যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কাতারে আলোচনার শুরুর প্রাক্কালে ইরানের হরমুজ প্রণালির কাছে কয়েক দফা বিমান হামলা চালিয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা করতে কাতারে গেছে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদল।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা ‘আত্মরক্ষামূলক’ এই হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানি বাহিনীর হুমকি রুখতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। তবে সেন্টকম এই হামলার বিস্তারিত তথ্য বা সুনির্দিষ্ট স্থানের কথা জানায়নি।
অন্যদিকে ইরানের গণমাধ্যম বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের এই শহর হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার (৪২ মাইল) দূরে অবস্থিত।
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর মধ্যেই এই নতুন হামলার ঘটনা ঘটল। যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির বিষয়ে এখনো আশা থাকলেও এটি সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকটের জন্ম দিয়েছে।
গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া মতবিরোধের ‘বড় একটি অংশ’ তারা সমাধান করেছেন। তবে শিগগিরই কোনো চুক্তি হচ্ছে না।
সর্বশেষ হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী বলেছে
সোমবার রাতের শেষ ভাগে আল–জাজিরাকে একটি বিবৃতি দিয়েছেন সেন্টকমের মুখপাত্র নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স। এতে তিনি দাবি করেছেন, ‘হামলার নিশানার মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র। পাশাপাশি মাইন বসানোর চেষ্টায় থাকা ইরানি নৌকাগুলোও আমাদের নিশানায় ছিল।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড সর্বোচ্চ সংযম দেখাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের বাহিনীকে রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানায়নি তারা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে ভারত সফরে আছেন। তিনিও জানিয়েছেন, মাইন বসানোর চেষ্টায় থাকা নৌকা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে এই হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালির কাছে মাইন বসানোর জন্য ইরানের সামরিক বাহিনীকে দুষছে ওয়াশিংটন। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পারাপার হয়।
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জয়পুরে বিমানে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রুবিও। তিনি বলেন, বিশ্বের জ্বালানি চলাচলের অন্যতম প্রধান এই পথটি বর্তমানে ইরানের অঘোষিত অবরোধের মুখে রয়েছে। ‘যেভাবেই হোক’ এই হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে।
কূটনৈতিক দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রুবিও বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে ‘আরও কয়েক দিন লাগতে পারে’। তার এই কথায় দ্রুত সংঘাত অবসানের আশা কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প এতে লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘বেশ ভালোভাবেই’ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে আরও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তিনি লিখেছেন, ‘সবার জন্য একটি দারুণ চুক্তি হতে হবে। তা না হলে কোনো চুক্তিই হবে না।’
মাত্র কয়েক দিন আগেই ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ‘প্রায় চূড়ান্ত’ হয়ে গেছে। এই যুদ্ধ বিশ্ববাজারকে অস্থির করে তুলেছে। জ্বালানি তেলের দামও আকাশ ছুঁয়েছে। তাই ট্রাম্পের ওই ঘোষণায় দ্রুত যুদ্ধ শেষের আশা তৈরি হয়েছিল। এর পরপরই নতুন করে এই উত্তেজনা বাড়ল।
হামলা নিয়ে ইরান কী বলছে
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি যুদ্ধবিমান ও আরেকটি ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে। তবে এ ঘটনা ঠিক কখন ঘটেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি।
আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার ‘বৈধ এবং নিশ্চিত’ অধিকার ইরানের রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণ অঞ্চলের হরমুজগড় প্রদেশে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এই আক্রমণাত্মক ও অন্যায় কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট সব পরিণতির জন্য মার্কিন প্রশাসন দায়ী থাকবে।
মঙ্গলবার হজ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনিও হুমকি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ঢাল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য আর কাজে আসবে না। অশুভ শক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না।

সোমবার ইরানের বার্তা সংস্থাগুলো একটি খবর প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সাহায্যে ‘শত্রুপক্ষের’ একটি স্টিলথ ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান। তবে ড্রোনটি কোথা থেকে এসেছিল, তা তারা উল্লেখ করেনি।
ইরানি কয়েকটি সূত্র আল–জাজিরাকে একটি তথ্য দিয়েছে। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বশেষ হামলার আগেই সমুদ্রে একটি নৌযানকে নিশানা করেছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
সূত্রগুলোর মতে, ওই হামলায় আইআরজিসির বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনায় বেশ অগ্রগতি লাভ করেছে। তবে খুব শিগগির বড় কোনো সমাধানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে তারা।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই বলেন, ‘আলোচনায় থাকা বিষয়গুলোর বড় একটি অংশে আমরা একমত হয়েছি। এটি বলা একেবারেই সঠিক হবে। তবে এর মানে এই নয়, একটি চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এমনটা কেউ দাবি করতে পারবে না।’
তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই আরও জানান, ‘এই মুহূর্তে’ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো পক্ষই আলোচনা করছে না। আপাতত যুদ্ধ থামানোই তাদের মূল লক্ষ্য।
কূটনীতির মাঠে কী ঘটছে
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে আলোচনা ও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা এখনো চলছে।
চার দিনের চীন সফরে রয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সেখানে তিনি ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে রাজি করানো জরুরি। এ জন্য চীনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপ দিচ্ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এই শীর্ষ বৈঠকের আগেই তারা জানায়, বেইজিংয়ের সাহায্যের আর কোনো প্রয়োজন তাদের নেই।
এর আগে সোমবার একটি উচ্চপর্যায়ের ইরানি প্রতিনিধিদল কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছায়। স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে থাকা বাধাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে তাঁরা সেখানে গেছেন। জানা গেছে, এই প্রতিনিধিদলে আছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আরও আছেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, শান্তি আলোচনা ‘বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে’। তবে একটি পোক্ত চুক্তি ছাড়া তিনি অন্য কিছু মেনে নেবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। দোহা সফররত এই প্রতিনিধিদলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোল নাসের হেমমাতিও রয়েছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘সবার জন্য একটি দারুণ চুক্তি হতে হবে। তা না হলে কোনো চুক্তিই হবে না। আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরব, গোলাগুলি চলবে। এবারের আক্রমণ হবে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বড় ও শক্তিশালী। আর কেউই এমনটা চায় না।’
শান্তি আলোচনার সঙ্গে আরেকটি বিষয়জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। তিনি চাইছেন, সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তান আব্রাহাম চুক্তিতে সই করার প্রতিশ্রুতি দিক। মূলত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতেই এই চুক্তির শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন তিনি।
ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘এমন হতে পারে, এক বা দুটি দেশের এটি না করার পেছনে হয়তো কোনো কারণ আছে। সেটি মেনে নেওয়া হবে। তবে ইরানের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক রূপ দিতে বেশির ভাগ দেশেরই প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম হওয়া উচিত।’
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তি সই হয়। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। তবে আরব দেশগুলো জানিয়েছে, ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’-এর আওতায় একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই কেবল তারা ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে।
শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ তাহলে কী
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল–জাজিরার অ্যালান ফিশার খবর পাঠিয়েছেন। তিনি বলছেন, ট্রাম্প চুক্তিতে পৌঁছাতে উদগ্রীব। তবে এই হামলার কারণে যুদ্ধ শেষের চলমান আলোচনা লাইনচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফিশার বলেন, ‘এমন ছোটখাটো আরও বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার ঠিক পরেই। তবে ট্রাম্প তখন জানিয়েছিলেন, এগুলোকে তিনি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে ধরছেন না।’
ফিশার আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খুব সামান্যই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই অভিযানের মাত্রা ঠিক কতটা, তা আমরা জানি না। তাই, এই হামলা আসলেই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা কি না, তা বলা কঠিন।’
আল–জাজিরা