ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ফ্যামিলি কার্ডধারী নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে ২ কোটি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে খরচ ধরা হয়েছে ২৮২ কোটি টাকার বেশি।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

উন্মুক্ত দরপত্র (আন্তর্জাতিক) পদ্ধতিতে এ তেল কেনা হচ্ছে। এ ক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন টিসিবি।

জানা গেছে, দরপত্র প্রক্রিয়ায় মোট দুটি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব কারিগরি ও আর্থিকভাবে রেসপনসিভ (গ্রহণযোগ্য) হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রক্রিয়া শেষে টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) সুপারিশ অনুযায়ী একমাত্র রেসপনসিভ দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পিটি ট্রিনিটি ছায়া এনার্জিকে নির্বাচিত করা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটার ১.১৫১ মার্কিন ডলারে সয়াবিন তেল সরবরাহ করবে। মোট ২ কোটি লিটার তেলের জন্য ব্যয় দাঁড়াবে ২ কোটি ৩০ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৮২ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার টাকা।

টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, সিএফআরসহ গুদাম পর্যন্ত পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের খরচ পড়ছে ১৭৮ টাকা ৫৬ পয়সা। যা স্থানীয় বাজারের গড় মূল্য ১৯৫ টাকার তুলনায় লিটারে প্রায় ১৬ টাকা ৪৪ পয়সা কম।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ২৩ কোটি লিটার ভোজ্যতেল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১২ কোটি ১৬ লাখ ৭৯ হাজার ৩৪ লিটার তেল ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে।

 

দীর্ঘ চাপ ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে আবারও শক্ত অবস্থানে পৌঁছাতে শুরু করেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৭ মে) পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেশের রিজার্ভ এখন ৩১ বিলিয়ন ডলারের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয় স্থিতিশীল থাকা এবং আমদানি ব্যয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসার কারণে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ কমছে এবং ডলারের বাজারেও ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রবাসী আয়। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও বেড়েছে। একইসঙ্গে রপ্তানি আয়ও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে; বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ এবং বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ ছাড় পাওয়ার কারণে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে, অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় ডলারের ওপর চাপও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ফলে, বাজারে অতিরিক্ত ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ বাড়ার অর্থ হলো দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা শক্তিশালী হওয়া। বর্তমানে যে পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে কয়েক মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে।

রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যায়। এতে বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা বাড়ে এবং দেশের ক্রেডিট সক্ষমতাও উন্নত হয়।

এছাড়া, রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে ডলারের বাজারেও অস্থিরতা কমতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ডলারের দাম বেড়ে গেলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বাড়ে। এখন রিজার্ভ বাড়ার কারণে সেই চাপ কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তবে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং ডলারের অস্বাভাবিক চাহিদার কারণে পরবর্তী সময়ে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন সময়ে ডলার বিক্রি করে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ানো এবং বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সেই পদক্ষেপগুলোর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্রস ও বিপিএম-৬ রিজার্ভের পার্থক্য

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত দুটি ধরনের রিজার্ভ হিসাব প্রকাশ করে।

গ্রস রিজার্ভ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট বৈদেশিক মুদ্রা ও সম্পদের হিসাব। এতে বিভিন্ন তহবিল ও স্বল্পমেয়াদি দায়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

অন্যদিকে, বিপিএম-৬ রিজার্ভ হচ্ছে আইএমএফের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ। এতে এমন অর্থ বাদ দেওয়া হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে বিপিএম-৬ হিসাবকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

গত তিন দশক ধরে বৈশ্বিক পোশাক ক্রেতাদের প্রধান প্রশ্ন ছিল—কোন দেশে সবচেয়ে কম খরচে, ঠিক সময়ে ও ভালো মানের পণ্য তৈরি করা যায়। এই প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগামী পাঁচ বছরে শুধু কম দাম দিয়ে ক্রয়াদেশ (অর্ডার) ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এখন ক্রেতারা শুধু উৎপাদন খরচ দেখছেন না; তাঁরা দেখছেন শুল্ক, পণ্যের উৎসবিধি, কাঁচামালের অনুসরণযোগ্যতা, শ্রম অধিকার, পরিবেশগত তথ্য, রাজনৈতিক ঝুঁকি, জ্বালানি ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংরক্ষণ ও সরবরাহ করার সক্ষমতা।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি একই সঙ্গে ‘বড় ঝুঁকি’ ও ‘বড় সুযোগ’। কারণ, বিশ্ববাজার এখন আর শুধু ‘সস্তা উৎপাদন’ খুঁজছে না; তারা খুঁজছে এমন সরবরাহকারী, যারা পণ্য তৈরি করতে পারে, পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের তথ্য দিতে পারে, শ্রম ও পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যাখ্যা করতে পারে এবং সময়মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিতে পারে।

ক্রেতারা যা বিবেচনায় নেবেন
আগে অনেক ক্রেতা শুধু কারখানার দেওয়া দাম দেখে ক্রয়াদেশ দিতেন। এখন তাঁরা দেখতে চাইবেন মোট প্রকৃত খরচ, অর্থাৎ পণ্যের দাম, শুল্ক, পরিবহন, বিলম্বের ঝুঁকি, কাগজপত্রের ঘাটতি, কাস্টমসে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা, অনুসরণযোগ্যতার খরচ এবং মাননিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার খরচ মিলিয়ে আসল ব্যয় কত দাঁড়ায়।

কোনো কারখানা যদি কম দামে পণ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু কাঁচামালের উৎস, তুলার উৎস, সুতার উৎস, কাপড়ের মিল, রাসায়নিক ব্যবহারের তথ্য, শ্রমিকের অধিকারসংক্রান্ত তথ্য বা পণ্যের গঠন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দিতে না পারে, তাহলে সেই সরবরাহকারী ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কম দামে নয়, বরং কম ঝুঁকির নির্ভরযোগ্য সরবরাহে।

পণ্যের উৎস এখন বড় বাস্তবতা
পণ্যের উৎস এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে কোন দেশে কাটিং ও সেলাই হয়েছে, সেটিই পণ্যের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন সুতা, কাপড়, বোতাম, জিপার ও অন্যান্য উপকরণ কোথা থেকে এসেছে, সেটিও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে চীনা উপকরণ, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো এবং জবরদস্তিমূলক শ্রমের ঝুঁকি নিয়ে নজরদারি বাড়ছে।

এই জায়গায় বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের নিজস্ব স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং ও তৈরি পোশাক উৎপাদনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি আছে। যদি আমরা স্থানীয় মূল্য সংযোজন আরও বাড়াতে পারি এবং কাঁচামাল থেকে তৈরি পোশাক পর্যন্ত তথ্য প্রমাণসহ দেখাতে পারি, তাহলে অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে যেতে পারে।

ইইউর বাজারে তথ্য ও প্রমাণ হবে নতুন শর্ত
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে ভবিষ্যতে পণ্যের ডিজিটাল পাসপোর্ট, পরিবেশবান্ধব পণ্য নকশা, মানবাধিকারভিত্তিক যথাযথ যাচাই এবং জবরদস্তিমূলক শ্রম প্রতিরোধ আইন বড় ভূমিকা রাখবে। এর অর্থ হলো, পোশাক তৈরি করলেই হবে না; পণ্যের পেছনের তথ্যও দিতে হবে। কোন ফাইবার ব্যবহৃত হয়েছে, কত শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত উপাদান আছে, কোন রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়েছে, কোন কারখানায় কোন ধাপ সম্পন্ন হয়েছে, শ্রমিকের অধিকার কীভাবে রক্ষা করা হয়েছে এবং পণ্যের পরিবেশগত প্রভাব কত; এসব তথ্য ক্রেতারা চাইবেন।

যেসব কারখানা এই তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও সরবরাহ করতে পারবে, তারা ভবিষ্যতে ক্রেতাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। আর যেসব কারখানা শুধু উৎপাদন করবে, কিন্তু প্রমাণ দিতে পারবে না, তারা ধীরে ধীরে বড় ক্রেতাদের সরবরাহকারী তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

জবরদস্তিমূলক শ্রম প্রতিরোধ
জবরদস্তিমূলক শ্রম প্রতিরোধ এখন আর শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি সরাসরি ব্যবসার খরচ ও ঝুঁকির অংশ। কোনো চালান যদি কাগজপত্র বা উৎস প্রমাণের ঘাটতির কারণে আটকে যায়, তাহলে পণ্য দেরিতে পৌঁছাবে, অতিরিক্ত বিমান পরিবহন খরচ হতে পারে, ক্রেতার দোকানে নির্ধারিত সময়ে পণ্য রাখা সম্ভব হবে না এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই তুলার উৎস, সুতার উৎস, কাপড়ের মিল, লেনদেনের রেকর্ড, সরবরাহকারীর ঘোষণা ও পণ্যের অনুসরণযোগ্যতার তথ্য এখন থেকেই কারখানাগুলোর নিয়মিত ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে। ভবিষ্যতে এগুলো আলাদা কাজ নয়; এগুলোই ব্যবসার মূল শর্ত হয়ে যাবে।

চীনের বিকল্প ও বাস্তবতা
অনেক ক্রেতা এখন চীনের বিকল্প উৎস খুঁজছে। কিন্তু বিকল্প দেশ খুঁজলেই সমাধান হয়ে যায় না। একটি দেশে শ্রমিক থাকলেই যথেষ্ট নয়; সেখানে কাপড় উৎপাদনের কারখানা, ডাইং, ট্রিমস, বন্দর, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা ও অর্থায়নের সক্ষমতা থাকতে হয়। এই জায়গায় বাংলাদেশের বড় সুবিধা হলো উৎপাদনের পরিসর, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নিরাপদ কারখানার ভাবমূর্তি ও পরিবেশবান্ধব কারখানায় নেতৃত্ব।

তবে আমাদের অনেক দুর্বলতাও আছে। জ্বালানি ও গ্যাসসংকট, বন্দরের কম সক্ষমতা, অর্থায়নের উচ্চ ব্যয়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতির ঘাটতি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে শুধু বড় উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে ভবিষ্যতের বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।

[caption id="attachment_273438" align="alignnone" width="852"] নিজের কারখানায় লেখক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ[/caption]

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনে পোশাক খাতে পরিকল্পনা, নকশা, উৎপাদন পর্যবেক্ষণ, মজুত ব্যবস্থাপনা, ভার্চ্যুয়াল নমুনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনই সেলাই, কাপড়, ডাইং, শ্রমিক দক্ষতা বা প্রমাণপত্র ব্যবস্থাপনার বিকল্প নয়। বরং এর ফলে ক্রেতারা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও দ্রুত সাড়া, ছোট ক্রয়াদেশ ব্যবস্থাপনা, সঠিক উৎপাদন তথ্য এবং পরিষ্কার ডিজিটাল প্রতিবেদন চাইবে।

যেসব কারখানা উৎপাদনের তথ্য, পরিবেশগত তথ্য, শ্রমিক কল্যাণের তথ্য এবং কাঁচামালের অনুসরণযোগ্যতা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে দিতে পারবে, তারাই আগামী দিনে বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে।

বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, কম দামের প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে নির্ভরযোগ্য, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সরবরাহব্যবস্থার দিকে যাওয়া। আমাদের বলতে হবে, বাংলাদেশ শুধু কম দামে পোশাক বানায় না; বাংলাদেশ নিরাপদ, সবুজ, অনুসরণযোগ্য, তথ্যসমৃদ্ধ এবং দায়িত্বশীল পোশাক উৎপাদন করতে পারে।

কারখানাগুলোকে এখন থেকেই কাঁচামালের উৎস অনুসরণ, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার, শ্রমিক কল্যাণের প্রমাণ, অভিযোগ নিষ্পত্তিব্যবস্থা, উৎপাদন তথ্য সংরক্ষণ ও পরিবেশগত তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সদস্য কারখানাগুলোর জন্য পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনভিত্তিক তথ্যভান্ডার, মানবাধিকারভিত্তিক যথাযথ যাচাই সহায়তা, পণ্যের ডিজিটাল পাসপোর্ট প্রস্তুতি, সবুজ অর্থায়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।

ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা

আগামী পাঁচ বছর তৈরি পোশাক খাতের জন্য সহজ হবে না। তবে বাংলাদেশ সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারলে এটি বড় সুযোগের সময়ও হতে পারে। যাঁরা শুধু কম দামের ক্রয়াদেশ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন, তাঁরা চাপের মুখে পড়বেন। আর যাঁরা তথ্য, প্রমাণ, অনুসরণযোগ্যতা, জ্বালানি দক্ষতা, স্থানীয় মূল্য সংযোজন, দ্রুত যোগাযোগ ও দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করবেন, তাঁরা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক পোশাকবাজারে শক্ত অবস্থান নিতে পারবেন।

সুতরাং আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কত কম দামে পণ্য তৈরি করা যায়—এর ওপর হবে না। প্রতিযোগিতা হবে কতটা নির্ভরযোগ্য, প্রমাণযোগ্য, টেকসই এবং ঝুঁকিমুক্ত সরবরাহ দেওয়া যায়—তার ওপর। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে এখনই সেই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

লেখক: শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ, পরিচালক, বিজিএমইএ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড

ঢাকা

কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাধারণত মসলার বাজারে চাহিদা ও দাম-দুটোই বেড়ে যায়। তবে, এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা। এলাচ থেকে শুরু করে জিরা, জায়ফল, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, কিসমিস, আলু বোখারাসহ প্রায় সব ধরনের মসলার দাম আগের তুলনায় কমেছে। দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে বেচাকেনাও। 

রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি মসলা বাজার ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বাজারে গরম মসলার বেচাকেনা চলছে ঠিকই, তবে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত দুই বছরের তুলনায় এবার মসলার দাম কম এবং বাজারে সরবরাহও বেশি।

আস্ত দারুচিনির দাম ভাঙা দারুচিনির তুলনায় কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকা বেশি। বর্তমানে চীনা দারুচিনি প্রতি কেজি ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ছিল প্রায় ৩৬০ টাকা। আর ভিয়েতনামের আস্ত দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৪৮০ টাকা।

অন্যদিকে, গোলমরিচের বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। পাইকারি বাজারে কালো ও সাদা-দুই ধরনের গোলমরিচই পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় সব গোলমরিচ ভিয়েতনাম থেকে আমদানি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় কালো গোলমরিচের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত বছর প্রতি কেজি কালো গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল ৯৫০ টাকায়, এবার তা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৩০ টাকা।

তবে, সাদা গোলমরিচের দাম কমেছে। বর্তমানে এটি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি এক হাজার ২২০ টাকায়। গত বছর একই পণ্য বিক্রি হয়েছিল এক হাজার ৩৫০ টাকায়।

মক্কা-মদিনা ট্রেডার্সের মো. সুজন জানান, বাজারে মানভেদে বিভিন্ন ধরনের এলাচ প্রতি কেজি তিন হাজার ৮০০ থেকে পাঁচ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যে এলাচ এবার পাঁচ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গত বছর সেটাই ছিল পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা।

তিনি জানান, মধ্যমানের ‘এলএমজি’ এলাচ বর্তমানে কেজিপ্রতি চার হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল ২০০ টাকা বেশি। গত বছর একই এলাচ বিক্রি হয়েছিল চার হাজার ৭০০ থেকে চার হাজার ৮০০ টাকায়। এছাড়া অপেক্ষাকৃত কম মানের ‘এসএমজি’ এলাচ এখন বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৮০০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল চার হাজার টাকা। গত বছর এসব এলাচের দাম ছিল চার হাজার ৩০০ টাকা।

আরও একজন ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে ভারতীয় জিরা প্রতি কেজি ৫১৫ টাকা এবং আফগান জিরা ৬৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতিকেজি লবঙ্গ এক হাজার ৩০০ টাকা, কালো গোলমরিচ এক হাজার ৩০ টাকা, সাদা গোলমরিচ এক হাজার ২৩০ টাকা, জায়ফল মানভেদে ৮০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা, কাঠবাদাম ও কাজুবাদাম এক হাজার ৩০০ টাকা, সোনালি কিসমিস ৮০০ টাকা এবং লম্বা কিসমিস ৭৯০ টাকা, মেথি ১৩২ টাকা, ধনিয়া ১৬০ টাকা, মৌরি ১৭৫ টাকা এবং দারুচিনি ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগেও দাম কিছুটা বেশি ছিল, তবে এখন কমেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত থাকায় আমদানি বেড়েছে, ফলে বাজারে মসলার দামও কম।

মেসার্স সোহেল অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক বলেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ বেচাকেনা হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। আগে এই সময় এত ব্যস্ত থাকতাম। দুপুরে খাওয়ার সময়ও পেতাম না। এবার সেই তুলনায় বাজার অনেকটাই ফাঁকা।

সান এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. ফারুক আহমেদ বলেন, ঈদের আগে শুধু মসলার বাজার নয়, কোনও বাজারই ভালো না। ভারত থেকে চোরাই পথে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের মসলা দেশে ঢুকছে। এতে বৈধ আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। অবৈধ পথে আসা পণ্যে ট্যাক্স দিতে হয় না। ফলে তারা কম দামে বিক্রি করতে পারে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

পলাশ ট্রেডার্সের মালিক মো. রিপন বলেন, ঈদের আগে এমন অবস্থা আগে কখনও দেখিনি। এবার বেচাকেনা একদমই কম।

এ বিষয়ে বেগম বাজার-মৌলভীবাজার বণিক সমিতির সভাপতি হাজী নজরুল ইসলাম বলেন, কোরবানির আগে অনেক ধরনের মসলার দাম কমে গেছে। প্রতি কেজি আলু বোখারার দাম ৫০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকায়। পাঁচ হাজার ২০০ টাকার এলাচ এখন চার হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাজারে দারুচিনিও বিক্রি হচ্ছে দুই ধরনের। চীন থেকে আমদানি হওয়া ভাঙা দারুচিনি ২৫ কেজির বস্তায় পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম থেকে আসা আস্ত দারুচিনি ১০ কেজির প্যাকেটে বিক্রি হয়। 

 

প্রথমবারের মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার হচ্ছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। চলমান এডিপির চেয়ে আগামী এডিপি এক লাখ কোটি টাকা বাড়ছে।

আজ শনিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বর্ধিত সভায় আগামী অর্থবছরের এডিপির খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। আগামী ১৬ মে আরেকটি বর্ধিত সভায় এডিপির খসড়া চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আজকের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়।

চলতি মাসেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় আগামী অর্থবছরের এডিপি পাস হবে, যা পরে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নতুন এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা ১১২১।

চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নাজুক। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। এ অবস্থায় আগামী বছরে আরেকটি বড় এডিপি নিচ্ছে সরকার। এ ছাড়া প্রকল্পে বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবও আছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্ধিত সভায় উপস্থাপিত খসড়া অনুসারে আগামী অর্থবছরের মূল এডিপির আকার তিন লাখ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প, সেখানে খরচ আরও ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। খসড়া এডিপির মধ্যে দেশজ উৎস থেকে দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা প্রকল্প সাহায্য হিসেবে পাওয়া যাবে।

খসড়া প্রস্তাব অনুসারে চলতি এডিপি থেকে আগামী এডিপিতে শিক্ষায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ও স্বাস্থ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকা বাড়ছে।

চলতি অর্থবছরের এডিপির আকার ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই–মার্চ) এডিপির ৩৬ শতাংশের মতো বাস্তবায়ন হয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বরাদ্দে শীর্ষ ৫ খাত কোনগুলো

প্রস্তাবিত খসড়া এডিপিতে বরাদ্দের দিক থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতকে। এ খাতে মোট ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা খাতে। এ খাতে বরাদ্দ ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। এরপরে চতুর্থ স্থানে থাকা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে গৃহায়ণ খাতে। এ খাতে বরাদ্দ ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব