৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দেশে এল আরেক জাহাজ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে এল আরও একটি জাহাজ। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ‘এমটি শান গাং ফা জিয়ান’ নামের...
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে এল আরও একটি জাহাজ। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ‘এমটি শান গাং ফা জিয়ান’ নামের...
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা ২০২২ সালে কোনো নভোচারীকে ছাড়াই শুধু মহাকাশযান পাঠিয়ে আর্টেমিস–১ চন্দ্রাভিযান পরিচালনা করেছিল। ওই মহাকাশযান অভিযান শেষে...
চলতি মার্চ মাসের প্রথম ২৪ দিনে ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে। এর মাধ্যমে একক মাস হিসেবে রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে...
চলতি মার্চ মাসের প্রথম ২৩ দিনেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ২৮৩ কোটি মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৩...
ইন্টারনেটে মানুষের তুলনায় বটের (একধরনের সফটওয়্যার বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম) সক্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যেভাবে বিস্তার ছড়াচ্ছে, তা...
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা...
বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই।
তিনি আরও বলেন, এপ্রিল ও মে মাসের জন্য দেশে প্রয়োজনীয় জ্বালানির পূর্ণ মজুত রয়েছে। একইসঙ্গে জুন মাসের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী এরপর বলেন, জ্বালানি চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুত রয়েছে, যা জাতীয় চাহিদা পূরণে সক্ষম। পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
এর আগে, গত ১৫ এপ্রিল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরীও জানান, দেশে অকটেন ও পেট্রোলের মজুত আগামী দুই মাসের জন্য যথেষ্ট।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রাণালিতে চলমান অবরোধের প্রভাব দেখা যাচ্ছে দেশে; জ্বালানি তেল মজুতে মেতে উঠেছে অসাধু চক্র। ফলে, অস্থিরতা তৈরি হয়েছে ক্রেতাসাধারণের মনেও। ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় করছে মানুষ, বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোলের জন্য দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ সারি। ধারণা করা হচ্ছে, আতঙ্কের কারণে বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে—এমন প্রত্যাশায় বুধবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তেলের দাম কমেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আলোচনায় অগ্রগতি হলে হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা তেল বাজারে ফিরতে পারে।
আজ বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ২৭ ডলারে নেমেছে। আগের দিন এই তেলের দাম কমেছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক শূন্য ৪ ডলার বা ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৯০ দশমিক ২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে; আগের দিন যা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছিল। খবর রয়টার্সের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনা আগামী দুই দিনের মধ্যে পুনরায় পাকিস্তানে শুরু হতে পারে। গত সপ্তাহান্তে আলোচনা ভেঙে পড়ার পর ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করে। তবে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে আশাবাদ দেখা দিয়েছে—এতে সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে এবং অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়া ও ইউরোপে তেল ও পরিশোধিত পণ্য পরিবহনের প্রধান জলপথ এটি।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো অনিশ্চিত। সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত, এখন তা অনেকটাই কমে গেছে।
মঙ্গলবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ডেস্ট্রয়ার ইরান থেকে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার বের হতে বাধা দিয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শর্ক গ্রুপ এক নোটে বলেছে, কূটনৈতিক তৎপরতা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এবং যাতায়াতের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ শিথিল হতে পারে—এমন ইঙ্গিত মিললেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
তাদের মতে, বাজারে এখন স্থিতিশীলতা ফিরবে, এমন সম্ভাবনার চেয়ে সরবরাহ ব্যাহত হবে, এমন আশঙ্কাই বেশি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সমুদ্রপথে ইরানি তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিলের ৩০ দিনের যে মেয়াদ, তা এ সপ্তাহে শেষ হচ্ছে, এই শিথিলতার মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। একইভাবে রাশিয়ার তেলের ওপর অনুরূপ শিথিলতাও গত সপ্তাহান্তে নীরবে শেষ হয়েছে। ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) সাপ্তাহিক মজুতের কী তথ্য প্রকাশ করে, তার দিকে বাজারের নজর থাকবে। রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত সামান্য বেড়েছে, তবে ডিজেল ও পেট্রলের মজুত কমে যেতে পারে।
আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত টানা তৃতীয় সপ্তাহে বেড়েছে।
এর আগে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অচলাবস্থা ও হরমুজ প্রণালি অবরোধের পরিকল্পনার খবরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৬ ডলারে ওঠে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০৪ দশমিক ৮২ ডলারে ওঠে। খবর ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জ্বালানিসংকট আরও তীব্র হতে পারে।
চার মাস জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার বাড়তি দামে আমদানিতে দরকার ৩০০ কোটি ডলার।
ভর্তুকির জন্য বাড়তি লাগবে ৩৮,৫৪২ কোটি টাকা।
২০২২ সালে এমন সংকটের পর দারিদ্র্য বেড়েছিল ৯ শতাংশের বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বেড়ে গেছে। বাড়তি দামে এসব পণ্য আমদানিতে চার মাসে প্রয়োজন ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। আবার ভর্তুকি দিতে লাগবে সাড়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
সরকার এই চাপ সামাল দিতে ৩০০ কোটি ডলার (প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা) ঋণের খোঁজ করছে। গত মার্চ থেকে আগামী জুন সময়ের জন্য বাজেট সহায়তা হিসেবে উন্নয়ন–সহযোগীদের কাছ থেকে এই ঋণ নিতে চায় সরকার। ঋণ পাওয়া যায় কি না, তা আলোচনা করে দেখতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখা।
চিঠির সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে একটি অবস্থানপত্র। সেখানে জরুরি ঋণসহায়তার জন্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া চাপ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। অবস্থানপত্রে ঋণ তিনভাবে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, এই ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ধরে রাখা এবং জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি নিশ্চিতে সহায়তা করবে। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সহায়তা দিতে ভূমিকা রাখবে। তৃতীয়ত, দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার ইত্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে তা ব্যয় করা যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় অবস্থানপত্রে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য চাপের মুখে পড়েছে। এই ঋণসহায়তা জরুরি প্রয়োজন মেটানো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে দরকার।
বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডির শীর্ষস্থানীয় কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কারণ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ১৪ কর্মকর্তা ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বসন্তকালীন সভায় যোগ দিতে গেছেন। এই সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফের কাছে বাড়তি ঋণ চাওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ৩১ মার্চ বলেন, তিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরবেন।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হলে এবং বিশ্ববাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল।
বাড়তি দরে আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দ্রুত কমতে থাকে। একটি পর্যায়ে তা ৪ হাজার ৮০০ কোটি (৪৮ বিলিয়ন) ডলার থেকে নেমে আসে ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারের নিচে। অন্যদিকে ৮৬ টাকার ডলারের দাম ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এর জন্য দায়ী করা হয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অব্যবস্থাপনাকে।
জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ার চাপ সাধারণ মানুষের ওপর দিয়ে দেয় তখনকার সরকার। দফায় দফায় বাড়ানো হয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও সারের দাম। কিন্তু মজুরি মূল্যস্ফীতি অনুযায়ী বাড়েনি।
অর্থনীতির এই পরিস্থিতি বিপুলসংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে দেয়। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত গবেষণায় জানায়, তিন বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। তিনি বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল করার জন্য ঋণের সুদের হার বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। বাড়তে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বৈদেশিক মুদ্রার মোট মজুত সাড়ে ৩ হাজার কোটি (৩৫ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এর ১০ দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যেটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
বাংলাদেশ সময় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি এখনো খোলেনি। অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। আবার যুদ্ধবিরতি শেষ হলেও শিগগিরই জ্বালানির দাম আগের পর্যায়ে যাবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ে নতুন সরকার জরুরি ঋণের খোঁজে নামল।
আমদানির চাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোলিয়াম পণ্য অর্থাৎ জ্বালানি আমদানির ব্যয় ৫১৪ কোটি ডলার। সার আমদানিতে লেগেছে আরও ২৬২ কোটি ডলার। বাসসের একটি খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৮৮ কোটি ডলার।
জ্বালানির দাম বাড়লেই বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। অর্থ মন্ত্রণালয় অবস্থানপত্রে বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজি ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালের মার্চ-জুন সময়ে যেখানে জ্বালানি ও সার আমদানিতে ৩০১ কোটি ডলার লেগেছিল, সেখানে চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অবস্থানপত্রে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পরিস্থিতিও তুলে ধরেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার কোটি (৩০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি থাকলেও মার্চে তা কমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি (২৯ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, এই হিসাব আইএমএফ নির্দেশিত পদ্ধতিতে করা, যা বিপি ৬ নামে পরিচিত।
ভর্তুকির চাপ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থানপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্চ-জুন (২০২৬) সময়ে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বাড়তি ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে ভর্তুকি দাঁড়াবে ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। বাজেটে ভর্তুকি বরাদ্দ আছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্ববাজারে বাড়লেও এপ্রিলে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। তবে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ে ৯ এপ্রিল একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার প্রধান অর্থমন্ত্রী।
ঋণের জন্য যোগাযোগ
ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, জরুরি ঋণের জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। অতীতেও বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছিল, তবে সে সময় উন্নয়ন–সহযোগীরা নানা সংস্কারের শর্ত দিয়েছিল। এর কিছু বাস্তবায়িত হলেও কিছু হয়নি। ফলে নতুন ঋণ সহায়তা পেতে সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে আইএমএফের মতো সংস্থাগুলো জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের মতো খাতে সবার জন্য ভর্তুকি দেওয়ার বিরোধী। এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় অবস্থানপত্রে বলেছে, এই ভর্তুকি হবে স্বল্পমেয়াদি এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী। পাশাপাশি রাজস্ব বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশ উন্নয়ন–সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেটসহায়তা চাইছে। তাই বাংলাদেশের এই উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়। তবে তিনি মনে করেন, উন্নয়ন–সহযোগীরা জানতে চাইবে সরকার কী ধরনের নীতি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে জ্বালানির দাম কেন সমন্বয় করা হয়নি।
ঢাকা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা কমেছে। এতে আজ মঙ্গলবার এশিয়ার প্রাথমিক লেনদেনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৮ দশমিক ৪০ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৯৭ দশমিক ৪০ ডলারে নেমেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেছেন, ইসলামাবাদে বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তেহরান ‘খুব মরিয়া হয়ে’ ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে চায়।
গত শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদে আলোচনায় বসে। প্রায় ২১ ঘণ্টা আলোচনা শেষে রোববার সকালে এই বৈঠক শেষ হয় কোনো সমঝোতা ছাড়াই। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানের বন্দর অবরোধের নির্দেশ দিলে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
এদিকে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ জানিয়েছে, ইরান পাঁচ বছর পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করে ২০ বছরের শর্তে অনড় থাকে। প্রতিবেদনটিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ প্রস্তাব আদান-প্রদান করলেও এখনো চুক্তি থেকে অনেক দূরে রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। সামনাসামনি দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনাও রয়েছে।
আজ মঙ্গলবার এশিয়ার শেয়ারবাজারেও কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। জাপানের নিক্কি ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার কেওএসপিআই সূচক ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলোয় ইরান যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। হরমুজ প্রণালি এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইরান এই প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। তারপর হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের সচিব ক্রিস রাইট সোমবার বলেন, এই জলপথ কার্যত বন্ধ থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তিনি ওয়াশিংটনে আয়োজিত সেমাফোর ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমরা জ্বালানির উচ্চ মূল্য দেখতে থাকব। এমনকি তা আরও বাড়তেও পারে।’
বিবিসি
দেশজুড়ে ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের নোট গ্রহণ ও বিনিময়মূল্য প্রদান সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোববার (১২ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সী ম্যানেজমেন্ট (ডিসিএম) থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, জনসাধারণের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু নগদ লেনদেন নিশ্চিত করতে ব্যাংকের সব শাখায় বিধি অনুযায়ী ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং তার পরিবর্তে নতুন বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্রদানের সেবা নিয়মিতভাবে চালু রাখতে হবে। তবে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাজারে এ ধরনের নোটের আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যা নগদ লেনদেনে ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘ক্লিন নোট পলিসি’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছোট মূল্যমানের ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট নিয়মিতভাবে গ্রহণ করে নির্ধারিত বিশেষ কাউন্টারের মাধ্যমে তা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসব নোটের পরিবর্তে গ্রাহকদের ফ্রেশ বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট সরবরাহ করতে হবে। এ ধরনের সেবা প্রদানে কোনো ব্যাংক শাখার অনীহা বা গাফিলতি পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। বিষয়টিকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে দেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংককে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ভারত ও মালয়েশিয়া থেকে এলপিজি নিয়ে আরও দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। পাশাপাশি এলপিজি ও এলএনজি নিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আরও কমপক্ষে চারটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে।
রোববার (১২ এপ্রিল) চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, শনিবার (১১ এপ্রিল) রাতে মালয়েশিয়া থেকে এলপিজিবাহী ‘ডিএল লিলি’ এবং ভারত থেকে ‘গ্যাস ক্যারেজ’ নামে দুটি জাহাজ বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছায়। জাহাজ দুটি বর্তমানে চার্লি ও ব্রাভো পয়েন্টে অবস্থান করছে।
তিনি আরও জানান, রোববার যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি নিয়ে ‘কংটং’ নামের আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এরপর আগামীকাল মালয়েশিয়া থেকে এলপিজি নিয়ে ‘পল’ নামের আরেকটি জাহাজ পৌঁছাবে।
এছাড়া, ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে এলএনজি নিয়ে ‘মারান গ্যাস হাইড্রা’ এবং ১৮ এপ্রিল ‘লবিটো’ নামের আরও একটি এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি অব্যাহত রেখেছে।