সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ এবং এর চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য জার্মানির বন শহরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন শতাধিক দেশের হাজারের বেশি সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের আয়োজনে ‘ডিডব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’ শীর্ষক দুই দিনের এই সম্মেলন হয়। মঙ্গলবার সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকতার নানা দিক তুলে ধরে বক্তব্য দেন ডয়চে ভেলের মহাপরিচালক বারবারা মাসিং। তাঁর বক্তব্য প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

শুভ সকাল। আপনারা সবাই এখানে এসেছেন এবং গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন দেখে আমি খুবই আনন্দিত। প্রিয় প্রতিমন্ত্রী লেমিনস্কি, প্রিয় আইরিন খান, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়েরা এবং আমার প্রিয় সহকর্মীরা জার্মানির বনে আয়োজিত গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬-এ আপনাদের স্বাগত জানাই।

জার্মানির সাবেক পার্লামেন্টের এই ঐতিহাসিক ভবনে সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্র উদ্‌যাপনের এ আয়োজনে আপনারা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে যোগ দিয়েছেন। এতে আমি সত্যিই খুব আনন্দিত। আমার কাছে এটি দারুণ লাগছে যে আমরা বিশ্বের ১১০টির বেশি দেশ থেকে মানুষকে এক ছাদের নিচে আনতে পেরেছি। আমরা এখানে সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বলব। বিশেষ করে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ এবং এর চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করব। গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামের মূল উদ্দেশ্যই হলো এটি। বিভিন্ন দেশ, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নানা অভিজ্ঞতার মানুষদের একত্রিত করা হয়েছে যেন তাঁরা একে অপরের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারেন।

‘নির্ভীক, সোচ্চার সাংবাদিকতা’

আমাদের এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘নির্ভীক, সোচ্চার সাংবাদিকতা’ (জার্নালিজম আউট লাউড)। এর অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকতাকে শোরগোল করতে হবে। বরং ক্রমশ কোলাহলপূর্ণ হয়ে ওঠা এই পৃথিবীতে এর আওয়াজ শোনা যাওয়াটা খুবই জরুরি। এর অর্থ হলো মানুষকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে আমাদের সমাজে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি আবার নিশ্চিত করা।

এর অর্থ হলো মানুষকে একত্রিত করা, একে অপরের কাছ থেকে শেখা এবং বর্তমানে সাংবাদিকতার রূপ কেমন হওয়া উচিত, তা অনুধাবন করাও এর অংশ। এটি হওয়া উচিত বিভাজন, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক মহৌষধ।

‘ডিডাব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’-এ সাংবাদিকতার নানা বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। মঙ্গলবার জার্মানির বন শহরে ডয়চে ভেলে ভবনে
‘ডিডাব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’-এ সাংবাদিকতার নানা বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। মঙ্গলবার জার্মানির বন শহরে ডয়চে ভেলে ভবনে, ছবি: ডয়চে ভেলের সৌজন্যে

আমি বিশ্বাস করি, এই কক্ষে উপস্থিত অনেকেই এই ধারণার সঙ্গে একমত। কিন্তু শুধু নিজেদের মধ্যে এই ধারণাটি আটকে রাখলে চলবে না। আমাদের এই চারদেয়ালের বাইরে তা ছড়িয়ে দিতে হবে এবং দেখাতে হবে যে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম শুধু খবরই প্রচার করে না, আরও অনেক কিছু করে। তারা দিকনির্দেশনা দেয়, সমস্যার সমাধান তুলে ধরে এবং আলোচনার সুযোগ তৈরি করে এবং সমাজের নানা কাজে মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে। এই সবকিছু মিলিয়েই গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার মূলভিত্তি তৈরি হয়।

‘জার্নালিজম আউট লাউড’ অর্থ প্রাসঙ্গিক থাকাও। বিশেষ করে এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর ক্রমশ পেছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আমরা একটি বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছি। আমরা দেখছি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া বা ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। জনমতকে প্রভাবিত করতে এবং গণতান্ত্রিক সমাজকে অস্থিতিশীল করতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীগুলোও এসব কাজ করছে। একই সময়ে, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এবং তাদের অ্যালগরিদম তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই তার প্রচার বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবেগপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রায়ই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ ছড়িয়ে দেওয়া অথবা স্রেফ মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এটা করা হতে পারে।

‘জার্নালিজম আউট লাউড’–এর অর্থ মনোযোগ হারিয়ে ফেলা এই পৃথিবীতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখা এবং পরিকল্পিতভাবে সন্দেহ ছড়িয়ে দেওয়ার এই যুগে মানুষের আস্থা অর্জন করা।

সুখবর হলো, মানুষ এখনো মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখে। ইনফ্লুয়েন্সার এবং তথাকথিত ‘নিউজ ইনফ্লুয়েন্সাররা’ যে প্রভাব রাখেন ও গ্রহণযোগ্যতা পান, তাতে আমরা এটি দেখতে পাই।

আর এখানেই সাংবাদিকতার জন্য একটি বড় সুযোগ লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের বার্তাকক্ষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে চমৎকার সব সাংবাদিক রয়েছেন, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে তাঁদের নিষ্ঠা, কাজ ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। আসুন, আমরা এই সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে আসি। তাঁরা কে, সেই পরিচয়ে নন, বরং তাঁরা সাংবাদিকতার মানদণ্ড বজায় রেখে কী করেন, তার ভিত্তিতে। এভাবেই আমরা আস্থাভাজন ‘নিউজ ইনফ্লুয়েন্সার’ তৈরি করতে পারি। তবে এই পরিচিতির জন্য চড়া মূল্যও দিতে হয়।

বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী শাসক ও সরকারের সংখ্যা বাড়ছে এবং রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে সত্যকে বলি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সাংবাদিকতা দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা আর হয়রানিগুলো বাস্তবে সাংবাদিকদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিহত সাংবাদিকদের সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে ৫০০ জনের বেশি সাংবাদিক এখন কারাগারে বন্দী। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্য অনুযায়ী, দিন দিন আরও বেশি সাংবাদিক নির্বাসনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু নির্বাসনে থেকেও অনেকেই নিরাপদ থাকতে পারছেন না। স্বৈরাচারী সরকারগুলো তাদের দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। নির্বাসনে থাকা সাংবাদিকেরাও নিয়মিত হুমকি ও চাপের মুখে পড়ছেন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিপীড়নের (ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন) মাত্রা এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এরপরও বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, অন্তত জার্মানিতে।

ডিডব্লিউতে কর্মরত আমাদের অনেক সহকর্মীও এ ধরনের নিপীড়নের শিকার। আমি সত্যিই মনে করি, এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের আরও বেশি কথা বলা উচিত।

সাংবাদিকতার জন্য সাহসের প্রয়োজন

সাংবাদিকতার জন্য সাহসের প্রয়োজন হয়। আমি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ যে আজ এই কক্ষে এমন অনেক সাহসী মানুষ উপস্থিত আছেন। আজকে যাঁরা সাহসী, রুখে দাঁড়াতে পারেন এবং আমাদের সঙ্গে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। এমন সাহসেরই এক মূর্ত প্রতীক হলেন জিমি লাই। তিনি হংকংয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এক অটল সমর্থক। আজ সন্ধ্যায় আমরা তাঁকে ‘ফ্রিডম অব স্পিচ’ পুরস্কার দিয়ে সম্মান জানাব। নিজের প্রতিশ্রুতির জন্য তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে তিনি কারাগারে বন্দী আছেন। আমরা সত্যিই সম্মানিত বোধ করছি যে তাঁর মেয়ে ক্লেয়ার লাই আজ আমাদের সঙ্গে এখানে আছেন। তিনি আজ সন্ধ্যায় বাবার হয়ে এই পুরস্কার গ্রহণ করবেন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 ‘ডিডব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’–এ ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয় হংকংয়ের প্রকাশক জিমি লাইকে। কারাবন্দী এই সংবাদ প্রকাশকের পক্ষে পুরস্কার নেন তাঁর মেয়ে ক্লেয়ার লাই। মঙ্গলবার জার্মানির বন শহরে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে
‘ডিডব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’–এ ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয় হংকংয়ের প্রকাশক জিমি লাইকে। কারাবন্দী এই সংবাদ প্রকাশকের পক্ষে পুরস্কার নেন তাঁর মেয়ে ক্লেয়ার লাই। মঙ্গলবার জার্মানির বন শহরে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে, ছবি: ডয়চে ভেলে
 

চড়া মূল্য দিচ্ছেন এমন আরেকজন হলেন তুরস্কে থাকা আমাদের সহকর্মী আলি ওদুয়ান। তিনি তিন মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দী ছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম তিনি বনে আসতে পারবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়নি। আমি সত্যিই তাঁর প্রতি খুব কৃতজ্ঞ। কারণ, কারাবাস এবং তাঁর বিচারকাজ চলমান থাকার পরেও মুক্তির পরের দিনই তিনি কাজে ফিরেছিলেন। আমার মনে হয় এটি সত্যিই অনেক সাহসের কাজ। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

তবে মানুষ শুধু নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে তা নয়, তারা প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপরও ভরসা করে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালটি একটি বিশেষ বছর হতে যাচ্ছে, যে বছর প্রথমবারের মতো খবর পড়ার জন্য মূল মাধ্যম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া এবং এআই চ্যাটবট ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যেও ভালো খবর হলো তথ্যের উৎস হিসেবে এখনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি আমাদের একটি শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্ভুল তথ্য, ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা এবং দীর্ঘমেয়াদি সাংবাদিকতার প্রতিশ্রুতির সুফল শেষ পর্যন্ত পাওয়াই যায়।

যখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আমাদের ওপর বিশ্বাস গড়ে তোলে, তখন মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্ম যা-ই হোক না কেন, আমাদের সাংবাদিকতার সঙ্গে তাদের একটি স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। আর যখনই তাদের নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন হয়, তারা তাদের পরিচিত ও বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছেই ফিরে আসে।

রয়টার্সের সর্বশেষ এই প্রতিবেদন আমাদের ব্র্যান্ডগুলোকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিকে জোরদার করে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মান বজায় রেখে অন্যদের চেয়ে আলাদা হওয়ার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের বিশ্বাস প্রতিদিনই অর্জন করতে হয়।

সংক্ষেপে ডিডব্লিউর কথা বলি: স্বাধীনতা, উদ্ভাবন ও সংলাপ—এই নীতিগুলোর ভিত্তিতেই আগামী চার বছর আমাদের কাজের চেহারা নির্ধারিত হবে। স্বাধীনতা—কারণ, স্বাধীন সাংবাদিকতাই আমাদের মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করি না।

‘মুক্ত মনের জন্য পক্ষপাতহীন তথ্য’—এটাই আমাদের স্লোগান। আমরা চাই, মানুষ যেন সঠিক তথ্য পায়।

স্বৈরতান্ত্রিক বা উদারপন্থী—ব্যবস্থা যেমনই হোক না কেন, মানুষ যেন বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে এবং নিজেদের মতামত নিজেরাই তৈরি করতে পারে।

উদ্ভাবন—কারণ, এটি সাংবাদিকতার ভবিষ্যতের জন্য খুবই জরুরি।

সাংবাদিকতা থেকে সুবিধা নিচ্ছে প্রযুক্তি কোম্পানি

এআই প্রযুক্তি এখন স্থায়ী রূপ নিচ্ছে এবং নিত্যনতুন উদ্ভাবনের গতি আরও দ্রুত হচ্ছে।

সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অবশ্যই পরিবর্তনকে মেনে নিতে হবে। কাজের মধ্যে উদ্ভাবনকে যুক্ত করতে হবে। এর সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ঝুঁকিগুলোও মোকাবিলা করতে হবে।

উদ্ভাবন আমাদের খবর পরিবেশনের ধরনও বদলে দিচ্ছে। যেসব মানুষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন, তাঁদের ওপর আমরা আরও বেশি নজর দিতে চাই।

আর সর্বশেষ, মতবিনিময় বা সংলাপ। কারণ, এর ওপরই গণতন্ত্র নির্ভর করে। আমরা ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষকে এক টেবিলে বসাতে চাই। এর মাধ্যমে গঠনমূলক বিতর্কে উৎসাহ দেওয়া, সমাধান বের করা এবং বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতে চাই।

এই সবকিছু মিলে আমাদের একটি অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর তা হলো মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার জন্য অর্থের প্রয়োজন। এর জন্য সময়, গবেষণা ও দক্ষতার দরকার হয়।

এখন প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার এই অর্থনৈতিক ভিত্তি বা অর্থের জোগান নিশ্চিত করব?

 ডয়চে ভেলের মহাপরিচালক বারবারা মাসিংয়ের (মাঝে) সঙ্গে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তাঁদের পাশে রয়েছেন ডয়েচে ভেলের বিপণন বিভাগের এশিয়া শাখার প্রধান ডানিয়েল ভোগেলগেসাং। বুধবার জার্মানির বন শহরে ডয়চে ভেলে ভবনে
ডয়চে ভেলের মহাপরিচালক বারবারা মাসিংয়ের (মাঝে) সঙ্গে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তাঁদের পাশে রয়েছেন ডয়েচে ভেলের বিপণন বিভাগের এশিয়া শাখার প্রধান ডানিয়েল ভোগেলগেসাং। বুধবার জার্মানির বন শহরে ডয়চে ভেলে ভবনে
 

একটি বিষয় স্পষ্ট, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এআই সিস্টেমগুলো সাংবাদিকতার নানা কনটেন্ট বা সংবাদ থেকে বিরাট সুবিধা নিচ্ছে। অন্যদের তৈরি করা কনটেন্ট এবং সেগুলোর মালিকানাও আসলে অন্যদের। তারা এগুলো ছড়াচ্ছে, একত্র করছে এবং নিজেদের সিস্টেমকে শেখাতে ব্যবহার করছে। এ কারণেই আমাদের এমন একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল দরকার, যা মানসম্পন্ন সাংবাদিকতাকে মূল্যায়ন করবে এবং তারা যে আয় করবে, তার ভাগ যেন সংবাদ বা কনটেন্ট নির্মাতারা পান, তা নিশ্চিত করবে।

একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা টিকে থাকতে পারে না। এর অর্থায়নে সহায়তা করার জন্য আমাদের একটি নির্ভরযোগ্য কাঠামো দরকার।

বেসরকারি মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি জনগণের অর্থে চলা সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে।

সংবাদমাধ্যমকে অবশ্যই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল ও সুনির্দিষ্ট অর্থায়নের ব্যবস্থা, যা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এ ক্ষেত্রে ‘ইউরোপীয় মিডিয়া ফ্রিডম অ্যাক্ট’ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড তৈরি করেছে। এটি জনস্বার্থে চলা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের অর্থায়ন কোনোভাবেই রাজনৈতিক সুবিধার ওপর নির্ভর করবে না।

স্বাধীন সাংবাদিকতায় ১ ডলার বিনিয়োগে ১০০ ডলারের সুফল

স্বাধীন সাংবাদিকতা মূলত নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একধরনের বিনিয়োগ। আজ সকালেই ডিডব্লিউ একাডেমি, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর পাবলিক ইন্টারেস্ট মিডিয়া এবং ইউনেসকো একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘দ্য ভ্যালু অব জার্নালিজম’ (সাংবাদিকতার মূল্য) নামের এই প্রতিবেদনে ঠিক এ বিষয়টিরই শক্ত প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে।

ওই গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ করা প্রতি মার্কিন ডলার সমাজের জন্য ১০০ ডলারের বেশি সুফল বয়ে আনতে পারে। তছরুপ হওয়া অর্থ উদ্ধার, উন্নত সরকারি সেবা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি কমানোর মাধ্যমেই এই সুফল পাওয়া যায়। এর বিপরীতে, অপতথ্যের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর সমাজকে ৩৫০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো গণতন্ত্র, নিরাপত্তা এবং একটি মুক্ত সমাজের জন্য অপরিহার্য। এই কারণেই ‘নির্ভীক, সোচ্চার সাংবাদিকতা’ অর্থ কোনো অবস্থাতেই আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে কোণঠাসা না হওয়া। সাংবাদিকতাকে অবশ্যই জনমত তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই গড়ে নিতে হবে।

জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের আয়োজনে দুই দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধিরা যোগ দেন। বন, জার্মানি, ২৩ জুন
জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের আয়োজনে দুই দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধিরা যোগ দেন। বন, জার্মানি, ২৩ জুন
 

গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ঠিক এ কাজটি করার জন্য উপযুক্ত জায়গা। আমি জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিসকে (জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) ধন্যবাদ জানাতে চাই। পাশাপাশি নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়, ফাউন্ডেশন...এবং বন শহর কর্তৃপক্ষকেও ধন্যবাদ জানাই এমন একটি চমৎকার আয়োজনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

এখানে সাংবাদিকতা, রাজনীতি এবং সুশীল সমাজের মানুষ একসঙ্গে সমবেত হয়ে শুধু ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েই আলোচনা ও বিশ্লেষণ করেন না, বরং এর সমাধানও খোঁজেন। এর জন্যও সাহসের প্রয়োজন। কারণ, সাহস না থাকলে সাংবাদিকতা নীরব হয়ে যায়।

আর আমরা তা কিছুতেই হতে দিতে পারি না। আসুন, আমরা উচ্চকণ্ঠ হই। আমরা আরও সাহসী হই। আপনাদের এই সম্মেলন চমৎকার হোক। সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব