আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর অংশ হিসেবে সারা দেশে ২৭ হাজার ৯৯৫টি বৈধ বা লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা পড়ে।

জানা গেছে, ব্যক্তির নামে ৪৮ হাজার ২৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার ২৮৮টি অস্ত্র এখনও জমা পড়েনি।

আদেশ লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

এর আগে, গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বৈধ অস্ত্র সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দেওয়ার শেষ দিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা না দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ আদেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে দেশের সব পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন

জমা না হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে আওয়ামী লীগের মেয়াদে লাইসেন্স পাওয়া অস্ত্রই বেশি বলে জানা গেছে। এসব অস্ত্রের মালিকদের অনেকেই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। দেশের ভেতরে অনেকে গা ঢাকা দিয়ে আছেন।

মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) পুলিশ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে থানা থেকে লুট হওয়া ব্যক্তিগত অস্ত্রের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, যে কোনো অস্ত্র থ্রেট। এর বাইরে বিভিন্নভাবে অস্ত্র দেশে প্রবেশ করে। সেজন্য মোকাবিলা করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রুহুল কবির রিজভীর ব্যক্তিগত সহকারী আরিফুর রহমান এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

আরিফুর রহমান বলেন, রুহুল কবির রিজভী জ্বর, ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। এ কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। সুস্থতার জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর। তবে যেসব আসনে অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোয় বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, সেসব আসনে ভোটের সমীকরণ নতুনভাবে গড়ে উঠছে। সারা দেশে এমন ৩০টির মতো আসন রয়েছে। এখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, দলটি নির্বাচনে নেই। ফলে বিএনপি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের সমর্থন। ফলে এই আসনগুলোর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পেতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।

প্রথম আলোর বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। কোথাও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, কোথাও কবর জিয়ারত, আবার কোথাও নিরাপত্তা ও মামলা থেকে বাঁচানোর আশ্বাস—এসব কৌশল এখন নির্বাচনী মাঠে আলোচনার কেন্দ্রে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির বহু নেতা-কর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন, অনেকে কারাগারেও আছেন। অনেক এলাকায় আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিরা যেন নিরাপদে এলাকায় ফিরতে পারেন, সে ধরনের আশ্বাসও শোনা যাচ্ছে।

কোথাও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, কোথাও কবর জিয়ারত, আবার কোথাও নিরাপত্তা ও মামলা থেকে বাঁচানোর আশ্বাস—এসব কৌশল এখন নির্বাচনী মাঠে আলোচনার কেন্দ্রে।

মাদারীপুর: ভোটের নতুন হিসাব

মাদারীপুরের তিনটি আসনই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। শাজাহান খান, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় নূর-ই-আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) মতো প্রভাবশালী নেতারা এই জেলার রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। এবার এই জেলার আসনগুলোয় আওয়ামী লীগের ভোট পেতে বিএনপি ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা নানা তৎপরতা চালিয়েছেন।

মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর কবর জিয়ারত করেন। ইলিয়াস আহমেদ হলেন লিটন চৌধুরীর বাবা। কবর জিয়ারতের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ জন নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানান।

নাদিরা আক্তার বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না। যারা অপরাধ করেনি, তারা কেন পালিয়ে থাকবে?’

এই আসনে বিএনপির দুই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।

নাদিরা আক্তার বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না। যারা অপরাধ করেনি, তারা কেন পালিয়ে থাকবে?’

মাদারীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খানের মা–বাবার কবর জিয়ারত করেন সেখানকার বিএনপির প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া ও বিদ্রোহী প্রার্থী মিল্টন বৈদ্য। শাজাহান খান কারাগারে। তাঁর আত্মীয় ও অনুসারীরা গোপনে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে আলোচনা আছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের পরিবার এই আসনের প্রার্থী মিল্টন বৈদ্যকে গোপনে সমর্থন করছেন বলেও আলোচনা আছে। নাছিম এখন আত্মগোপনে আছেন।

এ ছাড়া মাদারীপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীকে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

শরীয়তপুর: অবস্থান বদল

১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে শরীয়তপুরের তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। তবে গত দেড় মাসে এই জেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।

গত ৭ ডিসেম্বর সখিপুর থানা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও উত্তর তারাবনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুছ আলী মোল্যা সখিপুরের বিভিন্ন নেতা ও কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর তিনি বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন। আওয়ামী লীগের নেতা ফজলুর রহমান বলেন, দল থেকেও নির্বাচন সম্পর্কে দিকনির্দেশনা নেই। এলাকার শান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।

ইউনূছ আলী মোল্যা বলেন, ‘এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে বিএনপিতে যোগদান ও প্রচারে অংশ নিয়েছি।’

গত ২৭ জানুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গোসাইরহাট উপজেলার পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী ও সমর্থক শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সঙ্গে সভা করেন। আওয়ামী লীগ নেতারা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন। আওয়ামী লীগের নেতা ফজলুর রহমান বলেন, দল থেকেও নির্বাচন সম্পর্কে দিকনির্দেশনা নেই। এলাকার শান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।

গোপালগঞ্জ: প্রচেষ্টা থেমে নেই

গোপালগঞ্জকে দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের দুর্গ বিবেচনা করা হয়। ১৯৯১ সাল থেকে জেলার তিনটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অন্য কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি। এই জেলায় এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে প্রকাশ্যে অন্য দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি।

তবে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে বিএনপি, খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নানান চেষ্টা ও কৌশল অবলম্বন করছেন। কয়েকজন প্রার্থী টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

গোপালগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী সেলিমুজ্জামান বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি যাঁরা নিরীহ নিরপরাধ বিভিন্ন ধরনের হয়রানিমূলক মামলায় আসামি হয়েছেন, তাঁদের মুক্ত করতে আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবেন।

ফরিদপুর-৪ আসনে অনেক আওয়ামী লীগের নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যারা অন্যায় করেছে, তারা পালিয়েছে। কিন্তু অন্যদের আমি ফেলব কীভাবে?’

ফরিদপুর: পুরোনো ঘাঁটিতে নতুন বার্তা

ফরিদপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান ছিল। সম্প্রতি কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপির প্রার্থীর হাতে ফুল দিয়ে দলে যোগ দেন। বিএনপির প্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের আশ্বস্ত করছেন, যাঁরা মামলার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়েছেন, তাঁরা ফিরে এলে সহযোগিতা পাওয়া যাবে।

ফরিদপুর-৪ আসনে অনেক আওয়ামী লীগের নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যারা অন্যায় করেছে, তারা পালিয়েছে। কিন্তু অন্যদের আমি ফেলব কীভাবে?’

বাগেরহাট ও ঠাকুরগাঁও: আশ্বাসের রাজনীতি

বাগেরহাটে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা সভা-সমাবেশে বলেছেন, ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা হবে না। ঠাকুরগাঁওয়ে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তায় আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা। বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলের প্রার্থীরাই সংখ্যালঘুদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।

ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের আধিক্য রয়েছে। তাঁদের ভোট পেতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই চেষ্টা করছে।

৪ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাশভাংগা কালীমন্দির চত্বরে বিএনপির মহাসচিব ও এই আসনের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি সবাইকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘যত দিন বেঁচে আছি, আপনাদের পাশে থাকব।’

এদিন কালীমন্দির চত্বরে হাজির হন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তিনিও বিপদে-আপদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

ময়মনসিংহের ১১টি আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপির দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা বলছেন, হয়রানি এড়াতে তাঁরা বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

জামালপুর ও ময়মনসিংহ

জামালপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান। কেউ হয়রানির শিকার হবে না বলে আশ্বাস দেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক পদধারী নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির পক্ষে কাজ করছেন।

অন্যদিকে বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক আফসার আলীকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে প্রকাশ্যে ভোট চাইতে দেখা গেছে।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত আসনগুলোতে দলটির ভোট কীভাবে, কার দিকে এবং কতটা সরে যায়—তার ওপর ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করছে।

ময়মনসিংহের ১১টি আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপির দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা বলছেন, হয়রানি এড়াতে তাঁরা বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

ময়মনসিংহ-১ আসনে দলটির প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি নিরাপদ সমাজ গড়াই তাঁর লক্ষ্য।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত আসনগুলোতে দলটির ভোট কীভাবে, কার দিকে এবং কতটা সরে যায়—তার ওপর ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। নির্বাচন সামনে রেখে ভোট উৎসবে মেতেছে সারা দেশ। এর সঙ্গে ভোটের আগে ও পরে মিলিয়ে চার দিনের ছুটিতে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। ট্রেন ও বাসে ঈদের ছুটির মতো মানুষের চাপ। অনেকেই আসন না পেয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে পড়েন। মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে যানজটও তৈরি হয়েছে।

বিকেলে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সিরাজগঞ্জে যাওয়ার জন্য ট্রেনে ওঠেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে নিজ এলাকায় ভোট দিতে যাচ্ছেন। আমি অনেক কষ্ট করে ট্রেনে উঠতে পেরেছি, কিন্তু এখনো অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা উঠতে পারছেন না। অনেকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছাদে উঠে গেছেন। ঈদের ছুটিতে যে রকম বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা রাখা হয়, এবার কিন্তু সে রকম করা হয়নি। সরকারের উচিত ছিল বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা।’

রাজধানী ছাড়ছেন মানুষ। গাবতলী এলাকা। ১০ ফেব্রুয়ারি
রাজধানী ছাড়ছেন মানুষ। গাবতলী এলাকা। ১০ ফেব্রুয়ারি
 

জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে যাচ্ছেন রুমান হাসান। তিনি বলেন, সরকারের এই দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত ছিল। প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করলে মানুষকে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না। এখনো এক দিন রয়েছে, সরকারের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।

কোনো আসন না পেয়ে ট্রেনের বগির দরজার পাশে কোনোমতে বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাবিহা সুলতানা। ওই অবস্থাতেই তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছি (কিশোরগঞ্জ)। কোনোমতে উঠে দাঁড়ালাম। এখন ঠিকমতো বাড়িতে পৌঁছাতে পারলেই স্বস্তি।’

আজ গাজীপুরের টঙ্গী রেলস্টেশনে যাত্রীর চাপ ছিল সাধারণ দিনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। প্রায় প্রতিটি ট্রেনে ছিল যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ। যাঁরা ট্রেনের ভেতরে জায়গা পাননি, তাঁরা ছাদে চড়েই রওনা দেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁরা প্রায় সবাই শ্রমজীবী মানুষ।

কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. সাজেদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, গত সোমবার থেকে ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বেড়েছে। মঙ্গলবার সকালেও যাত্রীদের ভিড় ছিল অনেক। সব ট্রেন সময়মতো ছেড়ে গেলেও বুড়িমারী এক্সপ্রেস দেরিতে আসে এবং দেরিতে ছেড়ে যায়। রেলওয়ের পক্ষ থেকে ট্রেনের ছাদে ওঠার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে অনেক যাত্রী বিভিন্নভাবে ছাদে ওঠার চেষ্টা করছেন।

বাস, ট্রাক, পিকআপ যেটা পাওয়া গেছে, সেটাতে চড়েই মানুষ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। গাবতলী এলাকা। ১০ ফেব্রুয়ারি
বাস, ট্রাক, পিকআপ যেটা পাওয়া গেছে, সেটাতে চড়েই মানুষ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। গাবতলী এলাকা। ১০ ফেব্রুয়ারি
 

নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত বিশেষ ছুটিতে অন্যান্য শ্রেণি–পেশার মানুষের পাশাপাশি বাড়িতে যাচ্ছেন কারখানার শ্রমিকেরাও। আজ সকালে তাঁরা একযোগে রওনা দেওয়ায় গাজীপুরের ঢাকা–টাঙ্গাইল ও ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

সকাল থেকেই কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা পর্যন্ত একই রকম ভিড় দেখা যায়। চন্দ্রা থেকে উভয় দিকে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট লেগে থাকে এবং যানবাহন থেমে থেমে চলতে দেখা যায়।

দুপুরে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় কথা হয় মিরপুর এলাকার পোশাকশ্রমিক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। যানজটের কারণে বাসের জানালার পাশে বসা রফিকুলের মুখে ছিল বিরক্তি ভাব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কারখানা থেকে ভোট দেওয়ার জন্য ছুটি পেয়েই সকালে রওনা দিয়েছেন, কিন্তু এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। কখন বাড়িতে পৌঁছাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।

চন্দ্রা মোড়ে কথা হয় গৃহকর্মী হাসিনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভোট দেওয়ার জন্যই এত কষ্ট করে বাড়িতে যাচ্ছেন। কিন্তু রাস্তার এই দীর্ঘ যানজটে ছোট সন্তান নিয়ে ভোগান্তি বেড়ে গেছে।

বাসের অপেক্ষায় কাউন্টারে যাত্রীরা। কল্যাণপুর এলাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি
বাসের অপেক্ষায় কাউন্টারে যাত্রীরা। কল্যাণপুর এলাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি
 

গাজীপুরের জয়দেবপুর জংশনে ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল সকাল থেকে। পর্যাপ্ত ট্রেন না থাকায় অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

ঢাকার সড়কপথেও আজ একই ধরনের চাপ ছিল। যাত্রীর তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা কম থাকায় যাত্রীরা গাড়ির সংকটে পড়েন। বাস, ট্রাক, পিকআপ—যা সামনে পাওয়া গেছে, তাতে করেই যাত্রা করেন তাঁরা। পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় টিকিট না পাওয়া, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও করেন যাত্রীদের অনেকে।

ভিড় ছিল ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও। দিনভর বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ছেড়ে যায়। সাধারণ দিনের চেয়ে সেখানেও ভিড় ছিল কয়েক গুণ বেশি।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি আসনে একযোগে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ চলবে।

সচিবালয় ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ উপদেষ্টা নির্বাচনের দিন ঢাকায় অবস্থান করবেন এবং নিজ নিজ এলাকার নির্ধারিত কেন্দ্রে ভোট দেবেন।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসভুক্ত উদয়ন হাইস্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন। একই এলাকার ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেবেন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সিআর আবরার।

এছাড়া রাজধানীর মিরপুর ১২ নম্বর এলাকার ই ব্লকের একটি কেন্দ্রে ভোট দেবেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার শ্যামলী শিশু মেলার কাছের একটি কেন্দ্রে এবং নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন মহাখালী ডিওএসএইচ এলাকার একটি স্কুল কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

ঢাকার অন্যান্য এলাকার মধ্যে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গুলশান-২ এর গুলশান মডেল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ধানমন্ডির একটি কেন্দ্রে ভোট দেবেন। তবে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের মেহেদীবাগ এলাকায় ভোট দেবেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম।

ধর্ম উপদেষ্টা ড. খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, জরুরি দাপ্তরিক কাজের কারণে তিনি সম্ভবত এবার চট্টগ্রামে নিজ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারছেন না। মঙ্গলবার তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন বলেও জানান।

উল্লেখ্য, একই দিনে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

নাগরিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডব্লিউএফপি) অতিরিক্ত ২০ লাখ ইউরো (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৯১৪৮৯২০০ টাকা) অনুদান দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ডব্লিউএফপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন এই অনুদানের ফলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ডব্লিউএফপিতে ইইউর মোট অবদান বেড়ে দাঁড়াল ১ কোটি ৫৩ লাখ ইউরোতে। এই অর্থ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জীবন রক্ষাকারী খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হবে।

বাংলাদেশে ইইউ মানবিক সহায়তার প্রধান ডেভিড জাপ্পা বলেন, ২০২৫ সাল বিশ্বব্যাপী মানবিক কার্যক্রমের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বছর। তবুও রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের প্রতি ইইউ দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংকটে থাকা মানুষের প্রতি সংহতি ও সমর্থন ইইউর প্রতিষ্ঠাতা নীতির অংশ।

ডব্লিউএফপি বর্তমানে ই-ভাউচার ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে। প্রায় ১২ লাখ মানুষ এই সহায়তার আওতায় রয়েছে, যার মধ্যে ২০২৪-২০২৫ সময়ে নতুন আসা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গাও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি পরিবার মাসে ১২ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সহায়তা পায়, যা দিয়ে তারা প্রধান ও তাজা খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারে।

এ ছাড়া শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্য স্কুল মিল এবং রোহিঙ্গা ও স্থানীয় উভয় সম্প্রদায়ের জন্য জীবিকা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করছে ডব্লিউএফপি।

ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর সিমোন লসন পার্চমেন্ট বলেন, ইইউর সময়োপযোগী অবদান এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। এই ধরনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সহায়তা দেওয়া সম্ভব।

নবম বছরে প্রবেশ করা রোহিঙ্গা সংকট এখনও তীব্র তহবিল ঘাটতির মুখে। ২০২৬ সালে জীবন রক্ষাকারী খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি চালিয়ে যেতে ডব্লিউএফপির প্রয়োজন হবে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। নতুন অর্থ সহায়তা না এলে এপ্রিলের শুরু থেকেই এই কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় এই কথা বলেছেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না— একই সাথে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।’

তিনি আরও বলেন, আমি সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাই—নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।

 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এটা প্রকাশ করেছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মোট পরিসম্পদ ছিল ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকার। এক বছর আগে তা ছিল ১৪ কোটি এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রধান উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে এক কোটি ৬১ লাখ ৪ হাজার ৩৯২ টাকা।

সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী বা মেয়াদি আমানতে বৃদ্ধি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ার ইত্যাদি কারণে মোট সম্পদ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের মোট পরিসম্পদ এক কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬০ টাকা। যা আগের অর্থবছরে ছিল দুই কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৪ টাকা। সে হিসেবে এক বছরে তাঁর সম্পদ কমেছে ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টাকা।

আয়কর আইন অনুযায়ী, একজন করদাতার মালিকানাধীন স্থাবর-অস্থাবর, আর্থিক ও মূলধনী সম্পত্তির সমষ্টি হলো পরিসম্পদ।

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সরকারি সব কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে বলেও তিনি ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন।

ওই বছরের ১ অক্টোবর ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, যাঁরা সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তাঁরা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাঁদের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন। স্ত্রী বা স্বামীর পৃথক আয় থাকলে সেটিও জমা দিতে হবে। এই বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা নিজ বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রকাশ করবেন।

কিন্তু এতদিনেও তা প্রকাশ না করায় সমালোচনা হচ্ছিল। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত সোমবার জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী দু-এক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরে কয়েক দফায় নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। সংযোজন-বিয়োজনের পর বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসংখ্যা প্রধান উপদেষ্টাসহ ২১। এ ছাড়া উপদেষ্টা পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী, বিশেষ দূত ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চারজন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার চার বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন। আজ তাঁদের সবার সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হলো।

২০২৫ সালের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৩তম। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছিল ১৪তম অবস্থানে। আর এ বছর ৮৯ স্কোর নিয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে আছে ডেনমার্ক। আর ৯ স্কোর নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে আছে সাউথ সুদান ও সোমালিয়া।

এদিকে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের স্কোর ৩৯। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মাঝে আফগানিস্তানের স্কোর ১৬, পাকিস্তানের স্কোর ২৮, শ্রীলঙ্কার ৩৫, নেপালের ৩৪। এ অঞ্চলের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। ১০০-এর মধ্যে ৭১ স্কোর নিয়ে তাদের অবস্থান ১৮তম।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি 'দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫' প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

টিআইবি জানায়, বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০-তে ২৪ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম এবং উচ্চক্রম অনুযায়ী অবস্থান ১৫০তম।

টিআইবি মনে করছে, এ বছর বাংলাদেশের এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি না হওয়ায় আদতে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামা বলেন, বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। আগের রাজনৈতিক সরকারের মতো এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেরও ব্যর্থতা আছে, তবে এর পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা ও আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকারি ব্যয়ে কাউকে হজে পাঠানো হচ্ছে না। পাশাপাশি, চলতি বছর হজযাত্রীরা ৩ কোটিরও বেশি টাকা ফেরত পাবেন বলে জানিয়েছেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

ধর্ম উপদেষ্টা জানান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। গত দুই বছরে বিমানভাড়া ধাপে ধাপে ৪০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। ২০২৬ সালের হজে বিমানভাড়া নেমে এসেছে এক লাখ ৫৪ হাজার টাকায়।

তিনি আরও বলেন, গেলো হজে চালু হয়েছে ‘লাব্বাইক’ অ্যাপ, প্রি-পেইড কার্ড ও মোবাইল রোমিং সুবিধা। এবার তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে সাশ্রয়ী প্যাকেজের মূল্য ৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। উপদেষ্টা বলেন, এবছরের হজ প্রস্তুতি সন্তোষজনক। হাজিদের ভোগান্তি কমাতে হারাম শরীফের কাছাকাছি আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নির্বাচন নিয়ে কোন শঙ্কা নেই। এইবার যে পরিমাণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত করা হয়েছে, তা পূর্বের কোন নির্বাচনেই করা হয়নি— এমনটাই জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব) জাহাঙ্গীর আলম।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান তিনি। এদিন ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশ, আনসার এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভা করেন উপদেষ্টা।

উপদেষ্টা বলেন, 'নির্বাচনের দিনে কোন ধরনের সহিংসতা হলে, ওই দিন বুঝতে পারবেন, আপনারা দেখবেন প্রশাসনের কি ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। সবই তো আপনাদের সামনে ডিসক্লোজ করা যাবে না, কিছু বিষয় তো গোপন থাকে।' 

তিনি বলেন, 'আপনারা আগের অন্যান্য নির্বাচন গুলো দেখেন, যে পরিমাণ সহিংসতা হয়েছে, এবার কিন্তু আল্লাহ দিলে এখন পর্যন্ত তেমন কোন সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। আশা করবো সামনেও হবে না।'