নব্বইয়ের দশকের শুরু। বলিউডে তখন তারকা–সন্তানদের নতুন ঢেউ—কারিশমা কাপুর, রাভিনা ট্যান্ডন, পূজা ভাটরা নিজেদের জায়গা পাকা করছেন। ঠিক সেই সময়ই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখেন আরেক তারকাকন্যা, অভিনেত্রী মালা সিনহার মেয়ে প্রতিভা সিনহা। ১৯৯৬ সালের ব্লকবাস্টার ‘রাজা হিন্দুস্তানি’র জনপ্রিয় গান ‘পরদেশি’তে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিই তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের এক সম্পর্ক, আরেকটি বহুল আলোচিত খুনের মামলার ছায়া—সব মিলিয়ে থমকে যায় তাঁর সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার।

শুরুটা আশাজাগানিয়া
১৯৯২ সালে ‘মেহবুব মেরে মেহবুব’ দিয়ে অভিষেক হয় প্রতিভার। ছবি ব্যবসায়িকভাবে সফল না হলেও চলচ্চিত্র পরিবারে বেড়ে ওঠার সুবাদে তিনি দ্রুত আরও কাজের সুযোগ পান। দ্বিতীয় ছবি ‘কাল কি আওয়াজ’-এর মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ঘটে তৎকালীন সুপারহিট সুরকার জুটি নাদিম-শ্রবণ-এর সঙ্গে। ‘আশিকি’র বিপুল সাফল্যের পর তখন তাঁদের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।

সেই ছবির সংগীত বৈঠকেই নাকি ঘনিষ্ঠতা বাড়ে প্রতিভা ও নাদিম সাইফির। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক বলিউডের গসিপ কলামে জায়গা করে নেয়। অনেকের মতে, এই সময় থেকেই প্রতিভার মনোযোগ অভিনয়ের চেয়ে ব্যক্তিজীবনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। পরপর কয়েকটি ছবি ব্যর্থ হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন তাঁর মা মালা সিনহা।

মায়ের আপত্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন
প্রবীণ অভিনেত্রী মালা সিনহা প্রকাশ্যেই মেয়ের এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। আপত্তির কারণও ছিল স্পষ্ট—নাদিম তখন বিবাহিত, দুই সন্তানের পিতা; ধর্মীয় ভিন্নতাও ছিল বড় বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা, এই সম্পর্ক মেয়ের ক্যারিয়ারকে বিপথে নিচ্ছে—এমন আশঙ্কাই করেছিলেন তিনি।

‘পরদেশী’ গানে প্রতিভা সিনহা। আইএমডিবি
‘পরদেশী’ গানে প্রতিভা সিনহা। আইএমডিবি

‘পরদেশি’: যে গান হয়ে রইল পরিচয়
১৯৯৬ সালে আমির খান অভিনীত ‘রাজা হিন্দুস্তানি’তে ‘পরদেশি’ গানে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি ছিল প্রতিভার। ছবির পরিচালক ধর্মেশ দর্শন এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রতিভা এই গানের জন্য পারিশ্রমিক নেননি; বন্ধুত্বের খাতিরে ১৫ দিন শুটিং করেছিলেন। তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘একদিন মানুষ তোমার সব ছবি ভুলে এই এক গানেই তোমাকে মনে রাখবে।’ ভবিষ্যদ্বাণীটা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যি হয়।
শোনা যায়, আদিত্য চোপড়া তাঁকে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-র একটি চরিত্রের জন্য ভাবছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে প্রতিভা সেই প্রস্তাব নাকচ করেন।

পালিয়ে যাওয়া, অভিযোগ আর ঝড়
সম্পর্ক ঘিরে টানাপোড়েন চরমে পৌঁছালে মালা সিনহা মেয়েকে দূরে সরিয়ে নিতে চেন্নাইয়ে নিয়ে যান। তবু যোগাযোগ নাকি বন্ধ হয়নি। ইন্ডাস্ট্রিতে গুঞ্জন ছড়ায়, প্রতিভা নাদিমের সঙ্গে পালিয়ে গেছেন। পরে তাঁকে মুম্বাইয়ে ফিরিয়ে এনে মালা সিনহা সংবাদ সম্মেলনে নাদিমের বিরুদ্ধে অপহরণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

খুনের মামলার ছায়া
১৯৯৭ সালে সংগীত ব্যবসায়ী গুলশান কুমারের হত্যাকাণ্ড ভারতজুড়ে আলোড়ন তোলে। তদন্ত চলাকালে সংবাদমাধ্যমে নাদিম সাইফির নাম উঠে আসে। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি লন্ডনে ছিলেন এবং পরে আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন। তবে এই বিতর্কের জেরে তিনি আর ভারতে ফেরেননি।

এই ঘটনার পর প্রতিভাও ধীরে ধীরে অভিনয়ের জগৎ থেকে সরে যান। কয়েকটি ব্যর্থ ছবির পর তিনি নিভৃত জীবন বেছে নেন। আজও তিনি অবিবাহিত এবং আলোচনার আড়ালেই থাকেন।

সম্ভাবনা থেকে নিঃশব্দ প্রস্থান
প্রতিভা সিনহার গল্প যেন বলিউডের এক অপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিভা, সৌন্দর্য আর তারকাখ্যাতির সম্ভাবনা—সবই ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক বিরোধ আর একটি আলোচিত খুনের মামলার অভিঘাত মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার থেমে যায় মাঝপথেই।
‘পরদেশি’ গানের সেই হাসিমাখা মুখ আজ আর পর্দায় নেই। রয়ে গেছে কেবল একটি সময়ের স্মৃতি—আর এক প্রশ্ন: অন্য সিদ্ধান্ত নিলে কি তাঁর পরিণতি ভিন্ন হতে পারত?

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব