• Colors: Blue Color

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান ভয়াবহ সংঘাত এবার সম্পূর্ণ নতুন ও চরম বিপজ্জনক এক বাঁকে মোড় নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এ পর্যন্ত মূলত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ৩৫তম দিন শুক্রবার (৩ এপ্রিল) দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর সংঘাতের বারুদ প্রথমবার সরাসরি শত্রু ভূখণ্ডের স্থলভাগে আছড়ে পড়েছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিধ্বস্ত বিমানের নিখোঁজ পাইলটকে যেকোনো মূল্যে উদ্ধার করতে ইতোমধ্যে সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর (স্পেশাল ফোর্স) তুখোড় কমান্ডোরা।

ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার ভোরের দিকে। মার্কিন প্রশাসন পুরো আকাশ জুড়ে তাদের শতভাগ আধিপত্য রয়েছে বলে দাবি করে আসলেও ইরানের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হঠাৎ বড় আঘাত হেনে একটি সচল মার্কিন যুদ্ধবিমানকে মাটিতে নামিয়ে আনে। এফ-১৫ মডেলের এই শক্তিশালী যুদ্ধবিমানে সাধারণত দুজন ক্রু থাকেন। বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পরপরই পেন্টাগনের নির্দেশে অত্যন্ত গোপনীয় ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এক ‘কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ অপারেশন শুরু হয়। বিমান থেকে প্যারাশুটে নেমে আসা প্রথম ক্রু বা পাইলটকে মার্কিন হেলিকপ্টার টিম নাটকীয়ভাবে অক্ষত অবস্থায় তুলে নিয়ে আসতে সক্ষম হলেও বিমানের দ্বিতীয় ক্রু অর্থাৎ ‘উইপেন সিস্টেমস অফিসার’ বা অস্ত্র ব্যবস্থা কর্মকর্তা গভীর ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়েন।

পেন্টাগনের সূত্র এবং টেলিগ্রাফের খবর অনুযায়ী, মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের উদ্ধারকারী দল যখন রাতের আঁধারে ইরানে প্রবেশ করে নিখোঁজ সেনাকে খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছিল, তখন তারা ইরানের বর্ডার পুলিশ ও স্থানীয় সশস্ত্র মিলিশিয়াদের প্রবল বাধার মুখে পড়ে। চারপাশ থেকে হালকা অস্ত্র ও ভারী মেশিনগান দিয়ে হেলিকপ্টার এবং স্থল টিমকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিতে মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের লেজে আগুন লেগে যায় এবং ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সেটি কোনোমতে ইরাক সীমান্তে গিয়ে জরুরি অবতরণ করে।

আমেরিকা যেখানে নিজেদের সেনাকে যেকোনো মূল্যে শত্রুর সীমানা থেকে অক্ষত ফিরিয়ে আনতে মরিয়া, ইরান সেখানে এই ঘটনাকে দেখছে যুদ্ধজয়ের এক বিশাল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে। মার্কিন ওই পাইলটকে যুদ্ধবন্দি করতে পারলে ওয়াশিংটনের নৈতিক মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব— এই উদ্দেশ্যে তেহরান ওই সেনাকে জীবিত বা মৃত ধরে দিতে ৬০ হাজার ডলার নগদ পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

পুরস্কারের আশায় সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় মিলিশিয়ারাও এখন পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতিটি ভাঁজে লাঠিসোটা ও অস্ত্র নিয়ে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা চলমান যুদ্ধকে এক অন্ধগলিতে ফেলে দিয়েছে।

উল্লেখ্য, বিগত প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে একের পর এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালাচ্ছে। তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের নির্বিচার বোমাবর্ষণে ইতোমধ্যেই দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সহস্রাধিক ইরানি প্রাণ হারিয়েছেন। খামেনির প্রয়াণের পর দেশটিতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং তীব্র রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হলেও ইরান থেমে থাকেনি। তারা মার্কিন-ইসরায়েলি এই সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই দাঁতভাঙা ও বিধ্বংসী জবাব দিয়ে আসছে।

 

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ গতকাল শুক্রবার এক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

নাম প্রকাশ না করা সূত্রটি জানায়, গত বুধবার নাম প্রকাশ না করা একটি বন্ধু দেশের মাধ্যমে এ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল।

তবে সেই প্রস্তাব বা এর সত্যতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য বা নিশ্চিত করার তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফার্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী যখন ক্রমাগত উত্তেজনা ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তখনই এ প্রস্তাব সামনে আসে। বিশেষ করে কুয়েতের বুবিয়ান দ্বীপে একটি মার্কিন সামরিক গুদামে হামলার পর যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে। ইরান এই প্রস্তাবের কোনো লিখিত জবাব দেয়নি, বরং হামলার তীব্রতা বাড়িয়ে মাঠেই এর পাল্টা জবাব দিয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৪০ জন নিহত হয়েছেন। জবাবে ইরানও ইসরায়েলসহ জর্ডান, ইরাক এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এমন উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স, আনাদোলু এজেন্সি ও দ্য হিন্দু

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আরও বড় ধরনের হামলার হুমকি দেওয়ার পরই এমনটি ঘটেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে ইরানে ‘অত্যন্ত কঠোরভাবে’ হামলা চালানো হবে। তবে যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা দেননি। খবর বিবিসির।

ট্রাম্পের ওই ভাষণের পরপরই বিশ্ববাজারে আজ শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড জ্বালানি তেলের মূল্য সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের মূল্যও ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপর উঠে যায়, যদিও পরে কিছুটা কমে আসে।

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগির এই যুদ্ধের ‘কৌশলগত লক্ষ্য’ পূরণ করবে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ ইরানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চলবে।

এর আগে গত বুধবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। বাজারে আশা ছিল, ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সরে আসবে, সে বিষয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু তাঁর ভাষণে আগের অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে এ পথ দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান।

ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা নেই। তিনি অন্য দেশগুলোকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

জ্বালানি খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইন্টারক্যাপিটাল এনার্জির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলবার্তো বেলোরিন বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধবিরতির আশাবাদে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, বাজার তা থেকে সরে এসেছে। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে এখন সপ্তাহ নয়, মাসও লাগতে পারে।

ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, যুদ্ধ শেষ হলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

ইরানে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের একজন ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ওই কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, মার্কিন বাহিনী উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ওই ক্রুকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

ট্রাম্পকে জানানো হয়েছে: হোয়াইট হাউস

ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র: বিবিসি

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার কথা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে স্বীকার করেছেন মার্কিন এক কর্মকর্তা। সেই যুদ্ধবিমানে পাইলটদের খুঁজতে মার্কিন একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ওই এলাকায় গেলে সেটিকেও ভূপাতিত করা হয়েছে।

ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত হয় বলে উল্লেখ করেছে মেহর নিউজ এজেন্সি।

সূত্র: আল–জাজিরা।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব