• Colors: Purple Color

ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের পাল্টা হামলার জেরে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ সব জায়গায় শেয়ারবাজারে প্রভাব পড়েছে।

সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে আজ সোমবার সংকটগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’র উল্লেখ করে আজ কুয়েতের শেয়ারবাজারের লেনদেন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সৌদি আরবের প্রধান সূচক টিএএসআই সূচক ২ দশমিক ২ শতাংশ, মিসরের ইজিএক্স ৩০ সূচক ২ দশমিক ৫ শতাংশ, বাহরাইনের বিএএক্স সূচক ১ শতাংশ, ওমানের এমএসএক্স সূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।

পাকিস্তানের প্রধান সূচক কেএসই ১০০ আজ ১৬ হাজার পয়েন্ট কমেছে, যা এক দিনে এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ পতন। এ জন্য পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ (পিএসএক্স) শেয়ারবাজারের লেনদেন বন্ধ করে দেয়। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে ভারতের নিফটি ৫০ সূচক ১ দশমিক ২৪ শতাংশ, জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, হংকংয়ের হেংসেং সূচক ২ দশমিক ১৪ শতাংশ, চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক দশমিক ৪৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার মূল সূচক কোসপি ১ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধান সূচক কেএলসিআই দশমিক ৯৬ শতাংশ ও তাইওয়ানের প্রধান সূচক দশমিক ৯০ শতাংশ পড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকের পতন ঘটতে শুরু করে। আজ রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত পৌনে ৯টা) পাওয়া খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ডাউ জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ সূচক ৫৪৩ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ১ শতাংশ এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকও ১ দশমিক ১ শতাংশ ও নাসড্যাক সমম্বিত সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকগুলোরও পতন ঘটে। ওয়ালস্ট্রিটের এসঅ্যান্ডপি ৫০০, নাসড্যাক কম্পোজিট, ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ফিউচার—সব কটিই প্রায় ১ শতাংশ করে কমেছে।

ফিউচার (ভবিষ্যৎ চুক্তি) হলো এমন ধরনের আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা আগাম নির্ধারিত দামে ভবিষ্যতের কোনো তারিখে শেয়ার, পণ্য বা সূচক কেনাবেচার অঙ্গীকার করেন। বাজার খোলার আগেই ফিউচার লেনদেন দেখে বিনিয়োগকারীরা দিনটি সম্পর্কে আগাম ধারণা পান।

ইউরোপীয় শেয়ারবাজারগুলোতেও আজ বড় পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু হয়। লন্ডনের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটার কিছু পর প্যান-ইউরোপীয় সূচক স্টক্স ৬০০ সূচক প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ ও লন্ডনের প্রধান শেয়ারসূচক এফটিএসই ১০০ সূচক প্রায় ১ শতাংশ পড়ে যায়। ইউরোপের অন্য বাজারগুলোতে পতন আরও বেশি ছিল। ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক ১ দশমিক ৮ শতাংশ ও জার্মানির ড্যাক্স সূচক ২ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ইউরোপে তেল, গ্যাস ও প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছাড়া প্রায় সব প্রধান খাতেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

ইউরোপের প্রতিরক্ষা তথা সামরিক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারও আজ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ইতালির মহাকাশ ও প্রতিরক্ষাপ্রতিষ্ঠান অ্যাভিওর শেয়ার প্রায় ২ শতাংশ বাড়ে। যুক্তরাজ্যের বিএই সিস্টেমসের শেয়ারমূল্য প্রায় ৫ শতাংশ ও সুইডেনের যুদ্ধবিমান নির্মাতা এসএএবির শেয়ার প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ইতালির লিওনার্দো ও জার্মানির রেঙ্ক—এ দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম প্রায় ৪ শতাংশ করে বাড়ে।

ইউরোপের শেয়ারবাজারে ভ্রমণ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন দেখা যায়।

অন্যদিকে ভ্রমণ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন দেখা যায়। অ্যাংলো-আমেরিকান ক্রুজ অপারেটর কার্নিভ্যাল ও এয়ারলাইনস গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল কনসোলিডেটেড এয়ারলাইনস গ্রুপের শেয়ারমূল্য ৩ শতাংশ কমে যায়। জার্মান পর্যটন কোম্পানি টুই এজির শেয়ার প্রায় ৯ শতাংশ ও লুফথানসার শেয়ারের দাম ৩ শতাংশ কমেছে।

সূত্র: সিএনএন, সিএনবিসি, বিবিসি, দ্য ডন, রয়টার্স

ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলারের উত্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সংকটকালে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলার এখনো কার্যকর।

সংবাদে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গ্রিনব্যাক আবারও ঐতিহ্যগত ‘ক্রাইসিস কারেন্সি’ বা সংকটকালীন মুদ্রার পরিচয় ফিরে পেয়েছে। খবর রয়টার্সের

কয়েক মাস ধরেই ডলার নিয়ে বাজারে সংশয় ছিল। বিশেষ করে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বিক্রির ধুম পড়লেও ডলার প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠেছিল, চাপের সময়ে ডলারের স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ কি ফিকে হয়ে যাচ্ছে?

কানাডার বহুজাতিক স্কশিয়াব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ এরিক থিওরেট বলেন, ‘আজকের দিনটি ডলারের দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারে ধ্রুপদি দিন। কেননা এদিন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ না করে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ডলারের আশ্রয় নিয়েছেন।’

এরিকের ভাষায়, ‘লিবারেশন ডে’ আমাদের চিরপরিচিত ঐতিহাসিক ধারা থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। বিষয়টি হলো, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেন, সেই দিনটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিবারেশন ডে’ বা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আখ্যা দেন। ওই ঘোষণার পর ডলারসহ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা যায়। অর্থাৎ তখন ডলার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারেনি।

গোল্ড প্রাইস ডট অর্গের তথ্যানুসারে, সোমবার বিশ্ববাজারের সোনার দাম বেড়েছে আউন্সপ্রতি ৮৮ ডলারের বেশি। ফলে সোনার দাম এখন ৫ হাজার ৩৬৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শিগগরিই তা আবার সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৮৯ ডলারে উঠেছিল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারের গভীরতা ও শক্ত ভিত ডলারের জন্য সহায়ক। এরিক থিওরেটের ভাষায়, ‘আপনি যদি বড় পরিসরে ঝুঁকি কমাতে চান, মার্কিন ট্রেজারি বাজারই একমাত্র বাজার, যে বাজার আপনার ঝুঁকির মাত্রা সামলাতে পারে।’ সংকটের সময় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল-বন্ডের দিকে ঝুঁকলে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের চাহিদা বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের মার্সার অ্যাডভাইজার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডন ক্যালকাগনি বলেন, ‘ডলারের বিকল্প নেই, এটাও বড় কারণ। অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলার থেকে দূরে থাকা কঠিন। তাই নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের নৈপুণ্যে আমি তেমন একটা অবাক নই।’

ঝুঁকির উৎস যখন যুক্তরাষ্ট্র

গত বছর বাজারের অস্থিরতায় ডলার কেন নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় হতে পারেনি, এর ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, তখন ঝুঁকির উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। ওয়াশিংটনের শুল্ক–ঝড় বিশ্ববাজারে তোলপাড় সৃষ্টি করে। যে দেশ অনিশ্চয়তার উৎস, তার মুদ্রায় আশ্রয় নিতে বিনিয়োগকারীদের অনীহা থাকা স্বাভাবিক।

ম্যাক্রো গবেষণা ও কৌশল প্রতিষ্ঠান ম্যাক্রো হাইভের গবেষক বেঞ্জামিন ফোর্ড বলেন, ট্রাম্পের তথাকথিত ‘স্বাধীনতা দিবসের’ ঘোষণায় ডলারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বের অন্য অঞ্চলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। তাঁর মতে, এখন তেলের দামও বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগের অবস্থান থেকে মুখ ফিরিয়ে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন।

বিএনওয়াইয়ের আমেরিকাস ম্যাক্রো কৌশলবিদ জন ভেলিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে ধাক্কা এলে ডলারের আবেদন ক্ষুণ্ন হতে পারে। কিন্তু যখন সংকট আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক, তখন ডলারের আবেদন অটুট থাকে। এখনকার বাজারে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে সবাই এতটা নিশ্চিত নন। রাবোব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশল প্রধান জেন ফোলি বলেন, এবারের সংকটের সময় ডলারের অবস্থান দেখে মনে হতে পারে, সে তার পুরোনো মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। কিন্তু বিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি।

সোমবার ডলার শুধু নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবেই নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র যে নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক, সে কারণেও পালে হাওয়া পেয়েছে। তেলের দাম বাড়লে সাধারণত আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে।

স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক অ্যারন হার্ড মনে করেন, জ্বালানি বা তারল্যসংকটের বাইরে অন্য কোনো ধরনের ধাক্কায় ডলার একইভাবে শক্তিশালী না–ও থাকতে পারে। তাঁর কথায়, বিষয়টি যদি সাধারণ অর্থনৈতিক ভীতি হয়, তখন ডলার এতটা কার্যকর না–ও হতে পারে।

হার্ডের বক্তব্য হলো, আগে বড় সংকটের সময় শেয়ারবাজার পড়ে গেলেও ডলার সাধারণত শক্তিশালী হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন, ভবিষ্যতে বড় ধাক্কার সময় ডলার ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ একই সঙ্গে অস্থির হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ডলার সব পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা আগের মতো নেই।

ম্যাক্রো হাইভের ফোর্ড মনে করেন, স্বল্প মেয়াদে ডলারের ভবিষ্যৎ তেলের দামের গতিপথের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়তে থাকবে আর বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমবে—এমন পরিবেশে ডলারের চাহিদা বাড়বে।

তবে তেলের দাম কমে গেলে প্রচলিত নিরাপদ মুদ্রা, যেমন সুইস ফ্রাঁ ও জাপানি ইয়েন আবার শক্তিশালী হতে পারে। তেমন পরিস্থিতিতে এই দুটি মুদ্রাই বিনিয়োগের জন্য লাভজনক মাধ্যম হবে বলে মনে করছেন ফোর্ড।

দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) কারওয়ান বাজারে বিপিসি ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। তবে বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কোনো শঙ্কা নেই।

নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে গতকাল পর্যন্ত সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুদ রয়েছে।
জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদের তালিকা
পণ্য মোট মজুদ ব্যবহারযোগ্য মজুদ মজুদকাল
ডিজেল ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন ১ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন ১৪ দিন
অকটেন ৩৭ হাজার মেট্রিক টন ৩৪ হাজার মেট্রিক টন ২৮ দিন
পেট্রোল ২১ হাজার মেট্রিক টন ১৯ হাজার মেট্রিক টন ১৫ দিন
ফার্নেস অয়েল ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ৭৬ হাজার মেট্রিক টন ৯৩ দিন
জেট এ–১ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ৫৫ হাজার মেট্রিক টন ৩০ দিন

মধ‍্যপ্রাচ‍্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশেও জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে এবং বেশি বেশি তেল কিনছে। তাই ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

আজ শুক্রবার বিপিসির এক নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল।

স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ্যে করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলারেরা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কিছু কিছু ভোক্তা ও ডিলার ফিলিং স্টেশন হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন মর্মে খবর প্রকাশ হচ্ছে, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

জনগণের আতঙ্ক কমানোর লক্ষ্যের কথা জানিয়ে নির্দেশনায় বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য বিদেশ হতে আমদানি কার্যক্রম/সূচি নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে চালান দেশে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিলারদের সাময়িকভাবে প্রধান স্থাপনা হতে সারা দেশের সব ডিপোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগন/ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুত) গড়ে উঠবে।

 যানবাহনে নির্ধারিত তেলের পরিমাণ

রসিদ দেখিয়ে তেল নিতে হবে

ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও দাম উল্লেখ করে রসিদ দিতে হবে এবং প্রতিবার তেল কেনার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় নির্দেশনায়।

বিপিসি আরও বলেছে, ডিলারেরা বরাদ্দ ও ভোক্তার ক্রয় রসিদ গ্রহণ করে তেল সরবরাহ করবে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রির তথ‍্য ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল গ্রহণ করবে।

ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের আগে বর্তমান বরাদ্দ ও মজুতের তথ‍্য পর্যালোচনা করে সরবরাহ করা হবে এবং কোনো অবস্থায় বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে বিপিসি।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে আজ ছুটির দিনেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

যেমন পরিবাগে মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মোটরসাইকেল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হতে দেখা যায়। কে কার আগে যাবেন, এ নিয়ে কেউ কেউ হাতাহাতিতে লিপ্ত হন।

৫০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছেন উবারচালক নাজমুল হাসান। তিনি শাহবাগ মেট্রোরেলের স্টেশনের নিচ থেকে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন বলে জানান। প্রায় ৫০ মিনিট পর তেল নিতে পেরেছেন। এ সময়ে দুই থেকে তিনটি ভাড়া পেতেন বলে জানান এই চালক। বলেন, প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্যদের মানুষদের অল্প হলেও চলে, কিন্তু এই তেল ছাড়া তাঁদের চলবে না।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলছে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। তবে অনেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তেল কিনছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে অর্থনীতির আসন্ন ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আট অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলেছেন, সংকট কতটা হবে তা এখনো পরিষ্কার না। বৈশ্বিক সংকট হলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ আসবে। এ জন্য রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। এ ছাড়া সুদহার কমাতে এখনই নীতি সুদহারে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আসন্ন চাপ কেটে গেলে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

আজ শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সভায় দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদেরা এই পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও এখনই তা গ্রাহক পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যোগ দিয়ে নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে এক সদস্যের পদত্যাগ ও অর্থনীতিবিদদের বিরোধিতার মুখে সেই সভাটি ভেস্তে যায়। এর মধ্যে ইরানে আমেরিকার হামলা ও পাল্টা হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা বুঝতে দেশের অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সভা করার উদ্যোগ নেন গভর্নর।

সভায় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে গভর্নরের পাশাপাশি চার ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দেওয়া হয় একটি কমিটি গঠন করতে, যারা সময়ে সময়ে দেশের অর্থনীতি নিয়ে বিস্তারিত জানাবে। যাতে কোনো আতঙ্ক তৈরি না হয়।

সভায় আলোচনা হয় ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে ডলার ও রিজার্ভের ওপর আবারও চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি প্রবাসী আয়েও ধাক্কা আসতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে সরকারের নীতি হলো দেশের বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা। এমন পরিস্থিতিতে কী ধরনের নীতি নেওয়া যায় ও সরকার কী ধরনের নীতি পারে, তা জানতে চাওয়া হয় অর্থনীতিবিদদের কাছে।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, গভর্নর জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি সততার সঙ্গে কাজ করবেন। কোনো রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ব্যাংকগুলোকেও রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে বলেছেন।

সভায় উপস্থিত অর্থনীতিবিদেরা জানান, এখন যে বৈশ্বিক চাপের আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা এড়ানোর সুযোগ কম। কীভাবে কম ক্ষতি হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বর্তমানে যে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ) আছে, তা ধরে রাখতে হবে। রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করে আমদানি করা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আনা কঠিন হওয়া ব্রুনেই ও সিঙ্গাপুর থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখনই তা ভোক্তা পর্যায়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।

তাঁরা আরও পরামর্শ দেন বিশ্বব্যাংকসহ যত বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নিতে হবে। তেলের আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে বাড়তি ঋণের উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের যাতায়াতে সমস্যার কারণে প্রবাসী আয়ে ধাক্কা আসতে পারে। তবে যারা আয় পাঠাতে চায়, তাদের আনার ব্যবস্থাটা আরও মসৃণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদেরা পরামর্শ দেন, এখনো মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। আরও বেড়ে যাক এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে সরকার ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সুদের হার কমাতে এখনই নীতি সুদহার কমানো ঠিক হবে না। এ জন্য যুদ্ধের পর পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাতে চাহিদামতো ঋণ পায়, সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও চট্টগ্রাম বন্দরের পথে রয়েছে তেল ও গ্যাসবাহী একাধিক জাহাজ।

রোববার (৮ মার্চ) সকালে জ্বালানিবাহী ৮টি জাহাজ এসে নোঙর করে বন্দরে। জাহাজগুলো গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আগেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম এ তথ্য জানান।

এদিকে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত শুক্রবার জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রওনা দেওয়া জাহাজ দেশে এলেও এর পরবর্তী জাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, দুবাইসহ বিভিন্ন বন্দরে আটকা পড়েছে।

 

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব