পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিতে পারস্পরিক আস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাজের সমন্বয়কে বড় শর্ত বলে উল্লেখ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তিনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে পার্বত্য এলাকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন আঞ্চলিক পরিষদ এবং জেলা পরিষদগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দলের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার প্রথম আলো কার্যালয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন মন্ত্রী।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জীবিকায়নের ধরন, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাধাসমূহ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল যৌথভাবে আয়োজন করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো। সহযোগিতায় ছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

মন্ত্রী মনে করেন, পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে পর্যটন খাতকে থামিয়ে রাখা বা বিদেশি দাতা সংস্থাদের নিরুৎসাহিত করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, পুলিশ,বিজিবিসহ সব বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। তাঁর মতে, পর্যটন খাতের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার অর্জন করতে হলে এই খাতকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে। নিরাপত্তার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে দপ্তরের কাজের সমন্বয় বাড়াতে হবে।

পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে অনেক আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও দাতাদেশ কাজ করতে আগ্রহী হলেও নানা জটিলতায় সেটা হচ্ছে না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এনজিও বা বিদেশি সংস্থা পার্বত্য অঞ্চলে ঢুকলে একধরনের নেতিবাচক ও সন্দেহপ্রবণ মনোভাব তৈরি হয়। এমন ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। এ ছাড়া ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচের কারণে জুমচাষিদের বিষয়গুলোও ইতিবাচকভাবে বিকশিত হতে পারছে না।

মন্ত্রীর বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোকে উন্নয়নকাজে সম্পৃক্ত করার কথা। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকাজে আঞ্চলিক পরিষদকে গুরুত্ব না দিলে কাজ হবে না। এ কাজে জেলা পরিষদগুলোকে সম্পৃক্ত করতেই হবে।

১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। গঠিত হয় তিন জেলা পরিষদ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার বিবেচনায় এই তিন জেলা পরিষদকে অনেক স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ মডেল হিসেবে বিবেচনা করেন। যে চুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে, সেই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়েও আজ কথা বলেন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তিনি বলেন, চুক্তি সম্পাদনকারী যে দল, তাদের সঙ্গে অবশ্যই আলোচনায় বসতে হবে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। ফলে পাহাড়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা সশস্ত্র আন্দোলনের অবসান হয়।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জীবিকায়নের ধরন, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাধাসমূহ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জীবিকায়নের ধরন, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাধাসমূহ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা

অচিরেই রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—এই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ঘোষণা করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।

বেসরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের সমালোচনা ও সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে আজ দীপেন দেওয়ান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন সংস্থারর ইতিবাচক কাজের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে যথাযথ তদারকি বা ‘মনিটরিং’ না থাকায় দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অনেক ক্ষেত্রে অপচয় বা আত্মসাৎ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলের স্থায়িত্বের মূলে রয়েছে ‘পারস্পরিক আস্থা’।

পার্বত্য অঞ্চলকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বা ভিন্ন কোনো নেতিবাচক আঙ্গিকে না দেখে, এর অধিকার ও স্বাধিকার রক্ষা করে মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আস্থা ও সমন্বয়’—এই দুটি নীতিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এই অঞ্চল এক বিশাল এবং উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সহযোগী সংগঠনগুলো একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে জানান মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

শাহীন আনাম জানান, এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিকূল পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও পানির সংকট মোকাবিলা করে জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ২০ হাজার পরিবারকে স্বাবলম্বী করাই মূল লক্ষ্য।

শাহীন আনাম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাঙা রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি জানান। পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, ঐতিহ্য ও অনন্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি প্রকল্প শেষেও যেন এই টেকসই উন্নয়ন বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরেন।

গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদলের ফার্স্ট কাউন্সিলর এডউইন কোয়েক কোয়েক পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়নে যৌথ প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন, অসমতা দূরীকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ইইউর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন। সেখানে আরও বক্তব্য দেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদা, ডেলিগেশন অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন টু বাংলাদেশের রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মেহের নিগার ভূঁইয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য চঞ্চু চাকমা, রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, ইউএনডিপি বাংলাদেশের লাইভলিহুডস অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের চিফ বিপ্লব চাকমা, বান্দরবান জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জুলহাস আহমেদ, আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটসের নির্বাহী পরিচালক বিপ্লব চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা, পিআরএলসি প্রকল্পের সুবিধাভোগী কাজলী তঞ্চঙ্গ্যা, দ্য ডেইলি স্টারের সিনিয়র সাংবাদিক জাগরণ চাকমা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রজেক্টের কো–অর্ডিরেটর নিখিল চাকমা।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব