অবশেষে নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর গতকাল রোববার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আর লেবাননে যুদ্ধবিরতির মতো বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।
সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক শহরে শুরু হওয়া এই আলোচনা ৬০ দিন ধরে চলার কথা। এই আলোচনার লক্ষ্য গত বুধবার সই হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা।
গতকাল বাংলাদেশ সময় বিকেল পাঁচটায় দুই পক্ষের বৈঠক শুরু হয়। প্রথম ধাপে প্রায় ৮০ মিনিট বৈঠক চলে। এরপর বিরতি দেওয়া হয়। প্রথম ধাপের বৈঠকের পর কাতার ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেন। রাত সাড়ে ১১টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেই বৈঠক চলছিল।
ইরানে আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম বৈঠক–সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে হাত মেলানো ও তাঁদের সঙ্গে ছবি তোলার প্রস্তাবে রাজি হননি ইরানের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
প্রথম ধাপে কী আলোচনা হয়েছে, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা মধ্যস্থতাকারীদের কেউ কিছু জানাননি। তবে ইরানের প্রতিনিধিদলের সদস্য হোসেইন গুরবানজাদেহ দেশটির রাষ্ট্রীয় টিভিকে বলেছেন, ‘আজ আলোচনায় আমরা আমাদের জব্দ হয়ে থাকা সম্পদ এবং সেগুলো অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছি। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের জ্বালানি খাত–সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি। আমরা তেল ও তেলজাত পণ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে সাময়িক অব্যাহতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবের চূড়ান্ত খসড়াও সম্পন্ন হয়েছে।’
বৈঠক শুরুর ঘোষণা প্রথম আসে এই আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের পক্ষ থেকে। বৈঠক শুরুর কথা জানিয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সমঝোতা স্মারকে থাকা সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে দুই পক্ষের মধ্যে একটি টেকসই ও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদনের পথ প্রশস্ত করাই এই আলোচনার লক্ষ্য।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সঙ্গে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
বৈঠকে আরও অংশ নিচ্ছেন মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির। মধ্যস্থতাকারী দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বৈঠকে যোগ দিয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানি। দুই মধ্যস্থতাকারী দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই সরাসরি এই বৈঠক হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা চালায়। পরে ৮ এপ্রিল দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এরপর ১২–১৩ এপ্রিল পাকিস্তানে দুই পক্ষ আলোচনায় বসলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। তার পর থেকে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল পাকিস্তান, কাতারসহ বেশ কয়েকটি দেশ। জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতায় গত বুধবার সমঝোতা স্মারক সই হয়। তার পরও গত শুক্রবার নির্ধারিত দিনে দুই পক্ষের আলোচনা শুরু হয়নি। বৈঠক শুরু না হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ কোনো পক্ষ না জানালেও ইরান ইঙ্গিত দেয়—যুদ্ধবিরতির পরও লেবাননে ইসরায়েলি নৃশংসতা অব্যাহত থাকা এর বড় কারণ।
জেডি ভ্যান্স ও শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে কাতারের প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলকে ধন্যবাদ জানান। আলোচনা শুরুর আগে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি পদক্ষেপ। এর গুরুত্ব শুধু এই অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই নয়; বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সেখানে জেডি ভ্যান্স মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার জন্য ইরানকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ইরান এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার প্রধান নিয়ামক। তবে ‘শেষ কয়েক ঘণ্টায়’ দারুণ কিছু অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এ–ও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একসঙ্গে কাজ করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংকট নিরসনের জন্য ট্রাম্প আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদলকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলেও জানান ভ্যান্স। তিনি বলেন, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের এই ধরন বদলাতে পারব কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’
ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘তাঁর সেই নেতৃত্বের কারণেই এখানে বৈঠক হচ্ছে। আমি মনে করি, আমাদের মধ্যে দারুণ আলোচনা হবে। আশা করি, এই আলোচনার বেশ কার্যকর ফল পেতে যাচ্ছি আমরা।’
তবে বৈঠক চলাকালে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ইরানে আবারও হামলার হুমকি দেন। লেবাননে হিজবুল্লাহসহ ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো যেন সমস্যা সৃষ্টি না করে, এ ব্যাপারে তেহরানকে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘তেহরানকে অবশ্যই অবিলম্বে লেবাননে তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ পাওয়া মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে হবে। তারা যদি তা না করে, তাহলে আমরা গত সপ্তাহে যেমনটি করেছি, ঠিক তেমনি; বরং তার চেয়েও কঠোরভাবে আবার ইরানে আঘাত হানব।’
যুক্তরাষ্ট্রকেও সতর্ক করল ইরান
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পরও লেবাননে হামলা বন্ধ না হওয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। এতে আলোচনা শুরু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হরমুজ দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছে।
শুধু কাগুজে চুক্তি নয়, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়ে সতর্ক করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা ও সহকারী মোহাম্মদ মোখবার। গতকাল তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘প্রতিশ্রুতিগুলো যদি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির প্রবাহ থেমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত আমাদের আলোচকেরা সন্তুষ্ট হবেন না।’
ট্রাম্পের হুমকিকে উড়িয়ে দিয়েছেন ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান বাঘের গালিবাফ। পাল্টা হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, যদি প্রয়োজন হয় তাহলে পাল্টা আঘাত হানতে তেহরানও প্রস্তুত।
বাঘের গালিবাফ প্রথম ধাপের বৈঠকের পর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘তাদের মনে কি এই প্রশ্ন জাগে না যে তাদের হুমকির যদি সত্যিই কোনো প্রভাব থাকত, তাহলে আজ তারা এমন মরিয়া অবস্থায় এসে পৌঁছাত না? আমরা আমেরিকার হুমকিকে কোনো গুরুত্ব দিই না।’
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার আরও লিখেছেন, ‘তাদের বক্তব্যের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তারা যা-ই বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত পদক্ষেপ নেব আমরাই।’
আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে তিন বিষয়
আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রাথমিকভাবে তিনটি বিষয় এই বৈঠকে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানায়। সেগুলো হলো লেবাননে যুদ্ধবিরতি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি।
সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ‘কয়েক দিনের মধ্যে’ অগ্রগতির আশা করছেন তিনি।
কয়েক দশক ধরে ইরানের সঙ্গে চলা বিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্বেগ দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি। এবারের এই আলোচনায়ও ওয়াশিংটনের প্রধান দাবি হবে তেহরানের কাছে এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা, যাতে করে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। যদিও ইরান বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে পারমাণবিক তৎপরতা কমিয়ে দেবে তেহরান।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আলোচনার সময়সীমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আল–জাজিরার সাংবাদিক জেমস বেস। সুইজারল্যান্ডের আলোচনাস্থলে থাকা এই সাংবাদিক বলেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে পৌঁছতে ৫৯৭ দিন (২০১৩–১৫ ) সময় লেগেছিল। এখানে সময়সীমা মাত্র ৬০ দিন। এই সময়ের মধ্যে আলোচনা সফল হলে সেটা হবে অনেক বড় ব্যাপার।
রয়টার্স, বার্গেনস্টক