ফ্যাটি লিভার বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অসচেতন জীবনযাপনের ফলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে এ রোগের সৃষ্টি হয়। শুরুতে উপসর্গ কম থাকায় অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না, কিন্তু সময়মতো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ না করা হলে এটি লিভারের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
‘ফ্যাটি লিভার: বাস্তবতা ও আধুনিক চিকিৎসা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে গত ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ফ্যাটি লিভার রোগের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি ও এর বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তাঁরা রোগটির সময়মতো শনাক্তকরণ, জীবনযাপন পরিবর্তন এবং আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির গুরুত্বের ওপর জোর দেন। এ আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার ছিল প্রথম আলো এবং ব্র্যান্ড পার্টনার ছিল ইমাজিড ও রেসমিট।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির অনারারি প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাবেক সভাপতি এবং ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজির সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি ও বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারিয়া আফসানা, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দিন এবং কোষাধ্যক্ষ ও একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা শরীফুজ্জামান।
উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপাকতন্ত্র, লিভার ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ বি এম ছফিউল্লাহ, ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্ট্যারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল হোসেন, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আফসার আহাম্মদ, বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির প্রকাশনা সম্পাদক ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স ঢাকার এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমেদ সালাম মীর ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (সেলস) গোলাম হায়দার।
ফ্যাটি লিভার হলো লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার একটি অবস্থা। এটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার মতো একটি অসংক্রামক রোগ, যা অবহেলিত থাকলে ভবিষ্যতে লিভার ক্যানসারেও রূপ নিতে পারে।
আমন্ত্রিত অতিথিদের পরিচয় পর্ব শেষে সঞ্চালক শুরুতেই জানতে চান—ফ্যাটি লিভার কী, কেন হয় এবং এর লক্ষণ কী। জবাবে অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান বলেন, ফ্যাটি লিভার হলো লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার একটি অবস্থা। এটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার মতো একটি অসংক্রামক রোগ, যা অবহেলিত থাকলে ভবিষ্যতে লিভার ক্যানসারেও রূপ নিতে পারে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। তিনি জানান, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, মেদ বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত ঘুম, পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা এবং মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ওজন ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে, যা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি তৈরি করে। প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ না থাকায় এ রোগকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
ফ্যাটি লিভার কি শুধু মোটা মানুষের হয়
ফ্যাটি লিভার শুধু মোটা মানুষের হয়—এমন ধারণা প্রচলিত। কিন্তু আসলে এটি মোটা বা চিকন—উভয় রকম মানুষেরই হতে পারে বলে জানান ডা. ফারিয়া আফসানা। তিনি বলেন, ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণ হলো রক্তে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকা। ঝুঁকি বেশি থাকে এমন মানুষের মধ্যে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন না বা যাঁদের কোমরের মাপ নারীদের জন্য ৮০ সেমি ও পুরুষদের জন্য ৯০ সেমি এর বেশি। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি ও হরমোনজনিত সমস্যা, যেমন হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলেও ফ্যাটি লিভার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সুস্থ থাকতে হলে এসব ঝুঁকি এড়িয়ে চলা জরুরি।
বিশ্বে প্রতি ১০টি শিশুর ১টি এবং স্থূল শিশুদের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ এতে আক্রান্ত। ৯ বছর বয়স থেকেই এটি ধরা পড়তে পারে। স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশের এ সমস্যা রয়েছে।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক নিয়ে ডা. এ বি এম ছফিউল্লাহ বলেন, এই তিনটি রোগের সঙ্গেই ফ্যাটি লিভারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফ্যাটি লিভার শরীরে ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে দেয়। পাশাপাশি হার্টের সমস্যা ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সামাজিক সচেতনতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
শিশু–কিশোরদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভারের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি বিষয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে এটি সাধারণ ক্রনিক লিভার ডিজিজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বে প্রতি ১০টি শিশুর ১টি এবং স্থূল শিশুদের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ এতে আক্রান্ত। ৯ বছর বয়স থেকেই এটি ধরা পড়তে পারে। স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশের এ সমস্যা রয়েছে। তবে তরুণদের চেয়ে তরুণীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম। মূল কারণ হলো হাই ক্যালরি প্রসেসড ফুডের বেশি ব্যবহার, স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাওয়া ও কায়িক পরিশ্রমের অভাব।
আলোচনায় ডা. শাহজাদা সেলিম ফ্যাটি লিভার শনাক্তে আধুনিক পরীক্ষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেন। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে রক্ত পরীক্ষা, যেমন এএলটি (এসজিপিটি) এবং এএসটি (এসজিওটি), বিলিরুবিন, সিরাম অ্যালবুমিন ও লিপিড প্রোফাইল করা হয়। প্রাথমিক ইমেজিং হিসেবে পেটের আলট্রাসোনোগ্রাফি করা হয়। আধুনিক পরীক্ষার মধ্যে ফাইব্রোস্ক্যান লিভারের কঠিনতা ও চর্বির পরিমাণ নির্ণয়ে অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ প্রয়োজনে সিটি বা এমআরআই করা হয়। এ ছাড়া ফাইব্রোসিসের ঝুঁকি বুঝতে ‘এফআইবি–ফোর’ স্কোর এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে লিভার বায়োপসি করা হয়। তাই যাঁদের ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড রয়েছে, তাঁদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই পরীক্ষাগুলো করানো অত্যন্ত জরুরি।
ফ্যাটিলিভার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী
ফ্যাটিলিভার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডা. এম সাইফুদ্দিন ১০টি পরামর্শ তুলে ধরেন—
১. উচ্চতা ও পরিশ্রম অনুযায়ী দৈনিক ক্যালরি থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ৫০০–১০০০ ক্যালরি কমিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
২. প্লেট মডেল অনুসরণ করতে হবে: অর্ধেক প্লেট সবজি, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন, এক-চতুর্থাংশ শর্করা।
৩. হৃদ্রোগের ঝুঁকি এড়াতে অতিমাত্রার ডায়েট, যেমন কিটো ডায়েট, পরিহার করতে হবে।
৪. অ্যালকোহল এড়াতে হবে। লিভারের সুরক্ষার জন্য চিনি-দুধ ছাড়া ব্ল্যাক কফি পান করা ভালো।
৫. শরীরের ওজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে।
৬. নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা সবজি ও ফলমূল খেতে হবে।
৭. প্রসেসড খাবার ও ফ্রুক্টোজ এড়িয়ে, খাবারের উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
৮. শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
৯. দুধ ও ডিমকে ক্ষতিকর মনে না করে খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে।
১০. কৃত্রিম চিনি বা আর্টিফিশিয়াল সুইটেনার সম্পূর্ণভাবে এড়াতে হবে।
ফ্যাটি লিভারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ওজন বেড়ে যাওয়া। ফ্যাটি লিভারের আধুনিক চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবহার সম্পর্কে ডা. মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ওজন কমানোই এ সমস্যার মূল সমাধান। আধুনিক চিকিৎসায় এ জন্য ব্যবহার করা হয় জিএলপি-১ রিসেপ্টর এগোনিস্ট, যেমন সিমাগ্লুটাইড ও টির্জেপাটাইড। এ ছাড়া অবিটিকলিক অ্যাসিড নিয়েও চিকিৎসায় কথা হয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা কিছুটা সীমিত। ওজন কমানোয় এগুলো না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এন্ডোস্কোপিক থেরাপি বা ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি নেওয়া হয়। মেটাবলিক সিনড্রোমের জন্য অপর একটি কারণ হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, যা প্রতিরোধে মেটফরমিনের মতো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ে। তাই স্ট্যাটিন ওষুধ দিয়ে রক্তের কোলেস্টেরল ও অতিরিক্ত চর্বি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া অবিটিকলিক অ্যাসিড এবং সহায়ক হিসেবে ভিটামিন-ইও ব্যবহার করা হয়। মূলত জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন ও মেটাবলিক সিনড্রোমের উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রণ করলেই রোগীরা সুস্থ হতে পারেন।
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তনই প্রথম ও প্রধান ধাপ। এর জন্য সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন কমানো, অ্যালকোহল ও ধূমপান পরিহার করা জরুরি। প্রতিদিন সাত–আট ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন।
আলোচনার এক পর্যায়ে উঠে আসে, ওজন কমানো ও নিয়মিত ব্যায়াম করলে কি ফ্যাটি লিভার কমে যেতে পারে। ডা. মির্জা শরীফুজ্জামান বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তাঁর মোট ওজনের ৫ শতাংশ কমাতে পারেন, তবে লিভার থেকে চর্বি কমতে শুরু করে। আর ওজন ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে লিভারের প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতও ভালো হয়ে যেতে পারে। আর নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমায়, ফলে লিভারে নতুন করে চর্বি জমতে পারে না। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা উচিত। তবে দ্রুত ওজন কমানো উচিত নয়, এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সপ্তাহে ০.৫ থেকে ১ কেজি ওজন কমানোই আদর্শ।
ডা. আফসার আহাম্মদ বলেন, ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তনই প্রথম ও প্রধান ধাপ। এর জন্য সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন কমানো, অ্যালকোহল ও ধূমপান পরিহার করা জরুরি। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসল হরমোন বেড়ে বিপাক প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। তাই প্রতিদিন সাত–আট ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে ভারী খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলাও জরুরি।
ফ্যাটি লিভার হলে লিভার সুস্থ রাখা ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ফলোআপ ও সুশৃঙ্খল জীবনধারা অপরিহার্য। ডা. আহমেদ সালাম মীর বলেন, নিয়মিত ফলোআপের অংশ হিসেবে অন্তত বছরে একবার রক্তে লিভার এনজাইম বা এএলটি এবং এএসটি পরীক্ষা করা উচিত। এ ছাড়া লিভারের ফাইব্রোসিস কোন পর্যায়ে আছে, তা বোঝার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফাইব্রোস্ক্যান করানো প্রয়োজন। সঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এইচবিএ১সি পরীক্ষা এবং রক্তে চর্বির মাত্রা বুঝতে লিপিড প্রোফাইল নিয়মিত করানো জরুরি।
ফ্যাটি লিভারের মতো নীরব ঘাতক রোগ মোকাবিলায় দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (সেলস) গোলাম হায়দার বলেন, ‘কোম্পানিগুলোকে নিরাপদ ও প্রমাণভিত্তিক ওষুধ রোগীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে। শুধু ব্র্যান্ড নয়, বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণালব্ধ তথ্যও বিবেচনা করা জরুরি। আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, রেসমিটেরম—যা ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ অনুমোদিত। এসকেএফ প্রথমবারের মতো তা বাংলাদেশে এনেছে। এটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডিজিডিএ বা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দ্বারা অনুমোদিত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এসকেএফ শুধু ওষুধ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং চিকিৎসকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের সেমিনার আয়োজন ও রোগীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ওবেসিটি ও ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ মোকাবিলায় রেসমিটেরমের মতো আধুনিক ওষুধ আনার জন্য এসকেএফকে ধন্যবাদ। তবে নতুন ওষুধগুলো যেন শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রান্তিক পর্যায়ে অপব্যবহার না ঘটে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সিগারেট কোম্পানিগুলো মানুষকে প্রভাবিত করতে পারলেও চিকিৎসকেরা জনগণকে জীবনযাত্রা পরিবর্তনের বিষয়ে যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারছেন না। তাই ঠিক কোন উপায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে মানুষ তা গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন।
অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান আরও বলেন, ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা গবেষণার বিষয়। কারণ, সাধারণ মানুষের জন্য ক্যালোরি মেপে খাবার খাওয়ার চেয়ে এই উপবাস পদ্ধতিটি অনুসরণ করা অনেক সহজ। এ ছাড়া গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যা থেকে প্রতিরোধ সম্ভব।