• Colors: Purple Color

দেশে ফিরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিমানবন্দরের লবিতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

ভিডিওতে দেখা যায়, আলাপকালে প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন তারেক রহমান। এছাড়া, প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদও জানান তিনি।

তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টাকে বলেন, নিরাপত্তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আমার নিরাপত্তার জন্য। এর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষায় রয়েছি।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় ফজরের ঠিক পরে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। আমরা তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সকলের নিকট তার বিদেহী আত্মার জন্য দোয়া চাচ্ছি।

গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। শৈশবে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি ফার্স্ট লেডি হিসেবে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর দলের সংকটময় মুহূর্তে তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

আশির দশকে তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। আপসহীন সংগ্রামের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এই দীর্ঘ আন্দোলনে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করেন এবং স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার দৃঢ় ঘোষণা দেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক ও গৃহবন্দী করা হয়েছিল।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার সময়েই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শিক্ষা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন; যার মধ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত করেন।

১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলেও তিনি ১১৬টি আসন নিয়ে সংসদে বৃহত্তম বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি চারদলীয় জোট গঠন করেন এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে যে কয়টি আসনে দাঁড়িয়েছেন, তার সবকটিতেই জয়লাভ করেছেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্রের প্রতি তার অবদানের জন্য তাঁকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে ভূষিত করে।

২০১৮ সালে একটি বিতর্কিত মামলার রায়ে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে একে একে সব মামলায় খালাস পান বিএনপি চেয়ারপারসন।

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।

এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে জাতি তার এক মহান অভিভাবককে হারাল। তার মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার অবদান, তার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং তার প্রতি জনগণের আবেগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার চলতি মাসে তাকে রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার আপসহীন নেতৃত্বের ফলে গণতন্ত্রহীন অবস্থা থেকে জাতি বারবার মুক্ত হয়েছে, মুক্তির অনুপ্রেরণা পেয়েছে। দেশ ও জাতির প্রতি তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও জাতির কল্যাণে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, গণমুখী নেতৃত্ব এবং দৃঢ় মনোবল সব সময় পথ দেখিয়েছে। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত রাজনীতিককে হারাল।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি’র চেয়ারপারসন, যিনি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান, বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মাঠে আসা বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব স্বৈরশাসক এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের দুঃশাসনের পতন ঘটাতে প্রধান ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার বহু কর্ম ও সিদ্ধান্ত দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। তিনি মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করেন, যা বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বলেন, রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া ভীষণভাবে সফল ছিলেন। তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে তিনি পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, সেখানেই তিনি জয়লাভ করেছিলেন।

১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর অর্থনৈতিক উদারীকরণের মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতির একটি মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেন।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সংগ্রাম ও প্রতিরোধের এক অনন্য প্রতীক। তার আপসহীন ভূমিকা দীর্ঘ  লড়াই-সংগ্রামে জাতিকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক সাফল্যের কারণেই বেগম খালেদা জিয়া চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন। মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন কারাবাস করতে হয়েছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টা তার শোকসন্তপ্ত পরিবার ও দলের নেতাকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। জাতির এই অপূরণীয় ক্ষতির দিনে তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার ও ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং যার যার অবস্থান থেকে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করার অনুরোধ করেছেন।

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বুধবার বাদ জোহর সদ্যপ্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) গণমাধ্যমকে তিনি এ কথা জানান।

সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, জানাজার পর শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে তার স্বামী এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হতে পারে। 

উল্লেখ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে জানানো হয়, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায়, ফজরের নামাজের ঠিক পরে ইন্তেকাল করেছেন। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সবার কাছে দোয়া চাইছি।’

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। এ সময় হাসপাতালে তার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের নিকটাত্মীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

ঘর ছেড়ে এলেন রাজপথে। আপসকে দূরে টেলে দিয়ে বেছে নিলেন সংগ্রাম। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর জনসমাবেশ ছড়িয়ে দিলেন সারাদেশে। তারপর জনতার রায়ে গেলেন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পাশে সংসদ ভবনে। সেখানে থেকে বিশ্ব দরবারে নিজেকে চেনানোর প্রচেষ্টা। সরকার ছেড়ে বিরোধী দল, বিরোধী দল থেকে আবার সরকারে।

তারপর ষড়যন্ত্র, এক-এগারো। আশির দশকের সংগ্রাম আবার শুরু... পথ চলায় হারায় বাড়ি-ঘর, ছোট ছেলেকে।

কারাগারে গিয়ে ধীরে ধীরে শরীরে দানা বাঁধতে শুরু করলো রোগ। কিন্তু তার যে আপসহীন ভূমিকা, মাথা নোয়াবার নয়! তাই তো নিজের পথে ছিলেন অবিচল, করেননি আপস। আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

তবে শরীর যে মানে না! লড়াই চালিয়ে যান নিজের সাথে। পরিবার, দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সুস্থ করে তোলার।

চলতি বছরের একদম শুরুতেই গেলেন বিলেতে। চিকিৎসা নিয়ে সেখানে থাকতে পারতেন পরিবারের সান্নিধ্যে। কিন্তু দেশকেই বেছে নিলেন। একাই থাকবেন, তবুও দেশের মাটিতে।

দেশে ফেরার পথে হিথ্রো বিমানবন্দরে নেতাকর্মীদের বলেছিলেন, ভাইয়াকে (তারেক রহমান) দেখে রাখতে।

বারবার বলছিলেন, ছেলে তারেক রহমানকে দেখে রাখতে। এ যেন তিনি বুঝতে পারছিলেন, সময় ফুরিয়ে আসছে, নিজে আর ছেলেকে আগলে রাখতে পারবেন না। দলের নেতাকর্মীদেরকেই দিলেন সেই দায়িত্ব।

এই অনুরোধ করে ফিরলেন দেশে। কারণ, তিনি তো জাতিকে বলেছিলেন, 'আমি দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যাব না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। দেশের বাইরে আমার কিছু নেই, কোনো ঠিকানাও নেই।'

এক-এগারো থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে খালেদা জিয়া তার কথা রেখেছেন। এমনকি দেশে ফ্যাসিস্টমুক্ত হওয়ার পরেও। সুযোগ ছিল বিদেশে গিয়ে জীবন কাটানোর, কিন্তু সেই পথ বেছে নেননি। গোটা দেশ দেখলো তা। জাতিও বিনিময়ে ভালোবাসা দিতে ভোলেননি।

খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায়ে সারাদেশ থেকে ছুটে আসে মানুষ। সংসদ ভবন এলাকা পেরিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে শাহবাগ-বিজয় সরণি-আগারগাঁও-শ্যামলী-নিউমার্কেট এলাকা পৌঁছে যায় জনতার স্রোত।

জানাজাস্থল থেকে যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে মানুষ আর মানুষ।

জীবনের শেষ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা খালেদা জিয়া যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপাসনের পরিচয় ছাপিয়ে গেছেন, তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় মানুষের এই জনস্রোত। একজন রাজনীতিবিদের জীবন কতটা বর্ণাঢ্য হলে এতটা ভালোবাসা মেলে, তার উত্তর উপস্থিত মানুষের মাঝেই রয়েছে। তাদের অনেকেরই চোখ ছিল অশ্রুসজল। 

বাংলাদেশের নেতা খালেদা জিয়াকে স্বয়ং প্রকৃতিও বিদায় জানিয়েছে। গেলো কয়েকদিনের কনকনে ঠান্ডা দূর করে মিষ্টি রোদ ওঠে নগরীতে। তাতে কিছুটা স্বস্তি পায় আগত জনতা।

জনতার এই স্রোত থামেনি দুপুর দুইটায়-ও, যে সময় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ কারণে জানাজা শুরু হতে বিলম্বও হয় কিছুটা।

ঘড়ির কাটায় যখন ২টা ৪৫ মিনিট, জানাজাস্থলে খালেদা জিয়ার কফিন পৌঁছায়। কফিনজুড়ে ছিল বাংলাদেশের পতাকা। তার আগে হাসপাতাল থেকে গুলশানে তারেক রহমানের বাসা, সেখান থেকে সংসদ ভবন এলাকায় রাষ্ট্রীয় প্রোটকলে লাল-সবুজ রঙের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ফ্রিজার ভ্যানে করে তার মরদেহ আনা হয়।

কফিন পৌঁছার পর দলের পক্ষ থেকে শুরুতে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি তার বক্তব্যে খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের গল্প তুলে ধরেন।

এরপর ২টা ৫৮ মিনিটে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলেন তারেক রহমান। মা হারানো তারেক স্বাভাবিকভাবেই ছিলেন আবেগাপ্লুত, শোকে মূহ্যমান। তিনি কোনও ধরনের ভূমিকায় যাননি বক্তৃতায়।

স্বজন হারিয়ে বাংলার আট-দশটি সাধারণ পরিবারের সন্তানের মতোই শোনা গেলো তার কণ্ঠ।

‘আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। এখানে উপস্থিত সকল ভাই ও বোনেরা, মরহুমা যদি কারও কাছ থেকে কোনও ঋণ নিয়ে থাকেন, তাহলে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন, আমি পরিশোধ করব ইনশাআল্লাহ।

খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালীন উনার কোনও ব্যবহারে অথবা কোনও কথায় কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে তার পক্ষ থেকে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তার জন্য দোয়া করবেন।’

এরপর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেকের ইমামতিতে জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়।

লাখ-লাখ মানুষের এই জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শোক জানানোর পাশাপাশি শোকার্ত পরিবারকে সহমর্মিতা জানাতে ঢাকায় ছুটে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুংগেল এবং মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ড. মোহাম্মদ মুইজ্জুর বিশেষ দূত ও দেশটির উচ্চশিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ড. আলী হায়দার আহমেদ।

দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের উপস্থিতিই বলে দেয়, খালেদা জিয়া বিএনপির নেত্রী নন, এই জাতি-রাষ্ট্রেরই নেতা।

জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জিয়া উদ্যানে। সেখানে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এরপর তোপধ্বনির মাধ্যমে গান স্যালুট প্রদর্শন করে সম্মাননা জানানো হয়। সরকার, তিন বাহিনীর প্রধানরাও শ্রদ্ধা জানান।

নিরাপত্তাজনিত কারণে সমাধিস্থলে সীমিত সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল। তবে বাইরে অনেক মানুষ অপেক্ষা করছিলেন ফেরার সময় কবর জেয়ারত করে যেতে। বাংলার এই মানুষ বলে দিচ্ছেন খালেদা জিয়া অমর হয়ে থাকবেন তাদের মানসপটে। তিনি থাকবেন বাংলার ধানের শীষে মিশে। যেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা, রাজনৈতিক সংগ্রামের গল্প, দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাওয়ের স্লোগান।

বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মরদেহের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গুলশান অ্যাভিনিউয়ে ১৯৬ নম্বর বাসায় দলের নেতাকর্মী ও স্বজনরা খালেদা জিয়াকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকাল ৯টার আগে বাংলাদেশের পতাকায় মোড়ানো একটি গাড়িতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানের উদ্দেশ্যে বের করা হয় তার মরদেহ। 

পরে নেয়া হয় গুলশানের তারেক রহমানের বাসায়। সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন তার কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।

উল্লেখ্য, দুপুর ২টায়  জাতীয় সংসদ ভবন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হবে। নামাজে জানাজা পড়াবেন জাতীয় মসজিদের খতিব। এরপর সাড়ে তিনটার দিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রয়াত স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন অনুষ্ঠানে সাধারণ জনগণের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে জানাজা ও দাফনস্থলে কোনো ব্যাগ বা ভারী সামগ্রী বহন না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব