• Colors: Blue Color

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ কানাডার পণ্যের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক বাতিলের পক্ষে ভোট দিয়েছে।

২১৯–২১১ ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবটি পাস হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত ওই প্রস্তাবে ছয়জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও সমর্থন জানিয়েছেন। এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো গত বছর ট্রাম্প কানাডার ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা প্রত্যাহার করা।

আপাতত এ অনুমোদন প্রতীকীই থেকে যাচ্ছে। কারণ, প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটেও পাস হতে হবে। এরপর এটিকে আইনে পরিণত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে। তবে প্রস্তাবে ট্রাম্পের স্বাক্ষর করার সম্ভাবনা খুবই কম।

ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত প্রস্তাবে ছয়জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও সমর্থন জানিয়েছেন। এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো, গত বছর ট্রাম্প কানাডার ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা প্রত্যাহার করা।

দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করেছেন। সম্প্রতি তিনি কানাডা প্রস্তাবিত চীনের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ১০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন।

প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশনে ভোট চলাকালে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটে কোনো রিপাবলিকান যদি শুল্কের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে নির্বাচনের সময় তাঁকে এর গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘শুল্ক আমাদের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং কোনো রিপাবলিকানেরই এ সুবিধা নষ্ট করার দায় নেওয়া উচিত নয়।’

কংগ্রেসে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এ পরিষদে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি সেই চেষ্টায় সফল হননি।

প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটে কোনো রিপাবলিকান যদি শুল্কের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে নির্বাচনের সময় তাঁকে এর গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট

প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন রিপাবলিকান সদস্য দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত প্রস্তাবকে সমর্থন জানানোর কারণে এটি সহজে পাস হয়ে যায়।

ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন’ এবং এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।

ওয়াশিংটন

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে যুক্তরাজ্যের বংশোদ্ভূত এক তরুণী তাঁর বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে বাবা–মেয়ের ঝগড়া হয়। কিছুক্ষণ পর বাবা মেয়েকে গুলি করেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া তরুণীর নাম লুসি হ্যারিসন।

লুসি হ্যারিসন হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্তের শুনানিতে এসব তথ্য উঠে আসে।

লুসি থাকতেন যুক্তরাজ্যের চেশায়ারের ওয়্যারিংটনে। গত বছরের ১০ জানুয়ারি ডালাসের কাছের শহর প্রসপারে তাঁকে গুলি করা হয়।

পুলিশ ২৩ বছর বয়সী লুসির হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্তে নামে। তবে কলিন কাউন্টির গ্র্যান্ড জুরি বাবা ক্রিস হ্যারিসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ না তোলায় সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি।

পরে চেশায়ারের করোনারের (জুরি) আদালত লুসি হ্যারিসনের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত শুরু করে।

শুনানিতে লুসির প্রেমিক স্যাম লিটলার আদালতকে বলেন, ১০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে বাবা–মেয়ের মধ্যে ‘বড় ধরনের ঝগড়া হয়েছিল’। যে সময় ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ছুটিতে লিটলারও লুসির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। লিটলার বলেন, যখনই লুসির বাবা লুসিকে তাঁর কাছে একটি বন্দুক থাকার কথা বলতেন, প্রায় সময়ই লুসি এ নিয়ে বিরক্তি বা অসন্তোষ প্রকাশ করতেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্রিস হ্যারিসন মাদকাসক্ত। এ জন্য আগে তাঁকে রিহ্যাবেও পাঠানো হয়েছিল। লুসি যখন ছোট, তখন তাঁর বাবা ক্রিস যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

লুসির মৃত্যু নিয়ে তদন্তের শুনানিতে ক্রিস হ্যারিসন উপস্থিত ছিলেন না। তবে তিনি আদালতে একটি বিবৃতি পাঠিয়ে স্বীকার করেছেন, গুলির ঘটনার দিন তিনি মদ্যপ ছিলেন, প্রায় ৫০০ মিলিলিটার সাদা ওয়াইন পান করেছিলেন।

লিটলার আদালতে বলেছেন, ১০ জানুয়ারির সকালে ট্রাম্পকে নিয়ে তর্কের সময় তাঁর প্রেমিকা তাঁর বাবার কাছে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যদি আমি সেই পরিস্থিতিতে পড়তাম এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হতাম, তখন তোমার কেমন লাগত।’

লিটলার বলেন, ‘জবাবে ক্রিস বলেছিলেন, তাঁর আরও দুটো মেয়ে আছে, যারা তাঁর সঙ্গে থাকে। তাই এটা তাঁকে খুব একটা বিচলিত করত না। এটা শুনে লুসি হতাশ হয়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যায়।’

সেদিনই লুসি ও লিটলার যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেদিনের বর্ণনায় লিটলার আরও বলেন, তাঁরা বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা আগে লুসি রান্নাঘরে ছিলেন। তাঁর বাবা তাঁকে সেখান থেকে হাত ধরে নিচে তাঁদের শয়নকক্ষের দিকে নিয়ে যান।

লিটলার বলেন, লুসিকে নেওয়ার প্রায় ১৫ সেকেন্ড পর তিনি জোরে আওয়াজ পান। এরপর ক্রিস হ্যারিসন চিৎকার করে তাঁর স্ত্রী হেদারকে ডাকেন।

লিটলার বলেন, ‘আমার মনে আছে, আমি দৌড়ে শয়নকক্ষে যাই, দেখি লুসি ঘরে ঢোকার দরজার সামনে মেঝেতে পড়ে আছে, আর ক্রিস পাগলের মতো চিৎকার করছিলেন।’

ক্রিস তাঁর বিবৃতিতে সেদিনের ঘটনার ভিন্ন বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সেদিন তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে বন্দুক হাতে অপরাধের খবর দেখছিলেন। তখন কথায় কথায় তিনি মেয়েকে তাঁর কাছে একটি বন্দুক আছে বলে জানান।

ক্রিসের দাবি, তিনি এর আগে কখনো লুসিকে বন্দুক থাকার কথা বলেননি। লুসি সেটি দেখতে চাইলে তিনি মেয়েকে নিয়ে শোবার ঘরের দিকে যান।

শোবার ঘরে খাটের পাশে ক্যাবিনেটে সেটি রাখা ছিল। ক্রিস বলেন, পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কয়েক বছর আগে তিনি ৯এমএম আধা স্বয়ংক্রিয় বন্দুকটি কিনেছিলেন।

তদন্তে জানা গেছে, পুলিশ কর্মকর্তা লুসিয়ানা এস্কালেরা গুলির ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ক্রিস হ্যারিসনের শ্বাসে মদের গন্ধ পেয়েছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজেও ক্রিসের মদ কেনার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ক্রিস বলেন, ‘আমি বন্দুকটি তাকে দেখানোর জন্য তুলছিলাম। তখনই জোরে একটি শব্দ শুনতে পাই। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী ঘটেছে। দেখি লুসি মেঝেতে পড়ে আছে।’

কখন বন্দুকের ট্রিগারে তাঁর আঙুল গেছে, তা তিনি মনে করতে পারছেন না বলেও দাবি করেন ক্রিস।

বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত ইরানকে সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আবারও বলেছেন, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পর্যন্ত বিভিন্ন ইস্যুতে তেহরান যদি তাঁর শর্ত মেনে না নেয়, তবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হলে আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হয় আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, নয়তো আমাদের খুব কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে।’

ট্রাম্প এমন সময়ে নতুন হুমকি দিলেন, যখন কিনা ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি ওমানের সুলতান হাইতাম বিন তারিক আল সাইদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা দুজন গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে হওয়া বৈঠকের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করছেন।

সাম্প্রতিক সময়গুলোয় ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বারবার বলেছেন। তিনি ইরানের কাছাকাছি অবস্থিত জরসীমায় বড় নৌবহর পাঠিয়েছেন। এ নৌবহরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের একটি বিমানবাহী জাহাজও আছে।

ইসরায়েলি চ্যানেল টুয়েলভ এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দ্বিতীয় আরেকটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর কথাও ভাবছেন। এমন অবস্থায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে। সমালোচকেরা বলছেন, এমন হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে যেতে পারে।

গত সোমবার মার্কিন কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালনাধীন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যেন ইরানের সামুদ্রিক সীমান্ত থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকে।

গত জানুয়ারি থেকে ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা যেকোনো সময় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত আছে।

ট্রাম্প ইরানের পরিস্থিতিকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

আল–জাজিরা

এ বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই ডেনমার্কের কাছে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক দাবি তুলতে শুরু করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে। শুধু দাবি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ছিল স্পষ্ট হুমকি। প্রয়োজনে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। তারা চাক বা না চাক, আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করব।

ট্রাম্পের যুক্তি ছিল একটাই। চীন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডের দখল না নেয়, তাহলে রাশিয়া বা চীন তা দখল করে নেবে। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই রাশিয়া বা চীনকে প্রতিবেশী হিসেবে মেনে নেবে না। পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তাঁর প্রস্তাবিত গোল্ডেন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাটোর উচিত এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া। তাঁর মতে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে না গেলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও এক ধাপ এগিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে রুশ ও চীনা যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু না করলে রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেবে। কিন্তু এখানেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাস্তবে চীনের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ডে কোনো সামরিক হুমকিই নেই। বিষয়টি মূলত কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নরওয়ের আর্কটিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং চীনের আর্কটিক কৌশল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মার্ক ল্যান্টিন স্পষ্ট করে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে কোনো চীনা বা রুশ যুদ্ধজাহাজ নেই। সেখানে চীনের কোনো উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতিও নেই। খনিশিল্পে চীনের অবস্থান প্রায় শূন্য। চীনের উপস্থিতি বলতে মূলত গ্রিনল্যান্ডের সামুদ্রিক খাবার কেনা এবং সীমিত পর্যটন কার্যক্রমকেই বোঝায়।

বাস্তবে গ্রিনল্যান্ডে বড় ধরনের কোনো চীনা বিনিয়োগ নেই। অবকাঠামো কিংবা খনিশিল্পে চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। বিরল খনিজ নিয়ে আলোচিত কুয়ানারসুইট প্রকল্পে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অংশীদারত্ব ছিল। সেটিও ২০২১ সালে গ্রিনল্যান্ড সরকার ইউরেনিয়াম খনন নিষিদ্ধ করার পর বন্ধ হয়ে যায়।

একসময় অবশ্য গ্রিনল্যান্ড নিজেই চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছিল। ২০০৯ সালে স্বায়ত্তশাসন আইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্ব চীনকে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখেছিল। স্বাধীনতার পথে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন অর্জনের আশায় তাঁরা নিয়মিত চীনের খনি সম্মেলনে অংশ নিতেন। কিন্তু সেটি ছিল ২০১০–এর দশকের শুরুতে। সময়ের সঙ্গে চীন বদলেছে, আর বদলেছে গ্রিনল্যান্ডের দৃষ্টিভঙ্গিও।

গত কয়েক বছরে চীনের অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক আচরণ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ডও বুঝতে পেরেছে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে এখন তারা অনেক বেশি সতর্ক।

চীন অবশ্য আর্কটিক অঞ্চলে আগ্রহ হারায়নি। তারা নিজেদের নিকট আর্কটিক রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয় এবং ২০১৮ সালে পোলার সিল্ক রোডের ঘোষণা দেয়। বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু বাস্তবে এই কৌশলের বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি।

ডেনমার্কও এই বিষয়টি গভীরভাবে নজরে রেখেছে। ২০১৮ সালে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে বিমানবন্দর নির্মাণের একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। এর আগেই একটি পরিত্যক্ত নৌঘাঁটি চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি বন্ধ করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ পুরোপুরি উপেক্ষা করেনি।

গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। খনিশিল্পে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করা হয়। ইউরেনিয়াম খনন আবার নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে চীনের সবচেয়ে আলোচিত খনি প্রকল্প কার্যত বাতিল হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে চীনের জন্য গ্রিনল্যান্ডে কাজ করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও চীনের আগ্রহ কমিয়েছে। বরফাচ্ছন্ন পরিবেশ, অবকাঠামোর অভাব এবং বছরের অর্ধেক সময় জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা গ্রিনল্যান্ডে খনিশিল্পকে লাভজনক করে তোলে না। ফলে অনেক চীনা কোম্পানি লাইসেন্স নিয়েও প্রকৃত বিনিয়োগ করেনি এবং পরে সেই লাইসেন্স বাতিল হয়ে গেছে।

চীন অবশ্য আর্কটিক অঞ্চলে আগ্রহ হারায়নি। তারা নিজেদের নিকট আর্কটিক রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয় এবং ২০১৮ সালে পোলার সিল্ক রোডের ঘোষণা দেয়। বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু বাস্তবে এই কৌশলের বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে আর্কটিকে চীনের প্রধান অংশীদার কেবল রাশিয়া এবং সেখানেও তাদের ভূমিকা সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি উল্টো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ১৯৫১ সাল থেকেই ন্যাটোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তাকাঠামো কার্যকর রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডে কোনো আগ্রাসন মানেই ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি। এ কারণেই রাশিয়া বা চীন কখনোই সেখানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবেনি।

কিন্তু ট্রাম্প যখন ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধেই সামরিক শক্তির ইঙ্গিত দেন, তখন জোটের ভেতর ফাটল তৈরি হয়। এই বিভক্তি যদি গভীর হয়, তাহলে সেটিই চীন বা রাশিয়ার জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ট্রাম্প এড়াতে চান, তাঁর আচরণই সেটির সম্ভাবনা তৈরি করছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ন্যাটো মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প একটি কথিত সমঝোতার কথা জানান। সেখানে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানো, গ্রিনল্যান্ডে গোল্ডেন ডোম ব্যবস্থার ব্যবহার, খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং ন্যাটোর বাইরে থাকা দেশগুলোর প্রবেশ ঠেকানোর বিষয় থাকার কথা বলা হয়। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড স্পষ্ট করে জানায়, এটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি কেবল আলোচনার সূচনা।

গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব তাদের কাছে অচল সীমারেখা। ট্রাম্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি সেখানে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে এই উত্তেজনা ভবিষ্যতে আবারও ফিরে আসতে পারে।

আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অন্য দেশগুলোর কাছে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর সংকট হলেও ট্রাম্প বিষয়টিকে অস্বীকার করেছেন। এর ফলে আর্কটিক কাউন্সিল কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতায় চীন বিকল্প কাঠামো দাঁড় করানোর সুযোগ পেতে পারে এবং নিজেকে বিজ্ঞান ও জলবায়ু সচেতন শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান কোনো বাস্তব চীনা হুমকির প্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটি এমন এক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে সত্যিকারের চীনা উপস্থিতির পথ খুলে দেবে। যে আশঙ্কা তিনি দেখাচ্ছেন, তাঁর নীতিই হয়তো শেষ পর্যন্ত সেটিকে বাস্তবে রূপ দেবে।

*দ্য ডিপ্লোম্যাটের ভিডিও বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব