বেইজিং অটো শোতে চোখে পড়ার মতো এক দৃশ্য—স্মার্ট এসইউভিতে আছে যান্ত্রিকভাবে পা মালিশের ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে দেখা গেল বিলাসবহুল এক মিনিভ্যান। এই মিনিভ্যানের বৈশিষ্ট্য হলো, এতে আসন সরিয়ে নেওয়া যায়, অর্থাৎ প্রথম সারির আসন পিছিয়ে নেওয়া যায় এবং পেছনের সারির আসন সামনে আনা যায়।
এখানেই শেষ নয়, অনেক গাড়িতেই আছে পেশাদার মানের স্পিকারসহ কারাওকে। কোনো কোনো গাড়ির হেডলাইট দিয়েই দেয়ালে সিনেমা প্রজেক্ট করার সুবিধা পর্যন্ত আছে। ফলে চাইলেই কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দেয়ালে সিনেমা দেখতে পারেন। এমনকি তুলনামূলক সাশ্রয়ী গাড়িতেও আছে স্মার্ট ড্রাইভিং ফিচার।
বাইরের অনেক ভোক্তার কাছে এসব যেন স্বপ্নের মতো। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই অটো শোতে প্রদর্শিত চীনের গাড়িগুলোর বৈচিত্র্য দেখে অনেকের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এতেই হয়েছে বাজিমাত। চীনের এই প্রযুক্তিগত পরাক্রমের কারণে বিশ্বের অনেক গাড়ি কোম্পানি ও নীতিনির্ধারক অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
চীনের গাড়ি কোম্পানিগুলো বৃহৎ পরিসরে এবং তুলনামূলক কম দামে গাড়ি তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সুবিধা—ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যখন তেল-গ্যাসের দাম বাড়ছে, তখন এসব গাড়ির বৈদ্যুতিক বা হাইব্রিড গাড়ির কাটতি বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের পার্থক্য এখন স্পষ্ট। গত বছর ওয়াশিংটন বৈদ্যুতিক গাড়িতে (ইভি) ভর্তুকি কমিয়ে উল্টো জ্বালানিনির্ভর গাড়িতে একধরনের প্রণোদনা দিয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থানীয় শিল্প রক্ষার যুক্তিতে কার্যত বাজারে চীনা গাড়ির বাজারে প্রবেশ আটকে দিয়েছে।
মে মাসের মাঝামাঝি চীন সফরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই প্রেক্ষাপটে চীনের ইভি কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক চাহিদার দিকে নজর রাখছে—এই পরিস্থিতিতে কি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের দরজা খানিকটা হলেও খুলতে পারে।
তবে একটি বার্তা স্পষ্ট। সেটা হলো, প্রায় ৭০টি ফুটবল মাঠের সমান এই প্রদর্শনী কেন্দ্রে চীন দেখাতে চেয়েছে, একবিংশ শতকের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় তারা নিরলসভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। চীনের শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা ও বেইজিং সরকারের বাজি, বিশ্ব শেষ পর্যন্ত তাদের কল্পিত বৈদ্যুতিক ভবিষ্যৎই বেছে নেবে, তেলনির্ভর পুরোনো পথ নয়।
চীনের বৃহত্তম ইভি কোম্পানি বিওয়াইডির নির্বাহী স্টেলা লি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অনেকের জন্য ‘জাগরণী বাণী’। একবার বৈদ্যুতিক গাড়ি চালাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আর পেছনে ফিরে পেট্রলচালিত গাড়ি চালাতে ইচ্ছে করবে না।
ইভির বাজারে চীন অনেক এগিয়ে। দেশটিতে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির অর্ধেকের বেশি এখন বৈদ্যুতিক বা হাইব্রিড। বড় শহরগুলোতে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে ইঞ্জিনের শব্দ—তার জায়গা করে নিচ্ছে বৈদ্যুতিক মোটরের মৃদু আওয়াজ। তবে দেশের ভেতরেই চলছে বাজার দখলের তীব্র লড়াই। মূল্যযুদ্ধ, প্রতিযোগিতা ও অতিরিক্ত সরবরাহে মুনাফা কমে যাচ্ছে, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রবৃদ্ধি।
সে কারণেই কোম্পানিগুলো বিদেশের বাজারে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা, বিদেশি ক্রেতা ও অংশীদার টানার চেষ্টা চলছে জোরেশোরে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের ইভি রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেড়েছে।
তবে বৈশ্বিক বাজার সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ জনের বেশি আইনপ্রণেতা সম্প্রতি ট্রাম্পকে লেখা এক চিঠিতে সতর্ক করে বলেছেন, চীনা গাড়ির জন্য বাজার অবারিত করা হলে মার্কিন শ্রমবাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রে চীনা গাড়ির ওপর উচ্চ শুল্ক কার্যত একধরনের নিষেধাজ্ঞা তৈরি করে রেখেছে। পাশাপাশি নতুন গাড়িতে চীনে তৈরি সফটওয়্যার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের কারণেও বাজারে চীনের গাড়ির প্রবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
ইউরোপের বাজারেও চীনা গাড়িতে শুল্ক আছে, কিন্তু তারা প্রতিযোগিতা ঠেকাতে নয়, বরং সমতা আনতে শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে চীনা কোম্পানিগুলো সেখানে দ্রুত বাজার বাড়াচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিওয়াইডির নতুন গাড়ির নিবন্ধন প্রায় ১৭০ শতাংশ বেড়েছে।
চীনের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ
বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো চীনের উৎপাদন সক্ষমতা। শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল ও স্বয়ংক্রিয় কারখানার কারণে তারা বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পারে।
এর পেছনে রয়েছে চীন সরকারের দীর্ঘদিনের সহায়তা—ভর্তুকি, করছাড়সহ নানা সুবিধা। সমালোচকদের মতে, এতে চীনের ইভি বৈশ্বিক বাজারে অসম প্রতিযোগিতার সুবিধা পাচ্ছে। তবে চীনা কোম্পানিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। বিওয়াইডির স্টেলা লি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির উৎস হলো, সারা বিশ্ব থেকে মেধাবী প্রতিষ্ঠান ও মানুষকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। বাজার সুরক্ষিত করে ফেললে সেই সুবিধা হারিয়ে যাবে—দেশ দুর্বল হয়ে পড়বে।
তবে বিওয়াইডি বা জিলির মতো কোম্পানিগুলো আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্রুত প্রবেশের পরিকল্পনা করছে না। জিলির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ভিক্টর ইয়াং বলেন, ‘আলোচনার জন্য আমরা প্রস্তুত, তবে স্বল্প বা মধ্য মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি গাড়ি বিক্রির পরিকল্পনা নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও তারা সম্ভাবনা দেখছে। ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে যৌথ উদ্যোগ রয়েছে জিলির। ইয়াংয়ের ভাষায়, ‘চীনের বৈদ্যুতিক ও স্মার্ট প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে ভাগাভাগি করা গেলে শেষ পর্যন্ত গ্রাহকেরাই লাভবান হবেন।’

চীন প্রযুক্তি রপ্তানি করছে
একসময় বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল চীনের গাড়িশিল্প। এখন সেই চিত্র উল্টো—চীনা কোম্পানিগুলোই অন্যদের প্রযুক্তি দিচ্ছে। যেভাবে ফোর্ড ও অ্যাসেম্বলি লাইন একসময় মার্কিন উদ্ভাবনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, ঠিক তেমনি আজ স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনভিত্তিক ইভি খাত চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই খাতে বৈশ্বিক সাফল্য বেইজিংয়ের কূটনৈতিক শক্তির নতুন হাতিয়ার হতে পারে। বৈশ্বিক নেতৃত্বে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হয়ে উঠতে চায়, ইভি হতে পারে তাদের সেই প্রচেষ্টার হাতিয়ার।
দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা বৈশ্বিক তেলসংকটে চীনের এই পথ পরিক্রমার যৌক্তিকতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নের দিকে ঝুঁকছে।
রোডিয়াম গ্রুপের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির কল্যাণে দৈনিক তেলের চাহিদা এক মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি কমেছে। তবে বেইজিং অটো শো ঘুরে বোঝা যায়, চীনের এই দৌড় শুধু জ্বালানি সাশ্রয় পর্যন্ত নয়, বরং প্রযুক্তির। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের টেসলা বা ওয়েমো ভবিষ্যতের জন্য স্বচালিত গাড়ির জগৎ গড়তে কাজ করছে, তেমনি এক্সপেং, বিওয়াইডি, জিলি, বাইডু, হুয়াওয়ে, পোনি.এআইয়ের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও নিজেদের ইকোসিস্টেম তৈরি করছে।
এই প্রতিযোগিতায়ও চীনা কোম্পানিগুলো আত্মবিশ্বাসী। তারা মনে করে, ভবিষ্যতের এই প্রযুক্তি দৌড়ে তারাও সমানতালে লড়তে পারবে।
সিএনএন