উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে ব্যাংক খাতের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ। ২০২৫ সালের শেষে যা ছাড়িয়েছে ১০ লাখ কোটি টাকা। মূলধন পর্যাপ্ততাও ঋণাত্মক। এর ফলে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে ব্যাংক খাত। এটিকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন ব্যাংকার ও বিশ্লেষকরা। তাদের অভিমত, পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সংকটময় এ অবস্থার জন্য তারা বাংলাদেশ ব্যাংককেও দায়ী করছেন।

দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নানা উপায়ে লুটপাট হয়েছে ব্যাংক খাতে। আদায় করতে না পারায় এসব ঋণ পরিণত হয়েছে খেলাপি ঋণে। প্রকৃত চিত্র আড়াল করতেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেরিয়ে আসতে থাকে ব্যাংক খাতের দুর্দশার চিত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেড়েছে সংকটের গভীরতা।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ কোটি টাকার ওপরে। আর অবলোপন করা ঋণ যুক্ত করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের সক্ষমতাও হারিয়েছে অনেক ব্যাংক। এর প্রভাব পড়ছে মূলধনের ওপর। ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে পুরো ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততাও এখন ঋণাত্মক। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন ব্যাংকাররাও।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ব্যাংককে সহজ সুবিধা দিয়েছে। এসব সুবিধা না থাকলে অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অবস্থা আরও খারাপ হতো।

তিনি আরও বলেন, অনেক ব্যাংকের ৩৫ শতাংশেরও বেশি সম্পদ থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। অর্থাৎ ব্যাংকের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পদ অলাভজনক হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো খুব কঠিন, কারণ নতুন আয় দিয়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সহজ নয়।

উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের আয় কমেছে। ফলে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে খাতটি। গত বছর শেষে ব্যাংক খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় সংকট বেড়েছে। এর দায় বাংলাদেশ ব্যাংকও এড়াতে পারে না।

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বাড়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও কম দায়ী নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার শ্রেনীকৃত ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিচ্ছে, নানা ধরনের ছাড় দিচ্ছে এবং ডাউন পেমেন্ট কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ফলে ঋণ আদায়ে শৃঙ্খলা কমছে এবং সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় বিশ্বের অনেক বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণসুবিধা বন্ধ করে দিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের ব্যাংকগুলোর এলসি গ্রহণ করতেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা জরুরি। অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেশাদারিত্বেও ঘাটতি ছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির ভেতরেও সুশাসনের অভাব দেখা গেছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয় ভুলে যেতে পারি না।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূলধন ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের জন্য হতাশাজনক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রক্ষণশীল নীতির কারণে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বেশি দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদের মান এতটাই খারাপ হয়েছে যে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে খাতটির অবস্থা দুর্বল মনে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আলাদা করে মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে, অনেক ব্যাংক এখনও ভালো অবস্থায় রয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণচাহিদা পূরণের সক্ষমতা অনেক ব্যাংকেরই আছে। এমনকি তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ সরবরাহ করতে পারে।

 

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব