অনেক বছরের চেষ্টায় সন্তানের মা হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিসি ওয়াল্টার্স। কিন্তু ছয় মাস যেতেই এক বড় দুঃসংবাদ পান তিনি। ক্রিসি ওয়াল্টার জানতে পারেন, তিনি এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। মেয়ের বড় হয়ে ওঠা তিনি হয়তো দেখতে পারবেন না।
ক্রিসি ওয়াল্টারস অস্ট্রেলিয়ার টুউম্বা শহরের বাসিন্দা। একদিন বাড়িতে থাকাকালে হঠাৎ তাঁর বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হয়। এরপর একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বায়োপসির পর জানতে পারেন, তিনি জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত। ওই সময় ক্রিসি ওয়াল্টারসের বয়স ছিল ৩৯ বছর।
এই নারী বলেন, ‘আমি শুধু আমার স্বামী নিলকে বলেছিলাম, নিশ্চয়ই বড় ধরনের কোনো ভুল হয়েছে।’
এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে কঠিন ও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা নিচ্ছেন ক্রিসি ওয়াল্টারস। তবে ক্যানসার ইতিমধ্যে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাঁর রোগটি সারার পর্যায়ে নেই।
ক্রিসি বলেন, ‘আমি চাইব না, আমার সঙ্গে বাজে রকমের শত্রুতা থাকা ব্যক্তিরও কখনো এ রোগ হোক।’
ক্রিসি ওয়াল্টারসের মেয়ের বয়স এখন ১২ বছর। ক্যানসারের সঙ্গে মায়ের লড়াই দেখতে দেখতে সে বড় হয়েছে। ক্রিস্টি ওয়াল্টারস বলেন, মেয়ের বয়স মাত্র তিন বছর থাকতেই পারিবারিকভাবে মৃত্যুর মতো কঠিন বিষয় নিয়েও খোলামেলা কথা বলতে হয়েছে। তবে ২০২৬ সালে তাঁর মেয়ে এমন বয়সে পৌঁছেছে, যখন অস্ট্রেলিয়া শিশুদের জন্য জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। ভবিষ্যতে দেশ থেকে এ ধরনের ক্যানসার নির্মূল করাটাই এ টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্য।
অস্ট্রেলিয়া আশা করছে, আগামী এক দশকের মধ্যে তারা তা করতে পারবে। আর এভাবে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে একধরনের ক্যানসার পুরোপুরি শেষ করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।
অস্ট্রেলিয়ার হাইস্কুলগুলোতে টিকা দেওয়ার দৃশ্যটি কমবেশি একই রকম। স্কুলে ১২ ও ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এক জায়গায় সারি করে বসে এবং একজন নার্স তাদের একে একে টিকা দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাতে ছোট একটি ব্যান্ডেজ নিয়ে তারা ক্লাসে ফিরে যায়। ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রাম নামের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের তিনটি টিকা দেওয়া হয়। এর একটি হলো এইচপিভি টিকা।
এইচপিভি বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সাধারণত কোনো উপসর্গ তৈরি করা ছাড়াই শরীরে থাকতে পারে। অনেক সময় কোনো চিকিৎসা ছাড়াই নিজে থেকে চলে যায়। তবে ভাইরাসটির কিছু উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন ধরন আছে। আর এ ধরনগুলো শরীরে ধীরে ধীরে জরায়ু ক্যানসার তৈরি করতে পারে। বিশ্বে নারীরা সাধারণত যেসব ক্যানসারে আক্রান্ত হন, তার মধ্যে জরায়ু ক্যানসারের অবস্থান চতুর্থ।
তবে ভালো খবর হলো যে ধরনের ক্যানসারগুলো প্রতিরোধে আগে থেকে টিকা নেওয়া যায়, তার একটি এটি।
২০০৬ সালে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষাগারে চালানো গবেষণায় বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়। দীর্ঘ গবেষণার পর অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা গার্ডাসিল নামের একটি টিকা তৈরি করেন, যা এইচপিভি প্রতিরোধ করতে পারে। পরে এ টিকা ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পায়। এর এক বছর পর অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।
এ টিকা বিশ্বের স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মধ্যে জরায়ু ক্যানসার নির্মূলের সম্ভাবনা নিয়ে আশা জাগিয়েছে। বিশ্বে জরায়ু ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত গবেষক কারেন ক্যানফেল এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা যায়, সঠিক কৌশল নিলে এই ক্যানসার ধীরে ধীরে নির্মূল করা সম্ভব। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার জনস্বাস্থ্যবিষয়ক উদ্যোগগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
অস্ট্রেলিয়া কি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে
প্রকৃত অর্থে অস্ট্রেলিয়ায় জরায়ু ক্যানসারকে জনস্বাস্থ্যবিষযক সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার মানে রোগটি একেবারে শূন্য হয়ে যাওয়া নয়। বিজ্ঞানীরা ‘নির্মূল’ বলতে বোঝান—প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ জনের কম হওয়া।
একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি ২০৩৫ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণের পথে আছে। এমনকি সময়ের আগেই সেই লক্ষ্য অর্জন হয়ে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া ১৯৮২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অর্ধেকের বেশি কমেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী প্রথমবারের মতো ২৫ বছরের নিচের নারীদের মধ্যে কোনো নতুন রোগী পাওয়া যায়নি।
গবেষক কারেন ক্যানফেল বলেন, সব বয়সী নারীদের এ রোগ থেকে নিরাপদ রাখা না গেলেও নির্মূলের ধারণা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৬ দশমিক ৩ জন নতুন রোগী পাওয়া যায়। ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে টিকা নেওয়ার হার ৮০ শতাংশের একটু বেশি। আর ঝুঁকিপূর্ণ বয়সে থাকা নারীদের ৮৫ শতাংশ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাচ্ছেন।
তবে ক্যানফেল সতর্ক করে বলেছেন, টিকা নেওয়ার হার সামান্য কমছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার হার কমছে। আদিবাসী নারীদের মধ্যে জরায়ু ক্যানসারের হার দ্বিগুণ এবং মৃত্যুর হার তিন গুণের বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান গতিতে এগোলে আদিবাসী গোষ্ঠীর নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ু ক্যানসার নির্মূল হতে ২০৩৫ সালের লক্ষ্যের তুলনায় আরও ১২ বছর বেশি সময় লাগবে।
গবেষক নাটালি স্ট্রোবেন এবং তাঁর গবেষণা সহযোগী জোসলিন জোন্স বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিকা নিয়ে অনীহা, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং স্কুলে অনুপস্থিত থাকার কারণে অনেক শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।
গবেষকেরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার এ সাফল্যের অভিজ্ঞতাকে কম ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ, খরচ একটি বড় বাধা। এসব দেশে প্রয়োজনীয় অর্থ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক সময় থাকে না।
বিশেষজ্ঞ কারেন ক্যানফেল ও তাঁর দল বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, জরায়ু ক্যানসার নির্মূল করা একটি ভালো বিনিয়োগ, যা দীর্ঘ মেয়াদে খরচ কমাবে। এতে শুধু জীবনই বাঁচে না, সমাজেও বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। নারীরা কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় থাকতে পারেন। এতে অর্থনৈতিক উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়।
অস্ট্রেলিয়া এখন সরকারি তহবিল ও দাতব্য তহবিলের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে এই লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করছে।
তবে বিশ্বজুড়ে বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তারা গ্যাভি নামের জোটকে আর সহায়তা দেবে না। এ জোট উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিকা সরবরাহ করে।
কারেন ক্যানফেল বলেন, ‘খোলাখুলি বললে, আমরা ভাগ্যবান যে একটি উচ্চ আয়ের দেশে আছি, যেখানে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ রয়েছে।’
বিবিসি