পৃথিবীর বুকে মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় উপাদান হলো বিশুদ্ধ পানি। কিন্তু এই পানির বুকেই যখন বিষাক্ত আর্সেনিক লুকিয়ে থাকে, তখন তা মানব সভ্যতার জন্য এক নীরব মহাবিপর্যয় ডেকে আনে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে আর্সেনিকযুক্ত দূষিত পানি পানের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছেন। বড় বড় আধুনিক পানি শোধনাগারগুলো পানি থেকে আর্সেনিক দূর করতে পারলেও, দরিদ্র ও অনুন্নত অঞ্চল কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ নলকূপের পানিতে আর্সেনিক বিষক্রিয়ার সমস্যা থেকেই যায়। এবার বিশেষ ধরনের টি-ব্যাগের মাধ্যমে পানি থেকে ৯০ শতাংশেরও বেশি আর্সেনিক সফলভাবে দূর করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভিক টান নামের এক শিক্ষার্থী। যুক্তরাষ্ট্রের কেমিক্যাল সোসাইটির বিজ্ঞান সাময়িকী এসিএস ওমেগাতে প্রকাশিত এই গবেষণা ফলাফলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানুষের পানের জন্য প্রতি লিটার পানিতে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিকের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু মাটির নিচের খনিজ থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে কিংবা খনি খননের মতো মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা এই সীমার চেয়ে অনেক বেশি থাকে। সাধারণত এই বিষ দূর করতে রিভার্স অসমোসিসের মতো অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ও ব্যয়বহুল ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো যেসব অঞ্চলে বড় বড় পানি শোধনাগার নেই, সেখানে আর্সেনিকের প্রকোপ অনেক বেশি। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় ভুগছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসার ও শিশুদের মানসিক বিকাশের মতো নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই চরম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানী অ্যাডাম ব্রাউনশগের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করার সময় ভিক টান আর্সেনিক দূর করার সহজ একটি পদ্ধতির কথা জানান, যা মূলত এক কাপ চা বানানোর মতোই সহজ।
নিজের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের বিষয়ে ভিক টান বলেন, বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার বিষয়টি কোনো দামি বা বড় অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। আমাদের এই গবেষণা প্রমাণ করে খুব সাধারণ এবং কম খরচের উপাদানগুলোকেও বৈজ্ঞানিক উপায়ে উন্নত করে পানি থেকে আর্সেনিক দূর করার মতো বড় ও মাপযোগ্য সমাধানে রূপ দেওয়া সম্ভব। এটি বিশ্বের অন্যতম জরুরি জনস্বাস্থ্য সংকটের একটি সহজ সমাধান।
বিজ্ঞানীরা আগেই আবিষ্কার করেছিলেন, চা তৈরির প্রক্রিয়া চলাকালীন পানির ভেতরে থাকা আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুগুলো স্বাভাবিকভাবেই টি-ব্যাগের গায়ে আটকে যায়। এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে ভিক টান এবং অন্য বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে আর্সেনিক শুষে নেওয়ার উপযোগী একটি টি-ব্যাগের নকশা করেন। এরপর তাঁরা চুম্বকীয় আয়রন অক্সাইড ন্যানোকণা এবং গুঁড়া করা ডিমের খোসা দিয়ে পূর্ণ করেন টি-ব্যাগটি। বিজ্ঞানীদের মতে, এই দুটি উপাদানই পানি থেকে আর্সেনিক শুষে নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। ফলাফল ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। মাত্র একটি টি-ব্যাগ পানি থেকে অন্তত ৯০ শতাংশ আর্সেনিক আয়রন দূর করতে পেরেছে। ৬ ঘণ্টার একটি বিশেষ পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি ৫০ মিলিলিটার দূষিত পানি থেকে ৯৮ শতাংশের বেশি আর্সেনিক টেনে নিয়েছে।
বাংলাদেশের নলকূপে পাওয়া আর্সেনিকযুক্ত পানির নমুনার মতো তৈরি একটি বিশেষ মিশ্রণে টি–ব্যাগটির পরীক্ষা করেছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গেছে, টি-ব্যাগটি পানির আর্সেনিককে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়েও নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। একটি ব্যবহৃত টি-ব্যাগ ফেলে না দিয়ে সেটিকে আবার পরিষ্কার করে, ক্ষারীয় দ্রবণে ধুয়ে ও শুকিয়ে নিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচবার পর্যন্ত পুনরায় ব্যবহার করা যায়। তবে প্রতিবার ব্যবহারের পর এর আর্সেনিক দূর করার ক্ষমতা প্রায় ২০ শতাংশ করে কমতে থাকে। এই টি-ব্যাগের সাহায্যে মাত্র এক লিটার পানি সম্পূর্ণ আর্সেনিকমুক্ত করতে খরচ হয় মাত্র ৭ সেন্ট। এটি রিভার্স অসমোসিসের মতো দামি প্রযুক্তির তুলনায় অনেক কম সাশ্রয়ী।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই কাজ একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যার নতুন এবং সহজ সমাধান প্রদর্শন করে। তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো এই উদ্ভাবনকে আরও উন্নত করে দ্রুত সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম আর্সেনিকপ্রবণ অঞ্চল। ডিমের খোসা এবং আয়রন অক্সাইডের মতো সহজলভ্য উপাদান দিয়ে তৈরি এই টি-ব্যাগ প্রযুক্তি যদি এ দেশের গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে খুব সহজেই ঘরে ঘরে প্রতিদিনের খাবার পানিকে শতভাগ নিরাপদ করা সম্ভব হবে।
সূত্র: ফিজিস
জাহিদ হোসাইন খান