লালমনিরহাটের আদিতমারীতে এক নিখোঁজ শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে আজ মঙ্গলবার সকাল আটটার দিকে খবর পেয়ে ১০টার দিকে উপজেলার একটি গ্রামের ভুট্টাখেত থেকে বস্তাবন্দী লাশটি পুঁতে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে একই গ্রামের দুজনকে আটক করা হলে স্থানীয় জনতা মব সৃষ্টি করে তাদের নিজেদের হাতে তুলে নিতে চায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের লোকজনের ওপর দফায় দফায় হামলা হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে সরকারি ছয়টি গাড়ি। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আটক ব্যক্তিদের বাড়ি। আহত হয়েছেন এনডিসি, পুলিশ সদস্যসহ ৩০–৩৫ জন।

নিহত শিশুটির বয়স সাত বছর। সে গ্রামের কৃষক কৃষকের মেয়ে। গতকাল সোমবার বেলা তিনটার পর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের ধারণা, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে একই গ্রামের শ্রী বিধান চন্দ্র বর্মণ (২০) ও তাঁর বাবা রণজিৎ চন্দ্র বর্মণকে। মবের ঘটনাটি ঘটেছে বেলা একটা থেকে তিনটা পর্যন্ত।

জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধি এবং এলাকার লোকজন সূত্রে জানা যায়, আজ সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানতে পারে শিশুটির মরদেহ বাড়ির পাশের ভুট্টাখেতে বস্তাবন্দী অবস্থায় পুঁতে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে আদিতমারী থানা–পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করতে যায়। একই সঙ্গে আসে লালমনিরহাট ডিবি পুলিশ।

ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শনে যান পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদত হোসেনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন। এ সময় স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে ডিবি পুলিশ জানতে পারে গ্রামের একটি বাড়িতে ধান রাখার ডুলির ভেতর সন্দেহভাজন বিধান চন্দ্র বর্মণ লুকিয়ে আছেন। সেখানে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করে ডিবি। এরপর বিধানের বাবা রণজিৎ চন্দ্র বর্মণকেও আটক করা হয়। তখন দুপুর প্রায় একটা। এ সময় চারদিক থেকে উত্তেজিত লোকজন জড়ো হতে থাকে। একপর্যায়ে মব তৈরি করে স্থানীয় জনতা দুজনকে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায় এবং নিজেদের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু পুলিশ জীবননাশের আশঙ্কা এবং বেআইনি বিবেচনায় আটক দুজনকে নিজেদের হেফাজতে  নিয়ে আসার চেষ্টা করে।

একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন আটক দুজনকে নিয়ে  নিয়ে যেতে চায়। এরপর আসামি ও আহত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে আসার সময় কিছু লোক বাঁশ ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে এবং ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে আমার ও পুলিশ সুপারের গাড়িসহ ছয়টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. আল আমিনসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। মুহ. রাশেদুল হক প্রধান, জেলা প্রশাসক, লালমনিরহাট

একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা পুলিশের ওপর ব্যাপকভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং লাঠিসোঁটা ছুড়ে মারে। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ সুপার লালমনিরহাট জেলা প্রশাসককে ফোন করে বিষয়টি অবগত করেন। জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নে ফোন করে সহায়তা চান।

পরে বিধান চন্দ্র বর্মণ ও রণজিৎ চন্দ্র বর্মণকে পুলিশ হেফাজতে নিতে পারলেও তাঁদের বাড়িটি রক্ষা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আরও মানুষ উত্তেজিত জনতার সঙ্গে যোগ দেয়।

উচ্ছৃঙ্খল জনতার ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হয়েছেন লালমনিরহাটের এনডিসি (নেজারত ডেপুটি কালেক্টর) মো. আল আমিন। তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিক থেকে বৃষ্টিরমতো ইটপাটকেলের ঢিল আসছিল। একপর্যায়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমরা ঘটনাস্থল থেকে লালমনিরহাটে ফিরে আসি।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই আটক বাবা–ছেলের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় স্থানীয় জনতা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই আটক বাবা–ছেলের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় স্থানীয় জনতা, ছবি: সংগৃহীত
 

পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, স্থানীয় একশ্রেণির বিক্ষুব্ধ জনতা মব তৈরি করে আটক বাবা–ছেলেকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ত্রাস সৃষ্টি করে চাপ দিতে থাকে। না দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে উচ্ছৃঙ্খল জনতা। এনডিসি আল আমিন ও পুলিশ সদস্যসহ ৩০–৩৫ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন। তাঁরা লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। আটক দুজনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এ ঘটনার বিষয়ে একাধিক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান।

পুলিশ সুপার আরও জানান, জেলা প্রশাসকের ও পুলিশ সুপারসহ সরকারি ছয়টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তিনটি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় আদিতমারী থানার ওসি মো. নাজমুল হককে জেলা পুলিশ লাইনসে প্রত্যাহার করা হয়।

লালমনিরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসা কর্মকর্তা রাজিব কুমার সাহা জানান, এনডিসি আল আমিনসহ পুলিশের ৩০ থেকে ৩৫ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। সবাই আশঙ্কামুক্ত। তাই কেউ ভর্তি হননি।

জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘পুলিশ সুপারের ফোন পেয়েই বিজিবিকে পাঠানো হয়। এর পরেই জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট, আমি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক এ কে এম মমিনুল হকসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় লোকজনকে শান্ত করার চেষ্টা করি। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন আটক দুজনকে নিয়ে  নিয়ে যেতে চায়। এরপর আসামি ও আহত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে আসার সময় কিছু লোক বাঁশ ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে এবং ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে আমার ও পুলিশ সুপারের গাড়িসহ ছয়টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. আল আমিনসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’

বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য রাজনৈতিক পক্ষসহ প্রশাসনের তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব