• Colors: Purple Color

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পরও লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলের এমন নৃশংসতায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তেহরান-ওয়াশিংটন সংলাপের প্রস্তুতি চলছে।

যুদ্ধবিরতি চলবে দুই সপ্তাহ। এর মধ্যে আজ শুক্রবার ইসলামাবাদে সংলাপ শুরু হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে আগামীকাল শনিবার। মোটামুটি এটুকু নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও সংলাপে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কারা অংশ নেবেন, তা গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে একটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। যদিও সংবাদমাধ্যমগুলোয় সম্ভাব্য কিছু নাম এসেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার ৪০ দিন পূর্তিতে শোক সমাবেশ। বৃহস্পতিবার তেহরানে
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার ৪০ দিন পূর্তিতে শোক সমাবেশ। বৃহস্পতিবার তেহরানে, ছবি: রয়টার্স
 

এরই মধ্যে শান্তিপ্রক্রিয়া ভেস্তে যায় কি না, সে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, ইরানের যে ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংলাপ শুরু হওয়ার কথা, তার তিনটি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিও পুরোপুরি চালু হয়নি। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দিয়েছেন—চুক্তি না হলে আরও বড় পরিসরে হামলা চালাবেন। আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু তার অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেবে না।

এমন সব আলোচনার মধ্যে গতকাল রাতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানান, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তাঁরা। ‘লেবাননের আহ্বানের’ পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা শুরু করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। অবশ্য নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্যের পরপরই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়ে দেন, ‘যুদ্ধ থামবে না।’

ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চলছে তল্লাশি। বৃহস্পতিবার লেবাননের তিয়ার শহরে
ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চলছে তল্লাশি। বৃহস্পতিবার লেবাননের তিয়ার শহরে, ছবি: এএফপি

জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মালিহা লোদি। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার সময় ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটন আশ্বাস দিয়েছিল যে ইসরায়েলকে বুঝিয়ে হামলা বন্ধ করবে তারা। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর তার বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে এখন পর্যন্ত যতটা অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তার জন্য ইসরায়েল দায়ী।

সংলাপ ঘিরে ইসলামাবাদে তোড়জোড়

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগামীকালের আনুষ্ঠানিক বৈঠককে বলা হচ্ছে ‘ইসলামাবাদ সংলাপ’। এ সংলাপ ঘিরে নানা কারণে অনিশ্চয়তা থাকলেও ইসলামাবাদে ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার জন্য রাজধানী শহরটিতে গতকাল ও আজ দুই দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা। লকডাউন করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকা।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধিরা আজ ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারেন। এর আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে দেশটির ৩০ সদস্যের দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। ইরানি প্রতিনিধিরাও পাকিস্তানে যাবেন বলে জানিয়েছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ। লেবাননে হামলা বন্ধের ওপর জোর দিয়ে গতকাল রাতে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দিয়েছেন-চুক্তি না হলে আরও বড় পরিসরে হামলা চালাবেন। আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু তার অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেবে না।

দুই দেশের প্রতিনিধিদলে কারা থাকছেন, সে সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার অংশ নিতে পারেন। ইরানের প্রতিনিধিদলে থাকতে পারেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি।

এ সংলাপ নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা থাকলেও জেডি ভ্যান্সের একটি বক্তব্য আশার আলো দেখাচ্ছে। রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তাঁকেসহ পুরো আলোচক দলকে ‘সৎ বিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনা করতে বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এখন ইরানও যদি সৎভাবে আলোচনা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস—একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

তবু হুমকি ট্রাম্প-হেগসেথের

জেডি ভ্যান্স হয়তো ট্রাম্পের ইতিবাচক বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তবে নিজ মুখে কিন্তু নেতিবাচক কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, একটি ‘প্রকৃত চুক্তি’ সম্পূর্ণভাবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ইরান ও দেশটির আশপাশে থাকবে। আর চুক্তি না হলে এমন হামলা চালানো হবে, যা আগে কখনো কেউ দেখেনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফাইলছবি: রয়টার্স
 

এ প্রকৃত চুক্তিটি আসলে কী, তা খোলাসা করেননি ট্রাম্প। তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগেসেথও উসকানি দিয়ে গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ইসলামাবাদ সংলাপের অন্যতম প্রধান শর্ত হতে হবে ইরানের পরমাণু ইস্যু। তেহরানকে ইসফাহান পরমাণুকেন্দ্রে মজুত ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। না হলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে গিয়ে তা নিয়ে আসবে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার সময় ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটন আশ্বাস দিয়েছিল যে ইসরায়েলকে বুঝিয়ে হামলা বন্ধ করবে তারা। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর তার বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে এখন পর্যন্ত যতটা অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তার জন্য ইসরায়েল দায়ী।—মালিহা লোধি, জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত

ইরানে আবার ব্যাপক হামলা শুরু করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে মার্কিন বিশ্লেষকেরাই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুজান ম্যালোনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতি নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে ইরান। ট্রাম্প বিষয়টি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন। তাই চাইলেই তিনি হুট করে আবার যুদ্ধে ফিরতে পারবেন না।

‘ট্রাম্পের চাপে’ আলোচনার সিদ্ধান্ত

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইসরায়েলে যুদ্ধবিরোধী জনমত নেই। চলতি বছরের শেষে আবার ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ যুদ্ধবিরতির জন্য নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করেছেন। এমনকি যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করেছেন সরকারি দল লিকুদ পার্টির নেতা আমিচাই চিকলি।

এ পরিস্থিতিতে দেশে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকতে যুদ্ধবিরতির মধ্যে নেতানিয়াহু লেবাননে হামলা চালাতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত বুধবার লেবাননজুড়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর গতকালও দেশটির বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এদিন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রধানের ব্যক্তিগত সহকারী আলী ইউসুফ হারশিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ফাইল ছবি: এএফপি
 

এমন হামলার মধ্যে লেবাননের সঙ্গে নেতানিয়াহু কেন আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? মার্কিন এক কর্মকর্তার বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা হয় নেতানিয়াহুর। তখন লেবাননে হামলা কমানো এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা নিয়ে দেশটির সঙ্গে আলোচনা শুরুর নেতানিয়াহুকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তারপরই আলোচনার কথা বলেন নেতানিয়াহু।

বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ যুদ্ধবিরতির জন্য নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করেছেন। এমনকি যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করেছেন সরকারি দল লিকুদ পার্টির নেতা আমিচাই চিকলি।

লেবাননে হামলা থামিয়ে দেশটিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইতালি, স্পেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। আর লেবাননে হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এর আগে তেহরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির পর লেবাননে হামলা, ইরানের ভূখণ্ডে ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং তেহরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করতে দেওয়ার মার্কিন হুমকির মাধ্যমে তাদের ১০ দফা প্রস্তাবের লঙ্ঘন হয়েছে।

শিগগিরই স্বাভাবিক হবে না হরমুজ

যুদ্ধবিরতির পর আল-জাজিরাকে সূত্র জানিয়েছিল, বৃহস্পতি বা শুক্রবার (আজ) থেকে হরমুজ প্রণালি চালু করতে পারে ইরান। এর পরপরই ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি) জানায়, লেবাননে হামলা চলমান থাকায় প্রণালিটি খুলবে না তারা। অবশ্য গতকাল বাহিনীটি হরমুজ দিয়ে চলাচলের জন্য একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এতে প্রণালির কোথায় মাইন স্থাপন করা আছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও সমুদ্র গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ দিয়ে মাত্র একটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও পাঁচটি মালবাহী জাহাজ পার হয়েছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজের পরিচালক উদয় ভাস্কর বলেন, যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত। বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়।

যুদ্ধবিরতির পর ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ দিয়ে মাত্র একটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও পাঁচটি মালবাহী জাহাজ পার হয়েছে
যুদ্ধবিরতির পর ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ দিয়ে মাত্র একটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও পাঁচটি মালবাহী জাহাজ পার হয়েছে, ফাইল ছবি: রয়টার্স
 

এর কারণ হিসেবে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কপলার। প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও বেশির ভাগ জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কিছু বিষয় বিবেচনা করছে। যেমন নিরাপত্তা ও বিমাসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা থাকায় তারা উল্লেখযোগ্য হারে ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক নয়। এ ছাড়া হরমুজ দিয়ে চলাচল করা জাহাজ থেকে ইরান যে বাড়তি অর্থ নেওয়ার কথা বলেছে, তা-ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবেচনায় রয়েছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি হলেও এ সময়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫টি জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করতে পারে।

রয়টার্স আল–জাজিরা

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই লেবাননে ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বুধবারের (৮ এপ্রিল) মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে ৫০টি যুদ্ধবিমান নিয়ে দেশটির বৈরুত ও অন্যান্য অঞ্চলে ১০০ বারেরও বেশি বোমাবর্ষণ করেছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। নারকীয় এ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। সেইসঙ্গে আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ।

তবে, এই হামলাই শেষ নয়; লেবাননে আরও ভয়ংকর হামলার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে ইসরায়েল। 

এ অবস্থায় লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশিদেরকে বৈরুতের ১৪টি এলাকা থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এক জরুরি সতর্কবার্তায় এসব এলাকা থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য আক্রমণের বিষয়ে জরুরি সতর্কবার্তা প্রদান করা হলো।  

এলাকাগুলো হলো, সাবরা শাতিলা, শাতিলা, বুর্জ আল বারাজনে, আল-রিহাব, ইজনাহ, বীর হাসান, হাইছুলুম, এয়ারপোর্ট রোড, আল-উযায়ী, আল-শিয়েহ, তারিক আল-জাদিদের উপকণ্ঠ, আল-তাইউনেহ, ফুর্ন আল-শুব্বাকের উপকণ্ঠ ও বাদারো (আল-শিয়ার কাছে)।

 

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালিয়েছে র‍্যাব-২। অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় তিন ব্যক্তিকে।

র‍্যাব-২–এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-২–এর আভিযানিক দল গতকাল রাতে জেনেভা ক্যাম্পে এ অভিযান চালায়।

গ্রেপ্তার হওয়া তিন ব্যক্তি
গ্রেপ্তার হওয়া তিন ব্যক্তি,ছবি: র‍্যাব–২–এর সৌজন্যে
 

র‍্যাব-২ বলছে, অভিযানে ১টি দেশি পিস্তল, ৭টি সামুরাই, ১৮০ গ্রাম হেরোইন, ২ কেজি গাঁজা ও ৬০টি ইয়াবা বড়িসহ তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য যাচাই–বাছাই সাপেক্ষে র‍্যাব-২ ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাজীপাড়া চৌরাস্তায় গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সয়াবিন তেল তৈরির একটি কারখানা সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

রূপগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারজান ইসলামের নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত এ অভিযান চালান। অভিযানে বিজিবি ও র‍্যাবের যৌথ দল অংশ নেয়। আজ শুক্রবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল দিবাগত রাত একটার দিকে অভিযানটি চালানো হয়। অভিযানকালে ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখতে পান, কারখানাটি অবৈধভাবে সয়াবিন তেল উৎপাদন ও মজুত করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিকভাবে কারখানাটি সিলগালা করার নির্দেশ দেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, কারখানাটির কার্যক্রমসহ মালিকপক্ষের ব্যাপারে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সবার উপস্থিতিতে গ্রহণ করা হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিজিবি ও র‍্যাব দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে নিয়মিতভাবে যৌথ অভিযান চালিয়ে আসছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

ঢাকা

তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন নুসরাত। পুরো নাম নুসরাত জাহান রাফি। পরিবারের মধ্যমণি ছিলেন। কিন্তু সেই মেয়েটিই চলে গেলেন সবার আগে। পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে। সেই হত্যার সাত বছর পেরিয়েছে আজ। ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

কিন্তু আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি আটকে থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে। এতে হতাশা আর শঙ্কায় দিন কাটছে নুসরাতের পরিবারের। তাঁদের প্রশ্ন—বিচার শেষ হতে আর কত অপেক্ষা?

পরিবারের দাবি, দ্রুত উচ্চ আদালতের কার্যক্রম শেষ করে দণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা কার্যকর করা হোক।

তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন

চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়ে ছিলেন নুসরাত। সাত বছরেও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁর বাবা-মা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় নুসরাতের মা শিরিন আক্তারের সঙ্গে। মেয়ের স্মৃতি মনে করেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে। এটা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। মৃত্যুর আগে অন্তত মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর হতে দেখতে চাই।’

সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়ার বাড়িটিতে এখনো পুলিশ পাহারা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে বাড়িটি পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। তবে পরিবারের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামিপক্ষের স্বজনদের নানা হুমকিতে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে। এটা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। মৃত্যুর আগে অন্তত মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর হতে দেখতে চাই

শিরিন আক্তার, নুসরাতের মা

নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পরও বিভিন্নভাবে হুমকি পেয়েছি। আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।’

মামলার বাদী ও বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘দীর্ঘ সময়েও উচ্চ আদালতে মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। দ্রুত বিচার শেষ করে রায় কার্যকর করার দাবি জানাই।’

যেভাবে হত্যা

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা নুসরাতকে তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে তাঁর শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পাঁচ দিন পর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কোথায়

নুসরাত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে রয়েছেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ্দৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী।

ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. আব্দুল জলিল বলেন, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন ফেনী জেলা কারাগারে আছেন। তাঁদের একজন মাকসুদ আলম; অন্য মামলায় হাজিরা থাকায় তাঁকে সেখানেই রাখা হয়েছে। বাকি আসামিরা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন কারাগারে আছেন।

মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে তাঁর শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পাঁচ দিন পর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

উচ্চ আদালতে আটকে বিচার

মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে বিচারাধীন। নিম্ন আদালতের রায়ের প্রায় পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, ১৬ আসামির মধ্যে সাতজনের ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষ হয়েছে। বাকি ৯ আসামির শুনানি শেষ হলে আদালত রায় ঘোষণার পর্যায়ে যেতে পারেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে বেঞ্চ গঠন ও শুনানির ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মৃত্যুবার্ষিকীতে কর্মসূচি

নুসরাতের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা নুসরাতের কবর জিয়ারত করবেন।

এর আগে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুদিনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল। তবে এবার এখনো সে ধরনের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিবারের আশা, স্মরণ নয়—দ্রুত বিচারই হবে নুসরাতের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

ফেনীর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মেজবাহ উদ্দিন খাঁন বলেন, চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমে। এতে অপরাধীরা ভীত হয় এবং নতুন করে অপরাধে জড়াতে নিরুৎসাহিত হয়।

পিপি মেজবাহ উদ্দিন খাঁন বলেন, রায় ঘোষণার পর তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে অপরাধীদের মধ্যে উল্টো উৎসাহ তৈরি হতে পারে। তাই নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত এ মামলার রায় কার্যকর হবে।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব