বেইজিং

সাবমেরিনে (ডুবোজাহাজ) ব্যবহার করা হয়, এমন দুটি পারমাণবিক চুল্লি নিয়ে যাওয়ার সময় একটি রুশ পণ্যবাহী জাহাজ রহস্যজনকভাবে ডুবে গেছে। চুল্লিগুলো সম্ভবত উত্তর কোরিয়ায় পাঠানো হচ্ছিল। স্পেনের উপকূল থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পর জাহাজটি ডুবে যায়। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ‘উরসা মেজর’ নামে এ রুশ জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর থেকেই পুরো ঘটনা কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকা ছিল। তবে সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার মতো একটি প্রধান মিত্রদেশের কাছে রাশিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তর ঠেকানোর জন্য এটি কোনো পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর এক বিরল ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোপন অভিযান হতে পারে।

ইউক্রেন আক্রমণে মস্কোকে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং–উন সেনা পাঠানোর ঠিক দুই মাসের মাথায় জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল। সম্প্রতি জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের চারপাশে আকস্মিক সামরিক তৎপরতা এর মালামাল ও গন্তব্য নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।

জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ফ্লাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শনাক্তকারী বিশেষ ‘স্নিফার’ বিমান ডুবে যাওয়া জাহাজটির ওপর দিয়ে দুবার উড়ে গেছে। স্পেনের তদন্তপ্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানায়, জাহাজটি ডুবে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর একটি সন্দেহভাজন রুশ গুপ্তচর জাহাজ ধ্বংসাবশেষের স্থানটি পরিদর্শন করে। এরপর সেখানে আরও চারটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনা নিয়ে স্পেন সরকার খুব কম তথ্যই প্রকাশ করেছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের চাপের মুখে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তারা একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয় যে জাহাজটির রুশ ক্যাপ্টেন স্প্যানিশ তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, ‘উরসা মেজর’ জাহাজে সাবমেরিনে ব্যবহৃত চুল্লির মতো ‘দুটি পারমাণবিক চুল্লির যন্ত্রাংশ’ ছিল। তবে সেগুলোয় পারমাণবিক জ্বালানি ভরা ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না।

কী কারণে ‘উরসা মেজর’ ভূমধ্যসাগরের তলদেশে তলিয়ে গেল, সেই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো এখনো অস্পষ্ট। স্পেনের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, একটি সূত্রের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, জাহাজটির মূল কাঠামো বা খোল ছিদ্র করতে একধরনের বিরল টর্পেডো ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

ঘটনাটি ঘটেছিল জো বাইডেনের মার্কিন প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ সপ্তাহগুলোয়। সে সময় ইউক্রেন যুদ্ধ মস্কোর অনুকূলে চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রেরও তীব্র ইচ্ছা কাজ করছিল।

উরসা মেজর জাহাজটি ‘স্পার্টা ৩’ নামেও পরিচিত। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক অভিযানে এ জাহাজটির দীর্ঘ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেখানে রুশ সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইউক্রেন আক্রমণে মস্কোকে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং–উন সেনা পাঠানোর ঠিক দুই মাসের মাথায় জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল। সম্প্রতি জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের চারপাশে আকস্মিক সামরিক তৎপরতা এর মালামাল ও গন্তব্য নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।
 

২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর জাহাজটি ফিনল্যান্ড উপসাগরের উস্ত-লুগা জ্বালানি বন্দরে নোঙর করে। এরপর এটি সেন্ট পিটার্সবার্গের কনটেইনার টার্মিনালে চলে যায়। ১১ ডিসেম্বর যখন জাহাজটি রওনা দেয়, তখন এর প্রকাশ্য নথিপত্রে গন্তব্য হিসেবে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বন্দর ভ্লাদিভোস্টকের নাম উল্লেখ করা ছিল।

নথিতে মালামাল হিসেবে দুটি বড় ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’, ১২৯টি খালি শিপিং কনটেইনার ও ২টি বড় লিবহের ক্রেন বহনের কথা বলা হয়েছিল।

ওই বছরের অক্টোবর মাসে জাহাজটির মালিকপ্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকস এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, তাদের জাহাজগুলো পারমাণবিক সামগ্রী পরিবহনের অনুমতি পেয়েছে। উস্ত-লুগা বন্দরে উরসা মেজর জাহাজে মালামাল তোলার একটি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছে সিএনএন।

ফুটেজে দেখা যায়, জাহাজের খোলের ভেতর কনটেইনারগুলো এমনভাবে রাখা হচ্ছে, যাতে নিচে একটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। পরে ওই ফাঁকা জায়গার ওপর বসানো হয় বড় ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’ দুটি।

পর্তুগিজ নৌবাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, জাহাজটি ফ্রান্সের উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়ার সময় তাদের যুদ্ধবিমান ও জাহাজগুলো এটি অনুসরণ (ট্র্যাক) করছিল। ‘ইভান গ্রেন’ ও ‘আলেকসান্দর ওত্রাকোভস্কি’ নামে রাশিয়ার দুটি যুদ্ধজাহাজ উরসা মেজরকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ২২ ডিসেম্বর সকালে পর্তুগিজ নৌবাহিনী জাহাজটির পিছু নেওয়া বন্ধ করে।

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় কার্টাগেনা বন্দরের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর স্পেনের জলসীমায় জাহাজটির গতি নাটকীয়ভাবে কমে যায়। এতে স্প্যানিশ উদ্ধারকারীরা রেডিওর মাধ্যমে যোগাযোগ করে জাহাজটি কোনো বিপদে পড়েছে কি না, জানতে চান। জাহাজের ক্রু বা নাবিকেরা উত্তর দেন, তাঁরা ভালো আছেন।

তবে তদন্তে দেখা যায়, এর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর জাহাজটি হঠাৎই এর নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়। ২৩ ডিসেম্বর ইউটিসি (কো-অর্ডিনেটেড ইউনিভার্সাল টাইম) সময় বেলা ১১টা ৫৩ মিনিটে জরুরি সহায়তার জন্য বার্তা পাঠানো হয় জাহাজটি থেকে।

কেউ যখন আপনার চাওয়া তথ্য পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে দেয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ হয় যে তারা কিছু একটা লুকাচ্ছে।হুয়ান আন্তোনিও রোহাস মানরিকে, স্পেনের সংসদ সদস্য
 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, জাহাজটির ডান দিকে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণগুলো সম্ভবত এর ইঞ্জিন রুমের কাছাকাছি হয়েছিল। ফলে দুজন ক্রু নিহত হন। এ ঘটনায় জাহাজটি এক পাশে কাত হয়ে যায় ও পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। বেঁচে যাওয়া ১৪ জন ক্রু একটি লাইফবোটে করে জাহাজ থেকে নেমে আসেন।

পরে স্পেনের উদ্ধারকারী নৌযান ‘সালভামার ড্রাকো’ ক্রুদের উদ্ধার করে। সন্ধ্যা ৭টা ২৭ মিনিটে স্পেনের একটি সামরিক জাহাজ সহায়তার জন্য পৌঁছায় সেখানে। কিন্তু আধা ঘণ্টা পর, উরসা মেজরকে পাহারা দিয়ে আনা রাশিয়ার অন্যতম যুদ্ধজাহাজ ‘ইভান গ্রেন’ কাছাকাছি থাকা অন্যান্য নৌযানকে দুই নটিক্যাল মাইল দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। পরে উদ্ধার করা ক্রুদের অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার দাবি জানায় তারা।

স্পেনের সামুদ্রিক উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ তাদের অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান নেয়। জাহাজে কোনো জীবিত ব্যক্তি আটকে আছেন কি না, তা পরীক্ষা করতে তারা একটি হেলিকপ্টার পাঠায়। সিএনএনের দেখা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, স্পেনের একজন উদ্ধারকর্মী জাহাজের ইঞ্জিন রুমে প্রবেশের চেষ্টা করছেন; কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ সিলগালা বা অবরুদ্ধ অবস্থায় পান।

ভিডিও অনুযায়ী, ওই উদ্ধারকর্মী ক্রুদের থাকার জায়গায় কোনো জীবিত মানুষ আছে কি না, তা খোঁজেন এবং কনটেইনারগুলোর ভেতরে উঁকি দেন। সেখানে দুটি কনটেইনারের ভেতর ময়লা-আবর্জনা, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভরা ছিল। তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানিয়েছে, সে সময় উরসা মেজর জাহাজটি বেশ স্থিতিশীল ছিল এবং এটি দ্রুত ডুবে যাওয়ার কোনো লক্ষণ ছিল না।

রুশ পণ্যবাহী জাহাজ উরসা মেজর ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা স্পেনের কার্টাগেনা বন্দরে পৌঁছানোর পর একটি স্প্যানিশ উদ্ধারকারী জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪
রুশ পণ্যবাহী জাহাজ উরসা মেজর ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা স্পেনের কার্টাগেনা বন্দরে পৌঁছানোর পর একটি স্প্যানিশ উদ্ধারকারী জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ছবি: রয়টার্স
 

কিন্তু রাত ৯টা ৫০ মিনিটে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ‘ইভান গ্রেন’ দুর্ঘটনাস্থলের ওপর পরপর কয়েকটি লাল ফ্লেয়ার বা আলোকরশ্মি নিক্ষেপ করে। এর ঠিক পরপরই সেখানে চারটি বিস্ফোরণ ঘটে।

স্পেনের জাতীয় ভূকম্পন নেটওয়ার্ক সিএনএনকে জানিয়েছে, ঠিক ওই সময়ে এবং ওই এলাকার কাছাকাছি একই ধরনের চারটি ভূকম্পন তরঙ্গ বা সংকেত রেকর্ড করা হয়। সংকেতগুলোর ধরন পানির নিচের মাইন বিস্ফোরণ অথবা মাটির ওপর খনি বিস্ফোরণের মতো ছিল।

স্প্যানিশ তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানায়, রাত ১১টা ১০ মিনিটের মধ্যে উরসা মেজর জাহাজটি সম্পূর্ণ ডুবে গেছে বলে নিশ্চিত করা হয়।

উদ্ধার হওয়া রাশিয়ার ১৪ জন নাবিককে কার্টাগেনা বন্দর নগরীতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে স্পেনের পুলিশ ও তদন্তকারীরা তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কাছে দেওয়া স্পেন সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রুশ ক্যাপ্টেন তাঁর নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে জাহাজের মালামাল সম্পর্কে কথা বলতে বেশ অনিচ্ছুক ছিলেন। জাহাজের নথিতে মালামাল হিসেবে যে ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’র কথা উল্লেখ ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জাহাজের খোলের ভেতর কনটেইনারগুলো এমনভাবে রাখা হচ্ছে, যাতে নিচে একটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। পরে ওই ফাঁকা জায়গার ওপর বসানো হয় বড় ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’ দুটি।

অবশেষে রুশ ক্যাপ্টেন স্বীকার করেন যে ওগুলো মূলত সাবমেরিনে ব্যবহৃত চুল্লির মতো দুটি পারমাণবিক চুল্লির যন্ত্রাংশ ছিল। ক্যাপ্টেনের দাবি, চুল্লিগুলোয় কোনো পারমাণবিক জ্বালানি ছিল না। তবে স্পেনের তদন্তকারীরা তাঁর এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি।

তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানিয়েছে, ইগোর আনিসিমভ নামের ওই রুশ ক্যাপ্টেন ধারণা করেছিলেন, পারমাণবিক চুল্লি দুটি পৌঁছে দিতে জাহাজটিকে উত্তর কোরিয়ার রাসোন বন্দরে ঘুরিয়ে নেওয়া হবে। রাশিয়ার বিশাল রেল নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও ২টি ক্রেন, ১০০টি খালি কনটেইনার ও দুটি বড় ম্যানহোলের ঢাকনা বহন করার জন্য কেন এক রুশ বন্দর থেকে অন্য রুশ বন্দরে যাওয়ার মতো দীর্ঘ ও অস্বাভাবিক জলপথ বেছে নেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখছেন স্পেনের তদন্তকারীরা।

তদন্তে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে রাসোন বন্দরে পৌঁছানোর পর ওই সংবেদনশীল মালামাল খালাসের সুবিধার্থেই ক্রেন দুটি জাহাজে তোলা হয়েছিল। ঘটনার কয়েক দিন পর জাহাজের ক্রুদের রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।

সিএনএন ওই রুশ ক্যাপ্টেনের নাম ও চেহারার সঙ্গে মিল থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে তিনি উরসা মেজর জাহাজের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন এবং নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত দাবি করেন।

জাহাজটি ডুবে যাওয়ার চার দিন পর এর মালিকপ্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকস একে একটি ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করে। তারা জানায়, জাহাজে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটেছিল। জাহাজের খোলে ৫০ সেন্টিমিটার/৫০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ছিদ্র পাওয়া গেছে, যার ক্ষতিগ্রস্ত ধাতব অংশটি ভেতরের দিকে দুমড়েমুচড়ে ছিল।

প্রতিষ্ঠানের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘জাহাজের ডেক বোমার স্প্লিন্টার বা টুকরায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।’

তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানায়, এর এক সপ্তাহ পর রাশিয়ার সামরিক বাহিনী আবার দুর্ঘটনাস্থলে ফিরে আসে। ‘ইয়ানতার’ নামের একটি জাহাজ উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষের ওপর টানা পাঁচ দিন অবস্থান করে। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার একটি গবেষণা জাহাজ হিসেবে পরিচিত হলেও ন্যাটো জলসীমায় গুপ্তচরবৃত্তি এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে এর বিরুদ্ধে।

সূত্রটি জানায়, ইয়ানতার ওই স্থান ত্যাগ করার আগে সেখানে আরও চারটি বিস্ফোরণ শনাক্ত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রের তলদেশে থাকা জাহাজের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করতেই এ বিস্ফোরণগুলো ঘটানো হয়েছিল।

বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর সামুদ্রিক যান চলাচল–সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারিতে ‘ইয়ানতার’ জাহাজটি ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। জাহাজটি প্রথমে মিসর ও পরে আলজেরিয়ায় নোঙর করে। ১৫ জানুয়ারি উরসা মেজরের ডুবে যাওয়ার স্থান থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দূরে অবস্থানকালীন একটি সংকেত পাঠায় জাহাজটি।

ভূমধ্যসাগরের তলদেশে প্রধান প্রমাণ

এ ঘটনায় স্পেনের তদন্তের কিছু বিবরণ গত ডিসেম্বরে কার্টাগেনার স্থানীয় সংবাদপত্র লা ভেরদাদে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর পর থেকেই স্পেনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। দেশটির সংসদ সদস্য হুয়ান আন্তোনিও রোহাস মানরিকে সিএনএনকে বলেন, ‘কেউ যখন আপনার চাওয়া তথ্য পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে দেয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ হয় যে তারা কিছু একটা লুকাচ্ছে।’

সংসদ সদস্যদের কাছে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পেন সরকার জানিয়েছে, উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষ প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিটার (৮ হাজার ২০২ ফুট) গভীরে রয়েছে। এত গভীর থেকে জাহাজের তথ্য ধারণকারী ‘ডেটা রেকর্ডার’(ব্ল্যাক বক্স) উদ্ধার করা বড় ধরনের কারিগরি সক্ষমতা ছাড়া অসম্ভব। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও।

তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, মালামালের মধ্যে যদি কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ না-ই থেকে থাকে, তবে সরকার এটিকে কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে? সাবেক মার্চেন্ট মেরিন ক্যাপ্টেন ও বর্তমান সংসদ সদস্য রোহাসও এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘আজকাল যেকোনো দুর্ঘটনায় ব্ল্যাকবক্সগুলো সাধারণত একটি লোকেটর বা অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্রসহ পানির ওপরে ভেসে ওঠে, যেন তা সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। আমার মনে হয়, ব্ল্যাকবক্সটি কারও না কারও হাতে রয়েছে। তবে সেটি স্পেনের কাছে রয়েছে, নাকি রুশরাই উদ্ধার করেছেন, আমরা জানি না।’

উরসা মেজর ডুবে যাওয়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীও এই এলাকার ওপর গভীর নজর রাখছে। উন্মুক্ত ফ্লাইটের তথ্য অনুযায়ী, নেব্রাস্কাভিত্তিক একটি বিরল ও অত্যাধুনিক পরমাণু শনাক্তকারী বিশেষ ‘স্নিফার’ বিমান (মডেল ডব্লিউসি১৩৫-আর) গত এক বছরে দুবার দুর্ঘটনাস্থলের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে। এর মধ্যে প্রথমবার গত বছরের ২৮ আগস্ট ও দ্বিতীয়বার চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি বিমানটি ওই এলাকায় যায়।

নেব্রাস্কার ওফুট ঘাঁটির ৫৫তম উইংয়ের মুখপাত্র ক্রিস পিয়ার্স ওই বিশেষ বিমানের ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিমানটি সাধারণত ‘পারমাণবিক উপকরণের ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ ও তা বিশ্লেষণের’ কাজে সহায়তা করে। তবে তিনি আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট ফ্লাইটের রুট বা পথ, অভিযানের ফলাফল কিংবা কোনো অংশীদার দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে আমরা বাড়তি কোনো তথ্য দিতে পারছি না।’

উরসা মেজর জাহাজটি ডুবে যাওয়ার ১৩ মাস আগেও আরেকটি ‘ডব্লিউসি১৩৫-আর’ বিমান প্রায় একই পথ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। এতে ইঙ্গিত মেলে, এই এলাকার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ জাহাজটি ডুবে যাওয়ার আগে থেকেই ছিল, অথবা এটি তাদের একটি নিয়মিত অভিযানের অংশ।

রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চল বা ইরানের পারমাণবিক তৎপরতা শনাক্ত করতে সাধারণত অত্যন্ত গোপনে এ বিরল ও ব্যয়বহুল বিমানগুলো ব্যবহার করা হয়। তবে উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষ থেকে তারা কোনো তেজস্ক্রিয়তার সন্ধান পেয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

স্পেন সরকারও তাদের দক্ষিণ উপকূলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কার কথা জানায়নি, যা একটি জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

পারমাণবিক প্রযুক্তি ফাঁসের আশঙ্কা

উরসা মেজর জাহাজে থাকা পারমাণবিক চুল্লি দুটি উত্তর কোরিয়ার কাছে পাঠানো হচ্ছিল বলে যে দাবি উঠেছে, তার পেছনে একটি বড় কারণ রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে উত্তর কোরিয়ার সরকার তাদের প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিনের কিছু ছবি প্রকাশ করে। স্থির ছবিগুলোয় দেশটির শীর্ষ নেতা কিম জং–উনকে হাসিমুখে দেখা গেলেও সেখানে শুধু সাবমেরিনের সিলগালা করা মূল কাঠামোটিই দৃশ্যমান ছিল। এর ভেতরে প্রকৃতই কোনো কার্যকর পারমাণবিক চুল্লি আছে কি না, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ‘জেনস’-এর জ্যেষ্ঠ নৌ প্ল্যাটফর্ম বিশ্লেষক মাইক প্লাঙ্কেট বলেন, (উরসা মেজর জাহাজে থাকা) পারমাণবিক চুল্লিগুলো যদি নতুন হয়ে থাকে, তবে জ্বালানিসহ সেগুলো পাঠানোর সম্ভাবনা কম। তিনি আরও বলেন, ‘যদি এই চুল্লিগুলো বাতিল করা কোনো সাবমেরিন থেকে খোলা হয়ে থাকে, তবে সেগুলো অবশ্যই তেজস্ক্রিয় হবে। তবে পুরোদমে জ্বালানি ভরা চুল্লির মতো অতটা মারাত্মক হবে না।’

প্লাঙ্কেট মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত রাশিয়া সহজে নেয়নি। এটি শুধু অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেই সম্ভব। তাই এটি সত্য হলে তা হবে ‘মস্কোর একটি বড় চাল’। তিনি এ ধরনের যেকোনো তৎপরতাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য।

স্পেনের তদন্ত প্রতিবেদনে উত্তর কোরিয়াকে রাশিয়ার একটি কৌশলগত মিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, পিয়ংইয়ং কীভাবে মস্কোকে তার পারমাণবিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলে যুদ্ধ করার জন্য রাশিয়ার পক্ষে অন্তত ১০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েন করার পর পিয়ংইয়ংয়ের এ ধরনের দাবি বা চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

স্পেনের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘উরসা মেজর’ জাহাজে করে সম্ভবত ‘ভিএম-৪এসজি’ মডেলের পারমাণবিক চুল্লি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ মডেলের চুল্লি সাধারণত রাশিয়ার ‘ডেল্টা ফোর’ শ্রেণির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোয় ব্যবহার করা হয়। তবে এ দাবির পক্ষে প্রতিবেদনে খুব সীমিত প্রমাণ দেওয়া হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভ্যান্টরের কাছ থেকে সিএনএন কিছু কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) ছবি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বরের ওই ছবিগুলোয় দেখা যায়, উরসা মেজর জাহাজটি ফিনল্যান্ড উপসাগরের উস্ত-লুগা বন্দরের পূর্ব প্রান্তে নোঙর করে আছে। জাহাজটির মালিকপ্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকসের অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা ভূ-অবস্থান চিহ্নিত ‘টাইম-ল্যাপস’ ভিডিওতেও সেখানে ক্রেন ও কনটেইনার তোলার চিত্র দেখা যায়।

তবে জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর রাশিয়ার সংবাদপত্র ‘কোমারসান্ত’একটি ভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা দাবি করে, ভ্লাদিভোস্টকে নির্মাণাধীন একটি নতুন বরফকাটা জাহাজের পারমাণবিক চুল্লি ঢেকে রাখার ঢাকনা ও বন্দরের ক্রেন বহন করছিল উরসা মেজর।

রুশ পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে রহস্যময় সাদা বস্তু দুটির কোনো উল্লেখ ছিল না।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর উত্তর কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী ৮ হাজার ৭০০ টনের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের নির্মাণস্থল পরিদর্শন করেন
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর উত্তর কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী ৮ হাজার ৭০০ টনের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের নির্মাণস্থল পরিদর্শন করেন, ছবি: রয়টার্স

জাহাজের খোলে ছিদ্র হলো কীভাবে

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য জেনেছেন, এমন একটি সূত্রের বরাতে সিএনএন বলেছে, স্পেনের তদন্তকারীরা প্রথম কোন আঘাতের কারণে জাহাজটি পথ হারিয়েছিল ও কাত হয়ে গিয়েছিল, তা-ও খতিয়ে দেখছেন।

জাহাজের রুশ ক্যাপ্টেন তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, ২২ ডিসেম্বর যখন তাঁর জাহাজের গতি হঠাৎ কমে যায়, তখন তিনি কোনো আঘাত বা বিস্ফোরণের শব্দ শোনেননি। এর ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর ইঞ্জিন রুমের কাছে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ‘সেকেন্ড মেকানিক’ নিকিতিন ও মেকানিক ইয়াকোভলেভ নামের দুজন ক্রু নিহত হন। তাঁদের মরদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

স্পেনের তদন্তকারীদের ধারণা, উরসা মেজরের খোলে ৫০ সেন্টিমিটার/৫০ সেন্টিমিটার আকারের যে ফুটো হয়েছে, তা মূলত ‘ব্যারাকুডা সুপারক্যাভিটেটিং টর্পেডো’র আঘাতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার পাশাপাশি গুটিকয়েক ন্যাটো মিত্রদেশ ও ইরানের কাছে এ ধরনের অত্যাধুনিক ও উচ্চ গতির টর্পেডো রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পানির ঘর্ষণ বা বাধা কমাতে এ টর্পেডোর সামনের অংশ থেকে বাতাস নির্গত হয়। ফলে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুর মূল কাঠামো ভেদ করতে পারে। এই প্রযুক্তির কিছু মডেলে জাহাজ ধ্বংস করার জন্য কোনো বিস্ফোরক ব্যবহারেরও প্রয়োজন পড়ে না।

তদন্তের সূত্রটি জানায়, এ ধরনের টর্পেডোর আঘাতের সঙ্গে উরসা মেজরের খোলে হওয়া ছিদ্রের আকার মিলে যায়। আর এ কারণেই ২২ ডিসেম্বর কোনো শব্দ ছাড়াই জাহাজটিতে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছিল। ফলে সেটির গতি হঠাৎ থমকে যায়।

তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ‘জেনস’-এর বিশ্লেষক মাইক প্লাঙ্কেট মনে করেন, ছিদ্রের আকার ও অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে এটি ‘লিম্পেট মাইন’-এর কাজ। তিনি বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি বা বস্তু জাহাজের খোলের গায়ে একটি বিশেষ বিস্ফোরক বসিয়ে দিয়েছিল।’

এ ঘটনার বিষয়ে জাহাজের রুশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকস এবং রাশিয়া, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

সিএনএনের যোগাযোগ করা একাধিক পশ্চিমা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা ঘটনাটিকে ‘রহস্যময়’ বলে বর্ণনা করেছেন। স্পেনের তদন্তের কিছু সিদ্ধান্তকে তাঁদের কাছে ‘অতিরঞ্জিত’ মনে হলেও জাহাজটিতে প্রথম আঘাত বা রাশিয়ার এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে অন্য কোনো স্বাভাবিক কারণ তাঁরা দেখাতে পারেননি। এ কারণে উরসা মেজর মালামালের প্রকৃত রহস্য ও এটি ডুবে যাওয়ার কারণ এখনো সমুদ্রের তলদেশেই চাপা পড়ে রয়েছে।

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠকটি শুরু হয়।

এই বৈঠকে দুই দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনা সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেটে হেগসেথ, বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ও বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।

সম্প্রতি বাণিজ্য উত্তেজনা, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে নতুন সমঝোতার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

দুই বিশ্ব নেতা ইরান যুদ্ধ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়েও আলোচনা করতে পারেন। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এশিয়ায় তেল আর এলএনজি পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও রয়েছে।

বৈঠকে শুরুর বক্তব্যে শি জিনপিং বলেন, সারা বিশ্ব আমাদের এই বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এমন এক রূপান্তর ত্বরান্বিত হচ্ছে যা গত এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত পরিবর্তনশীল ও অশান্ত।

ট্রাম্প বলেন, আমরা এক ছিলাম। যখনই কোনো সমস্যা হয়েছে আমরা সমাধান করেছি। আমি আপনাকে কল দিতাম। আপনি আমাকে কল দিতেন। মানুষ জানে না যখনই আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়েছে, আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে এটির সমাধান করেছি।

এর আগে, বুধবার (১৩ মে) বেইজিং পৌঁছান ট্রাম্প। এ সময় বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের পর এটিই ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর।

 

ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আজ রাজধানী নয়াদিল্লির গুরুগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়।

বুধবার (১৩ মে) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে বুধবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ নিয়ে মোট তিনবার হাসপাতালে ভর্তি করা হলো ৭৯ বছর বয়সী রাজ্যসভার এই সদস্যকে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলেছে, সোনিয়া গান্ধীর ছোট একটি অস্ত্রোপচারের জন্য গুরুগ্রামের ‘মেদান্ত- দ্য মেডিসিটি’ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে তার বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরীক্ষা চলছে।

এর আগে, গত মার্চ মাসে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। সে সময় পরীক্ষায় শরীরে সিস্টেমিক ইনফেকশন ধরা পড়ে এবং অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তার চিকিৎসা করা হয়েছিল। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তখন তাকে কয়েক দিন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

তারও আগে রুটিন চেকআপের জন্য তাকে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছিল।

দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইকে হাসপাতালের একটি সূত্র বলেছে, সোনিয়া গান্ধী দীর্ঘস্থায়ী কাশির সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে দিল্লির বায়ুদূষণের কারণে তাকে নিয়মিত বিরতিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে আসতে হয়।

 

শান্তি আলোচনা ঘিরে অচলাবস্থার কারণে ইরান যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আজ বুধবার চীন পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সফরে ওয়াশিংটনের বাণিজ্য–সংশ্লিষ্ট বিষয় বেশি গুরুত্ব পাবে। তবে একই সঙ্গে আলোচনায় ইরান যুদ্ধের বিষয়টিও স্থান পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ বেইজিং পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এর আগে সর্বশেষ তিনি চীন সফরে গিয়েছিলেন নিজের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালে। ট্রাম্পকে লালগালিচায় বরণ করে নিতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।

বিমানবন্দর ছাড়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরাই দুই পরাশক্তি। সামরিক শক্তির দিক থেকে আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ও পরদিন শুক্রবার বৈঠকের কথা রয়েছে।

এমন এক সময়ে ট্রাম্প বেইজিং গেলেন, যখন ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির জন্য এক মাসের বেশি চেষ্টা করেও সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান এ সমঝোতা নিয়ে বর্তমানে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প কয়েক দিন ধরে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, চুক্তি না হলে তিনি ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর নির্দেশ দিতে পারেন। অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের হামলার দ্রুত জবাব দিতে ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রয়েছে। ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে চীন। যুদ্ধের কারণে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ থাকায় অন্য দেশগুলোর পাশাপাশি চীনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারাও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের অবসান চায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে চীন জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তিতে তেহরান চীন ও রাশিয়ার মতো জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যদের নিশ্চয়তা চাইবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি চীন সফর করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। চীনের পাশাপাশি রাশিয়াও তেহরানের কৌশলগত মিত্র।

অবশ্য চীন সফরের আগে গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান বিষয়ে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে হোক বা অন্য কোনোভাবে, আমরাই এই যুদ্ধে জয়ী হব।’ ইরান সংকট সমাধানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাহায্যের প্রয়োজন দেখছেন কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প এ কথা বলেন।

তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প যতই বলুন না কেন ইরান যুদ্ধ বন্ধে চীনের প্রয়োজন হবে না, প্রকৃত বিষয় হলো সির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গটি গুরুত্বসহকারে ওঠাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বেইজিংকে উৎসাহিত করবেন, যাতে তারা তেহরানকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করাতে রাজি করায়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্রেজিয়ার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে এবং সমঝোতায় সম্মত হতে চাপ দিতে অন্তত সি চিন পিংকে পাশে পেতে চাইবেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।’

রয়টার্স
এএফপি

ম্যানিলা

যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করেছে যে ইরানের সামরিক শক্তি ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া’ হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনো বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে দেশটির।

গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ইরানের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু এবং শত্রুজাহাজগুলোর দিকে তাক করা রয়েছে। চূড়ান্ত নির্দেশ পেলেই বাহিনীগুলো আঘাত হানতে প্রস্তুত।
মজিদ মুসাভি, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার
 

নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, চলতি মে মাসের শুরুতে তৈরি করা ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরান তার অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কার্যক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির পাশে অবস্থিত ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে।

গোপন প্রতিবেদনের তথ্য জানেন এমন ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগের তুলনায় বর্তমানে (সামগ্রিকভাবে) ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণ যন্ত্র (মোবাইল লঞ্চার) অক্ষত রয়েছে।

হরমুজ প্রণালির কাছে ওমান সাগরের উপকূলে ‘ভেলায়াত-৯০’ সামরিক মহড়া চলাকালে ‘নাসর’ নামের একটি দূরপাল্লার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। ২ জানুয়ারি ২০১২
হরমুজ প্রণালির কাছে ওমান সাগরের উপকূলে ‘ভেলায়াত-৯০’ সামরিক মহড়া চলাকালে ‘নাসর’ নামের একটি দূরপাল্লার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। ২ জানুয়ারি ২০১২, ছবি: রয়টার্স
 

গোয়েন্দা তথ্যে আরও বলা হয়, ইরানজুড়ে মাটির নিচে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও উৎক্ষেপণ ঘাঁটির প্রায় ৯০ শতাংশই এখন ‘আংশিক বা পুরোপুরি সচল’। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস ইরানের সামরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী ওয়েলস বলেন, ইরান ভালো করেই বোঝে যে তাদের ‘বর্তমান পরিস্থিতি টেকসই নয়’।

অলিভিয়া ওয়েলস আরও মন্তব্য করেন, যাঁরা ভাবছেন, ইরান তার সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করেছে, তাঁরা হয় বিভ্রান্তিতে আছেন, না হয় ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের হয়ে কথা বলছেন।

হামলা চলাকালে ট্রাম্প একের পর এক দাবি করেছিলেন যে এই হামলার ব্যাপকতা অনেক বড় এবং তা ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। তবে যুদ্ধকালে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংবেদনশীল ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে কমপক্ষে ১০০টি ধাপে ধারাবাহিক পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

হামলা চলাকালে ট্রাম্প একের পর এক দাবি করেছিলেন যে এই হামলার ব্যাপকতা অনেক বড় এবং তা ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। তবে যুদ্ধকালে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংবেদনশীল ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে কমপক্ষে ১০০টি ধাপে ধারাবাহিক পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বারবার বিজয় দাবি করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হলেও তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় রয়েছেন। গত মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিদ মুসাভি জানিয়েছিলেন, যুদ্ধবিরতির সময় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ যন্ত্রের সংখ্যা যুদ্ধের আগের চেয়েও বাড়িয়ে নিয়েছে।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালানো হচ্ছে
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালানো হচ্ছে, ফাইল ছবি: এএফপি
 

গত শনিবার মুসাভি বলেন, ইরানের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু এবং শত্রুজাহাজগুলোর দিকে তাক করা রয়েছে। চূড়ান্ত নির্দেশ পেলেই বাহিনীগুলো আঘাত হানতে প্রস্তুত।

নিউইয়র্ক টাইমস

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইরাক ও পাকিস্তান—দুই দেশই ইরানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র রয়টার্সকে এমন তথ্য দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ চলার মধ্যে এমন চুক্তির খবর পাওয়া গেছে।

অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষক ক্লদিও স্টয়ার বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে এমন একটি অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে, যেখান থেকে সাধারণত বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে। যদিও ইরান শুরুতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে চেয়েছিল, তবে এখন সেই অবস্থান বদলাচ্ছে।

ক্লদিও স্টয়ার আরও বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার অবস্থান থেকে সরে এসে এখন সেখানে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করছে। হরমুজ এখন আর নিরপেক্ষ নৌপথ নয়, এটি এখন নিয়ন্ত্রিত করিডর।’

সাধারণত ইরাকের বেশির ভাগ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়েই রপ্তানি করা হয়। প্রণালিটি কার্যত বন্ধ থাকায় যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার একটি ইরাক। অন্যদিকে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা পাকিস্তানও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশটিতে জ্বালানির দাম অনেক বেড়ে গেছে।

বাগদাদ ও তেহরানের মধ্যে আগে প্রকাশ না হওয়া একটি চুক্তির আওতায় গত রোববার ইরাকের তেলবাহী বিশাল দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।

প্রাথমিক চুক্তি ও চলমান আলোচনা সম্পর্কে অবগত থাকা ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, আরও জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেতে তাঁর দেশ এখন ইরানের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ, ইরাকের বাজেটের ৯৫ শতাংশই তেল থেকে আসা আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ইরাক ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাই ইরাকের অর্থনীতি খারাপ হলে দেশটিতে ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা এবং জাহাজ চলাচল খাতের একটি সূত্রও তেহরানের সঙ্গে এসব আলোচনার কথা নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় সব সূত্রই নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে ইরাক সরকারের এক মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

পাকিস্তানের জন্য কাতারের এলএনজি

শিল্প খাতের দুটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ইসলামাবাদ ও তেহরানের মধ্যে আলাদা একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর কাতারের এলএনজি বহনকারী দুটি ট্যাংকার এখন পাকিস্তানের দিকে যাচ্ছে। তবে গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই দুই সূত্রও নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে পাকিস্তানে প্রতি মাসে প্রায় ১০টি এলএনজি কার্গো যেত। এখন গরমের মৌসুমে বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে দেশটির জ্বালানির প্রয়োজন বেড়েছে।

সূত্রগুলো বলেছে, ইরাক বা পাকিস্তান এসব জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেতে ইরান বা ইরানের বিপ্লবী গার্ডকে (আইআরজিসি) সরাসরি কোনো অর্থ দেয়নি।

সূত্র আরও বলেছে, কাতার সরাসরি এসব দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে যুক্ত ছিল না। তবে পাকিস্তানে জ্বালানি পাঠানোর আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিষয়টি জানিয়েছিল।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তারা কোনো জবাব দেয়নি। একইভাবে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

রয়টার্স

দীর্ঘ ৯ বছর পর আবারও চীন যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার (১৩ মে) মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেইজ অ্যান্ড্রুস থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওয়ানা দেয় ট্রাম্পকে বহনকারী এয়ার ফোর্স ওয়ান। 

মার্কিন প্রেস সচিব অ্যানা কেলি জানিয়েছেন, বুধবার (১৩ মে) বেইজিং পৌঁছানোর পর ট্রাম্পকে এক রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হবে। 

পরদিন বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দুই বিশ্ব নেতার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ট্রাম্প ঐতিহাসিক ‘টেম্পল অফ হেভেন’ পরিদর্শন করবেন এবং শি জিনপিংয়ের দেওয়া রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেবেন। 

এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে থাকছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা। 

হোয়াইট হাউস সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলে রয়েছেন টেসলা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক, অ্যাপল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী টিম কুক, বোয়িংয়ের শীর্ষ নির্বাহী কেলি অর্টবার্গ এবং জিই অ্যারোস্পেসের ল্যারি কাল্পসহ আরও অনেকে। 

ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে সর্বশেষ বৈঠকটি হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে। সংক্ষিপ্ত ওই বৈঠকে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা তিন অঙ্কের শুল্ক স্থগিত করেছিলেন। 

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে দুই শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ নিরসনের পথ প্রশস্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক তিয়ানআনমেন স্কয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। 

এই সফর দুই পরাশক্তির দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বর্তমানে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি চীনের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উৎপাদন খরচ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় বেইজিং এই যুদ্ধের অবসান চায়। 

 

ভারতের আসামে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এ নিয়ে টানা দুই মেয়াদে রাজ্যটিতে ক্ষমতায় থাকছেন তিনি। হিমন্তের পাশাপাশি আজ মঙ্গলবার রাজধানী গুয়াহাটিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সরকারের চার মন্ত্রীও শপথ নেন।

শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো আসামের ক্ষমতা নিজেদের কাছে ধরে রাখল কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা দল বিজেপি।

হিমন্ত বিশ্বশর্মা কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। ২০১৫ সালে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। এরপর ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো আসামের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। আসামের এবারের বিধানসভা নির্বাচনে মোট ১২৬ আসনের মধ্যে ১০২ আসন পেয়েছে হিমন্তের দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ। এর মধ্যে শুধু বিজেপিই পেয়েছে ৮২টি আসন।

হিন্দুস্তান টাইমস

মস্কো