বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়াল সংসদে, প্রায় ১০ মিনিট অচল থাকল আইনসভার কার্যক্রম।
কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না, কোনো শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ– ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য ঘিরে দেখা দেয় উত্তেজনা।
বিরোধী দলের সদস্যরা হই চই শুরু করলে সরকারি দলের সদস্যরাও প্রতিবাদ জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কাউকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে যান। পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার সরকারি ও বিরেধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না।’
সদস্যদের কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে বলে মন্তব্য করেন স্পিকার। তিনি বলেন, ‘যারা অলরেডি দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে?’
দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার বিকেল তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। ফজলুর রহমান রাষ্ট্রপতির ভাষণে ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনার বিরোধিতা করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা।’
তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘তারা বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। সেইদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এখনও কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’
ফজলুর রহমান বলেন, ‘অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ইলেকশন হইছে। সেই ইলেকশনে তারা কী করেছে? আজকে যারা আমার ডান দিকে (বিরোধী দল) বসে আছে, তারা কী করেছে? তারা যা করেছে, সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে। আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনো যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। তাদের পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, ততদিন রাজাকার এদেশে কখনো জয়লাভ করতে পারবে না।’
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে ফজলুর রহমান স্পিকারের কাছে আরও পাঁচ মিনিট সময় চান। স্পিকার তিন মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমার বক্তব্যের পরে বলবে, আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? যেমন বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সব সময় মাননীয় বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে “ফজা পাগলা” বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য, তারা ইসলাম... ।’
এ সময় অধিবেশন কক্ষের সবাই হেসে ওঠেন। এক পর্যায়ে ফজলুর রহমানের কাছে স্পিকার জানতে চান, ‘আপনাকে কেউ “ফজা পাগলা” এই ধরনের উক্তি করেছে? এ রকম সংসদে কেউ বলে নাই তো। আপনি কেন নিজের...’
ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।’
এসময় ব্যাপক হইচই শুরু করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। স্পিকার তখন সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সবাইর প্রতি আহ্বান জানান।
এরপর ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করছেন।’
এ বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে একযোগে হইচই ও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ পর্যায়ে ফজলুর রহমান বক্তব্য চালিয়ে যেতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের কণ্ঠ আরো চড়া করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
ফজলুর রহমান তখন বলেন, ‘আমি ওনাদের কিন্তু খারাপ কিছু বলি নাই।’
এ সময় স্পিকার ফজলুর রহমানকে বসার এবং একটু অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের ধৈর্য্য ধরার আহ্বান জানান।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় জামায়াত এবং তাদের মোর্চার শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, খেলাফত মজলিশের এমপিদের দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়।
সরকারি দলের সদস্যরাও পাল্টা হইচই করেন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে সরকারদলীয় এমপিদের দাঁড়াতে ইশারা করলে অনেকেই দাঁড়িয়ে যান। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সবাইকে বসার অনুরোধ করতে দেখা যায়। পরে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সবাইকে বসার অনুরোধ করেন।
এ সময় এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ), আব্দুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান মোজাহিদ নিজ আসনে বসে ছিলেন।
পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করেন। পরে তিনিও বসে পড়েন।
এসময় বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইলে স্পিকার তাঁকে বলেন, ‘মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বসুন। আমি বললে তারপর আপনি বলুন।’
পরে স্পিকার ফজলুর রহমানকে তিন মিনিট সময়ের মধ্যে বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ করেন।
তবে বিরোধীরা হইচই করতে থাকলে স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সবাই আপনারা নির্বাচিত সদস্য, এখানে সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্য। আমি প্রতিদিনই বলি যে রুলস অফ প্রসিডিউর বইটা একটু পড়েন। যদি এই সংসদ যদি বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না।’
সরকারি দলের কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপত্তি থাকলে পরবর্তীতে বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তি খণ্ডনের পরামর্শ দেন তিনি। স্পিকার বলেন, ‘সংসদের স্পিকার যখন দাঁড়ায়, তখন এটি অবশ্যই কর্তব্য, সবাই এখানে বসে পড়বেন। আমাকে তো আপনারাই স্পিকার বানিয়েছেন। সংসদের অভিভাবকের প্রতি যদি সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না আগামী দিনে।’
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যদের সুযোগ দেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলে টাইম বাড়িয়ে দেব। তার যুক্তি খণ্ডন করুন। তিনি যদি অসংসদীয় কোনো কথা বলে থাকেন, সেটা আমরা পরীক্ষা করে এক্সপাঞ্জ করে দেব। কিন্তু বক্তব্যের সময় তাকে ডিস্টার্ব করবে না।
এরপর আবার বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরকে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের বলা হয় আল বদর। সেই আল বদর বাহিনী কারা ছিল আপনারা জানেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রথম দিন কিন্তু এইখানে (সংসদে) কোনো বাতি ছিল না, আমি কিছু শুনতে পারি নাই। এই হাউজে প্রস্তাব হইছে তাদের ব্যাপারেও। তাদের ব্যাপারেও শোকপ্রস্তাব হইছে, আমি একা হইলেও এটার প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু যেহেতু আমার দল এটা করছে, আমি চুপ কইরা ছিলাম। কথাটা খুব ক্লিয়ার । কিন্তু এই সংসদ সম্পর্কে আজকে না হলেও কালকে, কালকে না হলে পরশু, না হলে ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে, যদি আমরা যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে শোক প্রস্তাব করি।’
জুলাই অভ্যুত্থানরে সময় পুলিশ হত্যার বিচারের পক্ষেও মত দিয়ে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার ছিলাম, ১৬ ডিসেম্বরের পরে শত শত রাজাকার আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি কাউকে হত্যা করি নাই, সবাইকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি। ৫ আগস্টের পরে এত থানা লুট হয়েছে, পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, তখনতো পুলিশ যুদ্ধ করে নাই, তারা তো নিরাপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার নেতা। ৫ আগস্টের পরে এত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কোনো আইনে দায়মুক্তি হওয়ার কথা না। পাঁচ আগস্টের পরে পুলিশ হত্যা হয়ে থাকে, থানা লুট হয়ে থাকে, সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, দোষীদের বিচার হওয়া উচিত।’
ফজলুর রহমানের এমন বক্তব্যের সময় সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্যকে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়।
বক্তব্যের শেষ দিকে এসে জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন নিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মহান কাজ করেছেন। ৭৮ জনকে ২২২ জনের সমান সমান ভাগ দিয়ে কমিটি করেছেন। সিরাজউদৌলা ও মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদৌলাকে হত্যা করেছে।’

বিরোধীদলীয় নেতার জবাব
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সবকিছু বলেছেন। কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের উপরে হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি পার্সোনালি আমাকে হার্ট করেছেন। তিনি বলেছেন যে আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। বলেই তিনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর উনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে উনাকে জিজ্ঞেস করা লাগবে? আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ করেছে। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে উনি কথা বলেছেন, এটা বাড়তি অপরাধ করেছে।’
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের অসংসদীয় অংশ এক্সপাঞ্জ বা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, ‘এই সংসদকে ফাংশনাল করার জন্য বর্তমান জ্বালানি অব্যবস্থাপনা সংকট যেটাই বলি, সেই ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে এসেছিলাম, কথা বলেছি, আলোচনা হয়েছে এবং পরের দিন এসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা সাথে সাথে এটা গ্রহণ করেছি। তিনি (ফজলুর রহমান) এইটাকে শেষ পর্যন্ত কনক্লুশন রাখলেন কী দিয়ে? যার মগজ যেরকম, তার কনক্লুশন সেরকম। তার মত একজন প্রবীণ ব্যক্তির কাছ থেকে, রাজনীতিবিদের কাছ থেকে আমি এই ধরনের আচরণ আশা করি না।’
পরে ফজলুর রহমান আবার বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার তাঁকে ফ্লোর না দিয়ে বলেন, এখন আর তো না বললেও চলে। আমরা সংসদ উত্তপ্ত হোক এরকম চাই না।
স্পিকার আরো বলেন, ফজলুর রহমানের বক্তব্যে যদি অসংসদীয় কোনো কিছু থাকে, সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে। বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যেও যদি অসংসদীয় কিছু থাকে, সেটিও এক্সপাঞ্জ করা হবে।