• Colors: Blue Color

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই ইরান নিজেদের সামরিক–পারমাণবিক ক্ষেত্র ও স্থাপনা মেরামত এবং নতুন অবকাঠামো তৈরির কাজ করছে। সম্প্রতি কয়েকটি স্যাটেলাইট ইমেজ পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইরান তাদের একটি সংবেদনশীল সামরিক ক্ষেত্রে নতুন একটি স্থাপনা তৈরির পর সেটির ওপর কংক্রিটের ঢাল তৈরি করে তা মাটি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।

স্যাটেলাইট দিয়ে তোলা এসব ছবিতে দেখা যাচ্ছে, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পারমাণবিক স্থাপনার সুড়ঙ্গের প্রবেশদ্বারগুলো মাটিতে ঢেকে দিয়েছে ইরান। অন্য একটি স্থাপনার কাছে সুড়ঙ্গের প্রবেশদ্বারগুলোকে মজবুত করেছে এবং সংঘর্ষের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো মেরামত করেছে।

গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইরানে কয়েকটি পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে যেসব পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—

পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স

রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত পারচিন কমপ্লেক্স ইরানের সবচেয়ে সংবেদনশীল সামরিক ঘাঁটির একটি।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, তেহরান দুই দশকের বেশি সময় আগে সেখানে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ সম্পর্কিত পরীক্ষা চালিয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল বারবার ইরানের পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। এখানে ওপরে হামলার আগের এবং নিচে হামলার পরের ছবি
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল বারবার ইরানের পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। এখানে ওপরে হামলার আগের এবং নিচে হামলার পরের ছবি, ছবি: রয়টার্স
 

ইরান সব সময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল বারবার পারচিনে হামলা চালায়।

ওই হামলার আগে ও পরে তোলা স্যাটেলাইট ছবি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, হামলায় পারচিনের একটি আয়তাকার ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সেখানে পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।

১২ অক্টোবর ২০২৫ এর ছবিতে সেখানে আরও উন্নয়ন কার্যক্রমের তৎপরতা চিত্রে দেখা যাচ্ছে। সেখানে একটি নতুন ভবনের কাঠামো দেখা যাচ্ছে, তার পাশে দুটি ছোট ভবন। ১৪ নভেম্বরের ছবিতে কাজের অগ্রগতি স্পষ্ট। সেদিনের ছবিতে বড় ভবনের ওপর কংক্রিটের ছাদ বসানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তারপর ১৩ ডিসেম্বরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, স্থাপনার কিছু অংশ ঢেকে গেছে। ১৬ ফেব্রুয়ারির ছবিতে স্থাপনাটি সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কংক্রিটের একটি কাঠামোর আড়ালে সেটিকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস) ২২ জানুয়ারি তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, ওই স্থাপনার নতুন নির্মিত ভবনের চারপাশে কংক্রিটের ঢিবির মতো কাঠামো নির্মাণের কাজ অগ্রসর হচ্ছে। তারা ওই স্থাপনাটিকে তলেঘান–২ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ইস্পাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ মাটিতে ঢাকা

ইস্পাহান কমপ্লেক্স হলো ওই তিনটি ইরানি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের একটি, যেখানে গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা চালিয়েছিল।

পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের অংশ হিসেবে থাকা স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি ইস্পাহান কমপ্লেক্সে একটি ভূগর্ভস্থ এলাকা রয়েছে। কূটনীতিকদের ধারণা, ইরানের বেশির ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ভূগর্ভস্থ ওই এলাকায় সংরক্ষিত আছে।

স্যাটেলাইটের ছবিতে ইস্পাহানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সে সুড়ঙ্গ প্রবেশদ্বারগুলো মাটিতে ঢাকা রয়েছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা
স্যাটেলাইটের ছবিতে ইস্পাহানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সে সুড়ঙ্গ প্রবেশদ্বারগুলো মাটিতে ঢাকা রয়েছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা, ছবি: রয়টার্স
 

আইএসআইএস জানিয়েছে, জানুয়ারির শেষ দিকে তোলা ছবিতে ইস্পাহান কমপ্লেক্সের দুটি সুড়ঙ্গ প্রবেশদ্বার মাটিতে ঢাকার নতুন প্রচেষ্টা দেখা গেছে।

৯ ফেব্রুয়ারি হালনাগাদ তথ্যে আইএসআইএস বলেছে, তৃতীয় প্রবেশদ্বারও মাটিতে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে গেছে। এর অর্থ, এখন সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সটির সব প্রবেশদ্বার ‘সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে’।

নাতাঞ্জের কাছের কমপ্লেক্সের সুড়ঙ্গের মুখগুলো মজবুত করা হয়েছে

আইএসআইএস জানিয়েছে, স্যাটেলাইট ছবিগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে নাতাঞ্জ কমপ্লেক্সের কাছের একটি পাহাড়ের নিচে থাকা সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সের দুটি প্রবেশপথ ‘শক্তিশালী ও প্রতিরক্ষামূলকভাবে মজবুত’ করার কাজ চলছে।

নাতাঞ্জে ইরানের বাকি দুটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে। পাহাড়ের নিচে থাকা এই সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সটি নাতাঞ্জ কমপ্লেক্স থেকে ২ কিলোমিটার দূরে।

স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে নাতাঞ্জ কমপ্লেক্সের কাছের একটি স্থাপনার দুইটি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথকে শক্তিশালী ও মজবুত করার কাজ চলছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা
স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে নাতাঞ্জ কমপ্লেক্সের কাছের একটি স্থাপনার দুইটি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথকে শক্তিশালী ও মজবুত করার কাজ চলছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা, ছবি: রয়টার্স
 

আইএসআইএস আরও বলেছে, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পুরো কমপ্লেক্সজুড়ে কর্মযজ্ঞ চলছে। ছবিতে সেখানে বহু যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ডাম্প ট্রাক, সিমেন্ট মিক্সার এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতিও রয়েছে।

‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি নিয়ে ইরান কী পরিকল্পনা নিয়েছে, তা স্পষ্ট নয় বলেও জানিয়েছে আইএসআইএস।

দক্ষিণ শিরাজের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি

দক্ষিণ ইরানের শিরাজ শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি মাঝারি-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম ইরানের ২৫টি প্রধান ঘাঁটির একটি। ইসরায়েলি সংস্থা আলমা রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত বছরের যুদ্ধে এই স্থাপনাটি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতির শিকার হয়েছে।

স্যাটেলাইটের ছবিতে ইরানের শিরাজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি। বাম দিকের ছবিতে (৩ জুলাই ২০২৫) পুনর্নির্মাণের আগে এবং ডান দিকের ছবিতে (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) পুনর্নির্মাণ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজের পর ঘাঁটির অবস্থা দেখা যাচ্ছে

স্যাটেলাইটের ছবিতে ইরানের শিরাজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি। বাম দিকের ছবিতে (৩ জুলাই ২০২৫) পুনর্নির্মাণের আগে এবং ডান দিকের ছবিতে (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) পুনর্নির্মাণ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজের পর ঘাঁটির অবস্থা দেখা যাচ্ছে,ছবি: রয়টার্স

৩ জুলাই ২০২৫ এবং ৩০ জানুয়ারি তোলা ছবিগুলোর তুলনা করলে দেখা যায়, ঘাঁটির প্রধান লজিস্টিকস এলাকা এবং সম্ভাব্য কমান্ড কম্পাউন্ডে পুনর্নির্মাণ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে।

কোম ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি

আলমার মতে, কোম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই ঘাঁটির ভূপৃষ্ঠের ওপরের অংশ মাঝারি মাত্রার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গুডহাইন্ডের মতে, ১৬ জুলাই ২০২৫ এবং ১ ফেব্রুয়ারি তোলা ছবিগুলোর তুলনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ওপর একটি নতুন ছাদ তৈরি করা হয়েছে। ছাদ মেরামতের কাজ ১৭ নভেম্বর শুরু হয়েছিল এবং সম্ভবত ১০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আজ বৃহস্পতিবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের উদ্বোধনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বৈঠকে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গাজা পুনর্গঠনের কৌশল ও অর্থায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ওয়াশিংটনের ‘ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিস’-এ শান্তি পর্ষদের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা এ পর্ষদ থেকে নিজেদের কিছুটা সতর্ক দূরত্বে রাখলেও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ এতে যোগ দিচ্ছে।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই পর্ষদের ‘অসীম সম্ভাবনা’র প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘শান্তি পর্ষদ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে প্রমাণিত হবে।’ ট্রাম্প নিজেই এ পর্ষদের আজীবন চেয়ারম্যান।

তবে সমালোচকেরা এ পর্ষদকে ট্রাম্পের ‘সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই পর্ষদ কার্যত জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই তৈরি করা হয়েছে।

পর্ষদে কারা থাকছে, কারা থাকছে না

এ পর্ষদের সদস্য হিসেবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এই দুই নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তবে এ পর্যন্ত শুধু নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন; যদিও ‘গাজা নির্বাহী পর্ষদে’ তুরস্ক ও কাতারের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ।

হোয়াইট হাউস মোট ৫০টি দেশকে এ পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও ৩৫টি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি দেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তালিকায় নাম লিখিয়েছে। অন্যদিকে ১৪টি দেশ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

আজ ওয়াশিংটনের বৈঠকে অংশ নিতে যাওয়া দেশগুলোর কয়েকটির জন্য বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক নয়; অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে এ উদ্বোধনী বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত হবে, তা তাদের নিজ নিজ দেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে কারা আসছেন? কারা আসছেন না?

সমালোচকেরা এ শান্তি পর্ষদকে ট্রাম্পের ‘সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এ পর্ষদ কার্যত জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই তৈরি করা হয়েছে।

উদ্বোধনী বৈঠকের এজেন্ডা

উদ্বোধনী বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য হলো, গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা। ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে গাজা বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে; যে যুদ্ধে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়ে আসছে।

পর্ষদের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে ‘গাজার মানবিক ও পুনর্গঠন প্রচেষ্টায়’ ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার তহবিলের ঘোষণা আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাজায় শান্তি বজায় রাখতে একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স) গঠনের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে। গত বছর ঘোষিত ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বাহিনী গাজায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবে।

এ পরিকল্পনায় গাজায় ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও অন্তর্বর্তী সময়ে গাজা শাসনের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ শাসন কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

গত মাসে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈঠকের ফাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ শান্তি পর্ষদস্বরূপ উন্মোচন করা হয়েছে। সেখানে ট্রাম্পের জামাতা ও পর্ষদের নির্বাহী সদস্য জ্যারেড কুশনার গাজা পুনর্গঠনে একটি চকচকে রূপরেখা তুলে ধরেন। এর মধ্যে গাজা উপত্যকাকে সমুদ্রসৈকতের অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা ও সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে ফিলিস্তিনি অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীগুলো একে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ পরিকল্পনা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

শান্তি পর্ষদ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে প্রমাণিত হবে।ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট

১৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে জানান, শান্তি পর্ষদের সদস্যরাষ্ট্রগুলো ‘গাজাবাসীর নিরাপত্তায় ও গাজায় শান্তি বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী এবং স্থানীয় পুলিশের জন্য হাজার হাজার কর্মী নিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে’।

ইসরায়েলি তাণ্ডবে গুঁড়িয়ে যাওয়া গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পুনর্গঠন করা একটি বিশাল কাজ। জাতিসংঘ মনে করছে, এ কাজে প্রায় ৭০ বিলিয়ন (৭,০০০ কোটি) ডলার প্রয়োজন হবে।

প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনার কথা থাকলেও এখন এ পর্ষদ বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব–সংঘাত নিরসনের পরিকল্পনা করছে। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে আরও বলেন, এ পর্ষদ ‘গাজার বেসামরিক নাগরিকদের জন্য একটি সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করবে এবং শেষ পর্যন্ত গাজার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব শান্তি নিশ্চিত করবে!’

উদ্বোধনী বৈঠকে কারা আসছেন, কারা আসছেন না

হোয়াইট হাউস ৫০টি দেশের প্রতিনিধিকে এ পর্ষদের বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও এ পর্যন্ত ৩৫টি দেশের নেতা আগ্রহ দেখিয়েছেন। অন্তত ১৪টি দেশের নেতারা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

হোয়াইট হাউস মোট ৫০টি দেশকে এ পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও  ৩৫টি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি দেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তালিকায় নাম লিখিয়েছে। অন্যদিকে ১৪টি দেশ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
 

ইউরোপ

ইউরোপের দেশগুলো এ পর্ষদ নিয়ে বিভক্ত। বিশেষ করে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি শেষ হওয়ার পরও তিনি এটির চেয়ারম্যান থাকবেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জানিয়েছে, তারা পর্ষদে যোগ দিচ্ছে না এবং ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বৃহস্পতিবারের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন পুতিনকে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানোয় ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে; যদিও পুতিন পর্ষদে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও স্পেন এ পর্ষদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক কমিশনার দুব্রাভকা সুইচাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠাচ্ছে। একজন মুখপাত্র বলেছেন, পর্ষদের কর্মকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গাজার শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে ইইউ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদে সদস্য না হলেও জোট সদস্য হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়া পর্ষদে যোগ দিয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। অরবান ট্রাম্পের একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত। কসোভো ও আলবেনিয়াও সদস্য হিসেবে যোগ দিচ্ছে।

বৈঠকে ইতালি, সাইপ্রাস, গ্রিস ও রোমানিয়া পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে। রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুসর ড্যানও বৈঠকে সরাসরি অংশ নেবেন। পোপ ফ্রান্সিস এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বাস্তবে বিষয়টি (শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়া) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ও ট্রাম্পের মতো অস্থির ব্যক্তিকে অসন্তুষ্ট না করার সঙ্গে বেশি জড়িত। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ফিলিস্তিনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রেকর্ড ভালো নয়।তাহানি মুস্তাফা, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ভিজিটিং ফেলো

মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শক্তিধর দেশ শান্তি পর্ষদে যোগ দিয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মরক্কো, বাহরাইন, মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক, জর্ডান, কাতার ও কুয়েত এতে যোগ দিয়েছে। দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির ভিজিটিং ফেলো তাহানি মুস্তাফা মতে, আল–জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা ‘নিয়মভিত্তিক উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিকতা’ ধরে রাখতে চায়। এতে তারা সমান অবস্থান পায়।

তাহানি মুস্তাফা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বলছে, তারা বাস্তববাদী হতে চায় এবং গাজার জন্য যা ভালো, সেটাই করতে চায়; যাতে রক্তপাত বন্ধ হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাবেক এই বিশ্লেষক বলেন, বাস্তবে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ও ট্রাম্পের মতো অস্থির ব্যক্তিকে অসন্তুষ্ট না করার সঙ্গে বেশি জড়িত। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ফিলিস্তিনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রেকর্ড ভালো নয়।

এশিয়া ও ওশেনিয়া

মধ্য এশিয়া থেকে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্টরা সদস্য হিসেবে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের শীর্ষ নেতারাও ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবো সুবিয়ান্তো ও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তো লাম অংশ নিচ্ছেন।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র দেশ হিসেবে পাকিস্তান পর্ষদে যোগ দিচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ওয়াশিংটনে রয়েছেন। ভারত আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছে, কিন্তু এখনো যোগ দেয়নি। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। আর অস্ট্রেলিয়া বলেছে, তারা আমন্ত্রণ পর্যালোচনা করে দেখছে।

আল–জাজিরা

ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালাতে চলতি সপ্তাহের শেষেই প্রস্তুত থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। বিষয়টি সিএনএনকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

সূত্রগুলো জানায়, হোয়াইট হাউসকে জানানো হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিমান ও নৌ শক্তির বড় ধরনের সমাবেশের পর সপ্তাহান্ত নাগাদ হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে হামলার পক্ষে ও বিপক্ষে-দুই ধরনের যুক্তিই বিবেচনা করছেন। তিনি উপদেষ্টা ও মিত্রদের মতামতও নিচ্ছেন।

বুধবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। একই দিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে তাদের পরোক্ষ আলোচনার বিষয়ে ব্রিফ করেন। তবে সপ্তাহান্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

মঙ্গলবার জেনেভায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে নোট আদান-প্রদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়। কোনো চূড়ান্ত সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। ইরানের প্রধান আলোচক বলেন, উভয় পক্ষ একটি ‘নির্দেশক নীতিমালায়’ একমত হয়েছে। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এখনো অনেক বিস্তারিত বিষয় আলোচনা বাকি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, কূটনীতি ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ। তবে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পও খোলা রয়েছে।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্ভাব্য ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল।

গতকাল বুধবার রাতে ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’(কেএএন)-এর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ছবি: এএফপি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দেবেন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যেই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় ইসরায়েলের হামলার এ সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এল।

এদিকে ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর মূল্যায়নে দেখা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সাম্প্রতিক আলোচনার পর ইরানে মার্কিন হামলার আশঙ্কা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে।

তেহরান

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব