জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা। তাঁদের অনেকেই ভবিষ্যতে দেশের প্রেসিডেন্ট হতে চান। শেষ পর্যন্ত তাঁদের কারও গন্তব্য যদি হোয়াইট হাউস হয়ও, তারপরও একটি উপাধি দাবি করতে পারবেন না—‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’। বিগত এক বছরে তাঁদের জন্য মুক্তি বিশ্বের নেতা হওয়ার হিসাব–নিকাশ অনেক বদলে গেছে।
সম্মেলনে যোগ দেওয়া ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম সিএনএনকে বলেন, সম্মেলনে যেসব নেতার সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন, তাঁরা মনে করেন আটলান্টিক পারের দেশগুলোর জোটের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করা সম্ভব নয়। এসব ক্ষতির পেছনে দায় কার? বলাই বাহুল্য যে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কে অবনতির জন্য অনেকাংশে দায়ী করা হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। তাঁর বক্তব্য ইউরোপের নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে। তা হলো, এখন ‘যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী’ শতাব্দী চলছে। তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। ইউরোপের পরমাণু নিরাপত্তা নিয়ে তিনি ফ্রান্সের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁর ইঙ্গিত হলো—যুক্তরাষ্ট্র সব সময় মিত্রদের পাশে দাঁড়াবে, এমন বিশ্বাস আর ইউরোপের নেই।
দুর্বল হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্র
সপ্তাহান্তের মিউনিখ সম্মেলনের দৃশ্য ছিল প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনের সময়ের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। ম্যাককেইন এই সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ এক মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। ২০১৭ সালে মিউনিখে বায়ারিশার হফ হোটেলে ৫৩তম সম্মেলনের প্রথম দিন বক্তব্য দিয়েছিলেন ম্যাককেইন। এখনো সম্মেলনের প্রথম রাতে ওই হোটেলে ম্যাককেইনের নামে নৈশভোজ হয়।
এবার নৈশভোজে ম্যাককেইনের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন ডেলাওয়ারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস। তবে মূল মঞ্চে ম্যাককেইন নামের কেউ ছিলেন না। জার্মান চ্যান্সেলরের দেওয়া সংবর্ধনায়ও কংগ্রেস সদস্যদের উপস্থিতি ছিল কম। এর অর্থ আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এরপরও বিশ্ব জনমতের বিরুদ্ধে যেতে তোয়াক্কা করছেন না রিপাবলিকানরা।
যেমন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ তিনি। গ্রাহাম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ট্রাম্পকে ইরানে পদক্ষেপ নিতে বলছেন। না হলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাহস বেড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা না বদলায়, তা হবে ভয়াবহ। এর মানে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা যাবে না।
দেশের ভেতরে পরিবর্তন
ট্রাম্পের একের পর এক কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা উন্নতি করছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার কমেছে। এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের কাছে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নিউসম সিএনএনকে বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়বেন। আমার মনে হয় বিশ্বও ধীরে ধীরে এই বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের বেশির ভাগ সদস্য এবার মিউনিখ সম্মেলনে যেতে পারেননি। কারণ, রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল বাতিল করে দেন। এরপরও কয়েকজন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি নিজ উদ্যোগে সম্মেলনে যান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কলোরাডোর প্রতিনিধি জেসন ক্রো। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ক্রো।
সম্মেলনে ক্রো ইউরোপীয় নেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিলেন যে ট্রাম্পের হাত থেকে অন্তত কিছু ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ডেমোক্র্যাটরা প্রস্তুত। তিনি এই সতর্কবার্তাও দেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ক্রো বলেন, যদিও এই ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ সমাজের প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইউরোপের নেতারাও মার্কিন জনগণের মতোই একই ধাক্কার মুখে পড়েছেন। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়াকে একটি ব্যতিক্রম মনে করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু ট্রাম্পের আবার নির্বাচিত হওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে তাঁর আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান ইউরোপের সে ভুল ভাঙিয়েছে। ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ধ্বংসের পথে। এটি এখন আগের রূপে নেই।
সিএনএন