তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন নুসরাত। পুরো নাম নুসরাত জাহান রাফি। পরিবারের মধ্যমণি ছিলেন। কিন্তু সেই মেয়েটিই চলে গেলেন সবার আগে। পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে। সেই হত্যার সাত বছর পেরিয়েছে আজ। ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
কিন্তু আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি আটকে থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে। এতে হতাশা আর শঙ্কায় দিন কাটছে নুসরাতের পরিবারের। তাঁদের প্রশ্ন—বিচার শেষ হতে আর কত অপেক্ষা?
পরিবারের দাবি, দ্রুত উচ্চ আদালতের কার্যক্রম শেষ করে দণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা কার্যকর করা হোক।
তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন
চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়ে ছিলেন নুসরাত। সাত বছরেও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁর বাবা-মা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় নুসরাতের মা শিরিন আক্তারের সঙ্গে। মেয়ের স্মৃতি মনে করেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে। এটা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। মৃত্যুর আগে অন্তত মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর হতে দেখতে চাই।’
সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়ার বাড়িটিতে এখনো পুলিশ পাহারা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে বাড়িটি পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। তবে পরিবারের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামিপক্ষের স্বজনদের নানা হুমকিতে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে। এটা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। মৃত্যুর আগে অন্তত মেয়ের হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর হতে দেখতে চাই
নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পরও বিভিন্নভাবে হুমকি পেয়েছি। আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।’
মামলার বাদী ও বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘দীর্ঘ সময়েও উচ্চ আদালতে মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। দ্রুত বিচার শেষ করে রায় কার্যকর করার দাবি জানাই।’
যেভাবে হত্যা
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা নুসরাতকে তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে তাঁর শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পাঁচ দিন পর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কোথায়
নুসরাত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে রয়েছেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ্দৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী।
ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. আব্দুল জলিল বলেন, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন ফেনী জেলা কারাগারে আছেন। তাঁদের একজন মাকসুদ আলম; অন্য মামলায় হাজিরা থাকায় তাঁকে সেখানেই রাখা হয়েছে। বাকি আসামিরা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন কারাগারে আছেন।
উচ্চ আদালতে আটকে বিচার
মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে বিচারাধীন। নিম্ন আদালতের রায়ের প্রায় পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি জাহেদ মনসুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, ১৬ আসামির মধ্যে সাতজনের ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষ হয়েছে। বাকি ৯ আসামির শুনানি শেষ হলে আদালত রায় ঘোষণার পর্যায়ে যেতে পারেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে বেঞ্চ গঠন ও শুনানির ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে কর্মসূচি
নুসরাতের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা নুসরাতের কবর জিয়ারত করবেন।
এর আগে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুদিনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল। তবে এবার এখনো সে ধরনের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিবারের আশা, স্মরণ নয়—দ্রুত বিচারই হবে নুসরাতের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
ফেনীর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মেজবাহ উদ্দিন খাঁন বলেন, চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমে। এতে অপরাধীরা ভীত হয় এবং নতুন করে অপরাধে জড়াতে নিরুৎসাহিত হয়।
পিপি মেজবাহ উদ্দিন খাঁন বলেন, রায় ঘোষণার পর তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে অপরাধীদের মধ্যে উল্টো উৎসাহ তৈরি হতে পারে। তাই নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত এ মামলার রায় কার্যকর হবে।