সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছিলেন, চলমান তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে অস্তিত্ব সংকটে আছে জাপান। এমন মন্তব্যের পর ক্ষিপ্ত হয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হুশিয়ারি দিয়েছিলো, জাপান যাতে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলায়। 

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এসেছে যুদ্ধ ব্যবহৃত 'নিউ জেনারেশন প্রযুক্তি' থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান 'এফ-৩৫' ও বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান। 

ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে নিখুঁত লক্ষ্যভেদী গাইডেড বোমা, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে তারা ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও নৌ-ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে, ইরান বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল। কম খরচের ড্রোন, স্বল্প প্রযুক্তির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘একইসঙ্গে অনেকগুলো মিসাইল’ হামলার পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের লেটেস্ট  প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো সিস্টেমকেও ফাঁকি দিচ্ছে ইরান।

মূলত, এখানেই বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের সংজ্ঞা। একটি ২০ হাজার ডলারের ড্রোন যদি কয়েক মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত বা অকার্যকর করে দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভর করবে না বরং নির্ভর করবে সামরিক কৌশল, গতি ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর।

চীনের সামরিক বিশ্লেষকরা এই যুদ্ধকে দেখছেন ‘ভবিষ্যতে সম্ভাব্য তাইওয়ান যুদ্ধের প্রাক-অনুশীলন’ হিসেবে। 

চীনা বিমান বাহিনীর কর্নেল ফু ছিয়ানশাওর মতে, এই সংঘাত থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তিগতভাবে অ্যাডভান্সড সামরিক শক্তিকেও ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন কৌশল ভোগান্তিতে ফেলেছে।

এখানেই চীনের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। দেশটি ইতোমধ্যে হাইপারসনিক মিসাইল, দীর্ঘপাল্লার রকেট ব্যবস্থা ও স্টেলথ প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির জে-২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানকে এখন অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের 'এফ-৩৫'-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন। 

পাশাপাশি, তারা নতুন স্টেলথ বোমারু বিমানও তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে 'মার্কিন বি-২' বা 'বি-২১'-এর সমকক্ষ হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের বড় দুর্বলতা হচ্ছে বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সর্বশেষ বড় যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে সংঘর্ষে। 

বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, আফগানিস্তানসহ বহু যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবে, ইতিহাস বলে ইরাক-আফগানিস্তান-ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে মার্কিন অভিযান কখনোই সফল হয়নি। 

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা এমন একটি বিষয়, যা শুধু প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করা যায় না। একথা ঠিক যে মার্কিন বাহিনীর বেশ কয়েকটি দেশে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। একইসঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতাও কম নয়। 

বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলোর একটি এখন তাইওয়ান প্রণালি। তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে চীন। 

একইসঙ্গে, বারবার দেশটি সতর্ক করেছে তাইওয়ান ইস্যুতে বিদেশি হস্তক্ষেপ হলে তার পরিণতি হবে 'ভয়াবহ'। এই অবস্থায় ইরান যুদ্ধ থেকে চীন বুঝতে চাইছে যদি ভবিষ্যতে তাইওয়ানে সংঘাত শুরু হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। চীন হয়তো ‘ড্রোন’ কৌশল ব্যবহার করবে, যেখানে শত শত ড্রোন একসঙ্গে আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার চেষ্টা করবে।

তবে তাইওয়ানও বসে নেই। ড্রোন শনাক্তকরণ ও ধ্বংস করতে একের পর এক উন্নত প্রযুক্তির সামরিক চালানের অনুমোদন দিচ্ছে দেশটির পার্লামেন্ট। আর তাইওয়ানকে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে চীনের চির প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও বিশ্লেষকদের মতে, তাদের বর্তমান সক্ষমতা এখন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। গত মাসে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এই যুদ্ধের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো আঞ্চলিক সংঘাত এখন আর 'আঞ্চলিক' থাকছে না। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। 

একইভাবে তাইওয়ান বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। ফলে এই দুই অঞ্চলে যেকোনো বড় সংঘাত সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছে বিশ্লেষকরা।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। আর যদি ভবিষ্যতে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুরু হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

ইরান যুদ্ধ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও সবার সামনে এনেছে। আর সেটি হচ্ছে সামরিক শক্তি সবসময় রাজনৈতিক সমাধান এনে দেয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত সাফল্য পাওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বেশ কঠিন। 

আফগানিস্তান ও ইরাকের সামরিক অভিযানের মতোই ইরান যুদ্ধও দেখাচ্ছে, প্রযুক্তিগত আধিপত্য থাকলে-ই চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হয় না।

এ বিষয়ে বিশ্লেষক ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে জয় মানেই রাজনৈতিকভাবে 'বিজয়' নয়।

বর্তমান সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয় বরং এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা তৈরির লড়াই। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনীর প্রতিটি অ্যাটাক, প্রতিটি রণকৌশল, প্রতিটি দুর্বলতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে চীন। 

 

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে সম্মত হয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।

গতকাল সোমবার এক বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ‘নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ’ নিয়ে এ ঐকমত্যে পৌঁছান।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার কারণে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর ইইউর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বহুল প্রতিক্ষীত ছিল। এতদিন ইইউভুক্ত হাঙ্গেরির সদ্যবিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এ উদ্যোগ আটকে রেখেছিলেন। দেশটিতে ক্ষমতার পালাবদলে এখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন পিটার মাজিয়ার। এখন ইইউর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আগের সেই জটিলতা কাটছে।

তিনজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং বসতি স্থাপনকারী চারটি সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ইইউর। তাদের নাম–পরিচয় এখনো প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।

নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ঐকমত্যের পর ইইউর পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘অচলাবস্থা কাটিয়ে (নিষেধাজ্ঞা) বাস্তবায়নের এটাই উপযুক্ত সময়।’

ঐকমত্যের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো। তিনি বলেন, ‘পশ্চিম তীরে চরমপন্থা ও সহিংস উপনিবেশ স্থাপন প্রক্রিয়ায় সমর্থনকারী প্রধান ইসরায়েলি সংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে ইইউ।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেখেন, ‘অত্যন্ত গুরুতর ও অসহনীয় এসব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’

অবশ্য অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিষয়ে ইইউর এ উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ইইউ কোনোরকমের ভিত্তি ছাড়াই শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে খেয়ালখুশি মতো এবং রাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে।’

ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নেতা ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির ইইউকে ‘ইহুদি-বিদ্বেষী’ বলে কড়া সমালোচনা করেছেন।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানান, ইইউর নেতারা হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে একমত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ফিলিস্তিনের গাজা থেকে হামলা চালিয়েছিল হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। গাজায় জিম্মি করে আনা হয় ২৪০ জনকে।

জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, ‘এ গুরুতর ও অসহনীয় কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’

হামাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইইউর বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামি ও বর্ণবাদের’ অভিযোগ তুলেছেন।

আল–জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ তথা ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায়’ রয়েছে বলে মন্তব্য করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সোমবার (১১ মে) হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন ট্রাম্প। যুদ্ধ শেষ করতে আলোচনা শুরুর শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের এখনো একমত না হতে পারাকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে মনে করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির অবস্থা এমন, যেন একজন ডাক্তার এসে বলছেন, ‘স্যার, আপনার প্রিয়জনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ।’

ইরানের পাল্টা প্রস্তাবকে ‘নির্বোধের মতো’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি নির্বোধের মতো প্রস্তাব এবং কেউই এটি গ্রহণ করবে না— যদিও ওবামা বা বাইডেন এটি গ্রহণ করতেন। তারা যা কেড়ে নিয়েছে তা ছিল আরও অনেক বেশি ভয়াবহ।’

এসময় ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রসঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধে ইরানের নৌশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘তাদের ১৫৯টি জাহাজ ছিল, এখন আর একটিও নেই। শুধু কয়েকটি ছোট স্পিডবোট বেড়াচ্ছে। এগুলোর মধ্যে থেকে আমরা একদিনে আটটি ধ্বংস করে দিয়েছি।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় ছয় সপ্তাহ যুদ্ধের পর ৮ এপ্রিল থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। যদিও লেবাননের নৃশংসতা থামায়নি ইসরায়েলি বাহিনী।

যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ‘অযৌক্তিক’ ও ‘একতরফা’ দাবি জানাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ অভিযোগ করেন।

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বশেষ প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। গতকাল রোববার পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দেওয়া এ পাল্টাপ্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছেছে। ইরানের জবাব প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘তাদের শর্তগুলো আমার পছন্দ হয়নি—এটি একবারেই অগ্রহণযোগ্য।’

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বক্তৃতা করেন। তিনি দাবি করেন, সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে ইরানের প্রস্তাবগুলো ছিল বৈধ ও উদার।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আজ সোমবার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রস্তাবের ইরানের জবাব বা পাল্টাপ্রস্তাবসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।

বাঘাই বলেন, ‘আমরা কোনো বাড়তি সুবিধা চাইনি। আমাদের দাবি ন্যায্য। আমরা যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন অবরোধ ও জলদস্যুতার অবসান এবং অন্যায়ভাবে আটকে রাখা (ইরানের) সম্পদের মুক্তি চেয়েছি।’

আমরা কোনো বাড়তি সুবিধা চাইনি। আমাদের দাবি ন্যায্য। আমরা যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন অবরোধ ও জলদস্যুতার অবসান এবং অন্যায়ভাবে আটকে রাখা (ইরানের) সম্পদের মুক্তি চেয়েছি।
ইসমাইল বাঘাই, মুখপাত্র, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

বাঘাই আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল এবং লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ইরানের লক্ষ্য। (ইরানের জবাব) আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি দায়িত্বশীল ও উদার প্রস্তাব।’

ইরানের জবাবের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রোববার ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দিয়েছেন। এতে তিনি লিখেছেন, ইরানের পাল্টাপ্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করবেন। তবে সেই প্রস্তাবের বিস্তারিত কিছু তিনি জানাননি।

ট্রাম্প পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আসা জবাব পড়েছি। আমার পছন্দ হয়নি—এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’

যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এ পর্যন্ত একাধিকবার পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব বিনিময় করেছে। কিন্তু তারা একমত হতে পারছে না।

সোমবারের খবরটি বেশ নেতিবাচক। কারণ, দুই পক্ষ ক্রমাগত তাদের সর্বোচ্চ দাবিতে অটল থাকতে চাইছে।
আন্দ্রেয়া ডেসি, বিশেষজ্ঞ, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোম

এ অচলাবস্থা প্রসঙ্গে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের আন্দ্রেয়া ডেসি বলেন, দুপক্ষই যার যার অবস্থানে অনড় রয়েছে।

আন্দ্রেয়া বলেন, সোমবারের খবরটি বেশ নেতিবাচক। কারণ, দুপক্ষ ক্রমাগত তাদের সর্বোচ্চ দাবিতে অটল থাকতে চাইছে।

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, এই অচলাবস্থার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি, পারস্য উপসাগরসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধি

ট্রাম্পের পোস্টের পর বিশ্বে জ্বালানির বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আজ সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেলের দাম ৯৯ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছেছে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এ পর্যন্ত একাধিকবার পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব বিনিময় করেছে। কিন্তু তারা একমত হতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও চার শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথভাবে আগ্রাসন শুরু করে। এর কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ ও ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। পরবর্তী সময়ে ইরানের বন্দরে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিতে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার ইত্যাদির মতো কার্গো জাহাজ ও ট্যাংকারের চলাচল প্রায় শূন্যের কোটায় চলে আসে।

আজ সংবাদ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিরাপদ করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন বাঘাই।

ইরানের রাজধানী তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। বিলবোর্ডটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হরমুজ প্রণালিতে চিত্রায়িত করা হয়েছে। ১১ মে ২০২৬
ইরানের রাজধানী তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। বিলবোর্ডটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হরমুজ প্রণালিতে চিত্রায়িত করা হয়েছে। ১১ মে ২০২৬, ছবি: রয়টার্স

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ৫০টির বেশি দেশ নিয়ে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছেন। তাঁরা বলছেন, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে হরমুজে নৌযোগাযোগ আবার চালু করতে তাঁরা কাজ করবেন।

আজ সকালে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেলের দাম ৯৯ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছেছে।

বাঘাই বলেন, ইরান ইউরোপীয় দেশগুলোকে স্পষ্ট করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঔদ্ধত্যের কাছে তাদের নতি স্বীকার করা উচিত নয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ মুখপাত্র আরও বলেন, ‘তাদের (ইউরোপীয় দেশগুলো) এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা তাদের স্বার্থ নষ্ট করবে। আমি আগেও বলেছি, এই যুদ্ধ কেবল অনৈতিকই নয়, অবৈধও।’

বাঘাই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই ইরানে আগ্রাসন শুরু করেছে। তাই ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের ফাঁদে পা দেওয়া উচিত হবে না।’

যুক্তরাজ্যের সরকারের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আগামীকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করবে।

এর আগে গত এপ্রিলে লন্ডনে বিভিন্ন দেশের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের নিয়ে দুই দিনব্যাপী একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগরে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।...এতে তেলের দাম আরও বেড়ে যাবে। আমরা আশা করি, বিশ্বের (শক্তিশালী) দেশগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করবে।’

আল–জাজিরা

শারীরিক অবস্থার ক্রমেই অবনতি হওয়ায় ইরানের কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদিকে। তার আগে তাঁকে জামিন দেওয়া হয়েছে।

এই মানবাধিকারকর্মীর পরিবার পরিচালিত ফাউন্ডেশন গতকাল রোববার জানায়, অসুস্থতার কারণে সাময়িকভাবে কারাগারের বাইরে থাকার অনুমতি পেয়েছেন নার্গিস।

গত সপ্তাহে নার্গিসের পরিবারের সদস্য ও সমর্থকেরা তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। বলা হয়, বছরের শুরুতে কারাগারে দুবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন নার্গিস। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে কারাগারে থাকলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হতে পারে।

এক বিবৃতিতে নার্গিস মোহাম্মদি ফাউন্ডেশন জানায়, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানী তেহরানের পারস হাসপাতালে নার্গিসকে ভর্তি করা হয়েছে। নিজস্ব চিকিৎসকেরাই তাঁর চিকিৎসা করছেন।

ফ্রান্সের প্যারিসে থাকা নার্গিসের স্বামী সপ্তাহান্তে এক বিবৃতিতে জানান, নার্গিসের সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। তাঁর শারীরিক অবস্থা এখনো অস্থিতিশীল।

নোবেলজয়ীর আইনজীবী চিরিনে আরদাকানি তাঁর মক্কেল সম্পর্কে বলেন, আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারাগারে প্রায় ২০ কেজি ওজন হারিয়েছেন নার্গিস। কথা বলতেও তাঁর কষ্ট হয়। তাঁকে চেনাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নার্গিসের বয়স ৫৩ বছর। সর্বশেষ দফায় গত ১২ ডিসেম্বর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। তখন ইরানের পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে একটি স্মরণসভায় অংশ নিয়েছিলেন নার্গিস। সেখান থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে কারাবন্দী নার্গিসকে সাত বছরের বেশি সময়ের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নার্গিসের আইনজীবী জানিয়েছেন, অপরাধ করার উদ্দেশ্যে সমবেত হওয়া এবং এতে যোগসাজশের অভিযোগে এই মানবাধিকারকর্মীকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়ার আগে নার্গিস ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচারমূলক কার্যকলাপ’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশ’-এর অভিযোগে করা মামলায় ১৩ বছর ৯ মাসের সাজা ভোগ করছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে ২০২৪ সালের শেষ দিকে তাঁকে তেহরানের এভিন কারাগার থেকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

ইরানে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং নারী নিগ্রহের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার নার্গিস ২০২৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জেতেন।

বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের বিপরীতে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের দেওয়া জবাব গতকাল রোববার প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে নিজেদের জবাব দিয়েছিল তেহরান।

কোনো বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি মাত্রই ইরানের তথাকথিত “প্রতিনিধিদের” পাঠানো জবাবটি পড়লাম। এটি আমার পছন্দ হয়নি, পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।’

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তেহরানের দেওয়া জবাবে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা, বিশেষ করে লেবানন পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ কীভাবে বা কখন আবার খুলে দেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিবদমান আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে লড়াই বন্ধের বিষয়ে তেহরান এ জবাব দিল।

ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরানের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আর কোনো হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা এবং ইরানি তেল বিক্রিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসহ দেশটির ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরান তাদের উচ্চমাত্রাসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কিছু অংশের মাত্রা কমিয়ে আনা এবং অবশিষ্ট অংশ তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে।

পাকিস্তান ইরানের এ জবাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বলে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

রয়টার্স

যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনা শুরু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের জবাব পাঠিয়েছে ইরান। রোববার (১০ মে) দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের কাছে ইরান তাদের জবাব ‘আনুষ্ঠানিকভাবে’ পাঠিয়েছে। তবে সেই জবাবে ঠিক কী বলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

আইআরএনএ জানিয়েছে, ইরানের তরফ থেকে এই মুহূর্তে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিকে। এদিকে, অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি কাতারি ট্যাংকারকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে রয়টার্স।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংঘাত নিরসনে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, চুক্তি না হলে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’ অপারেশন চালু করবেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ওই অভিযান শুরু করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহেই প্রজেক্ট ফ্রিডম নামে অভিযানটি শুরু করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া। তবে শুরু হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই হঠাৎ করে তা স্থগিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, নৌ অভিযান চালানো হলেওইরান কয়েক মাস পর্যন্ত তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন সামরিক তৎপরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।

এদিকে, হরমুজ প্রণালির অবরোধ এড়িয়ে কাস্পিয়ান সাগরপথে ইরানে জন্য ড্রোনের যন্ত্রাংশ পাঠাচ্ছে রাশিয়া। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এমন তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কাস্পিয়ান সাগর এখন রাশিয়া ও ইরানের গোপন ও প্রকাশ্যে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে এই রুট ইরানকেব ‘ব্যাপকভাবে সহায়তা’ করছে।

তাদের দাবি, রাশিয়া থেকে ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ যদি এমন গতিতে সরবরাহ অব্যাহত থাকে, তাহলে খুব দ্রুতই ইরান তাদের ড্রোন ভাণ্ডার পুনর্গঠন করতে পারবে।

সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের প্রায় ৬০% ড্রোন ধ্বংস হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যুদ্ধে তেহরান যে পরিমাণ ড্রোন ব্যবহার করেছে, তা মোট মজুদের থেকে অতি ‘নগণ্য’।

আরও তিন থেকে চার মাস টানা বিরতিহীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে ইরান বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সরাসরি স্থলসীমান্ত না থাকলেও কাস্পিয়ান সাগর দুই দেশকে সংযুক্ত করেছে। এই জলপথ ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তুলনামূলক নিরাপদে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এনওয়াইটির তথ্যমতে, যেসব পণ্য সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো, সেগুলোর একটি অংশ এখন কাস্পিয়ান সাগর হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শস্য, পশুখাদ্য, সূর্যমুখী তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য।

প্যারিসের গবেষক অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য কাস্পিয়ান সাগর আদর্শ জায়গা।’

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক হাডসন ইনস্টিটিউট-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো লুক কফি বলেন, ‘মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে কাস্পিয়ান অঞ্চল এক ধরনের ভূরাজনৈতিক ব্ল্যাক হোলের মতো; যেন এর অস্তিত্বই নেই। ইরান ও রাশিয়া মার্কিনিদের এই মতাদর্শেরই ফায়দা নিচ্ছে।’

তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চাপ সৃষ্টি করে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরানকে এখনো ইউরেনিয়াম ছাড়তে রাজি করাতে পারেননি তিনি। এর মধ্যেই ভেনেজুয়েলা থেকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

শুক্রবার (১০ মে) মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানায়, ভেনেজুয়েলার একটি পুরোনো গবেষণা রিঅ্যাক্টর থেকে ১৩ দশমিক ৫ কেজি বা প্রায় ৩০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভেনেজুয়েলার যৌথ অংশগ্রহণে পরিচালিত এ অভিযানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) সহযোগিতা করেছে।

 

চেন্নাই

হাঙ্গেরির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গতকাল শনিবার শপথ গ্রহণ করেছেন পিটার মাজিয়ার। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের দেশটিতে রুশপন্থী নেতা ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটল।

মাজিয়ার ইউরোপপন্থী। অন্যদিকে অরবান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তাঁর সখ্য ছিল।

শনিবারের শপথ অনুষ্ঠান সামনে রেখে মাজিয়ার হাঙ্গেরির সাধারণ মানুষকে রাজধানী বুদাপেস্টে এসে ‘হাঙ্গেরির নতুন ইতিহাস লেখার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন।

মাজিয়ারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন হাজার হাজার মানুষ দেশটির পার্লামেন্টের বাইরে জড়ো হয়েছিলেন। সেখানে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তনের পথ খুবই দীর্ঘ এবং অনেক সময় বেশ কণ্টকাকীর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাঙ্গেরির জনগণ জিতে যায়।

মাজিয়ার আরও বলেন, ‘আজ, বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষ একটু হলেও হাঙ্গেরীয় হতে চায়। আপনারা দেশ ও বিশ্বকে শিখিয়েছেন যে সবচেয়ে সাধারণ, রক্ত-মাংসে গড়া মানুষরাই সবচেয়ে নৃশংস স্বৈরশাসককে পরাজিত করতে পারে।’

এর আগে পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে মাজিয়ার বলেন, হাঙ্গেরির জনগণ তাঁর দলকে দেশের ইতিহাসে একটি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করার ম্যান্ডেট দিয়েছে। সেই ম্যান্ডেট হলো—শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং পুরো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন পথে যাত্রা শুরু করা।

অরবানের শাসনামলে হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মাজিয়ার।

হাঙ্গেরিতে এপ্রিলের সাধারণ নির্বাচনে অরবানের জাতীয়তাবাদী দল ফিদেজের ভরাডুবি হয়, বড় ব্যবধানে জয় পায় পিটার মাজিয়ারের মধ্য ডানপন্থী তিসজা পার্টি। ২০১০ সাল থেকে অরবান হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

দ্য গার্ডিয়ান