গত মাসে গ্যাসের দাম আবারও বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। নতুন এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পারিবারিক সঞ্চয় চার বছরের মধ্যে এপ্রিলেই হয়েছে সবচেয়ে কম।
ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তার প্রভাবে এপ্রিল মাসে ফেডারেল রিজার্ভের পছন্দের মূল্যসূচক (পিসিই) বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, মার্চে যা ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মাসিক ভিত্তিতে এপ্রিলে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় সূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, মার্চে যা ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, অর্থাৎ মার্চের তুলনায় কিছুটা ধীর।
অর্থনীতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোক্তা ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল, এপ্রিলে তা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। তবে মার্চে প্রবৃদ্ধি ছিল ১ শতাংশ, সেখানে এই গতি তুলনামূলকভাবে কম। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রকৃত ব্যয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। কর ফেরতের কারণে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া অনেক পরিবার জ্বালানি দামের ধাক্কা সামাল দিতে পেরেছে। তবে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন হবে।
নেশনওয়াইড মিউচুয়ালের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্যাথি বোস্টজ্যানসিক বলেন, পরিবারগুলো এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। এক মাসে ভোক্তাদের আয় ছিল প্রায় স্থির। কর-পরবর্তী আয় কমেছে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করার পর প্রকৃত আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।
এই অবস্থায় মানুষ সঞ্চয় ভাঙিয়ে খরচ চালাচ্ছে। এপ্রিলে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের হার নেমে এসেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে, ২০২২ সালের জুনের পর যা সর্বনিম্ন। চলতি বছরের শুরুতে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
ন্যাভি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিদার লং লিখেছেন, আমেরিকানরা এখন আর্থিকভাবে চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি ৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এবং ব্যক্তিগত সঞ্চয় গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অনেকেই এখন আয় থেকে বেশি ব্যয় করছেন—বিষয়টি টেকসই নয়, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য।
মূল্যস্ফীতির আবারও উল্টো পথে
ফ্যাক্টসেটের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, এপ্রিলে মাসিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং বার্ষিক ভিত্তিতে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ব্যয় বৃদ্ধিও শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে। গত মাসে ব্যয়ের বড় অংশই গেছে গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে—জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাসস্থান ও খাদ্য মিলিয়ে মোট ব্যয় বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেক এসেছে এসব খাত থেকে। তবে মানুষ এখনো ঐচ্ছিক খাতে ব্যয় কমায়নি; বিনোদন ও রেস্তোরাঁয় খরচ বরং বেড়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে গেছে, ফলে তেল, গ্যাস, সারসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা চাপে পড়েছে। এই যুদ্ধের ধাক্কায় জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে, খাদ্যের দাম (বিশেষ করে তাজা পণ্যের) বাড়তে শুরু করেছে। সামগ্রিকভাবে পণ্য ও সেবার দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ এলিজাবেথ রেন্টার বলেন, তেলের দামের ধাক্কা ও তার পরোক্ষ প্রভাব এবং শুল্কনীতির কারণে মূল্যস্ফীতি আবারও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। কিন্তু আয় সেই হারে বাড়ছে না, ফলে ভোক্তারা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ছেন।
অর্থনীতিবিদেরা সাধারণত খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দিয়ে মূল্যসূচক পরিমাপ করে থাকেন। এতে মৌলিক মূল্যস্ফীতির প্রবণতা বোঝা যায়। এই কোর পিসিই সূচক এপ্রিল মাসে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে; এটি প্রত্যাশার তুলনায় কম হলেও বার্ষিক হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে।
ব্যাংক অব আমেরিকা সিকিউরিটিজের অর্থনীতিবিদ স্টিফেন জুনো মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে এই চাপ বাড়ছে। নেশনওয়াইডের বোস্টজ্যানসিক বলেন, টেকসই পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে, এটি জ্বালানি ও খাদ্য ব্যতীত মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি, যেখানে সাধারণত এই খাতে দাম কমে থাকে।
বোস্টজ্যানসিকের মতে, এর পেছনে আছে একদিকে শুল্কনীতি, অন্যদিকে চীনের পরিস্থিতিও দায়ী। তিনি বলেন, চীন এখন আর আগের মতো ডিফ্লেশন বা মূল্যহ্রাসের পর্যায়ে নেই; পাইকারি বাজারে দাম বাড়ছে। রপ্তানিকারক হিসেবে তারা এত বড় যে মার্কিন শুল্কের কারণে বাণিজ্য কিছুটা কমলেও তাদের রপ্তানি বাণিজ্যের বদৌলতে মূল্যস্ফীতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।
ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারকদের জন্যও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের অধীন সুদের হার কমবে, আপাতত তেমন সম্ভাবনা কম।
বোস্টজ্যানসিকের মতে, মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন দীর্ঘ সময় ধরে ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ করবে। বাণিজ্য বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে সহায়তা কর্মসূচি কমে যাওয়ায় এক মাসে আয় কিছুটা কমেছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতিতে গড় মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি দ্রুত হারে বাড়ছে।
একই দিনে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি হয়েছে আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কম। সংশোধিত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, আগের পূর্বাভাস ছিল ২ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের কারণে প্রথম প্রান্তিকে মার্কিন অর্থনীতি কিছুটা গতি পেয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকেও (এপ্রিল-জুন) এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা। আটলান্টা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে।
সিএনএন