সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং বিচার বিভাগের মতো স্বতন্ত্র পে–স্কেল (বেতনকাঠামো) চালুসহ কিছু দাবি তুলে ধরেছেন পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশ সপ্তাহ–২০২৬ উপলক্ষে আজ রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে আয়োজিত পুলিশ সপ্তাহের কল্যাণ প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এসব দাবিদাওয়া তুলে ধরা হয়।
রুদ্ধদ্বার কল্যাণ প্যারেডে উপস্থিত থাকা পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবিদাওয়া তুলে ধরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী ও বিচার বিভাগে স্বতন্ত্র পে–স্কেল চালু আছে। পুলিশকেও স্বতন্ত্র পে–স্কেল দেওয়ার দাবি তুলে ধরেন তিনি।
পুলিশের ওই সূত্রগুলো জানায়, পুলিশের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের যে সরকারি আদেশ হয়েছিল, তা বন্ধ আছে। ওই সব ভবন নির্মাণে নতুন বরাদ্দের আদেশ জারি করার দাবি করা হয়। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত বাবদ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বলা হয়, বর্তমানে প্রতিটি মামলা তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই খরচে তদন্ত শেষ করা যায় না। এ ছাড়া উপপরিদর্শকদের (এসআই) বিনা সুদে মোটরসাইকেল ঋণ দেওয়ার দাবি উঠেছে।
[caption id="attachment_273637" align="alignnone" width="847"]
পুলিশ সপ্তাহ–২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত পুলিশ সপ্তাহের কল্যাণ প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনেছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া[/caption]
একজন পুলিশ সদস্য দাবি তোলেন, অবসরে যাওয়ার সময় তাঁদের যেন এক ধাপ ওপরে পদায়ন করা হয়। অর্থাৎ অনারারি হিসেবে কনস্টেবল থেকে অনারারি সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদে; এএসআইকে অনারারি উপপরিদর্শক (এসআই) পদে এবং এসআইকে যেন অনারারি পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) করা হয়।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশকে সব সময় ওভারটাইম (অতিরিক্ত কাজ) করতে হয়। কর্মঘণ্টার বাইরে যে সময় দায়িত্ব পালন করা হয় সে জন্য যেন পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
পুলিশের চিকিৎসার জন্য বিভাগীয় শহরের হাসপাতাল ও ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় হাসপাতালে আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করার দাবি তোলেন আরেক সদস্য। পুলিশের সন্তানদের পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার দাবিও এসেছে।
কল্যাণ প্যারেডে অংশ নেওয়া পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দাবিদাওয়া তুলে ধরার পর প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের মোটরসাইকেল কিনতে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া ওভারটাইম (অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক) ও পুলিশ হাসপাতালসংক্রান্ত দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেন।
পুলিশের সন্তানদের পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশের নিজস্ব জায়গায় তা করা যেতে পারে। বিষয়টি দেখার জন্য তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে পরামর্শ দেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কল্যাণ প্যারেডে পুলিশ সদস্যদের চাহিদার অধিকাংশ বিষয় মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে পুলিশকে একটি জনকল্যাণমুখী ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের আর্থিক সংগতি ও সক্ষমতা বিবেচনায় তাদের যৌক্তিক দাবিসমূহ পূরণ করার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
কল্যাণ প্যারেডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক পুলিশ কনস্টেবল ৪০ বছর চাকরি করে অবসরে যান, তাঁরা পদোন্নতি পান না। সে জন্য বিশেষ নীতিমালা ও সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ড বিবেচনায় অবসরের সময় কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে পদোন্নতি দেওয়া হবে। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার ভিত্তিতে ভাতা দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এ ক্ষেত্রে পুলিশ পরিদর্শক থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত ওভারটাইম ভাতা বিবেচনা করা হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে এবং প্রয়োজনে আরও উন্নত হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ভবন, কার্যালয় নির্মাণ ও আবাসন সমস্যা দূরীকরণে বর্তমান সরকার আন্তরিক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মব কালচার (দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা) পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনকে সংশোধন ও সংযোজন করে যুগোপযোগী করা হবে। মন্ত্রী এ সময় পুলিশ বাহিনীকে জনপ্রত্যাশা ও জন–আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।

যে কারণে পদক স্থগিত
পুলিশ সপ্তাহের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই এবার পদক প্রদান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তালিকা নিয়ে আপত্তি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শেষ মুহূর্তে পদক প্রদানের প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিবছর সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য ‘বিপিএম-সেবা’ ও ‘পিপিএম-সেবা’ পদক দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) ও পদক কমিটির আহ্বায়ক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও ১১৫ জনকে পদক দেওয়ার তালিকা করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে ইতিপূর্বে পদক পরিয়ে দেওয়া হয়। তালিকায় নাম থাকা অন্যদের মধ্যে ১০৭ জন কর্মকর্তা পুলিশ সপ্তাহের মহড়ায়ও অংশ নেন। পরে গত শনিবার রাতে পদক স্থগিতের খবর বের হয়েছিল।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পদকের তালিকা নিয়ে আপত্তি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শনিবার রাতে এ–সংক্রান্ত সরকারি আদেশ জারি করা হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। পরে যাচাই–বাছাই করে যোগ্যদের এই পদক দেওয়া হবে।
গত বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৬২ জনকে বিপিএম ও পিপিএম দেওয়া হয়। এর আগের বছর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৪০০ জনকে বিপিএম ও পিপিএম পদক দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে ১১৭ জনকে ও ২০২২ সালে ২৩০ জনকে পদক দেওয়া হয়েছিল।
ঢাকা