যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হলে দেশটি থেকে সাড়ে চার হাজার শ্রেণির পণ্য আমদানিতে শুল্ক (কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক) শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে বাংলাদেশকে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই এই সুবিধা কার্যকর হবে। বাকি ২ হাজার ২১০ শ্রেণির পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে।
আমদানিতে শুল্কছাড় দেওয়া হলেও মূল্য সংযোজন কর বা মূসক বা ভ্যাট, অগ্রিম কর ও অগ্রিম আয়করে ছাড় দেওয়া হয়নি। আমদানি পর্যায়ে এসব কর পরিশোধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে যে রাজস্ব আদায় হয়, তার ৩৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক থেকে এবং ৬২ শতাংশ আসে বিভিন্ন কর থেকে।
অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮ শ্রেণির পণ্য রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না। এসব পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে। তবে দেশটির স্বাভাবিক আমদানি শুল্ক (এমএফএন) বহাল থাকবে।
গত সোমবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার চুক্তির কপি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো পণ্যে দুই দেশ কী সুবিধা দেবে ও পাবে, সেসব পণ্যের এইচএস কোডের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চার ধাপে যুক্তরাষ্ট্রকে এই শুল্কসুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাড়ে চার হাজার পণ্য আমদানিতে কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক শূন্য করতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকেই এই সুবিধা কার্যকর করতে হবে বাংলাদেশকে। দ্বিতীয়ত, ১ হাজার ৫৩৮ শ্রেণির পণ্যে চুক্তি কার্যকরের দিন থেকেই শুল্ক ৫০ শতাংশ বা অর্ধেক কমাতে হবে। অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ চার বছরে সমান হারে কমিয়ে পঞ্চম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তা শূন্য করে ফেলতে হবে। তৃতীয়ত, ৬৭২ শ্রেণির বা ধরনের পণ্যে চুক্তি কার্যকরের প্রথম দিন থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক কমাতে হবে। বাকি শুল্ক ৯ বছরে ধাপে ধাপে কমিয়ে দশম বছরে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। চতুর্থত, ৪২২ শ্রেণি বা ধরনের পণ্যে বর্তমানে কাস্টমস শুল্ক শূন্য রয়েছে। এটা বহাল রাখতে হবে। এর বাইরে ৩২৬ শ্রেণির পণ্য রয়েছে, যেগুলো থেকে বাংলাদেশ ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী শুল্ক আদায় করতে পারবে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোনো ধরনের কোটা আরোপ করা যাবে না। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যেসব অশুল্ক বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য যাতে প্রতিযোগিতা পড়ে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। আমদানি হওয়া এসব পণ্য থেকে কাস্টমস শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ বাংলাদেশ আদায় করেছে ৭৬২ কোটি টাকা। এর বাইরে মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর বাবদ আদায় করা হয় ১ হাজার ২২০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে যা রাজস্ব আদায় হয় তার ৩৮ শতাংশ ছাড় দিতে হবে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশি ১,৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্ক শূন্য
দুই দেশের স্বাক্ষর করা চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও দেশটির পক্ষ থেকে কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাতে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১ হাজার ৬৩৮ পণ্য রপ্তানিতে কোনো পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না। এই তালিকায় রয়েছে বেতের তৈরি ঝুড়ি ও ব্যাগ, লৌহজাত পণ্য, গ্রাফাইট, খনিজ, ওষুধ, রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও কাঠের নানা পণ্য। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ছাড়া মোট ১১৭ কোটি ডলার বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়েছে দেশটিতে।
আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও পাল্টা শুল্ক শূন্য হবে। সে ক্ষেত্রে শুধু স্বাভাবিক শুল্ক দিতে হবে, বাংলাদেশের পণ্যের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সেই গড় শুল্ক হার ১৬ থেকে ১৭।
চাপে পড়বে রাজস্ব আয়
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়ার ফলে রাজস্ব আদায় কিছুটা চাপে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, এই শুল্কছাড় দিতে হবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি পণ্যের জন্য। তবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাকে তা জানাতে হবে। সংস্থাটি তা গ্রহণ করলে অন্য দেশকে একই সুবিধা দিতে হবে না। আর যদি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা তাতে আপত্তি তোলে, তাহলে অন্য দেশের পণ্যেও এই ধরনের সুবিধা দিতে হতে পারে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নয়। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি না হলে এই সুবিধা অন্য দেশকেও দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক পণ্য আমদানিতে শুল্কসুবিধার প্রভাবে আমদানি পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে বিরাট চাপ তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
মাসুদ মিলাদ
চট্টগ্রাম