• Colors: Purple Color

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।

এর মধ্যে ছয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) কমপক্ষে ৬৩ জন পর্যবেক্ষক পাঠাতে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ১৬টি দেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ৩২ জন পর্যবেক্ষক যোগ দেবেন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩০ জনে।

আসন্ন নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের এই সংখ্যা ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ওই নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।

এর আগে ১২তম, ১১তম ও ১০তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৫৮, ১২৫ এবং মাত্র চারজন।

ওআইসির নির্বাচন পর্যবেক্ষক ইউনিটের প্রধান শাকির মাহমুদ বান্দার দুই সদস্যের পর্যবেক্ষক দলের নেতৃত্ব দেবেন। এ ছাড়া এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (এএনএফআরইএল) থেকে ২৮ জন, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে ২৫ জন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) থেকে সাতজন এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) থেকে একজন পর্যবেক্ষক আসবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভয়েস ফর জাস্টিস, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এসএনএএস আফ্রিকা, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন এবং পোলিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিত্বকারী ৩২ জন পর্যবেক্ষক ব্যক্তিগত পর্যায়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ সচিব ও এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মুরশেদ বলেন, আমরা আশা করছি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা আরও বাড়বে, কারণ যেসব দেশকে পর্যবেক্ষক পাঠানোর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তাদের কয়েকটি এখনও প্রতিনিধি দলের নাম নিশ্চিত করেনি।

এখনো যেসব দেশ প্রতিনিধি নিশ্চিত করেনি, সেগুলো হলো—ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, মিসর, ফ্রান্স, কুয়েত, মরক্কো, নাইজেরিয়া ও রোমানিয়া।

এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর ফোরাম (ফেম্বোসা) শিগগিরই তাদের প্রতিনিধিদের নাম ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে ৫০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ প্রায় দুই হাজার প্রার্থী ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

 

এক জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের ৯০ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, তাঁরা এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে চান। আর ৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা এখনো ভোট দেওয়ার বিষয়ে অনিশ্চিত বা ভোটে অংশ নেওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা করছেন না। অন্যদিকে আগে যাঁরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাঁদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন।

‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক মতামত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ একসঙ্গে এই জরিপ করেছে।

আজ বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপের ফল তুলে ধরা হয়। ফল তুলে ধরেন সিআরএফের স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ। তিনি জানান, তাঁরা দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনে ভোটারদের ওপর এই মতামত জরিপ করেছেন। মতামত জরিপে অংশ নিয়েছেন ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটার। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই ধাপে জরিপটি করা হয়।

জাকারিয়া পলাশ বলেন, জরিপে দেখা গেছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে দুর্নীতির ইস্যু। জরিপে ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতির ইস্যুটিকে গুরুত্ব দেবেন বলে জানিয়েছেন। ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন বলে মত দিয়েছেন।এ ছাড়া ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন বলে জরিপে এসেছে।

আগে যাঁরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাঁদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন বলে জরিপে উঠে এসেছে—সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এ ছাড়া আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন এমন ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার জামায়াতকে, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। ১৩ শতাংশ ভোটার অন্যদের ভোট দেবেন। ২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন।

জরিপের ফল অনুযায়ী, ২০০৮ সালের পর প্রথম ভোট দেবেন—এমন ভোটারদের ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা এবার জামায়াতকে ভোট দেবেন। ২৭ শতাংশ বিএনপি, ১৭ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। আর ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন।

জাকারিয়া পলাশ বলেন, মতামত জরিপে উঠে এসেছে, এবারের নির্বাচনে মানুষ এমন নেতাদের ভোট দিতে চান, যেই নেতা মানুষের কথা ভাবেন, আর শক্তিশালী নেতৃত্ব দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ভোটাররা ব্যক্তিগত বিশেষ যোগ্যতার তুলনায় জনদরদি প্রার্থীকে বেশি পছন্দ করছেন বলে জানিয়েছেন।

জরিপের ফলের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ দল ও প্রার্থী দুটিকে সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে—এমনটা জানিয়েছেন ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার। ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার শুধু দলকে গুরুত্ব দেবেন বলে জানিয়েছেন। শুধু প্রার্থীকে গুরুত্ব দেবেন ৩০ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার। আর ৬ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনটিকে গুরুত্ব দেবেন, তাঁরা এখনো তা ঠিক করেননি বলে জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসরিয়াল ফেলো এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচনে নেই, তাই তাদের ভোট এবার কোন দিকে যাবে, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ। জরিপের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এবারের নির্বাচনে অনেক মানুষ ভোট দেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তবে ভোটের দিনের পরিস্থিতি কেমন হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে ৮ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন—নিরাপত্তা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভালো না থাকলে তাঁদের অনেকে ভোটকেন্দ্রে না–ও যেতে পারেন। তখন এই ৮ শতাংশ হয়ে যেতে পারে ৮০ শতাংশ।

ভোটের দিনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষ যাতে কোনোভাবেই উদ্বিগ্ন না থাকেন, বিশেষত নারী ও বয়স্ক ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁরা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন।
এই অধ্যাপক মনে করেন, জরিপের ফল যেমনই হোক, নির্বাচনের দিন পরিস্থিতি কেমন হবে, ভোটাররা কতটা নিরাপত্তা পাবেন, ভোট গ্রহণ কতটা সুশৃঙ্খল থাকবে—এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে কত মানুষ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যাবেন।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সিআরএফের সহসভাপতি ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাবুল হক। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে, যেটা অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে বেশি।

মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে এখনো উদ্বেগ আছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক সাহাবুল হক। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে একধরনের টেনশন কাজ করছে যে ভোটটা সুষ্ঠু হবে কি না, নিরপেক্ষ হবে কি না, ব্যালট বাক্স দখল হয়ে যায় কি না, কোনো ধরনের সংঘাত হয় কি না। এই উদ্বিগ্নতা মানুষের মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও সাধারণ ভোটারও আছেন।

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ আগের চেয়ে ধর্মকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘বেশি মানুষ কিন্তু এটা নিয়ে ভাবছে না; বরং তাঁরা দুর্নীতিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে—প্রার্থী বা প্রার্থীর দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে কি না।’

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সারা দেশে এক হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

নিয়োগপ্রাপ্ত এই ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোটগ্রহণের আগে ও পরে মাঠপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলার সার্বিক তদারকি করবেন। মূলত নির্বাচনের ময়দানে অপরাধ প্রতিরোধ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই হবে তাদের প্রধান কাজ।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করবেন। তবে দায়িত্ব পালনের আগে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে যাতে তারা নির্বাচনী আইন ও বিধিনিষেধগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। তারা নির্বাচনী এলাকায় স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্বরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড এবং সশস্ত্র বাহিনীর টিমকে প্রয়োজনীয় আইনি দিকনির্দেশনাও প্রদান করবেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, নিয়োগপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর ৫ ধারা অনুযায়ী ক্ষমতা প্রাপ্ত হবেন। তারা ভোটগ্রহণের দুই দিন পর পর্যন্ত নির্ধারিত এলাকায় অবস্থান করবেন এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে এসব ম্যাজিস্ট্রেটের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং এলাকা নির্ধারণ করে দেবেন। এর ফলে নির্বাচনী সহিংসতা রোধ এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার।

 

ঢাকা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইনসাফ, প্রযুক্তি, মেধা এবং যুবকদের প্রাধান্য ও নারীদের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জনতার ইশতেহার’ শীর্ষক এই পরিকল্পনা ও কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। একইসঙ্গে বহু রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা সমুহের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।

জামায়াত সূত্রে জানানো হয়, মোট ২৬টি অগ্রাধিকারসূচি নিয়ে ইশতেহারটি তৈরি করা হয়েছে। ইশতেহারের প্রথম ভাগে একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে শাসনব্যবস্থা সংস্কার, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নির্বাচনি ব্যবস্থার সংস্কার, জবাবদিহিতামূলক জনপ্রশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং উন্নত আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

ইশতেহারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। বাণিজ্য, শিল্প, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ খাতেও বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

এ ছাড়া ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানোন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যুব প্রযুক্তি নেতৃত্বের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নারী ও শিশু নিরাপত্তা, সমাজকল্যাণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।

জামায়াত দাবি করেছে, ‘জনতার ইশতেহার’ তৈরিতে অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে এবং জনগণের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চাহিদা বিবেচনা করে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।

নির্বাচনি ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সেগুলো হলো-

১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’- এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।

২. বৈষমাহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।

৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেয়া।

৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।

৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্রে বিনির্মণ।

৬. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।

৭. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূলো আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।

৮. ব‍্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খ্যাত সংস্কারের মাখায়ে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও বাবসাবান্ধব টেকসই এ স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।

৯. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।

১২. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।

১৩. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূনা ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা। বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া।

১৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ণ ও কর্মসংস্থান তৈরি।

১৫. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা।

১৬. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

১৭. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয় বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।

১৮. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

১৯. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।

২০. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।

২১. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।

২২. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জনা স্বল্পমূলো আবাসন নিশ্চিত করা।

২৩. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।

২৪. সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২৫. সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

২৬. সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশের তারিখ ঘোষণা করেছে বিএনপি। আগামী শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দলটি তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জনকল্যাণমুখী ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরবে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

এর আগে রাজধানী ঢাকাতে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, ইশতেহার তৈরির যাবতীয় তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক কাজ ইতিমধ্যেই সাফল্যের সঙ্গে গুছিয়ে আনা হয়েছে। 

তিনি বলেন, বিএনপি একটি গণমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভাব-অভিযোগ এবং প্রত্যাশার কথা শুনেছে। জনগণের এই সরাসরি অংশগ্রহণ ও মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়েই এবারের ইশতেহারটি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে দলটির বিশ্বাস।

মাহদী আমিন আরও বলেন , বিএনপির প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কারের ‘৩১ দফা’ এবং ‘২৭ দফা’র মূল ভিত্তিগুলোর আলোকেই দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ওইসব কর্মসূচির অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইশতেহারটি প্রণীত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান, কৃষকের অধিকার, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো এখানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

 

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব