সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসে অবস্থিত দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) স্টেশনে গতকাল সোমবার ড্রোন হামলা হয়েছে। এটি ইরানি ড্রোন ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র আজ মঙ্গলবার রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছে।

তবে ওই সূত্র বলেছে, সিআইএর স্টেশনটি সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল—এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

সিআইএ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এর মধ্যে সৌদি আরবে সিআইএর স্টেশনে হামলার ঘটনা ঘটল।

সংঘাত চলাকালে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও হামলা হয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দুটি ড্রোন ব্যবহার করে দূতাবাসটিতে হামলা চালানো হয়। এতে সীমিত আকারে আগুন লাগে। কিছু বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সূত্র: রয়টার্স

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্য দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর আজ বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছেন। সকাল ৯টার আগেই তিনি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান।

দিনের শুরুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করছেন পল কাপুর। এরপর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

পরে পল কাপুর সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

সন্ধ্যায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি সফর উপলক্ষে নৈশভোজে অংশ নেবেন পল কাপুর।

ঢাকা–ওয়াশিংটন কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে পল কাপুর গতকাল মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় আসেন। গত অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই পল কাপুরের প্রথম বাংলাদেশ সফর।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এ সফরে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক প্রসঙ্গগুলো আলোচনায় আসবে। ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে ব্যবসা–বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, ভিসার মতো বিষয়গুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার থাকতে পারে। মূলত গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সই করা অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (আর্ট) চুক্তি মেনে চলার বার্তা থাকবে নতুন সরকারের প্রতি। আর এ কারণে চুক্তির আগে এ বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলাদা বৈঠকও করেছে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর।

গত শনিবার থেকে ইরানে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়াও হামলায় ইরানের ১৭টি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।

এক বিবৃতিতে ব্র্যাড কুপার বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার ১শ' ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছি। এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌযান এবং কমান্ড অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।'

ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এমন এক নজিরবিহীন অভিযান পরিচালনা করছে। লক্ষ্য—ইরানের সেই সক্ষমতা ধ্বংস করা, যার মাধ্যমে তারা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে আমেরিকানদের হুমকির মুখে ফেলছে।

তিনি আরও জানান, এই অভিযানে ৫০ হাজারেরও বেশি সেনা সদস্য, ২০০ যুদ্ধবিমান, দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি আরও সামরিক সক্ষমতা যোগ হচ্ছে। 

মার্কিন সিনেটে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হবে আজ। বুধবার (৪ মার্চ) প্রস্তাবটি পাস হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

বিলটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে স্থানীয় সময় সকাল ১১টায়। বিকেল ৪টায় ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হবে।

এরই মধ্যে সমালোচনা জোরদার হয়েছে যে, ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানে হামলা চালিয়েছেন। মার্কিন কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ইরানে এতো বড় হামলায় চালাতে পারেন কিনা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে হামলা শুরুর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। দেশটির আইন প্রণেতারা ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ সমর্থন করছেন না বলা জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।

এদিকে, ইরান বলছে, এই যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলকে সন্তুষ্ট করার জন্য কাজ করছে; মার্কিন নাগরিকদের জন্য নয়। 

 

 

 

 

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ঘিরে নাটকীয় দাবির প্রেক্ষাপটে। বুধবার (৪ মার্চ) ইরানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে দেশটির এসেম্বলি অব এক্সপার্ট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে, বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজ জানায়, ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন এবং তাকে মাশহাদ শহরের ইমাম রেজা মাজারে সমাহিত করা হবে। তবে দাফনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের নিকটে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, হামলার পর কনস্যুলেটের আশপাশ এলাকায় ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।

দুবাই মিডিয়া অফিসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ড্রোন হামলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হলেও দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এর আগে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও হামলার খবর পাওয়া যায়। তবে সেখানেও প্রাণহানির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

সাইপ্রাসে রণতরি ও হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ এক পোস্টে এ কথা জানিয়েছেন।

গত সোমবার সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের আক্রোটিরি ঘাঁটির রানওয়েতে ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সাইপ্রাসে রণতরি পাঠানোর উদ্যোগ নেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, রণতরি 'এইচএমএস ড্রাগন' সাইপ্রাসে পাঠানো হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার বিরোধিতা এবং অবিলম্বে এই সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানিয়েছে চীন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সারের সঙ্গে এক ফোনালাপে ওই আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, টেলিফোনে আলাপকালে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ওয়াং ই বলেছেন, বলপ্রয়োগ করে কখনোই সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়; বরং এটি প্রায়ই নতুন সমস্যার জন্ম দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর পরিণতি ডেকে আনে। সামরিক শক্তির আসল সার্থকতা যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করার মধ্যে নিহিত।

মঙ্গলবার ইরানের রাজধানী তেহরান, লেবাননের রাজধানী বৈরুত, বাহরাইনের মানামা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের হামলায় আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এদিকে, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা-পাল্টা হামলায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। 

এসব বিষয় উল্লেখ করে গিডিওন সারকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সব সমস্যা সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত বলে চীন বিশ্বাস করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চীন গঠনমূলক ভূমিকা পালন জারি রাখবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এ ছাড়া গত রোববার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গেও ইরান সংকট নিয়ে আলোচনা করেন ওয়াং ই। তবে গত শনিবার থেকে ইরানে হামলা শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনও কথা বলেননি চীনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলায় শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির চার ডজনের বেশি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এছাড়া দেশটিতে ওই দুই দেশের চলা হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

সূত্র: রয়টার্স।

 

ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ–১৩৬’ ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া। সেই ড্রোন এখন মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যবহার করছে ইরান। ৫০ হাজার ডলার মূল্যের এই ড্রোনগুলো ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দের জন্য আলাদা করে চেনা যায়।

গত ৪৮ ঘণ্টায় বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে কয়েক শ শাহেদ ড্রোন। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও ভয় দেখাতে তেহরান এই কৌশল নিয়েছে।

বাহরাইন থেকে পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের আঁধারে একটি ডেল্টা-উইং ড্রোন ঘাস টাকার মেশিনের মতো (লনমাওয়ার) কর্কশ শব্দে একটি বহুতল ভবনের দিকে ধেয়ে আসছে এবং সজোরে সেটিতে আঘাত হানছে। এতে ভবনের ব্যালকনি দিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ পড়তে দেখা যায়। সম্ভবত অ্যাপার্টমেন্টটি সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি।

গত শনিবার সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের লক্ষ্য করে এক হাজারের বেশি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর একটি বড় অংশই শাহেদ–১৩৬ মডেলের।

সোমবার বিকেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের ওপর ৬৮৯টি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৫টি ড্রোন তারা ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও ৪৪টি ড্রোন (মোট ড্রোনের প্রায় ৬ শতাংশের বেশি) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

যেভাবে কাজ করে শাহেদ ড্রোন

শাহেদ–১৩৬ ড্রোন ৩ দশমিক ৫ মিটার দীর্ঘ এবং এর ডানার বিস্তার ২ দশমিক ৫ মিটার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি সস্তা এবং তৈরি করা সহজ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরান বছরে কয়েক ডজন তৈরি করতে পারত। ফলে কিছু সময়ের জন্য চলমান সংঘাতের একটি অংশজুড়ে থাকতে পারে এসব ড্রোনই।

একটি শাহেদ ড্রোন প্রায় ৫০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে, যা একটি আকাশচুম্বী ভবন ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট হলেও তা ধসিয়ে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

এই ড্রোনগুলো তুলনামূলক ধীরগতির (যদিও ইউক্রেনে অবশ্য এর দ্রুতগতির জেট ইঞ্জিন সংস্করণও দেখা গেছে), কিন্তু এগুলোর বড় আকৃতি, ইঞ্জিনের উচ্চ শব্দ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ধরন সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

বাহরাইন থেকে পাওয়া দ্বিতীয় একটি ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেছে, মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরের ঠিক ওপর দিয়ে একটি ডেল্টা-উইং ড্রোন উড়ে যাচ্ছে। ড্রোনটি সফলভাবে নিচের দিকে নেমে একটি রাডার ডোমে আঘাত হানে এবং সেটি ধ্বংস করে দেয়।

ইরানের ড্রোন হামলার পর বাহরাইনের মানামায় একটি বহুতল ভবনে আগুনে জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি
ইরানের ড্রোন হামলার পর বাহরাইনের মানামায় একটি বহুতল ভবনে আগুনে জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ছবি: রয়টার্স
 

এ ছাড়া কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও শাহেদ ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতেও সম্ভবত এই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।

এই ড্রোনগুলোর পাল্লা সর্বোচ্চ দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এগুলো সাধারণত আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া জটিল পথ ধরে উড়তে সক্ষম। রাডার ফাঁকি দেওয়ার জন্য এগুলো নিচ দিয়ে উড়ে যায়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে এই ড্রোনগুলো দূর থেকে অপারেটরের মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যার ফলে একদম শেষ মুহূর্তেও এগুলো দিক পরিবর্তন করতে পারে।

শাহেদ–১৩৬ ড্রোনগুলো গত দশকের শেষের দিকে ইরানে নকশা করা হয়েছিল। ২০২১ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েলি মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজ ‘মার্সার স্ট্রিট’-এ হামলার মাধ্যমে প্রথম এই ড্রোনের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়। ওই হামলায় একজন ব্রিটিশ ও একজন রোমানিয়ার নাগরিক নিহত হয়েছিলেন।

এর আগে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলায়ও সম্ভবত এই ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, ইরানের ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান মূলত এই ড্রোনের নকশা করে। প্রতিষ্ঠানটি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অধীনস্থ। তবে ২০২২ সালের শরৎকাল থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ব্যাপক ব্যবহারের ফলেই এই ড্রোন বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।

শুরুতে ইরান থেকে রপ্তানি করা হলেও পরবর্তী সময়ে এই ড্রোনের প্রযুক্তি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করে তেহরান। এরপর রাশিয়ার ভোলগা নদীর তীরে অবস্থিত ইয়েলাবুগা শহরের একটি কারখানায় বিপুল পরিমাণে এই ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে।

রাশিয়া সাধারণত ইউক্রেনে হামলার সময় একসঙ্গে প্রায় ৮০০টি শাহেদ–১৩৬ ড্রোন, একই রকম দেখতে ‘জেবেরা’ ডেকয় (ধোঁকা দেওয়ার ড্রোন) এবং অল্পসংখ্যক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। মূলত ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতেই ‘ঝাঁক বেঁধে’ এই হামলা চালানো হয়, যাতে ড্রোনের আড়ালে আরও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যে আঘাত হানতে সফল হতে পারে।

ইউক্রেনের হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন
ইউক্রেনের হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন, ফাইল ছবি: রয়টার্স

তবে গত সপ্তাহান্তে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শাহেদ ড্রোনের বেশির ভাগ ভিডিওতে দেখা গেছে, সেখানে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে ড্রোনের বিশাল কোনো ঝাঁক নয়, বরং বিচ্ছিন্নভাবে একেকটি ড্রোনকে আঘাত হানতে দেখা গেছে।

ইউক্রেনে শাহেদ ড্রোনগুলো স্থির লক্ষ্যবস্তুতে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে চলতি শীতে দেশটিতে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। লাখ লাখ ঘরবাড়িতে এর প্রভাব পড়েছে।

ইরান যদি এই একই কৌশল অবলম্বন করে তবে তারা সফল হতে পারে। সোমবার সকালে সৌদি আরবের বৃহত্তম শোধনাগার রাস তানুরায় ড্রোন হামলার পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর ফলে শোধনাগারটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। যদিও এই হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি শাহেদ ড্রোন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে এর ধ্বংসক্ষমতা ছিল একই রকম।

দ্য গার্ডিয়ান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এতে আহত হয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর থেকে মঙ্গলবার সরকাল পর্যন্ত ৭৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। হামলায় আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ।

তবে ইরানে চলমান সংঘাতে হতাহতের বিষয়ে ইরান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দেওয়া তথ্য স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে এএফপি।

ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে আঘাত হেনেছে। তবে এতে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ক্ষেপণাস্ত্রে একাংশ ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলীয় শহর পেতাহ তিকভায় আঘাত হেনেছে।

হামলাস্থলে আলামত সংগ্রহ করছেন ইসরায়েলের একজন নিরাপত্তাকর্মী। আজ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলের পেতাহ তিকভা শহরে। ইসরায়েল, ৩ মার্চ
হামলাস্থলে আলামত সংগ্রহ করছেন ইসরায়েলের একজন নিরাপত্তাকর্মী। আজ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলের পেতাহ তিকভা শহরে। ইসরায়েল, ৩ মার্চছবি: এএফপি

দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে যে, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে আঘাত হেনেছে, যার ফলে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

সূত্র: আল জাজিরা

কাতার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (৩ মার্চ) জানিয়েছে, ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রেক্ষিতে সব ধরনের ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়ানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ বা শিগগিরই মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া সব এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক মাসের জন্য বৃদ্ধি করা হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে এবং এর জন্য কোনো ফি দিতে হবে না। সংশ্লিষ্ট দফতরে গিয়ে আবেদন করারও প্রয়োজন নেই।

তবে, ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে যেসব এন্ট্রি ভিসায় নিয়মভঙ্গ হয়েছে, তাদের প্রথমে নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। এরপরও তারা মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ফি মওকুফ সুবিধা পাবেন।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, স্থায়ী এবং ভ্রমণকারীদের আইনগত অবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার জন্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে লেগে ছিল। গত ছয় মাস ধরে এ জন্য তাদের প্রযুক্তিগত ও জনবল সহায়তা দেয় সিআইএসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ গোয়েন্দা এবং কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থাকে নির্মূল করার লক্ষ্যে শনিবার চূড়ান্ত ওই অভিযান চালিয়েছিল তারা।

ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হওয়া ‘ইরানের শীর্ষস্থানীয় সাতজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা’ এবং খামেনির পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রায় এক ডজন সদস্য এই হামলায় নিহত হন। মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় একই সময়ে চালানো একাধিক হামলায় খামেনিসহ তাঁদের হত্যা করা হয়। এ ছাড়া এই হামলায় ইরানের আরও ৪০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন।

তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতনের লক্ষ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে বিমান হামলা শুরু করেছে, তার সূচনা করা হয়েছে ৮৬ বছর বয়সী দেশটির শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে এক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

কিছু বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সম্ভাব্য কৌশলগত একটি ভুল হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে আরও প্রবল প্রতিপক্ষের উত্থান ঘটতে পারে।

গোয়েন্দা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও লেখক ইয়োসি মেলম্যান বলেন, ‘সমস্যা হলো, ইসরায়েল গুপ্তহত্যার প্রেমে মগ্ন...এবং আমরা কখনোই শিখিনি যে এটি কোনো সমাধান নয়। আমরা হামাসের সব নেতাকে হত্যা করেছি। কিন্তু তারা এখনো টিকে আছে। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। নেতাদের শূন্যস্থান সব সময়ই পূরণ হয়ে যায়।’

বিদেশের মাটিতে গুপ্তহত্যা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে এর আগে কখনোই তারা কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করেনি।

ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন এই হামলাকে ‘কৌশলগত ও অভিযানগত এক বিশাল চমক’ বলেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাধারণ ধারণা ছিল, জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা করা সেই আকস্মিক হামলার মতোই ইসরায়েল হয়তো রাতের আঁধারে হামলা চালাবে।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় চত্বর থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে। শনিবার সকালে তেহরানে
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় চত্বর থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে। শনিবার সকালে তেহরানে, ছবি: রয়টার্স
 

হামলার সময় শনিবার সকাল বেছে নেওয়া হয়েছিল সিআই এজেন্টদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। সে সময় তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে নেতৃত্বস্থানীয় একজনের কার্যালয় চত্বরে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনি ঠিক কখন ওই স্থানে থাকবেন এবং বৈঠকের সময় সম্পর্কে সিআইএ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল।

ইসরায়েলি গুপ্তচরেরাও অনেক বছর ধরে খামেনির ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। তারা তাঁর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, পরিবারের সদস্য, সহযোগী, মিত্র এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে নথি তৈরি করেছিল।

সিআইএর সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি বিশাল জিগস পাজলের মতো। আপনি তথ্যের এই ছোট ছোট টুকরোগুলো এক জায়গায় মেলাবেন। যেখানে আপনার কাছে (নির্ভরযোগ্য তথ্য) থাকবে না, সেখানে আরও গভীরভাবে খুঁজবেন। এতে সবকিছুই থাকে: কীভাবে তারা খাবার সংগ্রহ করে, তাদের ফেলে দেওয়া আবর্জনার কী হয়।’

সিআইএর সাবেক ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে তথ্য ও উপাত্তের এত বেশি স্তর রয়েছে যে কেউই কোনো না কোনো সূত্র রেখে যাওয়া ছাড়া থাকতে পারে না। আপনি যা-ই করেন না কেন, তার একটা ছাপ থেকে যায়।’

ইরান নিয়ে কাজ করে আসা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশ্লেষক রুয়েল গেরেখ্ত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই অভিযানে বিশাল প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে এসেছিল। তবে মূলত ইসরায়েলই মাঠপর্যায়ে এমন এক গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যারা সরাসরি মানুষের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে এবং ইরানের অভ্যন্তরে গোপন অভিযান পরিচালনায় সক্ষম ছিল।

গেরেখ্ত আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য।

শনিবার সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালায়
শনিবার সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালায়, ছবি: এএফপি
 

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর নজর রাখছে এবং সেখানে তথ্যদাতা, গুপ্তচর ও লজিস্টিকসের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের সহায়তায় তারা এর আগে ইরানে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দূরনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান দিয়ে প্রত্যন্ত রাস্তায় চলন্ত গাড়িতে থাকা ইরানের এক শীর্ষস্থানীয় পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল কম্পিউটারগুলোতে ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া পারমাণবিক নথির আর্কাইভ চুরির ঘটনাও রয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালে তেহরানের একটি সরকারি গেস্টহাউসে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়ার কক্ষে বোমা রেখে তাঁকে গুপ্তহত্যা করা হয়।

গত বছর জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি গুপ্তচরেরা ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদের বাড়িঘর শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে চালানো আকস্মিক হামলার প্রথম ঢেউয়েই ডজনখানেক কর্মকর্তাকে হত্যা করে তারা।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও লেখক ইয়োসি মেলম্যান বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে মোসাদ তাদের কৌশলে এক বড় পরিবর্তন আনে। তারা ইরানের ভেতর থেকেই স্থানীয় চর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ দেয়।

২০২১ সাল থেকে মোসাদের নেতৃত্ব দিয়ে আসা ডেভিড বার্নিয়া গুপ্তচরদের নিয়ে একটি ‘ফরেইন লিজিয়ন (বিদেশি বাহিনী)’-এর জন্য বিশেষ বিভাগ তৈরি করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে তাদের মোতায়েন করা হয়।

মেলম্যানের মতে, ইরানে এ ধরনের চর নিয়োগ করা অনেক সহজ ছিল। কারণ, সেখানকার অনেকেই ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী।

ইসরায়েল গত বছরই খামেনিকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আঞ্চলিক সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি নিতে এবং কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার বিষয়ে মিত্রদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে তাতে তখন সায় দেননি। তবে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর গত বছরের সেই সংক্ষিপ্ত সংঘাত শেষ হয়।

ইরানের তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলার পর একটি স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠছে। ১ মার্চ ২০২৬
ইরানের তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলার পর একটি স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠছে। ১ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এর পর থেকে ইরান নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অত্যন্ত গভীর সহযোগিতা’ গড়ে উঠেছে।

গত সপ্তাহে ইরানের মাঠপর্যায়ে থাকা মোসাদের নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আড়ি পাতা থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় করা হয়েছিল।

সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা গেরেখ্ত বলেন, ‘খামেনির অবস্থান শনাক্ত করতে তারা যদি বিভিন্ন পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে থাকে, তবে আমি মোটেই অবাক হব না। ইরানিরা বেশ অগোছালো স্বভাবের। তারা ফোন ব্যবহার করতে খুব ভালোবাসে। তাই হতে পারে সর্বোচ্চ নেতার কাছে অনেকগুলো বার্নার ফোন (অস্থায়ীভাবে ব্যবহারযোগ্য ফোন) ছিল। কিন্তু মূল বিষয় হলো, তিনি নিয়মিত কাদের ফোন করছিলেন, সেটি শনাক্ত করা।’

শেষমেশ, সব তথ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে একেবারে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে সেই সংক্ষিপ্ত, অথচ প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক এক মিনিটের অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে জেরুজালেম সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ওদেদ আইলাম বলেন, ‘মাত্র ৬০ সেকেন্ড। অভিযানে ঠিক এই সময়টুকুই লেগেছে। তবে এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছরের প্রস্তুতি।’ তিনি বলেন, ‘আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র আর কেবল ট্যাংক বা বিমান দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না। এটি এখন তথ্য, অনুপ্রবেশ, আস্থা ও উপযুক্ত সময়ের ওপর নির্ভর করে। এক মিনিট পুরো একটি অঞ্চল বদলে দিতে পারে।’

তবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা একটি ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা গেরেখ্ত। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় কাজটি ঠিক হয়নি। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি না—মানুষ হত্যায় আমার কোনো সমস্যা নেই, আমি অনেককেই হত্যা করেছি—কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ভুল ছিল। আমি জানি, আপনি যখন কারও নেতাকে সরিয়ে দেন, তখন আপনি মূলত সমস্যার সমাধান করেন না। বরং আপনি নতুন একটি সমস্যার জন্ম দেন।’

দ্য গার্ডিয়ান