মহাবিশ্বে প্রতিটি বস্তুর নাকি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে। আমার লক্ষ্যটা এত দিনে আমি বুঝে গেছি। সেই গল্প আর একটি ইচ্ছার কথা আজ বলতে এসেছি তোমাদের কাছে।
মানুষ আমাকে বানিয়েছে নিজের লক্ষ্যপূরণের জন্য, সেটা করতে করতে আমি যেন এখন অক্ষয়, অমর, অজর! ঝড়ে, ভূমিকম্পে ধসে পড়তে পারি, কিন্তু আমার নাম-পরিচয় বিনে ফুটবলের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। আমি এস্তাদিও বানোর্তে।
কোঁচকানো ভ্রু দেখে বেশ হাসি পাচ্ছে। এই নামে কাউকে মনে পড়ছে না? আমারও না, বুঝলে। আমার আদি নাম-পরিচয় বললে তো চিনেই ফেলবে, তাই নতুন নামটা বলে একটু মজা করলাম।
বিশ্বকাপের জন্য আমাকে সাজানোর খরচ তুলতে, তোমরা আমার জন্মগত নাম-পরিচয় বেচে নতুন এই নামটা রেখেছ। তবে বিশ্বকাপে আবার অন্য নিয়ম; আমাকে এই নতুন নামে ডাকা যাবে না। ফিফার কড়া নির্দেশ—বলতে হবে, মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম।
তবে আমার নাম বদলানোয় লোকের কিছুমাত্র অসুবিধা হয়নি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ডাকে জন্মগত নামেই। আজতেকা! লোকে বলে, আমার সবুজ বুকে যে সবচেয়ে সুন্দর ছবিটি আঁকতে পারে, অমরত্ব তাঁর অবধারিত।
আর আমি শুধু জানি, কালে কালে বিভিন্ন গল্পে-ঘটনায় আমি হয়ে উঠেছি এক রহস্যঘেরা ‘মিথ’ কিংবা সামান্য একটা স্টেডিয়াম নামের ‘কলোসাস অব সান্তা উরসুলা’। কালোমতো সেই ব্রাজিলিয়ান যেখানে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘আজতেকার কিছু একটা ব্যাপার আছে। খুব বিশেষ কিছু; ভেতরে পা রাখলে বোঝা যায়। অন্য কোথাও এমন লাগে না।’
ফুটবল–ইতিহাসে তর্ক সাপেক্ষে সেরা এবং প্রায় একই রকম দুটি ছবি কিন্তু আমারই বুকে তোলা।
এক. সতীর্থের কাঁধে হাস্যোজ্জ্বল খালি গায়ের সেই কালো ব্রাজিলিয়ান। দুই. রোবের্তো চেজাস নামের এক সমর্থকের কাঁধে সাদা চামড়ার আর্জেন্টাইন, হাতে বিশ্বকাপ। ছবির মানুষ দুটি তোমাদের বড় আবেগের জায়গা, আপনার চেয়েও আপন মানুষ। তবু বলি, প্রথম ছবিটি পেলের। পরেরটি ডিয়েগো ম্যারাডোনার।

সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের তর্কটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল তাঁদের মধ্যে। এটা যদি অমরত্ব হয়, তবে তাঁদের সেই বর প্রাপ্তির পুণ্যভূমি ছিলাম আমি—এস্তাদিও আজতেকা। বড়াই নয়, এ আমার বড় গর্বের, বড় তৃপ্তির কথা। ’৭০ বিশ্বকাপের ব্রাজিলে আমার জন্মের লক্ষ্যপূরণ, ’৮৬–এর ম্যারাডোনায় পূর্ণতা।
একটি গল্প বলি, তৃতীয় শতকে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে বর্তমান সান্তা উরসুলার বিশাল জায়গাজুড়ে পাথুরে লাভাভূমি তৈরি হয়েছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ২০০ ফুট ওপরে ওটাই আমার আর্বিভাবের জায়গা।
১৯৬১ সালে আমাকে বানানো এত সহজ ছিল না। এক বছর সময় নিয়ে ৬৪ হাজার বর্গমিটার জায়গা থেকে শুধু ১৮ কোটি কেজি পাথরই সরাতে হয় ৮০০ শ্রমিক, ৩৫ প্রকৌশলী ও ১০ স্থাপত্যবিদের সহায়তায়। জায়গাটা কয়োকান অঞ্চল, মেক্সিকানদের পূর্বপুরুষ আজতেক সভ্যতার প্রত্নতত্ত্বও পাওয়া গিয়েছিল আমাকে তৈরির সময়।
সেই ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে ’৭০ বিশ্বকাপ যখন শুরু হলো, তখনো আমি ইতিহাসের অংশ। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে প্রথম বিশ্বকাপ। আর মাঠে জন্ম হলো বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা সব গল্পের। শতাব্দীর সেরা ম্যাচ, সব রাউন্ডেই জর্জিনিওর গোল, কার্লোস আলবার্তোর অনিন্দ্যসুন্দর গোল…। সব ছাপিয়ে গিয়েছিল ‘বিউটিফুল টিম’ ব্রাজিল, পেলে তার শীর্ষবিন্দু।
আমার বুকেই ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ খেলে তৃতীয় বিশ্বকাপ জিতে পেলের অমরত্ব প্রাপ্তি। ফাইনালে খেলা ইতালিয়ান ফরোয়ার্ড অ্যাঞ্জেলো ডোমেনগিনির ভাষায়, ‘আ থিং অব বিউটি।’ সঙ্গে অমর কবি জন কিটসের বাকিটা জুড়ে দিলেই ফুটে ওঠে ’৭০ বিশ্বকাপের রূপ, ‘আ জয় ফরএভার।’
তবু আজ এত বছর পর মনে হয়, আমি আসলে মানুষের প্রয়োজনে ভাগ্যের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্য-মিথের ভারে ন্যুব্জ এক ‘থিয়েটার অব ইমর্টালিটি’।
’৮৬ বিশ্বকাপ আয়োজনে কলম্বিয়ার অপারগতা প্রকাশের পর ফিফাকে ফিরতে হয় আমার কোলে। ম্যারাডোনা কোয়ার্টার ফাইনালে ১১ সেকেন্ডের এমন এক দৌড় দিল, পেছনে ইংল্যান্ডের নয়জন, সামনে ‘শতাব্দীর সেরা গোল।’
৪ মিনিট পর আরও একটি, এবার ‘হ্যান্ড অব গড’—যেন অনিন্দ্যসুন্দর আর নিষিদ্ধ ‘গন্ধম’ পাশাপাশি! যেমনটা মেক্সিকান ওয়েভের বৈশ্বিক পরিচিতি, নেগ্রেতোর সিজর্স কিকের গোলে ফুটবল ইতিহাসে ‘কানে তালা লেগে যাওয়া মুহূর্ত’—সবই সেবার অমরত্ব পেয়েছে এই বুকে। কিন্তু ম্যারাডোনার মতো কেউ আদায় করে নিতে পারেনি।
’৭০ পূর্ণ বিকশিত পেলের প্রাপ্য ছিল। জর্জিনিও, তোস্তাও, রিভেলিনো, গারসনদের সেই ব্রাজিল ছিল তারকাখচিত। ’৮৬–এর আর্জেন্টিনা তেমন ছিল না। সাদামাটা একটি দল নিয়ে মানুষের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে ম্যারাডোনা সেবার হয়ে উঠেছিলেন ‘এল পিবে’ (সোনার ছেলে)।

২৯ জুন ১৯৮৬। ম্যারাডোনার অমরত্ব আদায়ের সেই ম্যাচই আমার বুকে শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। এবার আবারও ডাক পড়েছে নতুন কোনো গল্প, রূপকথার জন্ম দিতে। কিন্তু আমার মনে বেজায় দুঃখ। আমার ইচ্ছাটা হয়তো পূরণ হবে না!
বড় সাধ ছিল, লিওনেল মেসির অমরত্ব পূর্ণতা পাক আমার বুকে।
হেসো না। ভাবছ, সেটা তো ২০২২ সালেই নিশ্চিত হয়েছে, নতুন করে দেওয়ার কী আছে! আচ্ছা, কাতারে কয়টি স্টেডিয়াম ছিল যেটা ইতিহাস-ঐতিহ্যে আমার সমান? বড়াই নয়, এটা বাস্তবতা। অমরত্বের নীলপদ্মটি হয়তো তাঁর আছে, কিন্তু সেটার যোগ্য মঞ্চ কি ছিল? এবারও কি আছে? কেউ ভাবেনি, আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচ আমার বুকে রাখলে কী এমন হতো! পেলে, ম্যারাডোনা তারপর মেসি ধাঁধাটা মিলে যেত কী!
অবশ্য মানুষ ভাববে কেন, আমি তো তাদের কেউ না, আমি যে স্রেফ এক নিশ্চল ও জড় স্টেডিয়াম!
মেহেদী হাসান