ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্ভাব্য ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল।

গতকাল বুধবার রাতে ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’(কেএএন)-এর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ছবি: এএফপি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দেবেন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যেই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় ইসরায়েলের হামলার এ সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এল।

এদিকে ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর মূল্যায়নে দেখা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সাম্প্রতিক আলোচনার পর ইরানে মার্কিন হামলার আশঙ্কা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে।

তেহরান

জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা। তাঁদের অনেকেই ভবিষ্যতে দেশের প্রেসিডেন্ট হতে চান। শেষ পর্যন্ত তাঁদের কারও গন্তব্য যদি হোয়াইট হাউস হয়ও, তারপরও একটি উপাধি দাবি করতে পারবেন না—‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’। বিগত এক বছরে তাঁদের জন্য মুক্তি বিশ্বের নেতা হওয়ার হিসাব–নিকাশ অনেক বদলে গেছে।

সম্মেলনে যোগ দেওয়া ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম সিএনএনকে বলেন, সম্মেলনে যেসব নেতার সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন, তাঁরা মনে করেন আটলান্টিক পারের দেশগুলোর জোটের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করা সম্ভব নয়। এসব ক্ষতির পেছনে দায় কার? বলাই বাহুল্য যে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কে অবনতির জন্য অনেকাংশে দায়ী করা হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।

সম্মেলনে বক্তব্য দেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। তাঁর বক্তব্য ইউরোপের নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে। তা হলো, এখন ‘যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী’ শতাব্দী চলছে। তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। ইউরোপের পরমাণু নিরাপত্তা নিয়ে তিনি ফ্রান্সের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁর ইঙ্গিত হলো—যুক্তরাষ্ট্র সব সময় মিত্রদের পাশে দাঁড়াবে, এমন বিশ্বাস আর ইউরোপের নেই।

দুর্বল হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্র

সপ্তাহান্তের মিউনিখ সম্মেলনের দৃশ্য ছিল প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনের সময়ের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। ম্যাককেইন এই সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ এক মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। ২০১৭ সালে মিউনিখে বায়ারিশার হফ হোটেলে ৫৩তম সম্মেলনের প্রথম দিন বক্তব্য দিয়েছিলেন ম্যাককেইন। এখনো সম্মেলনের প্রথম রাতে ওই হোটেলে ম্যাককেইনের নামে নৈশভোজ হয়।

এবার নৈশভোজে ম্যাককেইনের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন ডেলাওয়ারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস। তবে মূল মঞ্চে ম্যাককেইন নামের কেউ ছিলেন না। জার্মান চ্যান্সেলরের দেওয়া সংবর্ধনায়ও কংগ্রেস সদস্যদের উপস্থিতি ছিল কম। এর অর্থ আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এরপরও বিশ্ব জনমতের বিরুদ্ধে যেতে তোয়াক্কা করছেন না রিপাবলিকানরা।

যেমন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ তিনি। গ্রাহাম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ট্রাম্পকে ইরানে পদক্ষেপ নিতে বলছেন। না হলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাহস বেড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা না বদলায়, তা হবে ভয়াবহ। এর মানে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা যাবে না।

দেশের ভেতরে পরিবর্তন

ট্রাম্পের একের পর এক কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা উন্নতি করছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার কমেছে। এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের কাছে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নিউসম সিএনএনকে বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়বেন। আমার মনে হয় বিশ্বও ধীরে ধীরে এই বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের বেশির ভাগ সদস্য এবার মিউনিখ সম্মেলনে যেতে পারেননি। কারণ, রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল বাতিল করে দেন। এরপরও কয়েকজন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি নিজ উদ্যোগে সম্মেলনে যান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কলোরাডোর প্রতিনিধি জেসন ক্রো। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ক্রো।

সম্মেলনে ক্রো ইউরোপীয় নেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিলেন যে ট্রাম্পের হাত থেকে অন্তত কিছু ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ডেমোক্র্যাটরা প্রস্তুত। তিনি এই সতর্কবার্তাও দেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ক্রো বলেন, যদিও এই ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ সমাজের প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইউরোপের নেতারাও মার্কিন জনগণের মতোই একই ধাক্কার মুখে পড়েছেন। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়াকে একটি ব্যতিক্রম মনে করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু ট্রাম্পের আবার নির্বাচিত হওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে তাঁর আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান ইউরোপের সে ভুল ভাঙিয়েছে। ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ধ্বংসের পথে। এটি এখন আগের রূপে নেই।

সিএনএন

উত্তর কোরিয়া সম্ভবত একটি উত্তেজনাপূর্ণ পারিবারিক দ্বন্দ্বের দিকে এগোচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার দাবি অনুযায়ী, শিগগিরই দেশটির সম্ভাব্য উত্তরসূরি বা পরবর্তী নেতা হিসেবে কিম জং–উনের কিশোরী মেয়ে কিম জু আয়ের নাম ঘোষণা করা হতে পারে।

যদি তা–ই হয়, তবে ভবিষ্যতে ক্ষমতার লড়াইয়ে আয়েকে তার প্রভাবশালী ফুফু কিম ইয়ো জংয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএস) গত সপ্তাহে দেশটির পার্লামেন্ট সদস্যদের বলেছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই বাবার উত্তরসূরি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কিম জু আয়ের নাম ঘোষণা হতে চলেছে। কিশোরী আয়ের বয়স ১৩ বছরের আশপাশে।

এ মাসের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার দলীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জু আয়ে ওই কংগ্রেসে উপস্থিত হয় কি না, তার ওপর নজর রাখছে এনআইএস। উত্তর কোরিয়ায় এটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমাবেশ, প্রতি পাঁচ বছর পরপর সেখানে দলীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।

সাধারণত দলীয় কংগ্রেসে পিয়ংইয়ং পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিজেদের বৈদেশিক নীতি, যুদ্ধ পরিকল্পনা, পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাসহ অগ্রাধিকারমূলক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

এর পর থেকে বাবা কিম জং–উনের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আয়েকে দেখা গেছে। এমনকি গত বছর সেপ্টেম্বরে কিম জং–উনের চীন সফরের সময়ও সঙ্গী হয়েছিল আয়ে।

রক্ষণশীল ও পুরুষপ্রধান নেতৃত্বের দেশ উত্তর কোরিয়ার একজন মেয়ে নেতা হতে পারেন কি না, তা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বহুদিন ধরেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কিম জু আয়ের ঘন ঘন প্রকাশ্যে আসা তাঁদের সেই ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

এর আগে এনআইএস তাদের একটি মূল্যায়নে বলেছিল, কিম জু আয়েকে চীনে নিয়ে যাওয়া সম্ভবত উত্তরসূরি হিসেবে জনমনে তার গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে।

গত বছর জুনে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটি অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন, পাশে মেয়ে কিম জু আয়ে। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাবার পাশে আয়েকে দেখা যাচ্ছে
গত বছর জুনে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটি অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন, পাশে মেয়ে কিম জু আয়ে। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাবার পাশে আয়েকে দেখা যাচ্ছে, ছবি: রয়টার্স

যে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে

কিম জু আয়েকে উত্তরসূরি করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ আসতে পারে কিম জং–উনের বোন কিম ইয়ো জংয়ের পক্ষ থেকে। ৩৮ বছর বয়সী কিম ইয়ো জং উত্তর কোরিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে তাঁর পক্ষে শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে।

কিম ইয়ো জং বর্তমানে কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে একটি উচ্চ পদে আছেন এবং ভাইয়ের ওপর তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে বলে জানা গেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রাহ জং ইল উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার ‘সম্ভাব্য’ লড়াই নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন। নিউইয়র্ক পোস্ট তাঁর বরাত দিয়ে বলেছিল, যদি কিম ইয়ো জং মনে করেন তাঁর সুযোগ আছে, তিনি শীর্ষ পদ দখলের চেষ্টা করবেন।

রাহ দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছিলেন, ‘এটা সময়ের ওপর নির্ভর করছে। তবে আমার বিশ্বাস, যদি কিম ইয়ো জং মনে করেন যে শীর্ষ নেতা হওয়ার সুযোগ তাঁর আছে, তবে তিনি সে সুযোগ নেবেন। তাঁর জন্য নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই।’

উত্তর কোরিয়ার ভেতরে ও বাইরে কিম ইয়ো জংয়ের কঠোর ও আপসহীন একটি ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। প্রতিপক্ষকে নিয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করার জন্য তিনি পরিচিত এবং মাঝেমধ্যেই নিজের নামে বিবৃতি দেন।

উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ওয়েবসাইট ‘৩৮ নর্থ’–এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে সম্ভাব্য ‘অস্থিরতায়’ কিম জং উনের হঠাৎ মৃত্যুর ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনটিতে গুরুত্ব দিয়ে আরও বলা হয়েছিল, কিম জং–উন ও তাঁর সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কিম জং–উনের হঠাৎ মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতার মতো পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও কিম ইয়ো জংয়ের মতো রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রার্থীদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’

বিপরীতে অন্যান্য সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর মধ্যে কিম জু আয়ে ও তাঁর দুই ভাই (ধরা হচ্ছে) আছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। তবে সে সঙ্গে এটাও বলা হয়েছিল, তারা এখনো খুবই ছোট এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই আগামী ৫ থেকে ১৫ বছর বাস্তবসম্মতভাবে উত্তরাধিকারী হিসেবে তাদের বিবেচিত হওয়া সম্ভব নয়।

একসময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভাই কিম জং–উনের পাশে নিয়মিত দেখা যেত কিম ইয়ো জংকে
একসময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভাই কিম জং–উনের পাশে নিয়মিত দেখা যেত কিম ইয়ো জংকে, ফাইল ছবি: রয়টার্স

রক্তাক্ত পারিবারিক ইতিহাস

উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পরিবারের ভেতর রক্তপাতের ইতিহাস পুরোনো। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর কিম জং–উন তাঁর চাচা ও একসময়ের পরামর্শদাতা (মেন্টর) জাং সং থাকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেন। ২০১৩ সালে তাঁকে ‘পার্টিবিরোধী, বিপ্লববিরোধী ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ‘ফায়ারিং স্কোয়াডে’ তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

কিম জং–উনের সৎভাই কিম জং–নমকেও হত্যা করা হয়েছে। একসময় কিম জং–নমকে উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী বিবেচনা করা হতো। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই নারী কিম জং–নমের মুখে মারাত্মক বিষাক্ত নার্ভ এজেন্ট ‘ভিএক্স’ মেখে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা এবং সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জন্য ফিলিস্তিনের অধিকৃত জমি কেনা সহজ করার লক্ষ্যে নতুন কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে ইসরায়েল। গতকাল রোববার ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় পদক্ষেপগুলো অনুমোদন করা হয়। ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের এ পদক্ষেপকে ‘কার্যত একীভূতকরণ’ বলে উল্লেখ করেছে।

পশ্চিম তীর সেই অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। অঞ্চলটির বড় অংশই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় পশ্চিমা সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সীমিত আকারে শাসনকাজ পরিচালনা করে।

চলতি বছরের শেষ দিকে নেতানিয়াহুকে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। ইসরায়েলি বসতি এলাকায় তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। জোটের অনেক সদস্যই পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার পক্ষে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করা এই ভূমির সঙ্গে কথিত বাইবেলীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা দাবি করে থাকে ইসরায়েল।

গতকাল ইসরায়েলের মন্ত্রিপরিষদ পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম এ বিতর্কিত প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে ইসরায়েল। এর এক সপ্তাহ আগেও পশ্চিম তীরে বেশ কিছু পদক্ষেপ অনুমোদন করেছিল ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা। ওই পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেন, ‘আমরা বসতি স্থাপনের বিপ্লব চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের ভূমির প্রতিটি অংশে আমাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করছি।’

জমি নিবন্ধনের নতুন পদক্ষেপটিকে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে পরিচালিত ‘অবৈধ জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার যথাযথ জবাব’ বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, জমি নিবন্ধন একটি অত্যাবশ্যক নিরাপত্তাব্যবস্থা।

ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই পদক্ষেপ স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে এবং জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়ক হবে।

 

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তারা মনে করে, এ পদক্ষেপটি আসলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিকে ধীরে ধীরে ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা। তাদের মতে, অবৈধ বসতি স্থাপনের মাধ্যমে দখল আরও স্থায়ী করতে ইসরায়েলের নেওয়া পরিকল্পনার সূচনাপর্ব এটি।

ইসরায়েলি বসতি–বিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা পিস নাউ বলেছে, ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের কারণে পশ্চিম তীরের প্রায় অর্ধেক এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিরা জমি হারাতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার বিরোধিতা করেছেন। তবে তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের দ্রুত বসতি নির্মাণ ঠেকাতে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ২০২৪ সালে এক পরামর্শমূলক মতামতে বলেছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখল ও বসতি আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী এবং যত দ্রুত সম্ভব তা বন্ধ করা উচিত। তবে ইসরায়েল এই মত মেনে নেয়নি।

রয়টার্স

দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর সময় গ্রেপ্তার হয়েছেন ইউক্রেনের সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী গেরমান গালুশচেঙ্কো। 

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ইউক্রেনের জাতীয় দুর্নীতি দমন ব্যুরো (নাবু) এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে এ তথ্য। খবর আল জাজিরার।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আজ রোবববার গোপনে দেশত্যাগ করার সময় সাবেক ‘মিডাস’ দুর্নীতি মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এবং সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী গেরমান গালুশচেঙ্কোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কারা হেফাজতে আছেন। আইন এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে এ ব্যাপারর আরও বিস্তারিত জানানো হবে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির একজন ঘনিষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন গালুশচেঙ্কো। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তার বিরুদ্ধে ১০ কোটি ডলার অবৈধভাবে উপার্জন ও সেই অর্থ বিদেশে পাচার করার অভিযোগ ওঠে।

গালুশচেঙ্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অর্থের বিনিময়ে নিজের প্রভাব খাটিয়ে দেশের জ্বালানি খাতে ইউক্রেনীয় ব্যবসায়ী তিমরুর মিন্ডিচকে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এছাড়া, ইউক্রেনের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির সবগুলো পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জোঅ্যাটমের ঠিকাদারদের কাছ থেকে যে কোনো কন্ট্রাক্টের বিনিময়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার তার বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগ ওঠার পর গত নভেম্বরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। এবার দেশ ছেড়ে পালানোর সময় গ্রেপ্তার করা হলো তাকে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ইউক্রেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তাইমোশেঙ্কোসহ কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গেরমান গালুশচেঙ্কোও তাদের মধ্যে অন্যতম।

দুর্নীতি ইউক্রেনের সরকারি প্রশাসনের বড় একটি সমস্যা। মূলত, এই কারণেই এখন পর্যন্ত ইউরোপের দেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের সদস্যপদ প্রাপ্তির ব্যাপারটি এখনও ঝুলে আছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন শান্তি পর্ষদের সদস্য দেশগুলো আগামী বৃহস্পতিবারের বৈঠকে গাজার পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার জন্য ৫০০ কোটি  ডলারের বেশি অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেবে।

গতকাল রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডে স্থানীয় পুলিশ গড়ার জন্য জাতিসংঘ অনুমোদিত একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনে হাজারো কর্মী দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, আগামী বৃহস্পতিবার শান্তি পর্ষদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠক হবে ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প ইনস্টিটিউট অব পিসে। সম্প্রতি এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে নামকরণ করেছে। রাষ্ট্রপ্রধানসহ ২০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি দল শান্তি পর্ষদের সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

গাজায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবের মাধ্যমে এই পর্ষদ গঠনের বিষয়টি অনুমোদন করেছিল।

গত বছর ইসরায়েল ও হামাস এই পরিকল্পনায় সম্মত হয় এবং অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে উভয় পক্ষই বারবার একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে ৫৯০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, একই সময়ে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হাতে তাদের চারজন সেনা নিহত হয়েছে।

তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব, কাতার ও ইসরায়েলের মতো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ এই পর্ষদে যোগ দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা এ বিষয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

রয়টার্স

নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নাইজার রাজ্যে শনিবার ভোরে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে চড়ে তিনটি গ্রামে হামলা চালিয়ে অন্তত ৩২ জনকে হত্যা করেছে। হামলায় বহু বাড়িঘর ও দোকানপাটে আগুন দেওয়া হয় বলে স্থানীয় কর্মকর্তা ও প্রাণে বেঁচে যাওয়া বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

ভোরে এই হামলার লক্ষ্য ছিল টুঙ্গা-মাকেরি, কঙ্কোসো ও পিসা গ্রাম।

বেনিন সীমান্ত–সংলগ্ন বরগু এলাকায় এসব হামলা হচ্ছে। যাকে স্থানীয়ভাবে ‘ডাকাত’ বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর তাণ্ডব হিসেবে দেখা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলজুড়ে এসব গোষ্ঠী প্রাণঘাতী হামলা, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ও বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার জন্য দায়ী।

নাইজার স্টেট পুলিশের মুখপাত্র ওয়াসিউ আবিওদুন জানান, টুঙ্গা-মাকেরি গ্রামে হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, অসংখ্য মানুষকে অপহরণ করা হয়েছে। তবে এর সংখ্যা এখনো নিরূপণ করা যায়নি।

কঙ্কোসো গ্রামে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত কিছু জানাননি আবিওদুন। তিনি বলেন, ‘যৌথ নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন চলছে এবং অপহৃতদের উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’

নাইজেরিয়াজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছে।

উত্তর নাইজেরিয়ায় একদিকে ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠী, অন্যদিকে সশস্ত্র অপহরণকারী চক্র—এই দুইয়ের সমন্বয়ে জটিল নিরাপত্তা–সংকট চলছে।

চলতি মাসের শুরুতে পাশের কাওরা রাজ্যে ভয়াবহ এক হামলায় ১৬২ জন নিহত হন। তারই ধারাবাহিকতায় শনিবারের এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটল।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদের সুরক্ষা না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। যদিও হামলার শিকার হচ্ছেন খ্রিষ্টান ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই। এ অভিযোগের পর দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ডিসেম্বরে নাইজেরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দেশটিতে মার্কিন সামরিক দলের উপস্থিতি দেখা গেছে।

কঙ্কোসো গ্রামের বাসিন্দা জেরেমিয়া টিমোথি, যিনি হামলার পর পাশের এলাকায় পালিয়ে যান, বলেন—শনিবার ভোরে এলোপাতাড়ি গুলির শব্দে হামলা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘পুলিশ স্টেশনে আগুন দেওয়ার পর গ্রামে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভোর ৬টার দিকে হামলাকারীরা গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে।

জেরেমিয়া টিমোথি আরও জানান, হামলার সময় আকাশে সামরিক যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা যায়।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০০টির বেশি মোটরসাইকেলে করে হামলাকারীরা এলাকায় ঢুকে একের পর এক গ্রামে তাণ্ডব চালায়।

টুঙ্গা-মাকেরি গ্রামের বাসিন্দা আওয়াল ইব্রাহিম জানান, স্থানীয় সময় রাত প্রায় তিনটার দিকে তাঁদের গ্রামে হামলা হয়।

ইব্রাহিম বলেন, ‘অসংখ্য মোটরসাইকেলে চড়ে তারা আমাদের গ্রামে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়, ছয়জনের শিরশ্ছেদ করে এবং আরও কয়েকজনকে হত্যা করে। দোকানপাটে আগুন লাগিয়ে পুরো গ্রামকে পালাতে বাধ্য করে।’

২০২১ সালে চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন এক ‘বিরাট অগ্রগতি’র ঘোষণা দিয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিসের চিকিৎসায় তাদের ব্যবহৃত একটি যন্ত্রে যুক্ত করা হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

জনসন অ্যান্ড জনসনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অ্যাক্লারেন্ট জানিয়েছিল, তাদের তৈরি ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’-এর সফটওয়্যারে এখন থেকে ‘মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম’ ব্যবহার করা হবে; যা নাক, কান ও গলাবিশেষজ্ঞদের অস্ত্রোপচারের সময় সহায়তা করবে।

এই চিকিৎসা সরঞ্জাম এর আগে বাজারে প্রায় তিন বছর ধরে প্রচলিত ছিল। সেই সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) যন্ত্রটির ত্রুটি নিয়ে সাতটি ও একজন রোগীর আহত হওয়ার বিষয়ে একটি ‘নিশ্চিত না হওয়া’ প্রতিবেদন পেয়েছিল। তবে যন্ত্রটিতে এআই যুক্ত করার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০০টি যান্ত্রিক ত্রুটি ও নেতিবাচক ঘটনার প্রতিবেদন জমা পড়েছে এফডিএর কাছে।

প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে অন্তত ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই ছিল এমন—অস্ত্রোপচারকালে রোগীর মাথার ভেতর চিকিৎসকের ব্যবহৃত যন্ত্রটি ঠিক কোথায় অবস্থান করছে, সে সম্পর্কে ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ভুল তথ্য দিয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় অস্ত্রোপচারের সময় এক রোগীর নাক দিয়ে মস্তিষ্কের তরল (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) চুইয়ে পড়েছিল। অন্য এক ঘটনায়, একজন সার্জন ভুলবশত রোগীর মাথার খুলির নিচের অংশ ফুটো করে ফেলেছিলেন। আরও দুটি ঘটনায়, প্রধান ধমনি দুর্ঘটনাবশত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই রোগী স্ট্রোকের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এফডিএর কাছে আসা প্রতিবেদনগুলো অসম্পূর্ণ হতে পারে এবং এগুলো চিকিৎসা বিভ্রাটের কারণ নিরূপণের জন্য তৈরি করা নয়। ফলে ঘটনাগুলোতে এআইয়ের ভূমিকা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ছিল, তা স্পষ্ট নয়।

চিকিৎসাযন্ত্র প্রস্তুতকারকেরা দ্রুতগতিতে তাঁদের পণ্যে এআই যুক্ত করছেন। নতুন এ প্রযুক্তি চিকিৎসাব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাবে বলে সমর্থকেরা দাবি করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো রোগীদের আহত হওয়ার অভিযোগ ক্রমেই বেশি পাচ্ছে।

তবে স্ট্রোকের শিকার দুই ব্যক্তি টেক্সাসে মামলা করেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, ট্রুডি সিস্টেমের এআই তাঁদের শারীরিক ক্ষতির জন্য দায়ী। একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ‘সফটওয়্যারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার আগে পণ্যটি যতটা নিরাপদ ছিল, পরিবর্তনের পর এটি ততটা থাকেনি।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে মামলার এসব অভিযোগ যাচাই করতে পারেনি।

ট্রুডি ডিভাইস নিয়ে এফডিএর প্রতিবেদনের বিষয়ে জনসন অ্যান্ড জনসন কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা হলে তারা ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। ২০২৪ সালে ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস অ্যাক্লারেন্ট ও ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম কিনে নেয়।

ইনটেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস বলেছে, প্রতিবেদনগুলো শুধু এটুকুই প্রমাণ করে যে যেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ট্রুডি সিস্টেমটি ব্যবহৃত হচ্ছিল। তারা আরও বলেছে, ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম বা এআই প্রযুক্তির সঙ্গে কোনো আঘাত বা ক্ষতির সরাসরি যোগসূত্র থাকার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।’

এমন এক সময়ে এ ঘটনাগুলো সামনে আসছে; যখন এআই স্বাস্থ্যসেবার জগৎকে ‘বদলে’ দিতে শুরু করেছে। এর প্রবক্তারা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে নতুন এই প্রযুক্তি বিরল রোগের নিরাময় ও নতুন ওষুধ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে, সার্জনদের দক্ষতা বাড়াবে এবং রোগীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

কিন্তু রয়টার্স যখন নিরাপত্তা ও আইনি নথিপত্র পর্যালোচনা এবং চিকিৎসক, নার্স, বিজ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে; তখন চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কিছু ঝুঁকিও উঠে এসেছে। ডিভাইস নির্মাতা, প্রযুক্তি জায়ান্ট ও সফটওয়্যার নির্মাতারা এখন এ প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

বর্তমানে এফডিএ অন্তত ১ হাজার ৩৫৭টি এআই–চালিত চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দিয়েছে; যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।

শুধু ট্রুডি সিস্টেমই নয়, আরও অনেক এআই-চালিত যন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এফডিএ ডজনখানেক এআই-চালিত যন্ত্রের ত্রুটির প্রতিবেদন পেয়েছে। এর মধ্যে এমন একটি হার্ট মনিটর আছে; যেটি হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একটি আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে; যা ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করেছে।

গত আগস্টে জামা হেলথ ফোরামে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জনস হপকিন্স, জর্জটাউন ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, এফডিএ অনুমোদিত ৬০টি এআই-চালিত চিকিৎসা সরঞ্জাম–সংশ্লিষ্ট ১৮২টি পণ্য প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে। তাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিভাইসগুলো অনুমোদনের এক বছরের মধ্যেই বাজার থেকে তুলে নিতে হয়েছে। সাধারণ চিকিৎসা সরঞ্জামের তুলনায় এআই-চালিত যন্ত্রের বাজার থেকে প্রত্যাহারের হার প্রায় দ্বিগুণ।

‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’-এর সফটওয়্যারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার আগে পণ্যটি যতটা নিরাপদ ছিল, পরিবর্তনের পর এটি ততটা থাকেনি।

এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী রয়টার্সকে বলেন, এআইয়ের এ জয়জয়কার সংস্থাটির জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের হারানোর পর এআই–সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো অনুমোদনের আবেদনের যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। এফডিএর অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান মার্কিন স্বাস্থ্য ও জনসেবা বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাঁরা এ খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেক রূপ ‘জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট’ এখন চিকিৎসা খাতে জায়গা করে নিচ্ছে। অনেক চিকিৎসক সময় বাঁচাতে রোগীর তথ্য সংরক্ষণের মতো কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তবে চিকিৎসকেরা এ–ও বলছেন যে অনেক রোগী নিজের রোগনির্ণয় করতে বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শের বিরোধিতা করতে চ্যাটবট ব্যবহার করছেন; যা নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

প্রায় তিন বছর আগে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর ব্যবসায়িক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি ও গুগলের জেমিনাই বা অ্যানথ্রোপিকের ক্লদ-এর মতো জনপ্রিয় চ্যাটবটগুলো কনটেন্ট (আধেয়) তৈরির জন্য ‘জেনারেটিভ এআই’ ব্যবহার করে। এগুলো মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; যা মানুষের ভাষা বুঝতে ও তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ তথ্য এবং ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এখন এসব এআই টুল সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা অ্যাপের মতো চিকিৎসাক্ষেত্রেও যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে এআই শুধু এলএলএমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এবং চ্যাটবট আসার অনেক আগে থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ খাতের ইতিহাস ৭০ বছরের বেশি পুরোনো। ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং যখন তাঁর এক গবেষণাপত্রে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?’, সেটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন বিভিন্ন পেশাজীবী
এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন বিভিন্ন পেশাজীবী,ছবি: রয়টার্স
 

এফডিএ ১৯৯৫ সালে প্রথম এআই-সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দেয়। সেই ব্যবস্থা জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্ত করতে দুটি ‘প্যাটার্ন-ম্যাচিং’ সফটওয়্যার ব্যবহার করত। বর্তমানে চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যবহৃত এআই-কে প্রায়ই ‘মেশিন লার্নিং’ বলা হয়; যার একটি অংশ হলো ‘ডিপ লার্নিং’। এগুলো নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যেমন রেডিওলজিতে চিকিৎসকদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে, এমন টিউমার শনাক্ত করে ক্যানসার নির্ণয়ে এ প্রযুক্তি সাহায্য করে।

এমন ব্যবস্থা অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২২ সালের জুনে টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের একটি হাসপাতালে এরিন রালফ নামের এক নারীর সাইনাসের অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর মাথায় একটি ছোট বেলুন প্রবেশ করানো হয়। রালফের করা মামলা অনুযায়ী, মার্ক ডিন নামের এক চিকিৎসক ওই সময় তাঁর মাথার ভেতর যন্ত্রের অবস্থান নিশ্চিত করতে এআই-চালিত ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ব্যবহার করছিলেন।

‘সাইনো প্লাস্টি’ নামের এ অস্ত্রোপচার দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিস চিকিৎসার একটি আধুনিক পদ্ধতি। এতে সাইনাসের ছিদ্র বড় করার জন্য একটি বেলুন ফুলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তরল বেরিয়ে যেতে পারে ও প্রদাহ কমে।

তবে ডালাস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে অ্যাক্লারেন্ট ও অন্যদের বিরুদ্ধে করা রালফের মামলায় অভিযোগ করা হয়, ট্রুডি সিস্টেম ডা. ডিনকে ‘ভুল পথে পরিচালিত’ করেছিল। এতে তাঁর একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যা মস্তিষ্ক, মুখ ও ঘাড়ে রক্ত সরবরাহ করে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা তৈরি হয়।

একটি ঘটনায়, একজন সার্জন ভুলবশত রোগীর মাথার খুলির নিচের অংশে ফুটো করে ফেলেছিলেন। আরও দুটি ঘটনায় প্রধান ধমনি দুর্ঘটনাবশত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই রোগী স্ট্রোকের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, রালফের আইনজীবী বিচারককে জানিয়েছেন যে ডা. ডিনের নিজস্ব রেকর্ডেই দেখা গেছে, তিনি বুঝতেই পারেননি যে তিনি ক্যারোটিড ধমনির এত কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে সেই রেকর্ডগুলো যাচাই করতে পারেনি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর স্পষ্ট হয় যে রালফ স্ট্রোক করেছেন। চার সন্তানের মা রালফকে আবার হাসপাতালে ফিরতে হয় এবং পাঁচ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কাটাতে হয়। তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগাতে খোলা একটি ‘গো ফান্ড মি’ পাতায় জানানো হয়, যদি তাঁর মস্তিষ্ক ফুলে যায়, সে ক্ষেত্রে জায়গা করে দিতে খুলির একটি অংশ অপসারণ করা হয়েছিল।

এ ঘটনার এক বছরের বেশি সময় পর স্ট্রোকের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ব্লগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রালফ বলেন, ‘আমি এখনো ফিজিওথেরাপি নিচ্ছি। ব্রেস (সহায়ক কাঠামো) ছাড়া হাঁটা এবং আমার বাঁ হাতটিকে আগের মতো সচল করা এখনো অনেক কঠিন।’

২০২৩ সালের মে মাসে ডা. ডিন যখন আরেকজন রোগী ডোনা ফার্নিহাফের ‘সাইনোপ্লাস্টি’ অস্ত্রোপচার করছিলেন, তখনো ‘ট্রুডি’ ব্যবহার করেন তিনি। ফোর্ট ওয়ার্থের আদালতে করা ফার্নিহাফের মামলা অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের সময় হঠাৎ তাঁর ক্যারোটিড ধমনি ‘ফেটে যায়’। রক্ত চারদিকে ‘ছিটে পড়তে থাকে।’ এমনকি অস্ত্রোপচার পর্যবেক্ষণ করতে আসা অ্যাক্লারেন্টের একজন প্রতিনিধির গায়েও সেই রক্ত লাগে। মামলায় বলা হয়, ডোনা ফার্নিহাফের একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অস্ত্রোপচারের দিনই তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অ্যাক্লারেন্ট কর্তৃপক্ষ জানত বা তাদের জানা উচিত ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে এই নেভিগেশন সিস্টেমটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ ও অনির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি ছিল।

আদালতের নথি অনুযায়ী, অ্যাক্লারেন্ট উভয় মামলার অভিযোগই অস্বীকার করেছে। মামলাগুলো বর্তমানে চলমান রয়েছে। কোম্পানিটি দাবি করেছে, তারা ট্রুডি সিস্টেমের নকশা বা এটি তৈরি করেনি, শুধু বাজারজাত করেছে। অ্যাক্লারেন্টের বর্তমান মালিক ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস রয়টার্সকে বলেছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে অস্ত্রোপচারকালে কোনো আঘাত বা ক্ষতির যোগসূত্র থাকার কোনো প্রমাণ নেই।

ফেডারেল ডেটাবেজ ‘ওপেন পেমেন্টস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ডা. ডিন ২০১৪ সাল থেকে অ্যাক্লারেন্টের পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছ থেকে ফি বাবদ ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার ছিল ট্রুডি সিস্টেম–সংশ্লিষ্ট।

ডা. ডিনের একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা এবং মামলা চলমান থাকায় চিকিৎসক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। ইন্টেগ্রা বলেছে, ডা. ডিন এখন আর ট্রুডির পরামর্শক নন এবং অ্যাক্লারেন্ট কিনে নেওয়ার পর তাঁকে যে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা শুধু তাঁর খাবারের খরচ বাবদ ছিল।

ফার্নিহাফের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২১ সালে অ্যাক্লারেন্টের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স ট্রুডি ডিভাইসে এআই যুক্ত করার পেছনে ‘বিপণন কৌশলে’ জোর দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যন্ত্রটিতে ‘নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি’ রয়েছে, এমন দাবি করা।

লিংকডইনে অ্যাক্লারেন্টের একটি পোস্ট অনুযায়ী, ট্রুডির এআই সফটওয়্যারটি রোগীর শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত এবং চিকিৎসকের নির্ধারণ করা দুটি বিন্দুর মধ্যে ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সঠিক পথ’ খুঁজে বের করতে সহায়তা করে। এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা সহজ করা এবং সাইনাস অপারেশনের মতো প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা।

ফার্নিহাফের মামলায় বলা হয়, এআই যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে অ্যাক্লারেন্ট কর্মকর্তারা যখন চিকিৎসক ডিনের কাছে গিয়েছিলেন, তখন তিনি হপকিন্স ও অ্যাক্লারেন্টকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে ‘কিছু সমস্যা রয়েছে; যা সমাধান করা প্রয়োজন।’

মামলায় দাবি করা হয়েছে, এ সতর্কতা সত্ত্বেও অ্যাক্লারেন্ট তাদের নিরাপত্তার মান কমিয়ে নতুন প্রযুক্তিটি বাজারে আনার তোড়জোড় শুরু করে। এমনকি ট্রুডি সিস্টেমে যুক্ত করার আগে এই নতুন প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে নির্ভুলতার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল মাত্র ৮০ শতাংশ।

ডিন সত্যিই এমন কোনো সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া ফার্নিহাফের দাবির সপক্ষে জমা দেওয়া নথিপত্রগুলো আদালতের গোপনীয়তার আদেশে থাকায় সংবাদদাতারা সেগুলো যাচাই করতে পারেননি।

অ্যাক্লারেন্টের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি।

‘ভুল অঙ্গ শনাক্ত’

এফডিএ সতর্ক করেছে, চিকিৎসা সরঞ্জামের ত্রুটি বা প্রতিকূল ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়ই এগুলোতে বিস্তারিত তথ্যের অভাব থাকে, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে অনেক তথ্য মুছে ফেলা হয় এবং শুধু প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এ ছাড়া একই ঘটনা নিয়ে সংস্থাটি একাধিক প্রতিবেদনও পেয়ে থাকে।

রয়টার্স দেখেছে যে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে এফডিএ-তে জমা পড়া অন্তত ১ হাজার ৪০১টি প্রতিবেদন এমন সব চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে, যেগুলো সংস্থাটির অনুমোদন দেওয়া এআই-চালিত ১ হাজার ৩৫৭টি পণ্যের তালিকায় রয়েছে। যদিও সংস্থাটি বলছে, এ তালিকা সম্পূর্ণ নয়।

২০২৫ সালের জুন মাসের এক এফডিএ প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ডের জন্য ব্যবহৃত একটি এআই সফটওয়্যার ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করছে। ‘সোনিও ডিটেক্ট’ নামের সফটওয়্যারটি ভ্রূণের ছবি বিশ্লেষণে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সোনিও ডিটেক্ট সফটওয়্যারের এআই অ্যালগরিদম ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি ভ্রূণের শারীরিক গঠন ভুলভাবে শনাক্ত ও সেগুলো ভুল অঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করছে।’ তবে এতে কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

‘সোনিও ডিটেক্ট’-এর মালিক স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্যামসাং মেডিসন। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এই প্রতিবেদন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় না এবং এফডিএ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেনি।

এ ছাড়া অন্তত ১৬টি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিকের তৈরি এআই-চালিত হার্ট মনিটরগুলো হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিক ছন্দ বা সাময়িক বিরতি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এতে কেউ আহত হওয়ার তথ্য নেই। মেডট্রনিক এফডিএ-কে জানিয়েছে, কিছু ঘটনা ‘ব্যবহারকারীর বিভ্রান্তির’ কারণে ঘটেছে।

মেডট্রনিক তাদের হার্ট মনিটরের এআই অ্যালগরিদমকে ‘ডিপ লার্নিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের দাবি, এটি ভুল সতর্কবার্তার হার কমিয়ে সঠিক তথ্য দেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইটে এ–ও স্বীকার করেছে, তাদের এই প্রযুক্তি প্রকৃত অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন শনাক্তের ক্ষেত্রে ভুল করতে পারে।

মেডট্রনিক রয়টার্সকে জানিয়েছে, ১৬টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটিতে তাদের যন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং এতে রোগীর কোনো ক্ষতি হয়নি।

ট্রাম্প আমলে এফডিএতে জনবল ছাঁটাই

রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, নতুন চিকিৎসাযন্ত্রের জোয়ার সামলানোর মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নেই। প্রায় চার বছর আগে এফডিএ এআই–বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীর সংখ্যা বাড়িয়েছিল। দলটি এআইয়ের নিরাপত্তা যাচাইয়ে সংস্থাটির প্রধান সম্পদে পরিণত হয়েছিল। গত বছরের শুরুর দিকে এ দলে সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০।

একজন সাবেক কর্মী বলেন, ‘কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। আমরা তাঁদের পাশে বসে বুঝিয়ে বলতাম, কেন এ প্রযুক্তিটি বাজারের জন্য নিরাপদ বা অনিরাপদ।’

তবে গত বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইলন মাস্কের ব্যয় সংকোচন অভিযানের অংশ হিসেবে এই এআই টিম ভেঙে দিতে শুরু করে। এফডিএর অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, ৪০ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে প্রায় ১৫ জন চাকরি হারিয়েছেন বা নিজে থেকে চলে গেছেন। ডিজিটাল হেলথ সেন্টার অব এক্সিলেন্স নামের আরেকটি বিভাগও তাদের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী হারিয়েছে।

মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু নিক্সন অবশ্য দাবি করেছেন যে এফডিএ এআই-চালিত যন্ত্রের ক্ষেত্রেও আগের মতোই কঠোর মান বজায় রাখছে। তিনি বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তাই এফডিএর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’

তবে এফডিএর সাবেক কর্মীদের মতে, ছাঁটাইয়ের পর কর্মীদের কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে অনেক ত্রুটি নজর এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এফডিএর নিয়ম অনুযায়ী, বেশির ভাগ এআই-চালিত যন্ত্র বাজারে আনার আগে রোগীদের ওপর পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। নির্মাতারা শুধু পুরোনো কোনো এআই-বিহীন যন্ত্রের ‘আপডেট’ হিসেবে এগুলো বাজারে ছাড়ার অনুমতি পান।

সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আলেকজান্ডার এভারহার্ট বলেন, ‘চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এফডিএর প্রথাগত পদ্ধতি এআই-চালিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা নির্মাতাদের ওপর নির্ভর করছি যে তারা ভালো পণ্য দেবে; কিন্তু এফডিএর কাছে এর কোনো কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কি না, আমার জানা নেই।’

রয়টার্স

নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা ‘আর বিদ্যমান নেই’ বলে সতর্ক করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস।

গতকাল শুক্রবার বার্ষিক মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে মের্ৎস বলেন, বড় শক্তিগুলোর প্রাধান্য বিস্তারের এই সময়ে ‘আমাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত নয়’। তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয়দের ‘ত্যাগ স্বীকারে’ প্রস্তুত থাকতে হবে।

ফ্রিডরিখ মের্ৎস এ-ও স্বীকার করেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘গভীর বিভাজন’ সৃষ্টি হয়েছে।

সম্মেলনটি এমন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছেন। এ ছাড়া তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্মেলনে মের্ৎসের ভাষণ শুনছিলেন। আজ তিনি নিজেও ভাষণ দেবেন। এর আগে রুবিও ‘ভূরাজনীতিতে এক নতুন যুগ’-এর কথা বলেছেন।

চলতি বছরের সম্মেলনে প্রায় ৫০ জন বিশ্বনেতার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ইউরোপের প্রতিরক্ষা এবং ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে।

এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ন্যাটো সামরিক জোটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের আগ্রহ এবং সে-সংক্রান্ত হুমকির কারণে অনেক ইউরোপীয় নেতা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন, যা তাঁদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের প্রতি বিশ্বাস ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে।

গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয় গ্রিনল্যান্ড আমাদের চাইবে…আমরা ইউরোপের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক রাখি। দেখব সব কীভাবে ঠিক হয়। আমরা বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনাই করছি।’

এবারের বার্ষিক সম্মেলনের এজেন্ডাতে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা দেশগুলো ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য ইরান‑যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি—এসব বিষয়ও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন একাধিক সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মের্ৎস সম্মেলনে বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের আরও স্পষ্টভাবে বলতে হবে—এই ব্যবস্থা, যতটা অসম্পূর্ণই হোক না কেন, সর্বোত্তম অবস্থাতেও, সেই রূপে আর বিদ্যমান নেই।’

মের্ৎস আরও বলেন, ‘ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিভাজন, একটি গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক বছর আগে মিউনিখে এটি খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন।’

মের্ৎস আরও বলেন, ‘তিনি ঠিক ছিলেন। মাগা (আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলুন) আন্দোলনের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ আমাদের নয়।’

মের্ৎস বলেন, ‘যখন কোনো বক্তব্য মানবমর্যাদা ও সংবিধানের বিরুদ্ধে যায়, তখন আমাদের কাছে বাক্‌স্বাধীনতার সীমা এখানেই শেষ। আমরা শুল্ক আর সংরক্ষণবাদের প্রতি বিশ্বাস করি না, বরং মুক্ত বাণিজ্যের প্রতি বিশ্বাসী।’

গত বছর জেডি ভ্যান্স ইউরোপের বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের বাক্‌স্বাধীনতা ও অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর সেই বক্তৃতা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের মধ্যে অভূতপূর্ব উত্তেজনার একটি বছর শুরু করেছিল।

তবে মের্ৎস দশকব্যাপী অংশীদারত্বকে উপেক্ষা করেননি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘চলুন ট্রান্সআটলান্টিক বিশ্বাস মেরামত ও পুনর্জীবিত করি।’

জার্মানির এই নেতা আরও বলেছেন, তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে যৌথ ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে ‘গোপন আলোচনা’ চালাচ্ছেন। তিনি এ নিয়ে আর কোনো বিশদ তথ্য দেননি।

ইউরোপে শুধু ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তবে জার্মানি এবং অন্যান্য অনেক ইউরোপীয় দেশ ঐতিহ্যগতভাবে ন্যাটো জোটের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সুরক্ষা বলয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

শুক্রবার পরে সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় এমানুয়েল মাখোঁ আবারও জোর দিয়ে বলেন, নতুন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপকে ‘ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তৈরি হতে শিখতে হবে’।

বিবিসি

আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আগামী ১ মে থেকে আফ্রিকার প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। 

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের (এউ) ৩৯তম বার্ষিক সম্মেলনে এক বিশেষ বার্তায় তিনি এই ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে আফ্রিকার ৫৩টি দেশ চীনের বিশাল বাজারে কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়াই পণ্য রপ্তানি করতে পারবে।

চীনের এই নতুন ঘোষণার আওতায় শুধুমাত্র এসওয়াতিনি (সাবেক সোয়াজিল্যান্ড) বাদে আফ্রিকার বাকি সব দেশ এই বাণিজ্যিক সুবিধা পাবে।

উল্লেখ্য যে, এসওয়াতিনি এখনো তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখায় তাদের এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। বর্তমানে চীন আফ্রিকার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং মহাদেশটির অবকাঠামো উন্নয়নে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে বড় বড় প্রকল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষণবাদী শুল্ক নীতির বিপরীতে চীন নিজেকে আফ্রিকার আরও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

সম্মেলনের ফাঁকে আফ্রিকার ঋণ সংকট নিয়ে নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তিনি ঘোষণা করেছেন, কোনো আফ্রিকান দেশ যদি চরম জলবায়ু দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়, তবে তাদের ঋণ পরিশোধের কিস্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করার সুযোগ দেবে দেশটি। 

মেলোনির এই প্রস্তাবটি মূলত ইতালির বিশেষ ‘মাত্তেই প্ল্যান’-এর অংশ, যা আফ্রিকার সঙ্গে জ্বালানি, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। যদিও এই ঋণ স্থগিতের প্রক্রিয়াটি ঠিক কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে জানানো হবে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে পানি নিরাপত্তা ও স্যানিটেশন। ২০২৬ সালের জন্য সংস্থাটির থিম হলো: “এজেন্ডা ২০৬৩ বাস্তবায়নে টেকসই পানি সরবরাহ ও নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ।” 

পরিসংখ্যান বলছে, আফ্রিকার প্রায় ৪০ কোটি মানুষ বর্তমানে নিরাপদ খাবার পানির সংকটে রয়েছেন এবং ৮০ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা নেই। সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্ব নেতারা এই মানবিক সংকট নিরসনে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।

দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।