নাগরিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডব্লিউএফপি) অতিরিক্ত ২০ লাখ ইউরো (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৯১৪৮৯২০০ টাকা) অনুদান দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ডব্লিউএফপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন এই অনুদানের ফলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ডব্লিউএফপিতে ইইউর মোট অবদান বেড়ে দাঁড়াল ১ কোটি ৫৩ লাখ ইউরোতে। এই অর্থ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জীবন রক্ষাকারী খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হবে।

বাংলাদেশে ইইউ মানবিক সহায়তার প্রধান ডেভিড জাপ্পা বলেন, ২০২৫ সাল বিশ্বব্যাপী মানবিক কার্যক্রমের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বছর। তবুও রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের প্রতি ইইউ দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংকটে থাকা মানুষের প্রতি সংহতি ও সমর্থন ইইউর প্রতিষ্ঠাতা নীতির অংশ।

ডব্লিউএফপি বর্তমানে ই-ভাউচার ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে। প্রায় ১২ লাখ মানুষ এই সহায়তার আওতায় রয়েছে, যার মধ্যে ২০২৪-২০২৫ সময়ে নতুন আসা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গাও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি পরিবার মাসে ১২ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সহায়তা পায়, যা দিয়ে তারা প্রধান ও তাজা খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারে।

এ ছাড়া শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্য স্কুল মিল এবং রোহিঙ্গা ও স্থানীয় উভয় সম্প্রদায়ের জন্য জীবিকা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করছে ডব্লিউএফপি।

ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর সিমোন লসন পার্চমেন্ট বলেন, ইইউর সময়োপযোগী অবদান এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। এই ধরনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সহায়তা দেওয়া সম্ভব।

নবম বছরে প্রবেশ করা রোহিঙ্গা সংকট এখনও তীব্র তহবিল ঘাটতির মুখে। ২০২৬ সালে জীবন রক্ষাকারী খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি চালিয়ে যেতে ডব্লিউএফপির প্রয়োজন হবে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। নতুন অর্থ সহায়তা না এলে এপ্রিলের শুরু থেকেই এই কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় এই কথা বলেছেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না— একই সাথে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।’

তিনি আরও বলেন, আমি সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাই—নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।

 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এটা প্রকাশ করেছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মোট পরিসম্পদ ছিল ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকার। এক বছর আগে তা ছিল ১৪ কোটি এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রধান উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে এক কোটি ৬১ লাখ ৪ হাজার ৩৯২ টাকা।

সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী বা মেয়াদি আমানতে বৃদ্ধি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ার ইত্যাদি কারণে মোট সম্পদ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের মোট পরিসম্পদ এক কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬০ টাকা। যা আগের অর্থবছরে ছিল দুই কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৪ টাকা। সে হিসেবে এক বছরে তাঁর সম্পদ কমেছে ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টাকা।

আয়কর আইন অনুযায়ী, একজন করদাতার মালিকানাধীন স্থাবর-অস্থাবর, আর্থিক ও মূলধনী সম্পত্তির সমষ্টি হলো পরিসম্পদ।

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সরকারি সব কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে বলেও তিনি ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন।

ওই বছরের ১ অক্টোবর ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, যাঁরা সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তাঁরা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাঁদের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন। স্ত্রী বা স্বামীর পৃথক আয় থাকলে সেটিও জমা দিতে হবে। এই বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা নিজ বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রকাশ করবেন।

কিন্তু এতদিনেও তা প্রকাশ না করায় সমালোচনা হচ্ছিল। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত সোমবার জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী দু-এক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরে কয়েক দফায় নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। সংযোজন-বিয়োজনের পর বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসংখ্যা প্রধান উপদেষ্টাসহ ২১। এ ছাড়া উপদেষ্টা পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী, বিশেষ দূত ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চারজন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার চার বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন। আজ তাঁদের সবার সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হলো।

২০২৫ সালের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৩তম। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছিল ১৪তম অবস্থানে। আর এ বছর ৮৯ স্কোর নিয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে আছে ডেনমার্ক। আর ৯ স্কোর নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে আছে সাউথ সুদান ও সোমালিয়া।

এদিকে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের স্কোর ৩৯। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মাঝে আফগানিস্তানের স্কোর ১৬, পাকিস্তানের স্কোর ২৮, শ্রীলঙ্কার ৩৫, নেপালের ৩৪। এ অঞ্চলের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। ১০০-এর মধ্যে ৭১ স্কোর নিয়ে তাদের অবস্থান ১৮তম।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি 'দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫' প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

টিআইবি জানায়, বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০-তে ২৪ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম এবং উচ্চক্রম অনুযায়ী অবস্থান ১৫০তম।

টিআইবি মনে করছে, এ বছর বাংলাদেশের এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি না হওয়ায় আদতে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামা বলেন, বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। আগের রাজনৈতিক সরকারের মতো এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেরও ব্যর্থতা আছে, তবে এর পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতা ও আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকারি ব্যয়ে কাউকে হজে পাঠানো হচ্ছে না। পাশাপাশি, চলতি বছর হজযাত্রীরা ৩ কোটিরও বেশি টাকা ফেরত পাবেন বলে জানিয়েছেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

ধর্ম উপদেষ্টা জানান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। গত দুই বছরে বিমানভাড়া ধাপে ধাপে ৪০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। ২০২৬ সালের হজে বিমানভাড়া নেমে এসেছে এক লাখ ৫৪ হাজার টাকায়।

তিনি আরও বলেন, গেলো হজে চালু হয়েছে ‘লাব্বাইক’ অ্যাপ, প্রি-পেইড কার্ড ও মোবাইল রোমিং সুবিধা। এবার তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে সাশ্রয়ী প্যাকেজের মূল্য ৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। উপদেষ্টা বলেন, এবছরের হজ প্রস্তুতি সন্তোষজনক। হাজিদের ভোগান্তি কমাতে হারাম শরীফের কাছাকাছি আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নির্বাচন নিয়ে কোন শঙ্কা নেই। এইবার যে পরিমাণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত করা হয়েছে, তা পূর্বের কোন নির্বাচনেই করা হয়নি— এমনটাই জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব) জাহাঙ্গীর আলম।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান তিনি। এদিন ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশ, আনসার এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভা করেন উপদেষ্টা।

উপদেষ্টা বলেন, 'নির্বাচনের দিনে কোন ধরনের সহিংসতা হলে, ওই দিন বুঝতে পারবেন, আপনারা দেখবেন প্রশাসনের কি ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। সবই তো আপনাদের সামনে ডিসক্লোজ করা যাবে না, কিছু বিষয় তো গোপন থাকে।' 

তিনি বলেন, 'আপনারা আগের অন্যান্য নির্বাচন গুলো দেখেন, যে পরিমাণ সহিংসতা হয়েছে, এবার কিন্তু আল্লাহ দিলে এখন পর্যন্ত তেমন কোন সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। আশা করবো সামনেও হবে না।'

নির্বাচনে মবের চেষ্টা হলে শুধু সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র নয়, ওই আসনের ভোট গ্রহণ স্থগিত করবে ইসি। এনমটাই জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

আইজিপি বলেন, নির্বাচন ঘিরে সকল প্রস্তুতি আছে, ইলেকশনকে কেউ বাধাগ্রস্থ করতে পারবে না। যে কোনও  জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে ৩ স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

গত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছে। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে। সব মিলে ভালো নির্বাচন উপহার দেয়ার প্রত্যাশা করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম। 

আসন্ন নির্বাচন পুলিশের জন্য জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সুযোগ মন্তব্য করে আইজিপি বলেন, কেন্দ্র, ভ্রাম্যমাণ ও স্ট্রাইকিং ফোর্স--এই ৩টি স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তায় মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ পুলিশ সদস্য কাজ করছে। নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও আনসার কাজ করছে।

বাহারুল আলম বলেন, ২৭ হাজার ৯৯৫ বৈধ অস্ত্র জমা পড়েছে। ৯০ ভাগ কেন্দ্রে সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহার করা হবে।

এ সময় তিনি আরও বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে কিছু সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১৭টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৫ জন, আহত হয়েছেন ৬০৩।

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ শহীদ শরিফ ওসমান হাদির পরিবারকে একটি ফ্ল্যাটের দলিল ও চাবি হস্তান্তর করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

আজ মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ওসমান হাদির স্ত্রীসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যের উপস্থিতিতে রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকায় অবস্থিত এই রেডি ফ্ল্যাটের দলিল ও চাবি হস্তান্তর করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এ তথ্য জানিয়েছে।

ফ্ল্যাটের দলিল ও চাবি হস্তান্তরের সময় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করায় বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন। একসঙ্গে হাজারো মানুষ বাড়ির পথে ছুটে চলায় গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ঘরমুখী যাত্রীরা।

আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে গন্তব্যে পৌঁছাতে।

ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জগামী পোশাকশ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কারখানা থেকে ছুটি পেয়েছি ভোট দেওয়ার জন্য। সকালেই রওনা হয়েছি। কিন্তু চন্দ্রা এলাকায় এসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে যানজটে আটকে আছি। কখন বাড়ি পৌঁছাব, বুঝতে পারছি না।’

গাজীপুরের কোনাবাড়ী থেকে বাসে করে রাজশাহী যাচ্ছিলেন গৃহকর্মী হাসিনা বেগম। তিনি বলেন, ভোট দেওয়ার জন্যই এত কষ্ট করে বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু রাস্তার এই যানজটে ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব ভোগান্তিতে পড়েছেন।

কোনাবাড়ী নাওজোর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, লম্বা সময় ছুটি থাকলে মহাসড়কে শত শত পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতিটা ভিন্ন রকম। পুলিশের সব সদস্য নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। পুলিশের সংখ্যা খুবই কম হওয়ায় চন্দ্রাসহ আশপাশের এলাকায় থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করছে। স্বল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্য দিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এদিকে আমাদের টাঙ্গাইলের মির্জাপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রীদের ভিড় অনেক বেড়েছে। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য অপেক্ষা করে বাস পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে অনেকে ট্রাকে চেপে গন্তব্যে যাচ্ছেন। এ সুযোগে বাসের চালক ও সুপারভাইজাররা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে যাত্রীদের অভিযোগ।

যাত্রী ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চল থেকে চলতি মৌসুমে সর্ষে আর ধানের আবাদ করতে শ্রমিকেরা টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে আসেন। তাঁরা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে থেকে কাজ করেন। আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহীরা গতকাল সোমবার বিকেলে থেকেই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে লোকজনের বেশি ভিড় দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া মির্জাপুরের গোড়াই শিল্পাঞ্চলের কারখানায় কর্মরত উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকেরাও বাড়ি ফিরছেন। এ কারণে মহাসড়কে যাত্রী ও গাড়ির চাপ বেড়েছে।

সকালে মহাসড়কের দেওহাটা ও মির্জাপুর বাইপাস বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রীদের ভিড় অনেক। তাদের মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে। অনেকে ট্রাকে চেপে গন্তব্যে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার সকালে মহাসড়কের মির্জাপুর বাইপাস বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে। অনেকে ট্রাকে চেপে গন্তব্যে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার সকালে মহাসড়কের মির্জাপুর বাইপাস বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে
 

মির্জাপুর বাইপাস বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন দিনাজপুরগামী যাত্রী সুজন দে। তিনি বলেন, সকাল ছয়টা থেকে তিনি বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু সকাল পৌনে ৮টা পর্যন্ত তিনি বাস পাননি। দু–একটি বাস থামলেও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। এ জন্য কম ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে তিনি অপেক্ষা করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহাসড়কে সময় আর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ। তিনি মির্জাপুর পৌর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি লিখেছেন, ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিনবাদ, কষ্টে আছে জনগণ। রাতে ঢাকা থেকে মির্জাপুর আসতে সময় লাগছে ১১ ঘণ্টা। রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ। কোনো ট্রাফিক নেই। ভাড়া আদায় করছে ৪ গুণ। দেখারও কেউ নেই। বলার কেউ নেই। অতএব কষ্টে নেই আইজুদ্দিন। কষ্টে আছি আমরা। কষ্টে আছে শ্রমিক। কষ্টে আছে বাংলার জনগণ।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সময় ঢাকা-ওয়াশিংটন অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসতে পারেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুর।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত রোববার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে আলোচনায় পল কাপুরের পরিকল্পিত সফরের প্রসঙ্গটি তোলেন। আগামী ৬ থেকে ৯ মার্চ ঢাকায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন পল কাপুর।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত পল কাপুরকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদের জন্য মনোনীত করেন। পরে ট্রাম্পের এই মনোনয়ন মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটিতে অনুমোদন পায়। গত অক্টোবরে পল কাপুরের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়।

গত বছরের জুন মাসে সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির শুনানিতে পল কাপুর বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি বৃহত্তর। মনোনয়ন নিশ্চিত হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার, চীনের প্রভাব মোকাবিলা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করবেন।

পল কাপুরের মতো ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসনও তাঁর নিয়োগ নিয়ে মার্কিন সিনেটের শুনানিতে চীনের প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলেছিলেন। আর গত মাসে ঢাকায় কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়কালে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন। এ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন বলেছিলেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ততার বিষয়ে ঝুঁকির যে বিষয়টি রয়েছে, তা তিনি স্পষ্টভাবে অন্তর্বর্তী সরকার বা নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে তুলে ধরবেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সিনেটে ‘থিংক টোয়াইস অ্যাক্ট’ পাস আর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএস) ঘোষণার পর চীনের সঙ্গে দেশটির দ্বৈরথের বিষয়টি বেশ স্পস্ট। ফলে নির্বাচনের পর পল কাপুর ঢাকায় এলে নতুন সরকারের কাছে হোয়াইট হাউস বা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন নিয়ে অবস্থান বেশ খোলামেলাভাবেই তুলে ধরবেন। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প অভিবাসননীতি নিয়ে যা বলতেন, ভিসা বন্ডের মতো নানা পদক্ষেপ নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। ফলে চীন নিয়ে কঠোর অবস্থানেই থাকবেন ট্রাম্প।

পল কাপুর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলে অধ্যাপনা করেছেন।

২০২০-২১ সালে পল কাপুর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পরিকল্পনা কর্মকর্তা ছিলেন। সে সময় তিনি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন।

এই দায়িত্ব পাওয়ার আগে পল কাপুর যুক্তরাষ্ট্রের ক্লারমন্ট ম্যাককেনা কলেজে শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভিজিটিং অধ্যাপক ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আমহার্স্ট কলেজ থেকে স্নাতক করেন। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে করেন পিএইচডি।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ ইকবাল করিম দ্বিতীয় দিনের মতো জবানবন্দি দেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল–১–এর অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো.মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি আজ শেষ হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরার দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দেওয়া দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দির পূর্ণ বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো—

আমি আমার দায়িত্ব পালনকালে এটাও জানতে পারি যে মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্রচ্ছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’–এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করে এবং সেখানে যে সাতটি মিটিং রুম ছিল, তার একটিতে তাদের কাজ করতে দেওয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তার তালিকা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিত। এ লিস্টের ওপর ডিজিএফআই কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।

সেনাপ্রধানের তথ্য পাওয়ার জন্য অনেক সূত্র রয়েছে। তার অধীনে আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট এবং ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স নামে দুটি ব্যক্তি/সংস্থা রয়েছে। এ ছাড়া র‍্যাবের অফিসার এবং অন্য ব্যক্তিদের সাথে আলাপের মাধ্যমে আমি অনেক তথ্য জানতে পারতাম। আমি এসব তথ্যের মাধ্যমে জানতে পারি যে আমাদের সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের মিসগাইড করা হচ্ছে এবং ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমি তিনটি ঘটনা উল্লেখ করব।

একজন কনিষ্ঠ অফিসার র‍্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে আমার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার অফিসে আসেন। র‍্যাব থেকে যারা ফিরে আসত তাদের আমি প্রথম প্রশ্ন করতাম যে তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে? এই অফিসারকে আমি একই প্রশ্ন করেছিলাম। সে উত্তরে বলল, ছয়জন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ছয়জনকে কি তুমি সরাসরি হত্যা করেছ? উত্তরে সে বলল, দুইজনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চারজনকে হত্যার সময় সে সেখানে উপস্থিত ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, প্রতি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছ? উত্তরে সে বলল, ১০ হাজার। আমি জিজ্ঞাসা করলাম টাকা নিয়ে কী করেছ? উত্তরে সে বলল, টাকাগুলো সে গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে দিয়েছে। আমি অনুধাবন করতে পারলাম যে এই কাজগুলো সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছে এবং অপরাধবোধ থেকে সে টাকাগুলো মসজিদে দান করেছে।

দ্বিতীয় ঘটনাতে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য আমার অফিসে আসেন। আমি তাকেও জিজ্ঞাসা করি কয়জনকে হত্যা করেছ? সে বলল, ছয়জন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন করেছ? উত্তরে সে বলল, ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি তোমার ঊর্ধ্বতন অফিসার কি না? সে বলল, ‘হ্যাঁ’। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি যদি আমার হাগু তোমাকে খেতে বলি খাবে কি না? সে বলল, ‘না’। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বলল, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। আমি তাকে বললাম, তাহলে কেন করেছ? উত্তরে সে নিশ্চুপ থেকেছে।

তৃতীয় ঘটনাতে একজন মেজর, যে আগে আমার সাথে চাকরি করেছে। র‍্যাবে পোস্টিং হওয়ার কিছুদিন পর সে আমার সাথে সেনা ভবনে দেখা করে। তার আগের একটি ঘটনা আমার কর্ণপাত হওয়ার কারণে আমি তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। ঘটনাটি ছিল হোটেল র‌্যাডিসনে চাকরিরত একটি মেয়েকে কিছু দুর্বৃত্ত রাতে বাড়ি ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যা করে। র‍্যাব, যার মধ্যে ওই মেজরও ছিল, সে ব্যক্তিদের হত্যা করে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি তুমি আইন নিজের হাতে কেন তুলে নিয়েছ? সে বলল, এই ব্যক্তিগুলো সমাজবিরোধী ব্যক্তি এবং তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি তাকে বললাম, তুমি যে আইন ভঙ্গ করে তাদের হত্যা করেছ, তুমিও তো সমাজবিরোধী ব্যক্তি। সে এরপর নিশ্চুপ হয়ে যায়। পরে আমি তাকে প্রতিজ্ঞা করাই, সে র‍্যাবে আর এই ধরনের কাজ করবে না। কিন্তু হতাশার সাথে দেখি কিছুদিন পর সে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে, যেখানে দেখা যায় যে শাপলা চত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে এবং কর্নেল জিয়া একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য ইন্টারভিউয়ের মধ্যে এগুলো ছিল অল্প কয়েকটি উদাহরণ।

শাপলা চত্বরের ঘটনাটি আমরা সবাই জানি। তবে সাল ও তারিখ মনে নেই। ওই দিন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছিলম, এটা তার পটভূমিতে তোলা ছবি।

আমি শুনেছি র‍্যাব যাদের হত্যা করত, তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট–পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত।

র‍্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে আমি বিভিন্ন ডিভিশন এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকি এবং অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করি। একপর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে, তাদের ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি। তাদের স্মরণ করিয়ে দিই শেখ মুজিব এবং জিয়া হত্যার সাথে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছে।

এত কিছুর পরও যখন বুঝতে পারি, ক্রসফায়ার থামছে না, তখন আমি ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র‍্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা এবং পোস্টিং করা বন্ধ করে দিই। আমাকে অনেকে মনে করিয়ে দেন যে আমি যা করছি তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল যে হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্মক। আমি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য এমএসপিএমের কাছ থেকে টেলিফোন পেতে থাকি। একসময় র‍্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ আমার অফিসে আসেন এবং র‍্যাবে অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। আমি তাঁকে কোনো কথা দিইনি। চট্টগ্রামে হোটেল র‌্যাডিসন উদ্বোধনের সময় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশদের সাথে বৈঠককালে আমাকে ডেকে নেন এবং র‍্যাবে অফিসার দিতে বলেন। অফিসারের স্বল্পতার কারণে র‍্যাবে অফিসার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানাই। আমার অবসর গ্রহণের আগপর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।

র‍্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে আমার দায়িত্বকালীন সময়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু না করতে পারার বেদনা আমাকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখত। আজ সুযোগ এসেছে, সেই করতে না পারার কাজটি সম্পন্ন করার। অনেকেই ভাবছেন, আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ ব্যাপারে আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করি না কেন সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। আমাদের উচিত হবে না আমাদের আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে, তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ন হবে না, বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি দূর হবে। আমি চাই র‍্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার এবং সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ, এই সংস্থাটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আমার জবানবন্দি।