ফুটবল মানুষের স্বপ্ন, আবেগ আর অসম্ভবকে ছুঁয়ে দেখার গল্প। সেই গল্পে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো বিরল ব্যতিক্রম। একদিকে রেকর্ডের রাজা, অন্যদিকে কঠোর পরিশ্রমের প্রতীক।
১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালের আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপ মাদেইরার ফুঞ্চালে জন্ম নেন ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো দোস সান্তোস আভেইরো। চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন তিনি। সংসারের আর্থিক অবস্থা ছিল সীমিত। বাবা জোসে দিনিস আভেইরো স্থানীয় একটি ক্লাবে কিটম্যান হিসেবে কাজ করতেন। মা মারিয়া দোলোরেস সংসার সামলানোর পাশাপাশি অন্যের বাড়িতেও কাজ করেছেন। ছোটবেলায় বিলাসিতা নয়, সংগ্রামই ছিল রোনাল্ডোর সবচেয়ে বড় শিক্ষক। সেই সংগ্রামই তাকে শিখিয়েছে জিততে হলে লড়াই করতে হয়।
ফুটবলের সঙ্গে তার পরিচয় খুব ছোট বয়সেই। স্থানীয় ক্লাব আন্দোরিনহায় প্রথম বল পায়ে জাদু দেখাতে শুরু করেন। এরপর নাসিওনাল হয়ে চলে যান স্পোর্টিং লিসবনের বিখ্যাত একাডেমিতে। মাত্র ১২ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে রাজধানীতে চলে যাওয়াটাই পরবর্তীতে বদলে দেয় তার জীবন।
২০০৩ সালে স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচই ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই ম্যাচে তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে কিংবদন্তি কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ইউনাইটেডে নিয়ে আসেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিজেকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেন, রিয়াল মাদ্রিদে পৌঁছে কিংবদন্তির মর্যাদা পান, জুভেন্টাসে নতুন ইতিহাস লেখেন, আবার ইউনাইটেডে ফিরে আবেগের অধ্যায় রচনা করেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিলেন দুরন্ত গতির উইঙ্গার। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে পরিণত করেন নিখুঁত স্ট্রাইকারে। বাম পা, ডান পা, হেড, দূরপাল্লার শট কিংবা পেনাল্টিতে ছিলেন সমান ভয়ংকর। বয়স বাড়লেও নিজের খেলাকে বদলে নিয়ে কীভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকতে হয়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণও তিনি।
রোনাল্ডোর ক্যারিয়ার সাফল্যে ভরা। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালির লিগ শিরোপাসহ অসংখ্য ট্রফি তার অর্জনের ঝুলিতে। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা । ৯০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা প্রথম ফুটবলার হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন।
পর্তুগালের জাতীয় দলের ইতিহাসও রোনাল্ডোকে ঘিরেই নতুন রূপ পেয়েছে। তিনি এনে দিয়েছেন ২০১৬ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম শিরোপা। পরে উয়েফা নেশনস লিগও জিতেছে তার নেতৃত্বে। দেশের জার্সিতে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও সর্বোচ্চ গোল দুটি রেকর্ডই তার দখলে।
চলতি বিশ্বকাপে বয়স তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। রোনাল্ডো দেখিয়ে দিয়েছেন, কিংবদন্তিরা শেষ হওয়ার আগে শেষ কথা নিজেরাই বলেন। গ্রুপ পর্বে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে গোল করে যাত্রা শুরু করেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষেও জালের দেখা পান। শেষ বত্রিশে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে পর্তুগালকে কোয়ার্টার ফাইনালের পথে এগিয়ে দেন।
ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, ভিতিনিয়া ও রাফায়েল লেয়াওদের সঙ্গে তার বোঝাপড়া পর্তুগালের আক্রমণকে আরও ভয়ংকর করেছে।
পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেছেন, ‘ক্রিস্টিয়ানো পুরো দলের মানসিক শক্তি। প্রতিদিন তার অনুশীলন অন্যদের অনুপ্রাণিত করে। বয়স তার ক্ষেত্রে শুধু একটি সংখ্যা।’
সতীর্থ ব্রুনো ফার্নান্দেস বলেন, ‘আমরা এমন একজন অধিনায়কের সঙ্গে খেলি, যিনি প্রতিদিন নতুন করে জিততে শেখান। তার পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাস পুরো দলকে বদলে দেয়।’
ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচও তার প্রশংসা করে বলেছেন, ‘রোনাল্ডোর বিপক্ষে খেলতে নামলে কখনো নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। এত বছর পরও তিনি এক মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।’
মাঠের বাইরেও রোনাল্ডো এক বৈশ্বিক আইকন। ‘সিআর৭’ এখন শুধু একটি নাম নয়, একটি সফল ব্র্যান্ড। পোশাক, জুতা, সুগন্ধি, হোটেল, ফিটনেসসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদদের একজন হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার প্রভাব বিস্ময়কর। বছরের পর বছর বিশ্বের সর্বোচ্চ আয় করা ক্রীড়াবিদদের তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
রোনাল্ডো একজন ফুটবলার নন, লক্ষ-কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। একদিন হয়তো তার রেকর্ডও ভাঙবে। নতুন কেউ গোলের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। এই মানুষটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে আলোকিত করেছেন। প্রতিটি প্রজন্মকে শিখিয়েছেন স্বপ্নের পেছনে কীভাবে ছুটতে হয়, তাকে ইতিহাস কখনও হারিয়ে যেতে দেবে না। ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো এক অবিনশ্বর অধ্যায়ের নাম।
মোজাম্মেল হক চঞ্চল