যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনা শুরু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের জবাব পাঠিয়েছে ইরান। রোববার (১০ মে) দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের কাছে ইরান তাদের জবাব ‘আনুষ্ঠানিকভাবে’ পাঠিয়েছে। তবে সেই জবাবে ঠিক কী বলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
আইআরএনএ জানিয়েছে, ইরানের তরফ থেকে এই মুহূর্তে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিকে। এদিকে, অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি কাতারি ট্যাংকারকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে রয়টার্স।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংঘাত নিরসনে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, চুক্তি না হলে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’ অপারেশন চালু করবেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ওই অভিযান শুরু করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহেই প্রজেক্ট ফ্রিডম নামে অভিযানটি শুরু করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া। তবে শুরু হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই হঠাৎ করে তা স্থগিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, নৌ অভিযান চালানো হলেওইরান কয়েক মাস পর্যন্ত তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন সামরিক তৎপরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালির অবরোধ এড়িয়ে কাস্পিয়ান সাগরপথে ইরানে জন্য ড্রোনের যন্ত্রাংশ পাঠাচ্ছে রাশিয়া। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এমন তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কাস্পিয়ান সাগর এখন রাশিয়া ও ইরানের গোপন ও প্রকাশ্যে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে এই রুট ইরানকেব ‘ব্যাপকভাবে সহায়তা’ করছে।
তাদের দাবি, রাশিয়া থেকে ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ যদি এমন গতিতে সরবরাহ অব্যাহত থাকে, তাহলে খুব দ্রুতই ইরান তাদের ড্রোন ভাণ্ডার পুনর্গঠন করতে পারবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের প্রায় ৬০% ড্রোন ধ্বংস হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যুদ্ধে তেহরান যে পরিমাণ ড্রোন ব্যবহার করেছে, তা মোট মজুদের থেকে অতি ‘নগণ্য’।
আরও তিন থেকে চার মাস টানা বিরতিহীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে ইরান বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সরাসরি স্থলসীমান্ত না থাকলেও কাস্পিয়ান সাগর দুই দেশকে সংযুক্ত করেছে। এই জলপথ ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তুলনামূলক নিরাপদে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এনওয়াইটির তথ্যমতে, যেসব পণ্য সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো, সেগুলোর একটি অংশ এখন কাস্পিয়ান সাগর হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শস্য, পশুখাদ্য, সূর্যমুখী তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য।
প্যারিসের গবেষক অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য কাস্পিয়ান সাগর আদর্শ জায়গা।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক হাডসন ইনস্টিটিউট-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো লুক কফি বলেন, ‘মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে কাস্পিয়ান অঞ্চল এক ধরনের ভূরাজনৈতিক ব্ল্যাক হোলের মতো; যেন এর অস্তিত্বই নেই। ইরান ও রাশিয়া মার্কিনিদের এই মতাদর্শেরই ফায়দা নিচ্ছে।’
তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চাপ সৃষ্টি করে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরানকে এখনো ইউরেনিয়াম ছাড়তে রাজি করাতে পারেননি তিনি। এর মধ্যেই ভেনেজুয়েলা থেকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
শুক্রবার (১০ মে) মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানায়, ভেনেজুয়েলার একটি পুরোনো গবেষণা রিঅ্যাক্টর থেকে ১৩ দশমিক ৫ কেজি বা প্রায় ৩০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভেনেজুয়েলার যৌথ অংশগ্রহণে পরিচালিত এ অভিযানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) সহযোগিতা করেছে।