হিউস্টন থেকে অবশেষে রোনালদো আসছেন মেসির শহরে। না, রোজারিও নয়, মায়ামি।

এমনিতেই শহরটা বিখ্যাত এর সমুদ্রসৈকত এবং প্রাণবন্ত নৈশজীবনের জন্য। তবে কয়েক বছর ধরে এই শহরের প্রধান আকর্ষণ লিওনেল মেসি নামের একজন। এই শহরের ক্লাব ইন্টার মায়ামি এখন মেসির ঠিকানা। সেই শহরে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও তাঁর পর্তুগাল বাংলাদেশ সময় কাল ভোর সাড়ে পাঁচটায় নামছে একটা নতুন মিশনে। বিশ্বকাপের ‘কে’ গ্রুপে এদিন গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে রোনালদোর পর্তুগালের সামনে কলম্বিয়া।

কাগজে-কলমে এটি এই গ্রুপের শেষ ম্যাচ, বাস্তবে নকআউট পর্বের মানচিত্র আঁকার লড়াই। কলম্বিয়া এরই মধ্যে ৬ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট নিশ্চিত করেছে। পর্তুগালও ৪ পয়েন্টে প্রায় নিরাপদ। কিন্তু নিরাপত্তাই সব নয়। গ্রুপে কোন দল প্রথম হবে, সেটিই হয়তো পরের কয়েকটি ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেবে। দাবার বোর্ডে যেমন কখনো একটি ঘুঁটি বাঁচাতে গিয়ে পুরো ম্যাচের পরিকল্পনা বদলে ফেলতে হয়, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বও অনেক সময় তেমন। একটি অবস্থান বদলে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের গল্প।

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে পর্তুগালের সামনে খুলে যেতে পারে তুলনামূলক সহজ পথ। শেষ ৩২-এ প্রতিপক্ষ হবে সেরা তৃতীয় হওয়া দলগুলোর একটি। তারপরও যদি এগিয়ে যেতে পারে, সত্যিকারের প্রথম বড় পরীক্ষাটি হয়তো আসবে কোয়ার্টার ফাইনালে। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য ফিফার সেই পরম আরাধ্য স্বপ্ন—মুখোমুখি মেসি আর রোনালদো! দুই মহাতারকার কারও একজনের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। টেলিভিশন রেটিংয়ের সব রেকর্ড চুরমার করার এক অবিকল্প চিত্রনাট্য!

কিন্তু এ স্বপ্নের পথে প্রথম শর্ত একটি। পর্তুগালকে গ্রুপে প্রথম হতে হবে।

দ্বিতীয় হলে পথ অনেক বেশি কাঁটায় ভরা। শেষ ৩২-এ কার্লোস কুইরোজের ঘানা কিংবা লুকা মদরিচের ক্রোয়েশিয়াকে যদিও পেরিয়েও যাওয়া যায়, শেষ ১৬-তে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে স্পেন। আর কোনোভাবে তৃতীয় হয়ে উঠলে হলে, প্রায় নিশ্চিতভাবেই সামনে দাঁড়িয়ে যাবে ইংল্যান্ড।

এই হিসাব-নিকাশ ফুটবলাররা করেন না বলে বাজারে যে রোমান্টিক মিথ চালু আছে, তা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিলেন পর্তুগিজ উইঙ্গার পেদ্রো নেতো। তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমরা অবশ্যই কী হবে না হবে, এটা ভাবি। যদি বলি, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হলে কী হতে পারে তা নিয়ে ভাবিনি, তবে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু পর্তুগিজ মানসিকতা সব সময় সেরা হওয়ার। আমরা কলম্বিয়ার মুখোমুখি হব প্রথম হওয়ার জন্যই।’

‘কে’ গ্রুপ থেকে নকআউটে খেলা নিশ্চিত করেছে কলম্বিয়া
‘কে’ গ্রুপ থেকে নকআউটে খেলা নিশ্চিত করেছে কলম্বিয়া, রয়টার্স
 

তবে সমস্যা হলো সামনে যে দল দাঁড়িয়ে আছে, তারা উজবেকিস্তান নয়। কলম্বিয়া এই বিশ্বকাপে নিঃশব্দে নিজেদের সবচেয়ে পরিণত সংস্করণটি মেলে ধরছে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে তিন গোল করে শুরু। এরপর কঙ্গোর বিপক্ষে ধৈর্যের পরীক্ষা পাস করে ১-০। দলটার আক্রমণে কল্পনা আছে, মাঝমাঠে ধৈর্য আছে, আছে রক্ষণে শৃঙ্খলাও। আর আছেন হামেস রদ্রিগেজ। ক্লাব ক্যারিয়ার প্রায় গোধূলিতে, কিন্তু এখনো কলম্বিয়া দলের মুখ। এই বিশ্বকাপেও দুটি গোল বানিয়ে দিয়েছেন।

কলম্বিয়ার আর্জেন্টাইন কোচ নেস্তর লোরেঞ্জো পর্তুগালকে দেখছেন নিজেদের আয়না হিসেবে। তাঁর কথা, ‘পর্তুগাল আমাদের মতোই এক দল। যে দল বল দখলে রাখতে চায়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চায় এবং সুন্দর খেলে জিততে চায়।’

এমনিতে এই বিশ্বকাপে পর্তুগালের যাত্রা যেন দুটি আলাদা গল্প। প্রথম গল্পটি হতাশার। কঙ্গোর বিপক্ষে ৭৪০টি পাস খেলেও লক্ষ্যভেদী শট মাত্র একটি। সমালোচকেরা বলেছিলেন, এত বল দখল রেখে লাভ কী, যদি গোলই না আসে!

দ্বিতীয় গল্পটি বিস্ফোরণের। উজবেকিস্তানের জালে পাঁচ গোল। আর সেই রাতেই ফিরে এলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ গোলহীন থাকার পর ৪১ বছর বয়সী কিংবদন্তির জোড়া গোল। মুহূর্তেই সমালোচনার শব্দ চাপা পড়ে গেল উদ্‌যাপনের আওয়াজে। তবু মায়ামির এই পরীক্ষা আলাদা। কলম্বিয়ার শারীরিক শক্তি, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ আর সুসংগঠিত রক্ষণ এমন এক প্রশ্নপত্র, যার উত্তর শুধু মহাতারকা দিয়ে লেখা যাবে না হয়তো।

মায়ামির এই ম্যাচ তাই রোমাঞ্চভরে অপেক্ষা করার মতোই। এমনিতে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ। আবার হয়তো এখানেই শুরু হবে রোনালদোর এমন একটি পথ, যার শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছেন মেসি বা লুকা মদরিচ, হ্যারি কেইন কিংবা অন্য কেউ।

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই। এখানে ট্রফি জয়ের গল্প পরে লেখা হয়। তার আগে লেখা হয় পথের গল্প।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব