একজন বাবা ছুটি চেয়েছিলেন সন্তান জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য। কাঙ্ক্ষিত সময়ে ছুটি মেলেনি। আর সেই ফাঁকে পৃথিবীতে এসেই নিভে গেছে ছোট্ট একটি জীবন। ঢাকায় দায়িত্বরত অবস্থায় সন্তানের জন্ম ও মৃত্যুর খবর পান পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসান। এরপর ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি রওনা দেন, তবে ছেলে কোলে নিতে নয়, দাফন করতে।
গত শনিবার রাতে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসান। ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ছুটি চাইছিলাম পাইলাম না। আমার ছেলেটা মারা গেল!!! ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ। আমি না থাকলে নির্বাচন আটকে যেত!! কী জবাব দিব বউকে???’
পোস্টটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। এর পরদিন রোববার আরেকটি পোস্টে মেহেদী লিখেছেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজটি করে আসলাম, পিতা হয়ে পুত্রকে চিরবিদায় দিয়ে আসলাম…ওকে যখন বুকে জড়িয়ে ধরলাম, কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না যে সে আমাকে বাবা ডাকবে না।’
রাজধানীর ভাষানটেক থানার সহকারী উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান দায়িত্বরত অবস্থায় সন্তানের জন্ম ও মৃত্যুর খবর পান। এরপর ছুটি ছাড়াই গভীর রাতে ঢাকা থেকে রওনা দেন ময়মনসিংহে। সকালে দাফন করেন নবজাতক পুত্রকে।
ভাইরাল হওয়া পোস্টের সূত্র ধরে রোববার কথা হয় মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সন্তানের মৃত্যু হয়তো অনিবার্য ছিল। তবু নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।’
ছুটির আবেদন, না পাওয়ার গল্প
মেহেদী হাসানের স্বজন ও সহকর্মীরা বলেন, সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে মেহেদী আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ছুটির প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিলেন। নির্বাচনের কথা বলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে মাত্র দুই দিনের ছুটি নিতে বলে। এ সময় মেহেদী বলেছিলেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম হলে হাসপাতাল থেকে স্ত্রী ও সন্তানকে বাসায় নিতে অন্তত তিন দিন ছুটি প্রয়োজন। তাই তিনি পাঁচ থেকে সাত দিনের ছুটি চান। তখন তাঁকে জানানো হয়, এত দিনের ছুটি দেওয়া সম্ভব নয়। এই ক্ষোভে মেহেদী আর ছুটির জন্য লিখিত আবেদন করেননি।
ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া প্রসঙ্গে মেহেদী বলেন, ‘সন্তানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর যা মনে হয়েছে তাই করেছি। ফেসবুকে একটার পর একটা স্ট্যাটাস দিয়েছি। স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে। আমি গতকাল (শনিবার) রাতেই ময়মনসিংহ রওনা দিই। আজ (রোববার) ছেলের দাফন করলাম।’
মেহেদী হাসানের সঙ্গে ঢাকায় ছিলেন তাঁর স্ত্রী। কিছুদিন আগে ছুটি নিয়ে স্ত্রীকে ময়মনসিংহে রেখে এসেছিলেন। ২ ফেব্রুয়ারি স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল। মেহেদী হাসান তাই আগে থেকেই ছুটির কথা জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া এবার নির্বাচনে দায়িত্বের তালিকায় তাঁর নামও নেই। তাই ভেবেছিলেন ছুটি পেতে সমস্যা হবে না।
ভাষানটেক থানায় মেহেদী হাসান গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি বছরের পাওনা ২০ দিন ছুটির মধ্যে তিনি স্ত্রীকে ময়মনসিংহে রেখে আসাসহ ৫ দিন ছুটি কাটিয়েছেন।
মেহেদী হাসান বলেন, ছুটির জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে (ওসি) গেলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তারপর তিনি ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তাকে ছুটির বিষয়টি জানিয়ে বলেন, বাড়িতে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা ছাড়া আর কেউ নেই। তখন ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দুই দিনের ছুটি নিতে বলেন। কিন্তু আবার বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে গেলে ওই কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দেন—‘কোনো ছুটি হবে না।’
তবে প্রথমে ছুটি না পেলেও নবজাতক সন্তানের মৃত্যুর পর মেহেদী হাসানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, ছুটি নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। তাঁরাই ছুটির ব্যবস্থা করবেন বলে উল্লেখ করেন মেহেদী হাসান।
অপেক্ষায় থাকা স্ত্রী ও বলতে না পারা সত্য
মেহেদী হাসানের দুই মেয়ে—একজনের বয়স আট, আরেকজনের সাড়ে ছয়। এবার ছেলের জন্ম হয় ময়মনসিংহ শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। জন্মের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসকেরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
মেহেদী বলেন, ‘স্ত্রী আগে থেকেই বলেছিল, এবার সন্তান জন্মের সময় তাঁর পাশে না থাকলে সন্তানের মুখ দেখতে দেবে না। হলোও তা–ই। জীবিত সন্তানের মুখ দেখতে পেলাম না, দেখতে পেলাম মৃত সন্তানের মুখ।’
সোমবার মেহেদী হাসানের স্ত্রীকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়া হয়েছে। মেহেদী বলেন, অস্ত্রোপচারের ধকল এখনো কাটেনি। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন, তাঁকে সন্তানের মৃত্যুর খবর সরাসরি না জানাতে। সন্তান নিয়ে কেউ সরাসরি কথাও বলছে না। কিন্তু মায়ের মন তো, ঠিকই বুঝে গেছে যে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটেছে।
মেহেদী ভেবেছিলেন, ছেলের জন্মের পর ফেসবুকে লিখবেন—‘দুই রাজকন্যার পর এক রাজপুত্র দিয়ে আল্লাহ–তায়ালা আমাকে পূর্ণতা দান করলেন।’ কিন্তু এমন স্ট্যাটাস আর লেখা হলো না। তার আগেই পিতা হয়ে কাঁধে নিতে হলো সন্তানের লাশ।
‘ছুটি না দেওয়া একটা কালচার হয়ে গেছে’
মেহেদী হাসানের সন্তানের মৃত্যুর খবর শুনে মর্মাহত জানিয়ে ভাষানটেক থানার ওসি আসলাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই পুলিশ সদস্য (মেহেদী হাসান) ছুটির কথা বলেছিলেন। তাঁকে এডিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলেছিলাম। এডিসি স্যার তাঁকে ছুটি দিতেও চান, তবে একটু কম সময়ের জন্য ছুটি নিতে বলেছিলেন। তাই মন খারাপ করে এই পুলিশ সদস্য আর লিখিতভাবে ছুটির আবেদন করেননি। আমাকেও আর কিছু বলেননি। নির্বাচনের জন্য ব্যস্ত থাকায় বিষয়টি আমরাও আর খেয়াল করতে পারিনি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিরপুর বিভাগের আরেকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এই পুলিশ সদস্য থানায় যোগ দেওয়ার পরই পাঁচ দিন ছুটি কাটিয়েছেন। এবার লিখিত ছুটির আবেদন করেননি। ছুটি ছাড়াই কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। তবে তাঁর বিষয়টি ‘আমরা পজিটিভলি দেখছি’ বলেও উল্লেখ করেন এ কর্মকর্তা।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে নির্বাচনসহ যাই ঘটুক না কেন, সবার আগে পুলিশের ছুটি বাতিল করা হয়। নির্বাচনের সময় বিবেচনা করে তো আর পুলিশ সদস্যের সন্তানের জন্ম বা জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হবে না। আসলে মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ছুটি না দেওয়া একটি ‘কালচার’–এ পরিণত হয়েছে। এটি পাল্টানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
মানসুরা হোসাইন
ঢাকা