দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন মামলার তথ্য–প্রমাণসহ একটি অনুরোধপত্র চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। পরে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
বেনজীর আহমেদ ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন। সে দেশের সরকার ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি জানায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ খবর জানান। তিনি বলেন, বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে তাঁর গ্রেপ্তার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অনুরোধপত্র পাঠাতে হবে।
বেনজীর আহমেদ ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবার দেশ ছেড়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারি করা হয়েছিল।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি দুর্নীতি ও জালিয়াতির মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়–বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলা, অভিযোগপত্রের নথি, তথ্য-উপাত্ত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একত্র করে অনুরোধপত্র দ্রুত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি।
দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে কিছু মামলার নথি আদালতে ছিল। সেগুলো ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় অনুরোধপত্র তৈরির কাজ চলছে।
এদিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দ্রুতই অনুরোধপত্র পাঠানো হবে।
বেনজীর আহমেদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার (২০১০-১৫) এবং র্যাবের মহাপরিচালকের (২০১৫-২০) দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালের এপ্রিলে তাঁকে আইজিপি করা হয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।
বেনজীর আহমেদের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। এই সুবাদে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে।
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব ও এর সাত সাবেক ও তৎকালীন কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নাম ছিল। তখন তিনি আইজিপি ছিলেন। ২০২২ সালে অবসর নেন বেনজীর। তখন তাঁকে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের শুরুতে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। দুদক বিষয়টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলে তিনি দেশ ছাড়েন।
মামলার অগ্রগতি
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের করা একটি মামলার বিচার চলছে। বাকি পাঁচ মামলার তদন্ত চলমান। ছয় মামলার মধ্যে তিনটিতে প্রধান আসামি বেনজীর। অন্য তিন মামলায় তাঁর স্ত্রী জীশান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় সহযোগী আসামি হিসেবে রয়েছেন বেনজীর আহমেদ।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলার বিচার চলছে। মামলাটিতে গত বছরের ৩০ নভেম্বর অভিযোগপত্র দেয় দুদক। তাতে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ প্রায় ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার মতো অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। গত ৮ মার্চ মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন দুদকের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম। তিনি বলেন, মামলাটিতে ৩৮ জনের মধ্যে ৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে ২৩ জুন। তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদকে যদি দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, তিনি যদি এসে মামলা লড়েন, তাহলে সাক্ষীদের আবার জেরা করা হবে। তারপর বিচারিক–প্রক্রিয়া এগোবে পর্যায়ক্রমে।
সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয় দিয়ে পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগে বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর মামলা করে দুদক। এই মামলায় অন্য আসামিরা হলেন ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের সাবেক পরিচালক মো. ফজলুল হক, সাবেক পরিচালক মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক।
‘বেনজীরকে ট্রাইব্যুনালে আনা হবে’
বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে আনা হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তাঁকে আনা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। গতকাল নিজের কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে বেনজীরের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা তদন্তাধীন ও বিচারাধীন আছে। তাঁকে যদি বাংলাদেশে আনা হয়, এই ট্রাইব্যুনালেও আনা হবে। যেসব মামলায় বিচার চলছে, সেখানে হাজির করা হবে।
সম্পদ কী অবস্থায়
বেনজীর আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের নামে প্রায় ৮০০ বিঘা জমি, ঢাকার গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসা করার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের সন্ধান পেয়েছিল দুদক। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদের প্রায় সব জব্দ করার আদেশ দেন আদালত।
ঢাকার গুলশানে যে ভবনে বেনজীর আহমেদের ৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে, সেখানে গতকাল গিয়ে কথা হয় একজন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই চার ফ্ল্যাট ‘সিলগালা’ অবস্থায় আছে। চারটি ফ্ল্যাটের ভাড়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগী টোল গ্রামে সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বেনজীর আহমেদ। ২০২৪ সালের ১০ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী মাহবুবুল আলম পার্কটি পরিদর্শন করেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পার্কের পুকুর, জলাশয়, ইকো রিসোর্ট, কটেজ ও অন্যান্য স্থাপনা ক্রোক করা হয় এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কৃষিজমি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এবং পুকুর ও জলাশয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে।
২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দরপত্রের মাধ্যমে সুরুচি ট্রেডার্স এক বছরের জন্য পার্ক ও পুকুর ইজারা নেয়। এর মধ্যে ২০টি পুকুরের ইজারামূল্য ছিল ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং পার্কের ইজারামূল্য ছিল ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সুরুচি ট্রেডার্স ১০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করে ৭৩ লাখ ১৫ হাজার টাকায় আবার শুধু পার্কের ইজারা নেয়। আগের বছর পুকুরে লোকসান হওয়ায় এবার তারা পুকুর ইজারা নেয়নি।
গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মামুনুর রহমান বলেন, পুকুরগুলো ইজারা দেওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে