বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের রদবদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে নতুন পররাষ্ট্রসচিব নিয়োগের পাশাপাশি নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি, দিল্লি ও লন্ডনে হাইকমিশনার এবং জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি পদে নতুন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে নিউইয়র্ক ও লন্ডনে নিয়োগ হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়।
সরকারের একজন নীতিনির্ধারক গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসব পরিবর্তনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া চার রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেয়; পাশাপাশি গত তিন মাসে পাঁচটি দেশে চারজন পেশাদার কূটনীতিক এবং একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগ দিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রসচিব পদে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দীন নোমান চৌধুরীকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর বর্তমান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে দিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। এই মুহূর্তে জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি নাহিদা সোবহানকে ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর হিসেবে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম ২০২৫ সালের ২০ জুন পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে মো. জসীম উদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত হন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত জসীম উদ্দিনকে পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ৯ মাসের মাথায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে পররাষ্ট্রসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
সরকার নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ের ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পরবর্তী অধিবেশনের আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব আইরিন খান নিউইয়র্কে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন।
নতুন পররাষ্ট্রসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোতে পরিবর্তন কবে কার্যকর হবে জানতে চাইলে সরকারের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ রদবদলের একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের দায়িত্ব গ্রহণের সময়সূচির সঙ্গে অন্য নিয়োগগুলোর কার্যকারিতা সমন্বয় করা হতে পারে।
গত মার্চ মাস থেকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের পদটি খালি আছে। লন্ডনে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সরকার ফরেন সার্ভিস একাডেমির বর্তমান রেক্টর ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুল মুহিতকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানা গেছে, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ মিশনে উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান (এপেলো)।
পাঁচ দেশে নতুন নিয়োগ পেলেন যাঁরা
সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (আন্ত সরকারি সংস্থাসমূহ) এম ফরহাদুল ইসলামকে মরিশাসে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি জকি আহাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন। সরকার এরই মধ্যে জকি আহাদকে ডেনমার্কে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত তিনটি দেশে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়েছে। জকি আহাদ ছাড়া নতুন নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রদূতেরা হলেন আয়ারল্যান্ডে নুর-ই আলম এবং আর্জেন্টিনায় এ এফ এম জাহিদুল ইসলাম। এ ছাড়া পর্তুগালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সাবেক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর ও ইরান দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের পদ খালি রয়েছে।
মালদ্বীপে রয়ে গেছেন নাজমুল ইসলাম
বিএনপি সরকার গঠনের পর মার্চের শুরুতে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূতদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক আদেশে পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত যথাক্রমে এম মাহফুজুল হক, মো. ময়নুল ইসলাম, এম মুশফিকুল ফজল (আনসারী) ও মো. নাজমুল ইসলামকে ঢাকায় ফিরে আসার নির্দেশ দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ওই চার রাষ্ট্রদূতের মধ্যে তিনজন সরকারের আদেশ মেনে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম দেশে ফেরেননি। তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে এখনো কর্মস্থলে রয়ে গেছেন।
রাহীদ এজাজ
ঢাকা