বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনকারী কোনো নৌযান দেখলেই গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই কথা জানিয়েছেন।

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি—হরমুজ প্রণালিতে যারা মাইন বসাচ্ছে, তাদের নৌকা ছোট হলেও যেন গুলি করে ধ্বংস করা হয়।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধাবোধ করা হবে না। তিনি দাবি করেন, মার্কিন ‘মাইন সুইপার’ বা মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলো বর্তমানে ওই প্রণালী পরিষ্কার করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি।

বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি, ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্টসহ হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত হয়ে আজ বৃহস্পতিবার ও গতকাল বুধবার আলীকদম স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামের লক্ষণ নিয়ে ১৫ টি শিশু ভর্তি হয়। ওই ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি পাড়ায় শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে বলে জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার ইউনিয়নের বেসরকারি একটি অনাথ আশ্রমের এক শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে।

মঙ্গলবার রাতে মারা যাওয়া শিশুর নাম চাংমুম ম্রো (৮)। দুর্গম এলাকা হওয়ায় গতকাল বুধবার রাতে বিষয়টি জানাজানি হয়। চাংমুম ম্রোর বাড়ি উপজেলার কুরকপাতা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে।

হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি এক শিশুর শয্যার পাশে পাখা করছেন তার বাবা। আজ সকালে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে
হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি এক শিশুর শয্যার পাশে পাখা করছেন তার বাবা। আজ সকালে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে
 

কুরুকপাতা ইউনিয়নের প্রেন্নয় নামের একটি অনাথ আশ্রমে থেকে পড়াশোনা করত চাংমুম ম্রো। প্রেন্নয় অনাথ আশ্রমের পরিচালক উথোয়াইংগ্যো মারমা জানান, গত মঙ্গলবার রাতে জ্বর, সর্দি থেকে হঠাৎ তার অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। হামের লক্ষণ থাকায় গত এক সপ্তাহে অনাথ আশ্রমটির ৪০টি শিশুকে আলীকদম হাসপাতালে নেওয়া হয়। এদের মধ্যে ৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো গতকাল সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, এখনো ইউনিয়নের উজিপাড়া, ছোট ব্যাটি, বড় ব্যাটি পাড়াসহ বিভিন্ন পাড়ায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত বহু শিশু রয়েছে। এরমধ্যে ১১ এপ্রিল দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরা হলো রিংলতপাড়ার লুকুন ম্রোর সাত মাসের ছেলে খতং ম্রো ও লেংক্লাং ম্রোর তিন মাসের মেয়ে জংরুং ম্রো। তবে ওই দুই শিশুর মৃত্যু হামে নয় বলে চিকিৎসকদের ধারণা।

উপজেলা স্বাথ্যকেন্দ্রে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা( আরএমও) মো. হাসান বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে আজ ১৬ জন এসেছিল। এদের মধ্যে ৬ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার থেকে ভর্তি আছে ৯ জন। এখন মোট ১৫ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

আরএমও হাসান আরও বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত দুই সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬১ জন রোগী এসেছে। এদের মধ্যে ২৮ জনকে ভর্তি করা হয়। ভর্তির রোগীর মধ্যে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৫ জন। ১৩ জন সুস্থ হয়ে ফিরেছে।

আলীকদমের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) মো. হানিফ চাংমুম ম্রোর মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে তার মৃতদেহ হাসপাতালে আনা হয়নি।

আলীকদমের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. হানিফ আরও বলেন, আগামী শনিবার থেকে কুরুকপাতা ইউনিয়নে ক্রাশ প্রোগ্রাম নেওয়া হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ডে দুজন করে স্বাস্থ্যকর্মী যাবেন। তারা প্রত্যেক ঘরে গিয়ে খোঁজ নেবেন। হামের উপসর্গে অসুস্থ দশ বছরের নিচে কাউকে পাওয়া গেলে হাসপাতালে নিয়ে আসা হবে।

হামের লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া শিশু চাংমুম ম্রো
হামের লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া শিশু চাংমুম ম্রো
 

আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, ছোট-বড় মিলিয়ে ওই ইউনিয়নে ১৩৫টি পাড়ায় প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। সীমান্ত সড়কের সঙ্গে আলীকদম-জানালিপাড়া-পোয়ামুহুরী হয়ে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকলেও অধিকাংশ পাড়া সড়ক থেকে অনেক দূরে। বিশেষ করে বিশেষ করে ম্রো পাড়াগুলোতে কোনো সড়ক নেই। ওই সব এলাকার ৯৫ শতাংশ পাড়ায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। এ কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে খবর দেওয়ার সুযোগ থাকে না।

জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, দুর্গম ও স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবে ম্রো সম্প্রদায়ের মধ্যে ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ও হামের মতো রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।

এশিয়ার কয়েকটি দেশের জলসীমা থেকে ইরানের অন্তত তিনটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

শিপিং ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছ থেকে জব্দ করা ট্যাংকারগুলো তাদের গন্তব্য থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরসমূহে, অর্থাৎ সমুদ্রপথে তেহরানের বাণিজ্যের ওপর ওয়াশিংটন অবরোধ আরোপ করার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে তেহরান তিনটি জাহাজে গুলিবর্ষণ করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই মাস পর দুপক্ষের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিনে মার্কিন বাহিনী ইরানের একটি কার্গো জাহাজ এবং একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে।

অন্যদিকে, ইরান জানিয়েছে, তারা গতকাল বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুটি কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই ইরানের প্রথম জাহাজ জব্দের ঘটনা।

মার্কিন ও ভারতীয় শিপিং সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা তিন ইরানি ট্যাংকারের একটি ‘ডিপ সি’ নামের সুপারট্যাংকার। এটি মালয়েশিয়া উপকূল থেকে এক সপ্তাহ আগে নিখোঁজ হয়েছিল। এ ছাড়া ‘সেভিন’ ও ‘ডোরেনা’ নামের আরও দুটি ট্যাংকার জব্দ করা হয়েছে। ডোরেনা ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভারত উপকূলের কাছে ছিল।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানি বন্দর অবরোধ অমান্য করার চেষ্টা করায় ডোরেনা বর্তমানে একটি মার্কিন রণতরীর পাহারায় ভারত মহাসাগরে রয়েছে।

সেন্টকম আরও জানায়, অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৯টি জাহাজকে তারা বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। সমুদ্রপথে ইরানের সামরিক তৎপরতা এবং ভাসমান মাইন এড়াতে মার্কিন বাহিনী এখন উন্মুক্ত সাগরে ইরানি জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তু করছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কাছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা সবাই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এই তথ্য জানিয়েছেন।

‘দ্য লেট শো উইথ স্টিফেন কোলবার্ট’-এ অতিথি হিসেবে আলাপের সময় জন কেরি বলেন, ‘ওবামা না বলেছিলেন। বুশ না বলেছিলেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেনও না বলেছিলেন। আমি সেইসব আলোচনার অংশ ছিলাম।’

সাবেক এই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে রাজি হননি। কারণ, তাঁরা ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ের সব পথ যাচাই করে দেখেননি।’

জন কেরি যুক্তি দেন, ভিয়েতনাম ও ইরাক যুদ্ধ—দুই যুদ্ধ থেকেই একটি সাধারণ শিক্ষা পাওয়া যায়। একজন ভিয়েতনাম যোদ্ধা হিসেবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানেন, মার্কিন জনগণকে বিভ্রান্ত করা উচিত নয়।

সাবেক এই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভিয়েতনামের একজন যোদ্ধা হিসেবে বলছি, যেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল—সেখানে আমাদের কাছে যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে মিথ্যা বলা হয়েছিল। ভিয়েতনাম ও ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা হলো, মার্কিন জনগণের কাছে মিথ্যা বলবেন না। তারপর তাঁদের ছেলেমেয়েদের যুদ্ধে পাঠাতে বলবেন না।’

জন কেরির এই বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপটি শেয়ার করে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’ লিখেছে, ‘সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট ওবামা, বুশ এবং বাইডেনকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা সবাই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, সেখানে (ইরানে) শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে এবং মানুষ জেগে উঠবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, তার কিছুই ঘটেনি।’

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি,ছবি: রয়টার্স
 

নেতানিয়াহুর ‘কঠিন অপপ্রচার’

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত উঠে এসেছে—কীভাবে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালাতে রাজি করিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘১১ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু জোরালোভাবে যুক্তি দিয়েছিলেন, ইরান এখন শাসন পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত সময়। তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শেষ পর্যন্ত ইসলামিক রিপাবলিকের পতন ঘটাতে পারে।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এটি আমার কাছে ভালো মনে হচ্ছে।’ পরবর্তী সময়ে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে এই যৌথ আগ্রাসনের সবুজসংকেত দেন।

জন কেরি বলেন, নেতানিয়াহুর উপস্থাপনাটি ছিল কেবল একটি ‘ভবিষ্যদ্বাণী’। দেশটির দখল নেওয়া বা শাসন পরিবর্তনের যে দাবি তিনি করেছিলেন, তার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে ভ্যান্সের উত্তপ্ত ফোনালাপ

আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত মাসে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ফোনে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছিল। ফোনে আলাপকালে ভ্যান্স ইরান যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর অতিরিক্ত আশাবাদী বক্তব্যের জন্য তাঁকে কড়া কথা শুনিয়েছিলেন।

সংবাদমাধ্যমটি জানায়, শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে নেতানিয়াহু কতটা নিশ্চিত—তা নিয়ে ভ্যান্স তাঁকে চেপে ধরেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন এক কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, যুদ্ধের আগে বিবি (নেতানিয়াহু) প্রেসিডেন্টের কাছে বিষয়টিকে খুব সহজ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স সেসব বক্তব্যের ব্যাপারে অনেক বেশি বাস্তববাদী ও সতর্ক ছিলেন।

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় এক নারী সাংবাদিকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ এই তথ্য জানিয়েছে। চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে এ হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।

গতকাল বুধবার এনএনএর খবরে বলা হয়, ইসরায়েল প্রথমে দক্ষিণ লেবাননের আত-তিরি গ্রামে একটি গাড়িতে হামলা চালায়, এতে ভেতরে থাকা দুজনই নিহত হন।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে দুটি যানবাহনে হামলা চালিয়েছে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত একটি সামরিক স্থাপনা থেকে ওই গাড়ি দুটি বের হয়েছিল বলে দাবি তাদের।

এর আগে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েল ওই সাংবাদিকদের ‘অনুসরণ’ করেছে এবং তাঁরা যে ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই ভবনকে হামলার ‘লক্ষ্যবস্তু’ করা হয়েছে।

এনএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়, এরপর একই গ্রামের একটি ভবনে ইসরায়েল বিমান হামলা চালালে দুজন সাংবাদিক আহত হন এবং ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আল আখবারে কর্মরত সাংবাদিক আমাল খলিলকে পরে ঘটনাস্থলেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর কর্মস্থল থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

দক্ষিণ লেবাননের টায়ার থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক হেইডি পিট জানান, আত-তিরি গ্রামে প্রথম হামলার পর স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আল আখবারের দুই সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন।

পিট তাঁর প্রতিবেদনে আরও লেখেন, ‘আত-তিরি গ্রামে একটি গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলার পর আমাল খলিল ও জয়নাব ফারাজ ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ওই হামলায় দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।’

কিছুক্ষণ পর সেখানে একটি ভবনে হামলায় ওই দুই সাংবাদিক আহত হন এবং ভবনের ধ্বংসস্তূপ নিচে চাপা পড়েন।

লেবানন-ইসরায়েল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে ২১ এপ্রিল দক্ষিণ লেবাননের মানসৌরি গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি বাড়ির সামনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি পড়ে আছে
লেবানন-ইসরায়েল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে ২১ এপ্রিল দক্ষিণ লেবাননের মানসৌরি গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি বাড়ির সামনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি পড়ে আছে, ছবি: রয়টার্স
 

পিট জানান, ‘কয়েক ঘণ্টা ধরে রেডক্রস ও উদ্ধারকর্মীরা ওই দুই সাংবাদিকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেখানে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকার কারণে উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়নি।’

পরে জয়নাব ফারাজকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর অবস্থা ‘সংকটাপন্ন’ বলে জানানো হয়েছে। তাঁর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন পিট।

এর আগে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েল ওই সাংবাদিকদের ‘অনুসরণ’ করেছে এবং তাঁরা যে ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই ভবনকে হামলার ‘লক্ষ্যবস্তু’ করা হয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্স যেন দুই আহত সাংবাদিকের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য ইসরায়েল আত-তিরির সঙ্গে হাদ্দাথার সংযোগকারী প্রধান সড়ক লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে বলে জানান পিট।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তারা সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না এবং তাদের ক্ষতি কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়।’ একই সঙ্গে তারা আত-তিরি হামলার ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারীদের পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছে।

অথচ গত মাসেও দক্ষিণ লেবাননে স্পষ্টভাবে ‘প্রেস’ লেখা একটি গাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় তিনজন সাংবাদিক নিহত হন।

এনএনএর খবরে বলা হয়, বুধবার দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমোর আল-শাকিফ শহরে ইসরায়েলের আরেকটি হামলায় দুজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চলছে। বাংলাদেশ সময় ১৭ এপ্রিল থেকে লেবাননে ওই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।

আল–জাজিরা

ইরান ও রাশিয়ার জাহাজে থাকা তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মেয়াদ ৩০ দিনের জন্য বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল সংকটের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ কথা জানিয়েছেন।

মার্কিন সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন্স উপকমিটির বাজেট বিষয়ক শুনানিতে বেসেন্ট জানান, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকের সময় প্রায় ১০টি দেশের অর্থমন্ত্রীরা তাঁকে এই অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

এর মাধ্যমে গত সপ্তাহে দেওয়া বেসেন্টের করা মন্তব্য থেকে সরে এল মার্কিন প্রশাসন। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে ইরানকে ‘ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রস্তাব’ উপস্থাপনের জন্য সীমিত সময় দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র সিএনএন-কে এ তথ্য জানিয়েছে।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বার্তা ইরানের কাছে পৌঁছেছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমান প্রশাসন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে চায় না এবং তারা ইরানকে আলোচনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগও দিতে চায় না।

সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, বুধবারের সময়সীমার পরও চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট সতর্ক ছিলেন। তিনি যত দ্রুত সম্ভব একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে চান এবং আশা করেছিলেন, সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার চাপ যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেই ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে বাধ্য করবে।

তবে সিএনএনের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টারা মনে করেন যে ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা আলোচকদের দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা একমত হতে পারেননি।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের ভাষায় তেহরানকে ‘ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রস্তাব’ উপস্থাপনের জন্য আরও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধ অবসানের প্রতি প্রশাসনের আগ্রহকেই প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে এটি সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তাদের অনিচ্ছারও বহিঃপ্রকাশ।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, আলোচনা চলার সময় হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ইরানিদের চাপে রাখবে। যদিও ট্রাম্পের সহযোগীদের মধ্যে এই স্বীকারোক্তিও রয়েছে যে, অবরোধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বিশ্ব অর্থনীতির তত বেশি ক্ষতি হবে।

দুই দেশের মধ্যে প্রায় দুই মাসের যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা দেয়। ইরানের অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তা করার অভিযোগে মোট ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

সংঘাত বন্ধে বড় ধরনের ছাড় পেতে ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর যে কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছেন, এ নিষেধাজ্ঞা তারই অংশ।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর জন্য ইরানি প্রশাসনকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।’ তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে ‘ইকোনমিক ফিউরি’ বা অর্থনৈতিক ক্রোধ কর্মসূচির আওতায় ইরানের ‘‘হঠকারিতা ও তাদের সহযোগীদের অর্থের উৎস’’ বন্ধ করা অব্যাহত থাকবে।

এদিকে আজ বুধবার পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার ওই বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অবরোধের কারণে তেহরান এ পর্যন্ত এই বৈঠকে যোগ দেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে জানান, বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি আছেন তিনি। দুই সপ্তাহের জন্য করা এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আজই শেষ হওয়ার কথা ছিল।

ট্রাম্প আগে এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ না বাড়ানোর কথা বললেও গতকাল তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন আনেন। তিনি বলেন, ইরানের প্রতিনিধিরা একটি সমন্বিত প্রস্তাব নিয়ে না আসা পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

ইসরায়েলের সঙ্গে ‘অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি’ স্থগিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরুর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) তাগিদ দিয়েছে সদস্যদেশ স্পেন, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড। ফিলিস্তিনের গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং লেবাননে চলমান পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দেশগুলো। তাদের ভাষ্য, এ অবস্থায় ইইউ আর ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ হয়ে থাকতে পারে না।

গত মঙ্গলবার লুক্সেমবার্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস বলেন, এই তিনটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি আলোচনার তালিকায় রাখার অনুরোধ করেছে।

আলবারেস বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের মধ্যে করা অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি আলোচনা ও বিতর্কের জন্য যৌথভাবে অনুরোধ জানিয়েছে স্পেন, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড।

আলবারেস আরও বলেন, ‘আমি আশা করি, প্রতিটি ইউরোপীয় দেশ মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) ও জাতিসংঘের অবস্থানকে সমর্থন করবে। এর ব্যতিক্রম কিছু হলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বড় পরাজয় হবে।’

গত সপ্তাহে ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসকে একটি যৌথ চিঠি দিয়েছে এই তিনটি দেশ। চিঠিতে তারা বলেছে, ইসরায়েল এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যা ‘মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী’। এটি ১৯৯৫ সালের চুক্তিরও লঙ্ঘন, যেখানে ইইউ ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের রূপরেখা দেওয়া আছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ইসরায়েলকে বারবার এ পথ থেকে সরে আসার অনুরোধ জানানো হলেও তারা তা তোয়াক্কা করেনি। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড চালুর প্রস্তাবিত ইসরায়েলি আইনের সমালোচনা করেন এই তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তাঁদের মতে, এটি মানবাধিকারের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘পরিকল্পিত নিপীড়ন, নির্যাতন, সহিংসতা ও বৈষম্যের’ আরেকটি বহিঃপ্রকাশ।

দেশগুলো গাজার মানবিক সংকটকে ‘অসহনীয়’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, সেখানে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না।

চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয় যে দখলকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা তীব্রতর হচ্ছে। সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীরা ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তি’ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছেন। এতে বেসামরিক ব্যক্তিরা প্রাণ হারাচ্ছেন।

তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা লেখেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর পাশ কাটিয়ে থাকতে পারে না’। তাঁরা ‘সাহসী ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের’ আহ্বান জানিয়ে সব বিকল্প বিবেচনায় রাখার কথা বলেন।

এসব দেশ যুক্তি দেখিয়েছে যে ইইউ-ইসরায়েল চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল। সেখানে মানবাধিকার সুরক্ষার শর্ত রয়েছে। তারা জানায়,আগের এক পর্যালোচনায় ইসরায়েলের শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।

এদিকে ব্রাসেলসে দাতা সংস্থাগুলোর এক সম্মেলনে কাজা কালাস জানান, গাজা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয় বর্তমানে ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ড ও স্পেন এই চুক্তি পর্যালোচনার প্রথম উদ্যোগ নিলেও ইসরায়েলপন্থী দেশগুলোর বিরোধিতায় তা ভেস্তে যায়। পরবর্তী সময়ে নেদারল্যান্ডের নেতৃত্বে এ ধরনের একটি আলোচনার উদ্যোগ সফল হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল সম্ভবত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে।

ইসরায়েল গাজায় ত্রাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করার মতো পদক্ষেপগুলো আর কার্যকর করা হয়নি।

আয়ারল্যান্ড তাদের ‘অকুপায়েড টেরিটোরি বিল’ আবার সক্রিয় করতে চাইছে। এই বিল পাস হলে পশ্চিম তীরসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা নিষিদ্ধ করা হবে।

এদিকে জনগণের প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে স্পেন ও স্লোভেনিয়াও অবৈধ ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছরের আগস্টে স্লোভেনিয়া প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে দখল করা এলাকার পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে।

স্পেনও একই পথ অনুসরণ করেছে এবং ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে।

২০২৪ সালের মে মাসে এই তিনটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’ বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই সমন্বিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি কী?

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জোটের বাইরের কোনো দেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় আইনি কাঠামোকে বলা হয় ‘অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি’। এটি মূলত ইউরোপের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি।

এই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, ইইউর সদস্য না হয়েও কোনো দেশ যাতে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য, রাজনৈতিক সহযোগিতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বজায় রাখতে পারে, সে সুযোগ নিশ্চিত করা।

ইসরায়েলের সঙ্গে ইইউর এই ঐতিহাসিক চুক্তি ১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ২০০০ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর রয়েছে। এ চুক্তির অন্যতম বিশেষত্ব হলো, এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ইউরোপীয় বাজারে বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা পায়। তবে এর বিনিময়ে তাদের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার শর্ত মেনে চলতে হয়।

 

মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরে শক্তিশালী অপরাধচক্র ‘মারা সালভাত্রুচার (এমএস-১৩)’ প্রায় ৫০০ সন্দেহভাজন সদস্যের বিরুদ্ধে গণবিচার শুরু হয়েছে। রাজধানী সান সালভাদরের আদালতে সোমবার (২০ এপ্রিল) শুরু হওয়া এই বিচারকে দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় ফৌজদারি মামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মোট ৪৮৬ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সংঘটিত প্রায় ৪৭ হাজার অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার হত্যাকাণ্ড। অভিযুক্তদের মধ্যে সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব, মাঠপর্যায়ের নেতা, সমন্বয়ক এবং প্রতিষ্ঠাতারাও রয়েছেন।

২০২২ সালের মার্চ মাসে এক সপ্তাহান্তে ৮৭ জনকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে গ্যাং দমনে কঠোর অভিযান শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, সে সময় দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

এর পরপরই জরুরি অবস্থা জারি করে সরকার, যার আওতায় এখন পর্যন্ত ৯১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও এদের মধ্যে হাজারো মানুষ পরে নির্দোষ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সরকারের অভিযোগ, এমএস-১৩ একটি ‘সমান্তরাল রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল, তাই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মামলাও করা হয়েছে। 

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হবে। বর্তমানে এসব মামলার শুনানি হচ্ছে গণবিচারের মাধ্যমে। অনেক অভিযুক্ত কারাগার থেকেই ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। বিচারকরা পরিচয় গোপন রেখে একসঙ্গে বহু আসামির বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছেন।

সরকার বলছে, এই কঠোর অভিযানের ফলে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং এল সালভাদর এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ।

তবে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং আঞ্চলিক সংগঠন ক্রিস্তোসাল এই গণবিচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না; বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটক রাখা, নির্যাতন এবং কারাগারে শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ফলে নির্দোষ ব্যক্তিরাও দোষীদের সঙ্গে শাস্তি পেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র: ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর

 

ইসরায়েলের সেনাবাহিনীকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সেনাবাহিনী বলে বর্ণনা করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজ। তিনি বলেছেন, তাদের কর্মকাণ্ড সব সীমারেখা অতিক্রম ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।

ইসরায়েলি সৈন্যরা এক ফিলিস্তিনি শিশুর ওপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে, এমন একটি ভিডিও দেখার পর আলবানিজ এ প্রতিক্রিয়া জানান।

আলবানিজ তাঁর অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘আমি যথেষ্ট দেখেছি, তাই সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলছি, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সেনাবাহিনী।’

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ চালানোর আভিযোগ এনে এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর থেকে আলবানিজের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে উসকানিমূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তিনি এমনকি সরাসরি প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন। 

ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে নিহত এক শিশুকে দেখছেন স্বজনেরা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ফিলিস্তিন
ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে নিহত এক শিশুকে দেখছেন স্বজনেরা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ফিলিস্তিনফাইল ছবি: এএফপি

দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের এ বিশেষ দূত বলেন, তাঁর জীবন হুমকির মুখে রয়েছে এবং তিনি সবসময়ই বিপদের মধ্যে বাস করছেন। 

আলবানিজ আরও বলেন, প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার পর থেকে তিনি যে চাপ ও হুমকির মুখোমুখি হচ্ছেন, তাতে তাঁর পরিস্থিতি এখন ‘রোলার কোস্টার রাইডের’ মতো হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। একই সঙ্গে আজ মঙ্গলবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে কিছুটা চাঞ্চল্য ফিরেছে।

চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হতে পারে—এমন প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

এর আগে গতকাল সোমবার আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। তবে আজ বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫৪ সেন্ট বা ০ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৯৪ দশমিক ৯৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) মে মাসের দর ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ১১ ডলার বা ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৮৮ দশমিক ৫০ ডলারে নেমেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এ সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তবে আলোচনার নতুন সম্ভাবনা সেই আশঙ্কা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স