বাজারে স্বাভাবিক সময়ে যতটুকু চাহিদা থাকে, তার চেয়ে কিছুটা বেশি অকটেন সরবরাহ করছে সরকার। কিন্তু সেই অকটেন কিনতেই মোটরসাইকেলচালক ও গাড়িচালকেরা দীর্ঘ লাইন তৈরি করছেন ফিলিং স্টেশনের সামনে। এমনকি রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল সংগ্রহ করতেও দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন হওয়ার যে আতঙ্কের কেনাকাটা শুরু হয়েছে, তা ঠেকানো যায়নি। এ কারণে বিপুল বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই চাহিদা পূরণ কঠিন। দরকার আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, যেখানে কে কখন কত পরিমাণ তেল নিচ্ছেন, তার তথ্যভান্ডার থাকবে। এর মাধ্যমে অপ্রয়োজনে তেল নেওয়া এবং মজুতদারি রোধ করা যাবে।
সরকার সে পথেই যাচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেল মজুত করার প্রবণতায় অনেকে বাড়তি কিনছেন। জেলা পর্যায়ে ফুয়েল কার্ড চালু করে ভিড় কমানো হয়েছে। ঢাকাতেও শিগগিরই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। এ ছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। মার্চে আতঙ্কের কেনাকাটা শুরু হয়। তখন সরকার থেকে গত বছরের সরবরাহের পরিমাণ দেখে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল দেওয়া শুরু হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, আগের বছরের একই মাসের তুলনায় গত মার্চে দিনে গড়ে ডিজেল সরবরাহ কমেছে ১০ শতাংশ, পেট্রল সরবরাহ কমেছে ১৫ শতাংশ। তবে অকটেন সরবরাহ বেড়েছে ২ শতাংশ। দিনে গড়ে ২৯ টন বেশি অকটেন বিক্রি করা হয়েছে।
এবার মার্চে দিনে গড়ে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৭১ টন। এপ্রিলে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৭০ টন। মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২২২ টন। তবে এপ্রিলে কিছুটা কমিয়ে দিনে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ১১৪ টন। আগামী সপ্তাহে সরবরাহ বাড়তে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পেট্রল ও অকটেনের ঘাটতির শঙ্কা নেই। তাই বাজারে সরবরাহ আরেকটু বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ানো উচিত।
উত্তরার একটি পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনে ১৮ হাজার লিটার অকটেন নেন তিনি। বেলা তিনটায় বিক্রি শুরু করলে সাতটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। আগে সারা দিনেও এ পরিমাণ তেল বিক্রি করা যেত না। এত তেল কোথায় যাচ্ছে, বুঝতে পারছেন না। তবে সোমবার তিনি কয়েকজন মোটরসাইকেলচালককে শনাক্ত করেছেন, যাঁরা টানা তিন দিন ধরে তেল নিচ্ছেন।
মোহাম্মদপুর এলাকার একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক বলেন, তেল নিয়ে বাইরে বিক্রি না করলে এত চাহিদা হওয়ার কথা নয়।
বিপিসি সূত্র বলছে, ৬ এপ্রিলের হিসাবে, দেশে ডিজেলের মজুত আছে ১ লাখ ৩২ হাজার ২২৮ টন। পেট্রলের মজুত আছে ১৬ হাজার ৩০ টন এবং অকটেনের মজুত আছে ১০ হাজার ৫২৬ টন। পেট্রল শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। আর অকটেনের চাহিদার ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়। আজ বুধবার রাতে ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এ মাসে ডিজেল নিয়েও কয়েকটি জাহাজ আসার কথা।
তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর আগে কোনো পাম্প সপ্তাহে এক দিন তেল নিত, এখন ৭ দিন তেল নিচ্ছে তারা।
তবে এ নিয়ে পেট্রলপাম্পের মালিকদের অভিযোগ আছে। তাঁরা বলছেন, কোনো পাম্প বেশি তেল পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে কম।
পদ্মা তেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, গত বছর কোন পাম্প কত তেল নিয়েছে, সেই তথ্য কোম্পানির কাছে আছে। সেটির ওপর ভিত্তি করে বর্তমান চাহিদা মূল্যায়ন করে তেল সরবরাহ করা হয়। কারও ক্ষেত্রে বৈষম্যের সুযোগ নেই।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় আলাদা ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। কোনো কোনো জেলা ফুয়েল কার্ড চালু করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেছে। তবে ফিলিং স্টেশনে ভিড় ঠেকাতে পথ দেখাতে পারে শ্রীলঙ্কা মডেল। কিউআর কোডের মাধ্যমে বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করছে দেশটি।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, যুদ্ধ না থামলে মানুষের ভীতি কাটবে না। বাড়তি কেনার প্রবণতাও অব্যাহত থাকবে। তবে যথাযথ রেশনিং ও তেল বিক্রির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা তৈরি করা গেলে জ্বালানিসংকট কমানো যেত। এ ক্ষেত্রে কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাড়তি তেল কেনা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ঢাকা