পিয়েরলুইজি কোলিনা। নামটা শুনলেই কারও কারও মুখটা মনে পড়তে পারে। মুণ্ডিত মস্তক, নীল চোখের শীতল দৃষ্টি, হাতে বাঁশি। ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস’–এর (আইএফএফএইচএস) বিবেচনায় টানা ছয়বার (১৯৯৮-২০০৩) ‘বিশ্বের সেরা রেফারি’ কোলিনা এখন সাবেক, তাই মাঠে আর তাঁকে বাঁশি বাজাতে দেখা যায় না।

তবে ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৬৬ বছর বয়সী কোলিনা। বিশ্বকাপ চলাকালে ফিফাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এই ইতালিয়ান। আজ সেই সাক্ষাৎকার ফিফার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বিশ্বকাপে রেফারিং বিতর্ক নিয়ে কথা বলেছেন কোলিনা। শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে রেফারিং নিয়ে যেসব বিতর্ক উঠেছে, সেসবের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কোলিনা।

প্রশ্ন: শেষ ষোলো শেষ হয়েছে। ফিফা বিশ্বকাপে আমরা ৯৬টি ম্যাচ দেখে ফেললাম। সব মিলিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

কোলিনা: শুরুতেই বলা ভালো, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় আমরা ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ ম্যাচ বেশি খেলেছি। এখনো সামনে আটটি বড় ম্যাচ বাকি।

সামগ্রিকভাবে আমরা সন্তুষ্ট। তবে তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি ম্যাচ হওয়ার কারণে কিছু বিষয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়াই স্বাভাবিক। তবে যখনই এমন হয়, পরের ম্যাচের জন্য নিজেদের শতভাগ প্রস্তুত করতে তারা (রেফারি) আরও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা নিয়েই মাঠে নামে।

আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের কাছ থেকে মিসরের মিডফিল্ডার মারওয়ান আত্তিয়ার বল কেড়ে নেওয়ার এ মুহূর্ত নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক
আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের কাছ থেকে মিসরের মিডফিল্ডার মারওয়ান আত্তিয়ার বল কেড়ে নেওয়ার এ মুহূর্ত নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক, এএফপি
 

অবশ্যই ম্যাচসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা সব সময়ই ফুটবলের অংশ থাকবে, কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগের কোনো জায়গা এই খেলায় নেই। ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ অফিশিয়ালদের সততা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। এমনটি করা হলে তা তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা ঠিক নয়।

একইভাবে, কেউ দাবি করতে পারবেন না যে ফিফার রেফারিং কারও দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, এমনকি ফিফা সভাপতি দ্বারাও নয়। পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে আমাদের ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি তিনি সব সময় ফিফা টিম ওয়ানের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন বজায় রেখেছেন। ম্যাচ অফিশিয়ালরা সততার সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন এবং খেলোয়াড় ও কোচদের মতো তাঁরাও সব সময় নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

প্রশ্ন: নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের ওপর কি জোর দিচ্ছেন?

কোলিনা: সাধারণত কোনো প্রতিযোগিতা চলাকালে আমরা সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করি না। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা প্রতিপক্ষের গোলকিপারকে নড়াচড়া করতে বা গোল রক্ষা করতে বাধা দিলে, ম্যাচ অফিশিয়ালরা কী দেখেন, সে বিষয়টি সম্প্রতি আমরা স্পষ্ট করেছি। এর ধারাবাহিকতায় এখন আমরা আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, যা নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

রেফারিং ও ভিএআর নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়েছে আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচ
রেফারিং ও ভিএআর নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়েছে আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচ, এএফপি
 

প্রতিটি গোল হওয়ার পর ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিআর) ‘অ্যাটাকিং পজিশন ফেজ’ (এপিপি) বা আক্রমণের শুরুর দিকটি পরীক্ষা করে দেখেন। গোলটি হওয়ার পেছনের প্রক্রিয়ায় বা বিল্ডআপে যদি কোনো ফাউল শনাক্ত হয় এবং সেটি যদি গোলের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়, তবে ভিএআর মাঠের রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউ (ভিডিওতে পুনরায় দেখার) করার পরামর্শ দেন। ফাউলের ঘটনাটি গোলপোস্ট থেকে কত দূরত্বে ঘটেছে বা ঘটনার কতক্ষণ পর গোল হয়েছে, সেটির কোনো নির্দিষ্ট সময় বা দূরত্বের সীমা নেই। এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেছে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে। সেখানে মিসরের ১৯ নম্বর জার্সির খেলোয়াড় মারওয়ান আত্তিয়া স্পষ্টভাবেই আর্জেন্টিনার ৬ নম্বর জার্সিধারী লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে পাড়া দিয়েছিলেন।

আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—ফাউল মানে ফাউল। মাঠের রেফারি সেটি দেখতে পাননি বলে ঘটনাটি যদি ‘স্পষ্ট’ মনে না–ও হয়, তাহলেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিআর) এতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন।

পিয়েরলুইজি কোলিনা। যখন রেফারি ছিলেন
পিয়েরলুইজি কোলিনা। যখন রেফারি ছিলেন ফেসবুক
 

একইভাবে, গোল হওয়ার আগের প্রক্রিয়ায় বা বিল্ডআপে যদি কোনো ফাউল না পাওয়া যায়, তবে ভিএআর রেফারিকে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের পায়ে পাড়া দেওয়া নিশ্চিতভাবেই ফাউল। পাশাপাশি কোনো ডিফেন্ডার যদি আগে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং এরপর প্রতিপক্ষের সঙ্গে স্বাভাবিক কোনো শারীরিক সংঘর্ষ হয়, তবে সেটিকে ফাউল ধরা হয় না। (আর্জেন্টিনা-মিসর) একই ম্যাচে শেষ দিকে এর একটি উদাহরণ দেখা গেছে। মিসরের ১০ নম্বর জার্সিধারী মোহাম্মদ সালাহ এবং আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিধারী (৯ নম্বর জার্সি) হুলিয়ান আলভারেজের মধ্যকার তেমনই একটি ঘটনাকে রেফারি ও ভিএআর ফুটবলে স্বাভাবিক শারীরিক সংঘর্ষ হিসেবেই গণ্য করেছেন।

অবশ্য কিছু কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যাখ্যার সুযোগ সব সময়ই থাকবে। তবে টুর্নামেন্টজুড়ে এ নিয়ম যেভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব