দেশের ইস্পাত খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম। রড উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও ট্রাকের জন্য প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানটির ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত বলেন, ‘গত শনিবার ডিপো থেকে আমরা ৯ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছি। রোববার কোন তেল পাইনি। যার কারণে আমাদের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দেওয়ায় চট্টগ্রামের বিএসআরএম গ্রুপের মতো অন্য শিল্পকারখানাও নানাভাগে এই সংকটে ভুগছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় অনেক শিল্পকারখানা তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। আবার অনেক শিল্পকারখানার পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
শিল্পকারখানার মালিকেরা বলছেন, ঈদের লম্বা ছুটির পর শিল্পকারখানা পুরোদমে খুলেছে। ফলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে তেলের চাহিদা বেড়েছে। দ্রুত তেল সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নতি না হলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। তাই তেল সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রয়োজনে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ তেল-গ্যাস আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। চলতি মাসে ১৭টি জাহাজে দেশে ডিজেল আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এসেছে ৯ টি। একটি জাহাজ পথে রয়েছে। বাকি ৭ টির সূচি এখনো অনিশ্চিত। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার।
গত শনিবার ডিপো থেকে আমরা ৯ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছি। রোববার কোনো তেল পাইনি, যার কারণে আমাদের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।
জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় ঈদের আগে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে সরকার। তারপর থেকে পেট্রল পাম্পগুলোতে যানবাহনের ভিড় লেগেই আছে। ঈদের আগে রেশনিং ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। তবে ডিপো থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় অনেক পাম্প গ্রাহকদের তেল দিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধভাবে তেল মজুতের পরিমাণও বাড়ছে।
উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পণ্য উৎপাদনে কিছু কারখানায় ডিজেল জেনারেটর ব্যবহৃত হয়। পণ্য পরিবহনে তাদের সাড়ে তিন হাজার ট্রাক রয়েছে। সব মিলিয়ে শিল্পগোষ্ঠীটির প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ ডিজেলের চাহিদার রয়েছে, এর ৬০ শতাংশ ডিপো থেকে পাচ্ছে।
আমরা তেল পাচ্ছি না। গাড়ির জন্য মজুত তেল প্রায় শেষ। দু-এক দিনের মধ্যে তেল না পেলে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় আমাদের সব ট্রাক চলতে পারছে না। তাতে পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। তেল–সংকটে কিছু কারখানায় উৎপাদনেও বিঘ্ন ঘটছে।’
হস্তশিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশনের কারখানা গাজীপুরের পুবাইলে। বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানা চললেও লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালাতে ডিজেলের দরকার হয়। গত দুই দিনে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও ডিজেল কিনতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা।
এ বিষয়ে ক্রিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম বলেন, ঈদের আগে ৫-৬ ঘণ্টাও লোডশেডিং হয়েছে। ঈদের ছুটির কারণে কয়েক দিন লোডশেডিং কম ছিল। ছুটি শেষে সবকিছু আগের মতো পুরোদমে সচল হয়েছে। ফলে লোডশেডিং বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। তখন তেল না পেলে উৎপাদনে ধস নামবে। তাই সরকারের উচিত সংকট মোকাবিলায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।
পিভিসি পাইপ, ফিটিংস, প্লাস্টিকের দরজা, আসবাব ও গৃহস্থালি পণ্যের এনপলি গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে কাঁচামাল আমদানি–সংকটে পড়েছে। এতে করে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে শিল্পগ্রুপটি। এমনকি তেলের অভাবে তাদের পণ্য সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জানতে চাইলে এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা তেল পাচ্ছি না। গাড়ির জন্য মজুত তেল প্রায় শেষ। দু-এক দিনের মধ্যে তেল না পেলে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’
এদিকে ছুটি শেষে চলতি সপ্তাহে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা চালু হয়েছে। কারখানাগুলোর উৎপাদন বিদ্যুতে চললেও লোডশেডিংয়ের সময় ডিজেল জেনারেটর চালাতে হয়। তবে ঈদের পর পাম্প থেকে অধিকাংশ পোশাক কারখানা তেল পাচ্ছে না বলে জানালেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ঈদের ছুটির পর পাম্প থেকে ডিজেল কিনতে পারছে না কারখানাগুলো। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। তিনি আরও বলেন, ‘কারখানাগুলোর তেল সরবরাহ নিয়ে সোমবার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা বৈঠকে বসব।’
ঈদের আগে পাম্প থেকে জ্বালানি তেল পেতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সদস্য প্রতিষ্ঠানকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তবে সেটিও এখন কাজ করছে না। গত শনিবার সদস্য কারখানাগুলোকে তাদের জেনারেটরের ক্ষমতা এবং দিনে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে কত লিটার তেল লাগবে, তার একটি চাহিদাপত্র চেয়েছে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘পাম্প থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান তেল পাচ্ছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে না। ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবে আমরা সদস্যদের কাছ থেকে তাদের চাহিদা আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ করছি।’
করণীয় কী
জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক আছে, সরকারের এমন অবস্থান থেকে সরে এসে রেশনিং–ব্যবস্থা চালু করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেল দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন। যুদ্ধকালীন সীমিত জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া ভবিষ্যতে জ্বালানির চাহিদা ও জোগান ডিজিটাল করার ওপর জোর দেন তিনি।
শুভংকর কর্মকার
, ঢাকা