জনগণকে না জানিয়ে বন্দর ইজারা দেওয়া গণস্বার্থের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে যুক্ত করে নেওয়া উচিত ছিল। কোনো নন-ডিসক্লোজার চুক্তির আড়ালে জনগণকে না জানিয়ে বন্দর ইজারা দেওয়া গণস্বার্থের পরিপন্থী।
আজ শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। ‘চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি’ শিরোনামে এ আয়োজন করে বন্দর সুরক্ষা কমিটি। এতে বন্দরের শ্রমিক, আলোচক ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, আমরা স্বচ্ছভাবে জনগণকে জানিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি কি না। নন-ডিসক্লোজার ক্লজের আড়ালে কোনো চুক্তি চলতে দেওয়া ঠিক নয়। বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর দেওয়ার যুক্তি আমরা অদক্ষ, বিদেশিরা বন্দর নেবে, তারা মুনাফা করবে—এটি ভয়াবহ। বিপদের সময় রাষ্ট্রের পক্ষে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারব কি না, এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।’
গণসার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘বন্দর ও গণসার্বভৌমত্ব একসঙ্গে। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আমলারা একতরফা নিতে পারবে না। গণসার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের সার্বভৌমত্বের নামেই ক্ষমতা লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণির হাতে যাচ্ছে। নির্বাচন চলাকালীন জনগণ ঠিক কারা লুট করবে, তা নির্বাচন করছে।’
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক আন্দোলন যৌক্তিক, কিন্তু বন্দর অচল হয়ে গেলে তা বিদেশি কোম্পানির কাছে বন্দর হস্তান্তরের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে গণসার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।’
সভার শুরুতে বক্তব্য দেন বন্দর সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আহমেদ ফেরদৌস। পরে ‘চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রোমেল। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন, মো. হুমায়ুন কবীর প্রমুখ।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘বন্দরের অর্থায়নে নির্মিত বিভিন্ন প্রকল্প বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, যা বন্দরের স্বার্থ ও কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি। এনসিটি বিদেশিদের হাতে গেলে প্রায় ৮০০ কর্মচারী কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। আমরা চাই বন্দর রক্ষা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা এবং দেশি দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।’
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘কৃত্রিমভাবে আয় কম দেখিয়ে চুক্তির যৌক্তিকতা তৈরি করা হচ্ছে। দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করতে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা হলেও চুক্তি করা হচ্ছে তাদের আরেকটি কোম্পানির সঙ্গে, যার বোর্ড ও কাঠামো স্পষ্ট নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা এই চুক্তির পূর্ণ তদন্ত ও তথ্য প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি।’