বানিজ্য

সমুদ্র মানেই হাজার হাজার জাহাজ; কিন্তু তারা কেউই সঠিক জায়গায় নেই। মেরিটাইম এআই কোম্পানি উইন্ডওয়ার্ডের সিনিয়র মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স অ্যানালিস্ট মিশেল উইজ বকম্যান ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের উপকূলীয় পানিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অবস্থান পরীক্ষা করার সময় অবাক হন। তিনি বলেন, ‘ওহ ঈশ্বর, আমি অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভিন্ন ক্লাস্টার দেখতে পাচ্ছি। মানচিত্রের ওপর অদ্ভুত বৃত্তাকার আইকন হিসেবে দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি আইকন একটি বাস্তব জাহাজের প্রতিনিধিত্ব করে; কিন্তু বাস্তবে জাহাজগুলো কখনোই এমন নিখুঁত বৃত্তাকারে এক জায়গায় জড়ো হয় না। এমনকি কিছু আইকনকে স্থলের ওপর ভাসমান অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। মূলত জিপিএস সিগন্যাল বিঘ্নিত হওয়ায় জাহাজগুলোর প্রকৃত অবস্থান দেখা যাচ্ছে না, ঢাকা পড়ে গেছে।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন আর কেবল বুলেট আর বোমায় সীমাবদ্ধ নেই; তড়িৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গও এখন যুদ্ধের ময়দান। জিপিএস জ্যামিং খালি চোখে দেখা যায় না। এতে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং এর ফলে মারাত্মক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিপিএস জ্যামিং ইউরোপে বিমান চলাচলে প্রভাব ফেলেছে, এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের এটি একটি নিয়মিত অনুষঙ্গ। এখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় এই ইলেকট্রনিক যুদ্ধ আরও বড় এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির আশপাশে জিপিএস জ্যামিংয়ের এ ঘটনা এবারই প্রথম নয়, গত বছর ইসরায়েল ও ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও বকম্যান এটি লক্ষ্য করেছিলেন; কিন্তু এবারের মাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, নৌ চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি যে কি ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পাকিস্তানের ন্যাশনাল হাইড্রোক্রাফিক অফিসও এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

জাহাজগুলো মূলত একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) ব্যবহার করে। ৩০০ মিটার লম্বা একটি তেলের বিশাল ট্যাঙ্কার থামানো বা ঘোরানো অনেক সময়ের ব্যাপার। যদি আশপাশের জাহাজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না যায়, তবে বিশেষ করে রাতে বা কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় সংঘর্ষের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

জ্যামিংয়ের পেছনে কারা রয়েছে সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না থাকলেও সামরিক বিশ্লেষকদের জোরালো সন্দেহ ইরানের ওপর। ইরান ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী যেকোনো জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের থমাস উইথিংটন জানান, ইরান সম্ভবত নিজেদের তৈরি অথবা রাশিয়া ও চীন থেকে আনা সরঞ্জাম দিয়ে এই জিপিএস জ্যামিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীও তাদের ঘাঁটি ও ড্রোন রক্ষা করতে পাল্টা জ্যামিং–ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে।

প্রযুক্তি কোম্পানি জেফায়ারের সহপ্রতিষ্ঠাতা শন গোরম্যান স্যাটেলাইটের রাডার ডেটা ব্যবহার করে এই জ্যামিংয়ের উৎস খুঁজে বের করার কাজ করছেন। তিনি জানান, জ্যামিং ডিভাইস রাডার সিগন্যালে একধরনের ছাপ রেখে যায়, যা দিয়ে এর অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব। জিপিএস জ্যামিং থেকে সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন কোম্পানি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসছে। যুক্তরাজ্যের অস্ত্র নির্মাতা রেইথন ইউকে তৈরি করেছে ল্যান্ডশিল্ড নামের একটি অ্যান্টি-জ্যাম অ্যান্টেনা সিস্টেম। এটি একাধিক চ্যানেল ব্যবহার করে জ্যামিং মোকাবিলা করতে পারে।

অন্য সংস্থাগুলো জিপিএসের বিকল্প খুঁজছে। অস্ট্রেলীয় কোম্পানি অ্যাডভান্সড নেভিগেশন এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছে, যা জাইরোস্কোপ এবং অ্যাক্সেলেরোমিটার ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয় করতে পারে। এ ছাড়া অপটিক্যাল ইমেজ বা মহাকাশের নক্ষত্রের অবস্থান বিশ্লেষণ করেও জাহাজগুলো তাদের অবস্থান বুঝতে পারে।

বর্তমান জিপিএস সিগন্যাল অত্যন্ত দুর্বল, তাই এগুলোকে জ্যাম করা সহজ। তবে সামরিক বাহিনী এমন কোড নামক একধরনের এনক্রিপ্ট করা জিপিএস ব্যবহার করে; যা জ্যামিং প্রতিরোধী। নেভিগেশন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট জিপিএসের আরও নিরাপদ বিকল্প তৈরির পথ খুলে দেবে। বর্তমানে যেমন আমরা উন্মুক্ত ওয়াইফাইয়ের বদলে পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করি, ভবিষ্যতে জিপিএস সিগন্যালগুলোকেও তেমনি সুরক্ষিত হতে হবে।

সূত্র: বিবিসি

জাহিদ হোসাইন খান

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব