চট্টগ্রাম

গতকাল সকালে পদত্যাগ করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির আগের কমিশন। দুপুরের পর দায়িত্ব নেন মাসুদ খানের নেতৃত্বে নতুন কমিশন।

২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর চতুর্থ দফায় বদল হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ নেতৃত্ব। ওই ধসের পর চতুর্থ চেয়ারম্যান হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার দায়িত্ব নিয়েছেন বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা মাসুদ খান। এর মাধ্যমে বিএনপি সরকার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুনর্গঠন করল।

২০১০ সালে আওয়ামী লীগের মেয়াদকালে বড় ধসের পর ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন এম খাইরুল হোসেন। এর পর থেকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর্যন্ত বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন শিবলী রুবাইয়াত–উল–ইসলাম। আর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। এই ১৬ বছরে বিএসইসির নেতৃত্বে তিন দফায় বদল হলেও বাজারে বড় কোনো বদল আসেনি। আস্থাহীনতায় বাজারবিমুখ হন বিনিয়োগকারীরা।

বিএসইসির বিগত তিন চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মোটাদাগে কয়েকটি মূল্যায়ন রয়েছে। তাঁদের মতে, খাইরুল হোসেনের মেয়াদকালে অনিয়ম, দুর্নীতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও বাজারটি পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি খারাপ কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয় খাইরুলের মেয়াদে। এরপর শিবলী রুবাইয়াতের মেয়াদে এসে সেকেন্ডারি বাজারটি কারসাজিকারকদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। দুই চেয়ারম্যানের মেয়াদে আইপিও এবং সেকেন্ডারি বাজারের নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে বিএসইসির কর্মকর্তাদের একাংশ। এরপর বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্বে আসেন রাশেদ মাকসুদ। তাঁর সময়ে বাজারে অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও নেতৃত্ব নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল হতাশা। এ সময়ে বিএসইসির কর্মীদের একটি বড় অংশের মধ্যেই কাজের প্রতি অনীহা দেখা যায়। ফলে খুব বেশি কর্মচাঞ্চল্য ছিল না। এমনকি শেয়ারবাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ কমিশনের সদস্যরা কর্মীদের হাতে নাজেহালের শিকারও হন। এ নিয়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। মামলায়ও অভিযুক্ত করা হয়।

আমরা চাই শেয়ারবাজার বিনিয়োগের সেই আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে আসুক। ভালো শেয়ার কিনে দীর্ঘ মেয়াদে কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন।মিনহাজ মান্নান, পরিচালক, ডিএসই

বিগত সময়ে নষ্ট হওয়া আইপিও বাজার, সেকেন্ডারি বাজার ও উদ্যম হারানো নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেরামত করাই এখন প্রধান কাজ মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশনের। বাজারেও ফেরাতে হবে প্রাণচাঞ্চল্য। ফেরাতে হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা। এ ছাড়া ভালো কোম্পানির খরা কাটানো, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কারসাজি বন্ধ, বাজারের সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রমালিকানাধীন কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা, মুখ থুবড়ে পড়া মিউচুয়াল ফান্ড খাত মেরামত, বাজার কেলেঙ্কারির নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনাসহ চ্যালেঞ্জের তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। হতাশা কাটিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন কমিশনকে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শেয়ারবাজারকে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে আনতে কাজ করতে হবে নতুন কমিশনকে। কারণ, বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার অংশীজন ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শেয়ারবাজার নিয়ে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। সে প্রত্যাশার কথা নিজেও স্বীকার করেছেন নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান। দায়িত্ব নিয়েই গতকাল বিএসইসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ প্রত্যাশার কথা জানান নতুন চেয়ারম্যান।

বিএসইসিতে যোগদানের পরপরই সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিশনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান (বাঁ থেকে তৃতীয়)। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার–বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও নবনিযুক্ত তিন কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। গতকাল বিকেল চারটায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসির সম্মেলনকক্ষে
বিএসইসিতে যোগদানের পরপরই সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিশনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান (বাঁ থেকে তৃতীয়)। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার–বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও নবনিযুক্ত তিন কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। গতকাল বিকেল চারটায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসির সম্মেলনকক্ষে
 

গতকাল বেলা দুইটার পর অর্থ মন্ত্রণালয় মাসুদ খানকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই সঙ্গে কমিশনের কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্সের পরিচালক তানভীর হাবিব রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব ও ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিজ আল তারিকের নিয়োগের প্রজ্ঞাপনও জারি হয়। তাঁদের চার বছরের জন্য এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বিএসইসির কমিশনের একজন কমিশনার নিয়োগ এখনো বাকি রয়েছে।

বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন এ নিয়োগের আগে গতকাল সকালে পদত্যাগ করে আগের পূর্ণাঙ্গ কমিশন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিশনকে গত বুধবারই সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এর আগে সরকার নতুন কমিশন চূড়ান্ত করে। গতকাল দুপুরের পর সেই নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ফলে বিএসইসির ১১তম চেয়ারম্যান হলেন মাসুদ খান। গতকাল বেলা সোয়া তিনটার পর তাঁর নেতৃত্বে নতুন কমিশনের সদস্যরা রাজধানীর আগাঁরগাওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দায়িত্ব নিয়েই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয় নতুন কমিশন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। সংবাদ সম্মেলনে নতুন চেয়ারম্যান তাঁর দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে শেয়ারবাজার ঘিরে তাঁদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

৩০ মিনিটের বেশি সময়ের দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে মাসুদ খান জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাজারে অযাচিত নিয়ন্ত্রণ কমানো তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি বলেন, যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং যেখানে সম্ভব, সেখানে নিয়ন্ত্রণ সহজ করতে কাজ করবে নবগঠিত কমিশন। সে সঙ্গে ভালো কোম্পানি বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থার নতুন কাঠামোও তৈরি করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। মাসুদ খান বলেন, ‘আমরা বাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাব। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে কঠোর ও স্মার্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। আর যেখানে সম্ভব, সেখানে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সহজ করে দেওয়া হবে। ধীরে ধীরে বাজারকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটালাইজড করতে কাজ করবে এই কমিশন। এমন একটি কমিশন আমরা গড়ে তুলতে চাই, যেটি হবে প্রযুক্তিনির্ভর। কাজ হবে দ্রুত ও অংশীজনদের জন্য সহজ।’

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বাজারের কারসাজি নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে রিয়েল–টাইম বা প্রকৃত সময়ভিত্তিক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কারসাজিকারকদের আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি শাস্তির মুখোমুখি হবে এবং সেটি হবে রিয়েল–টাইম ব্যবস্থা। কারসাজি নিয়ন্ত্রণে জেড শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির ওপর শুরু থেকে বিশেষ নজরদারি করা হবে। বিএসইসির সব ধরনের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা।

বিএসইসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান আরও বলেন, শেয়ারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা বাজারের উত্থান-পতন ঠেকানোর কৃত্রিম কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হবে না কমিশন। শেয়ারের বাজারভিত্তিক ন্যায্যমূল্য যাতে নিশ্চিত হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করবে এই কমিশন। এ সময় তিনি আরও বলেন, নতুন কমিশনের দর্শন হচ্ছে প্রথমে স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ, তারপর ডিজিটালাইজেশন, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ধারাবাহিকভাবে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

নতুন কমিশন প্রসঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান বলেন, ‘নতুন কমিশনের কাছে আমাদের প্রধান প্রত্যাশা, নষ্ট হয়ে যাওয়া বাজারের ইকো সিস্টেমটা ফিরিয়ে আনা হোক। আমরা চাই শেয়ারবাজার বিনিয়োগের সেই আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে আসুক। ভালো শেয়ার কিনে দীর্ঘ মেয়াদে কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আবার মন্দ শেয়ারের দাপটে ভালো শেয়ারগুলো আস্থা না হারায়। শেয়ারবাজারকে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে আসুক। যেখানে বিনিয়োগে আস্থা পাবেন দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ভালো কোম্পানিগুলোও বাজারে আসতে আগ্রহী হবে।’

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন দিতে নতুন এই ঋণ কর্মসূচি শুরু করার অনুরোধ জানিয়ে সংস্থাটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার আইএমএফের বাংলাদেশবিষয়ক মিশনপ্রধান আইভো ক্রিজনার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান কর্মসূচিগুলো হলো বর্ধিত ঋণসহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ)। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচি অনুমোদনের পর থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আইএমএফের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকারকে এখন আরও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং নতুন ও ধারাবাহিক সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশের এই অনুরোধ সংস্থাটির সঙ্গে এমন একটি সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করেছে, যা বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রতিফলিত করবে এবং নতুন সরকারের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে তা নির্ভর করবে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কর্মসূচিভিত্তিক শক্তিশালী নীতিগত প্রতিশ্রুতির ওপর। এ জন্য আইএমএফের নীতিমালা অনুযায়ী, সংস্থাটির নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদন লাগবে।

আইভো ক্রিজনার বলেন, আইএমএফের কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা করছেন। এ সফরে তাঁরা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং নীতিগত অগ্রাধিকার বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি অর্থনীতির সম্ভাবনা ও সংস্কার-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোও মূল্যায়ন করা হবে।

আইএমএফের বাংলাদেশবিষয়ক মিশনপ্রধান আরও বলেন, সম্ভাব্য নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির আকার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কারের অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে নতুন মিশন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবে থাকবে আইএমএফ।

এর আগে ২০২২ সালের ২৪ জুলাইয়ে জরুরি ভিত্তিতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা ও বাজেট সহায়তার জন্য ঋণ চেয়ে আইএমএফের কাছে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে ঋণের আকার নির্ধারণ করা হয় ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার। এখন পর্যন্ত ৫ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ঋণ কর্মসূচির আকার ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। সে হিসাবে এখনো ১৮৬ কোটি ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে।

গত ঈদের আগে ২১ মে অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, নতুন কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচির মেয়াদ হবে তিন বছর। এ সময়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার হতে পারে।

তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে। গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমলেও পরের প্রান্তিকে তা বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। আর এখন মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে এসব ব্যাংকে আগের প্রান্তিকের চেয়ে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমেছে। সব মিলিয়ে ওই সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু হয়। আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত অনেক গ্রাহককে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ফলে খেলাপি ঋণ হুঁ হুঁ করে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেয়। তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসে।

ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি গোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল, ইসলামী ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।

— চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট ৬ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০% বেশি।

— কাতারে সবজি রপ্তানি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৪০% কমেছে।

— বাংলাদেশি সবজির বড় বাজারগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র।

ঢাকা

সদ্য বিদায়ী মে মাসেও দেশে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক মে মাসের প্রবাসী আয়ের তথ্য প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, সর্বশেষ গত মাসে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। গত বছরের মে মাসে ২৯৬ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭০ লাখ ও মার্চে প্রায় ৩৭৫ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছিল। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ও গত ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছিল। ফলে গত ডিসেম্বর থেকে টানা ছয় মাস ধরে তিন বিলিয়ন বা তিন শ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। প্রবাসী আয় সংগ্রহে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এরপরই প্রবাসী আয় বেশি এসেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা মার্চ ও এপ্রিল মাসে বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে মে মাসেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে প্রবাসী আয়ে ডলারের দাম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, দেশে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে দেশে মোট ৩ হাজার ২৭৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশের বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ২ হাজার ৭৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল।

কোন ব্যাংকে কত প্রবাসী আয়

দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। মে মাসে প্রবাসীরা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে পাঠিয়েছেন প্রায় ২৩৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। মে মাসে ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৫৯ কোটি ২১ লাখ ডলার। আর বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছে ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে, প্রায় ৪১ কোটি ডলার।

এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের মাধ্যমে গত মাসে প্রায় ৫৬ কোটি ৬৫ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে, প্রায় সোয়া ২৪ কোটি ডলার। আর বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪৭ কোটি ডলার। সার্বিকভাবে প্রবাসী আয় আসার দিক থেকে কৃষি ব্যাংক দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আজ সোমবার দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৭৭ কোটি বা ৩৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি বা বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩ হাজার ১১ কোটি বা ৩০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করা হয় এবং এরই অংশ হিসেবেই সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সোমবার (১ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি একথা জানান।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি মাসেই জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করা হয়। তবে মে মাসে কোনো সমন্বয় হয়নি, কারণ এপ্রিলেই একটি সমন্বয় করা হয়েছিল। এছাড়া, একান্ত উপায়হীন হলেই সরকার এ ধরনের অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশের জ্বালানি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় অংশ ডিজেল, যার পেছনে সরকারকে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। এরপরও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কম রাখতে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলে আমরাও দ্রুত সমন্বয় করার চেষ্টা করবো। জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। মানুষের কষ্ট লাঘবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হবে।

বিদ্যুতের দাম প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। সরকার কমিশনের স্বাধীন ক্ষমতা পুনর্বহাল করেছে এবং বর্তমানে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানো হবে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদেরও আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দিতে পারব।

এছাড়া প্রতিমন্ত্রী জানান, ঈদের ছুটিতে বিদ্যুতের চাহিদা ৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছিলো। তাই লোডশেডিংয়ের কারণ নেই। তবে ঝড়-বৃষ্টির দুর্যোগের কারণে সঞ্চালন লাইনের সমস্যায় কিছু জায়গায় লোডশেডিং করতে হয়েছে।

ঈদুল আজহার পরপরই দেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য আসছে বাড়তি খরচের চাপ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) শিগগিরই বিদ্যুতের নতুন খুচরা মূল্য ঘোষণা করতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে এবং নতুন এই ট্যারিফ জুন মাস থেকেই কার্যকর হবে।

তবে স্বস্তির খবর হলো, নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত ‘লাইফ লাইন’ ক্যাটাগরিতে আপাতত কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। আগের মতোই শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা বর্তমান সুবিধা বহাল রাখবেন।

বিইআরসির এক কর্মকর্তা জানান, ঈদের ছুটির আগেই মূল্য সমন্বয়ের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। জুন মাস থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে করা শর্তের অংশ হিসেবে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দুই মাস আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী বিইআরসির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গত ২০ ও ২১ এপ্রিল দুই দিনব্যাপী গণশুনানি আয়োজন করে বিইআরসি। সেখানে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়।

প্রস্তাব অনুযায়ী, পিডিবি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছে।

তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি সুপারিশ করেছে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রতি ইউনিট ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে। কমিশন শেষ পর্যন্ত এই সুপারিশ গ্রহণ করতে পারে বলে জানা গেছে।

বিইআরসির এক কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে ইউনিটপ্রতি মূল্যবৃদ্ধি ১ টাকার কম হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তিনি জানান, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে দাম বাড়ানো হবে। এরপর ২০০ থেকে ৪০০ ইউনিট এবং ৪০০ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ধাপে ধাপে মূল্য বৃদ্ধি করা হবে। সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়বে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ওপর।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে দাম অনেক বেড়ে গেলে দেশেও গত এপ্রিলের মাঝামাঝি দাম বাড়ানো হয়। এরপর মে মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। তবে দেশের বাজারে জুন মাসের জন্য তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল সরকার।

আজ রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা আর অকটেনের দাম ১৪০ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করা হয়েছে। আজ রাত ১২টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এক লাফে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধি হয় ২০২২ সালের আগস্টে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। যদিও সমালোচনার মুখে একই মাসে ৫ টাকা কমানো হয়েছিল দাম। আর গত এপ্রিলে দাম বৃদ্ধির পর দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে পৌঁছায় জ্বালানি তেল। এখন পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও বাড়ল।

২০২৪ সালের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ শুরু করে সরকার। সে হিসেবে আগের মাসে আমাদনি করা জ্বালানি তেলের খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে নতুন দাম সমন্বয় করা হয়। মার্চের মতো এপ্রিলেও শুরুতে দাম অপরিবর্তিত রাখে সরকার। তবে ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের মধ্যে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আর নির্বাহী আদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে। দেশেও তেলের সরবরাহ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। ফিলিং স্টেশনগুলোতে লম্বা লাইন বাড়তে থাকে। তবে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার একদিন পর গত ২০ এপ্রিল থেকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে ফিলিং স্টেশন থেকে ভিড় কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

প্রতিবছর চামড়া পাচারের অভিযোগ শোনা যায় উল্লেখ করে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘আমরা চাই না দেশ থেকে একটি চামড়াও পাচার হোক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর লালবাগের পোস্তা এলাকায় কোরবানির কাঁচা চামড়া কেনা–বেচা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোরবানির চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের চামড়াশিল্পকে আরও শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করা সরকারের লক্ষ্য। জুলাইয়ের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিসক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।

আবদুল মুক্তাদির বলেন, ব্যবসায়ীদের হাতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া এসেছে। লবণ মাখানোর কার্যক্রমও চলছে। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছানো যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

দেশে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ও রপ্তানির পরিমাণ ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পশুর চামড়া ছাড়ানোর প্রক্রিয়াটিকে আধুনিক ও যন্ত্রনির্ভর করার পরিকল্পনা করছি।’

হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পরও অনেক ট্যানারি পুরোপুরি কার্যক্রম চালু করতে পারেনি জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো সমাধান করে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলে দেশের সব চামড়া শিল্পায়নের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে সিইটিপির পরিশোধনসক্ষমতা দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার হলেও বাস্তবে তা ১৪ থেকে ১৮ হাজার ঘনমিটারে সীমাবদ্ধ থাকছে। সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।

এ সময় শিল্পসচিব ওবায়দুর রহমান, বাণিজ্যসচিব (রুটিন দায়িত্ব) আবদুর রহিম খান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মহাপরিচালক সাইফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্বের বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের গাড়ি ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত বাজার হারাচ্ছে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে। শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নয়, ব্যাটারি, সফটওয়্যার, নকশা ও উৎপাদন প্রযুক্তিতেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ি প্রদর্শনী ‘অটো চায়না ২০২৬’ উপলক্ষে বেইজিং ও হেফেইয়ের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে বিবিসি দেখেছে, চীনের গাড়ি শিল্পে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উন্নয়নের গতি বিদেশি কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে।

জাপানি গণমাধ্যমকে হোন্ডার প্রধান নির্বাহী তোশিহিরো মিবে বলেন, সাংহাইয়ের অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় কারখানা দেখে তাঁর মনে হয়েছে, ‘এদের সঙ্গে আমাদের কোনো সুযোগই নেই।’

ফোর্ডের প্রধান নির্বাহী জিম ফার্লেও সতর্ক করে বলেছেন, চীনা কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক সম্প্রসারণের কারণে পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতারা এখন ‘টিকে থাকার লড়াইয়ে’ নেমেছে।

দশকের পর দশক ধরে বিদেশি কোম্পানিগুলো চীনা অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গাড়ি তৈরি করলেও এখন সেই সম্পর্কের ধরন বদলে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে তারা।

সাংহাইভিত্তিক গাড়ি বিশ্লেষক বিল রুসো বলেন, উন্নত বিশ্ব সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করছে, তা হলো—তারা ভাবছে এই পরিবর্তন কেবল বৈদ্যুতিক গাড়িকে ঘিরে। অথচ আসল লড়াই হচ্ছে ভবিষ্যতের ‘মোবিলিটি প্রযুক্তি’ কে নেতৃত্ব দেবে, তা নিয়ে।

‘চাকার ওপর স্মার্টফোন’
চীনের আধিপত্য শুধু গাড়ি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি এখন ৩১৫টির বেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬৩। এর অনেকগুলোই বৈদ্যুতিক গাড়ির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত—যেমন ব্যাটারি, যন্ত্রাংশ ও উৎপাদন সরঞ্জাম।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাবে, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় চীনে ছোট আকারের বৈদ্যুতিক এসইউভি উৎপাদনে অন্তত ৩০ শতাংশ কম খরচ হয়। এর বড় কারণ কম ব্যাটারি খরচ ও শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা।

এই সুবিধা তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর সরকারি সহায়তার মাধ্যমে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপের হিসাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীন বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, এসব ভর্তুকি বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করছে। তবে এই সহায়তাই চীনা কোম্পানিগুলোকে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে ও দাম কমাতে সহায়তা করেছে।

চীনের ভেতরের তীব্র প্রতিযোগিতাও উদ্ভাবনের গতি বাড়িয়েছে। শাওমি, হুয়াওয়ে ও আলিবাবার মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এখন গাড়ি তৈরি করছে। ফলে ভোক্তা প্রযুক্তি ও গাড়িশিল্পের মধ্যে দূরত্ব কমে এসেছে।

বিল রুসোর ভাষায়, ‘তারা এখন আর পশ্চিমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে না, নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা করছে।’

গাড়ি এখন ক্রমেই সফটওয়্যারনির্ভর হয়ে উঠছে—ড্রাইভার সহায়ক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে বিনোদনব্যবস্থা পর্যন্ত। এই পরিবর্তন চীনা কোম্পানিগুলোকে আরও এগিয়ে দিচ্ছে।

বেইজিংয়ের বাইরে শাওমির ইভি কারখানায় প্রায় প্রতি ৭৬ সেকেন্ডে একটি গাড়ি উৎপাদন লাইন থেকে বের হচ্ছে।

মাত্র ২০২৪ সালে প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আনার পরই শাওমি চীনের শীর্ষ বিক্রিত ব্র্যান্ডগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তাদের লক্ষ্য হলো গাড়ি, স্মার্টফোন, অ্যাপ ও স্মার্ট হোম ডিভাইসকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা।

হেফেইতে নিওর কারখানার বড় অংশ প্রায় পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়।

অন্যদিকে বিওয়াইডি এমন দ্রুতগতির চার্জিং প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে মাত্র ৫ মিনিটে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার চলার মতো চার্জ দেওয়া যায়, যা কি না গাড়ির পুরো ট্যাংকে পেট্রোল ভরার সময়ের কাছাকাছি।

এক্সপেংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী হে শিয়াওপেং বিবিসিকে বলেন, কোম্পানিটি বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি মানবসদৃশ রোবট ও উড়ন্ত গাড়ি নিয়েও কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আগামী এক দশকে প্রতিটি গাড়ি কোম্পানিকেই রোবোটিকস কোম্পানিতে পরিণত হতে হবে।’

ভাবছে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো
বিদেশি গাড়ি নির্মাতারা এখন বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহের জন্যও চীনের ওপর নির্ভরশীল। টেসলা সাংহাইয়ে তৈরি মডেল-৩ ইউরোপে রপ্তানি করছে। একইভাবে বিএমডব্লিউর চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক মিনি গাড়িও বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। তবে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর অবস্থা দুর্বল হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অটোমোবিলিটির তথ্য অনুযায়ী, চীনের গাড়ির বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডের অংশীদারত্ব ২০২০ সালের ৬৪ শতাংশ থেকে চলতি বছর নেমে এসেছে ৩২ শতাংশে। এর প্রভাব পড়েছে জেনারেল মোটরস (জিএম) ও জার্মান গাড়ি নির্মাতাদের আয়ে, যারা দীর্ঘদিন চীনের বাজার থেকে বড় মুনাফা করত।

বিলাসবহুল গাড়ির বাজারেও চাপ বাড়ছে। হুয়াওয়ের মেক্সট্রো এস ৮০০ সেডান এখন চীনে এক লাখ ডলারের বেশি দামের গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। এটি পোরশে পানামেরা ও বিএমডব্লিউ ৭ সিরিজের সম্মিলিত বিক্রিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
দীর্ঘদিন বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ড সরবরাহ করত, আর চীনা অংশীদারেরা দিত কারখানা ও বাজার। এখন সেই সমীকরণ বদলে গেছে।

স্টেলান্টিস সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডংফেংয়ের সঙ্গে ১০০ কোটি ইউরোর একটি চুক্তি করেছে। এর আওতায় চীনে পিউজো ও জিপ ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হবে। এ ছাড়া স্টেলান্টিস ইউরোপে ডংফেংয়ের বৈদ্যুতিক ব্র্যান্ড ভয়াহ নিয়ে আসছে। এমনকি ফ্রান্সে চীনা নকশার গাড়ি উৎপাদনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।

ফক্সওয়াগেনও এক্সপেংয়ের সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় চালনা প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে যে নিজস্বভাবে এই প্রযুক্তি যথেষ্ট দ্রুত উন্নয়ন করতে পারেনি।

এক্সপেং প্রধান হে শিয়াওপেং বলেন, ‘আমরা একে অন্যের কাছ থেকে শিখি, তাই একে অন্যকে বিশ্বাস করি। সহযোগিতা করি।’

টয়োটা, হুন্দাই, ফোর্ড ও নিসানও চীনে গবেষণা কার্যক্রম বাড়াচ্ছে অথবা বিদেশি কারখানায় চীনা নকশার গাড়ি তৈরির সম্ভাবনা খুঁজছে। তবে সব কৌশল সফল হচ্ছে না।

চীনের বাজারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা অডির ই৫ মডেলের বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে বড় ধরনের মূল্যছাড় দিতে হয়েছে।

জিএমও চীনে তাদের কার্যক্রমে কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদমূল্য কমিয়ে দেখিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তাদের বিক্রি ২১ শতাংশের বেশি কমেছে।
জাপানি কোম্পানিগুলো তুলনামূলক ধীর গতিতে পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকেছে। ফলে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে তারা চাপে পড়েছে, যেখানে চীনা ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

২০২৬ সালের শুরুতে ফক্সওয়াগেন সাময়িকভাবে আবার চীনের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত গাড়ি ব্র্যান্ডের অবস্থানে ফিরেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ ছিল চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়।

বিশ্বজুড়ে বিস্তার
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এখন প্রবৃদ্ধি কমছে। অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ও তীব্র মূল্য যুদ্ধের কারণে শিল্পটির মুনাফা চাপে পড়েছে।

এ কারণেই চীনা কোম্পানিগুলো বিদেশি বাজারে আরও আগ্রাসী হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পরও বিওয়াইডি, চেরি ও এসএআইসির মতো প্রতিষ্ঠান ইউরোপ ও উদীয়মান বাজারে দ্রুত বিস্তার ঘটাচ্ছে।

চেরির জাইকু ৭ মডেল বাজারে আসার মাত্র ১৪ মাসের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত নতুন গাড়িগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তবে ১০০ শতাংশের বেশি শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার কার্যত চীনা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গাড়ি উৎপাদন, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উন্নয়ন যদি ক্রমেই চীনের দিকে সরে যায়, তাহলে ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে চাকরি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে।

পরামর্শক জেমস পিয়ারসনের ভাষায়, ‘একটি বাজার থেকে তাদের ঠেকিয়ে রাখলেও তারা অন্য বাজার খুঁজে নেবে।’

বিশ্লেষক বিল রুসো মনে করেন, গাড়িশিল্পের কেন্দ্র ইতিমধ্যেই চীনের দিকে সরে গেছে। তাঁর মতে, যারা সহযোগিতায় আগ্রহী, তাদের সামনে এখনো সুযোগ আছে। কিন্তু যারা শুধু চীনের উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করবে, তারা পিছিয়ে পড়বে।

বিবিসি

কোরবানি ঈদের আগে চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। পরের ৪ দিনে সেটি আরও বাড়বে। যদিও সেই হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩৬ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার সমান। গত এপ্রিলে ৩১৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল। তার আগের মাসে এসেছিল রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়। ওই মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতর ছিল।

দেশে প্রবাসী আয় আনার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক সবার শীর্ষে। চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে ৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এনেছে ইসলামী ব্যাংক। এই সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এনেছে ব্র্যাক ব্যাংক, ৩৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৬ কোটি ২৮ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এনেছে ট্রাস্ট ব্যাংক। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংক ২১ কোটি ডলার এবং পূবালী ব্যাংক ১৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এনেছে।

গত ডিসেম্বর থেকে প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন বা তার বেশি প্রবাসী আয় দেশে আসছে। ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ ও ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে ২ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। গত অর্থবছর ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল।