পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আবারও জোরদার করতে চাইছে বেইজিং। তাই ৮ জুন দুই দিনের সফরে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। গত শুক্রবার চীন এই তথ্য জানিয়েছে। প্রায় সাত বছর পর উত্তর কোরিয়ায় সি চিন পিংয়ের এটিই প্রথম সফর। বর্তমানে রাশিয়ার বাইরে চীন একমাত্র দেশ—যাদের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার মিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে।
আলোচ্য সফরে সি চিন পিং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাঁরা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে মতবিনিময় করবেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, উভয় পক্ষ এই সফরকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়াই এই সফরের লক্ষ্য।
মিত্রকে নিজের বলয়ে ফেরানোর চেষ্টা
করোনা মহামারির কারণে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সুযোগে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেন কিম জং-উন। ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোকে সমর্থন দিতে তিনি সেনা ও অস্ত্র পাঠিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে পিয়ংইয়ংকে আবারও নিজের বলয়ে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে বেইজিং।
৬৫ বছর আগে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে একটি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহায়তা চুক্তি সই হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় কোনো এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ সামরিক সহায়তা দিতে আইনত বাধ্য।
এশিয়া সোসাইটির সিনিয়র ফেলো জন ডেলুরি বলেন, চীন একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেটি হলো—উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে এখনো চীনারাই প্রধান নিয়ন্ত্রক। তিনি আরও বলেন, চীন রাশিয়াকেও এই বার্তাটি দিতে চাইছে।
ক্ষমতাসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগ গত শুক্রবার এই সফরের ঘোষণা দিয়েছে। গত মাসে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সি চিন পিংয়ের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পরই উত্তর কোরিয়া সফরের এই ঘোষণা এল।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে একটি বড় সামরিক কুচকাওয়াজে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিম জং-উন। তিনি তাঁর সেই পরিচিত সবুজ রঙের সাঁজোয়া ট্রেনে চড়ে চীনের রাজধানীতে গিয়েছিলেন।
করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চে দুই দেশের রাজধানীর মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পরে ‘এয়ার চায়না’ দুই দেশের মধ্যে আবার বিমান চলাচল শুরু করে। তবে আপাতত শুধু কিছু ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থী যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছেন। সাধারণ পর্যটকদের জন্য এই পথ এখনো খোলেনি।
চলতি বছরে এটিই প্রথম বিদেশ সফর
চলতি বছরে সি চিন পিংয়ের প্রথম বিদেশ সফর হতে যাচ্ছে পিয়ংইয়ং। ৭২ বছর বয়সী সি চিন পিং সচরাচর খুব একটা বিদেশ সফরে যান না। তিনি সর্বশেষ গত অক্টোবরের শেষের দিকে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে কিম জং-উনের সঙ্গে তিনবার দেখা করেছিলেন। ট্রাম্প আগেই জানিয়েছেন, তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে আবারও দেখা করতে আগ্রহী।
জন ডেলুরি বলেন, পিয়ংইয়ংয়ে কী ঘটছে, সেদিকে নজর রাখা সি চিন পিংয়ের জন্য জরুরি। ডেলুরির মতে, এক বছরের মধ্যে সি চিন পিং যদি দুই কোরিয়াতেই সফর করেন, তবে তা একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। জন ডেলুরি আরও বলেন, চীন দুই কোরিয়ার বিষয়ে সব সময় একধরনের ভারসাম্য বজায় রাখতে পছন্দ করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ‘ব্লু হাউস’-এর একজন কর্মকর্তা জানান, সি চিন পিংয়ের এই সফরকে কেবল দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হিসেবে দেখছে সিউল। এর সঙ্গে রাশিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে করে তারা।
ব্লু হাউস জানায়, সিউলের প্রত্যাশা হচ্ছে কোরীয় উপদ্বীপের বিভিন্ন সমস্যায় বেইজিং তাদের গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।
২০১২ সালে চীনের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর সি চিন পিং এখন পর্যন্ত একবার উত্তর কোরিয়া এবং দুবার দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেছেন। এর আগে ২০০৮ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি পিয়ংইয়ং সফরে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি উত্তর কোরিয়ার তৎকালীন নেতা এবং কিম জং-উনের বাবা কিম জং–ইলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা একে তিন দেশের কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ হিসেবে মনে করছি না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে হওয়া শীর্ষ বৈঠকের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়েও আমরা নিশ্চিত নই।’
সিউল