একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলো। ভোটাররা অধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা অনেকে অনুভব করলেন, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ভোটের হার স্বস্তিদায়ক বলা যায়। জয়ী দল বিএনপি বড় ধরনের ম্যান্ডেট পেল। আবার ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য তাদের আসন ও ভোটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিতে সার্থক হলো।
নির্বাচনের আগে অনেক আলাপ-আলোচনা ছিল, সংঘাত হতে পারে। নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ভোটারদের মনে বড় আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর জোরালো ভূমিকা সেই শঙ্কা অনেকটা কেটে দেয়। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এবার আমরা যেটা দেখতে পেলাম, ভবিষ্যতেও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করা হয়তো জরুরি হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার, ভোটার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল—সবাই মিলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মাইলফলক অতিক্রম করলাম। একটা হচ্ছে নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে সমাপ্ত করলাম। আরেকটা হচ্ছে নির্বাচনের ফলাফলটাও মেনে নেওয়ার মাধ্যমে কার্যকর সংসদ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাটা অনেক দূর এগিয়ে গেল। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নবায়নের একটা সুযোগ তৈরি হলো। জনচাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে এই স্থিতিশীল উত্তরণ। অর্থাৎ যাঁরা সরকার গঠন করতে পারছেন না, তাঁরাও ফলাফল মেনে নিয়েছেন। যদিও তাঁদের অভিযোগ আছে। সেই অভিযোগগুলো নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু নিষ্পত্তি করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
মোটাদাগে আমরা দেখেছি মানুষ একটা মধ্যপন্থার দিকে এবং স্থিতিশীল উত্তরণের জন্য ভোট দিয়েছেন। কিন্তু আসনভিত্তিক ফলাফল একধরনের বার্তা দিচ্ছে, আবার ভোটের বিন্যাস আরেক ধরনের বার্তা দিচ্ছে। ঢাকার মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ভোট হয়েছে। আবার কিছু কিছু জায়গায় একদম একচেটিয়াভাবে হয়েছে—যেমন চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বিএনপি এবং খুলনা, রংপুর ও রাজশাহীর একটা অঞ্চলে জামায়াত একচেটিয়া আসন পেয়েছে। এই ভোটের বিন্যাসের তাৎপর্য বোঝাটা খুব জরুরি। মানুষ এগুলোর মধ্য দিয়ে কী বলতে চেয়েছেন। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মনোভাবটা কেমন ছিল। মধ্যবিত্তের মনোভাব কেমন ছিল। এগুলো থেকে অন্য কোনো বার্তা আছে কি না।
ঢাকায় যাঁরা জিতেছেন, তাঁরা কম ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। বিজয়ীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা; বিশেষ করে ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ব্যাপারে। অন্য একটি এজেন্ডাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ—বিকেন্দ্রীকরণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ তো দূরের কথা, কোনো বক্তব্যও শোনা যায়নি। এই সময়ে এসে বিকেন্দ্রীকরণ শুধু একটি প্রশাসনিক এজেন্ডা নয়, খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডাও। ঢাকায় সবকিছু হয়—এই ধারণাটা ভেঙে দেওয়া দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের সার্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জীবনটা যে সফল করা দরকার, সেই বিষয়টাও অগ্রাধিকারে থাকা জরুরি।
গণভোটের বিষয়টাকে যদি দেখি, এখানে ‘না’ ভোটের চেয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট বেশি এসেছে। কিন্তু প্রায় ৭৪ লাখ ভোট বাতিল হয়েছে। তার মানে এটা অনেকটা ‘না’ ভোটের মতোই। হ্যাঁ, না ও বাতিল—তিনটাকে মাথায় রেখে গণভোটের বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে, সুচিন্তিতভাবে এগোনো ভালো হবে। একদিক থেকে এটা ভালো যে এত দিন গণভোট নিয়ে কী হবে না হবে, তা ঐকমত্য কমিশনের পরিধির মধ্যেই হচ্ছিল। এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে—এখানে রাজনীতিবিদদেরই মুখ্য ভূমিকায় থাকা উচিত। সংসদেই এটার মূল সুরাহা হওয়া উচিত।
এখন আমাদের বহু কাজ করার আছে। দল ও তাদের মন্ত্রিসভা ইত্যাদির যেমন কাজ করার আছে, সংসদে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদেরও অনেক কাজ করার আছে। নাগরিক যাঁরা, আমরা যাঁরা ভোটার, আমাদেরও কিন্তু অনেক কাজ করার আছে। নাগরিক সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা অগ্রাধিকার থাকবে এই পরবর্তী পর্যায়ে।
এখানে তরুণদের একটি বিষয় আছে। তরুণদের একাংশের একটি দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কয়েকজন জিতেছেন। তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। তাঁরা যেন একটা সুষ্ঠু ভূমিকা পালন করতে পারেন। তরুণদের যে রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে রাজনৈতিক সক্রিয়তার এজেন্ডা—এটা বড় এজেন্ডা হিসেবে উন্মোচিত হলো। এটাকে শুধু এনসিপির ভবিষ্যৎ কী, এই প্রশ্নের সঙ্গে সমার্থক দেখাটা উচিত হবে না। তরুণদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একটি দলের ভবিষ্যতের চেয়ে আরও বৃহত্তর। তরুণেরা আরও উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন।
এই নির্বাচনে নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। যদিও তাঁরা নির্বাচনে প্রতিযোগী হিসেবে সংখ্যায় নিতান্তই অপ্রতুল ছিলেন।
আমি অগ্রাধিকার হিসেবে যদি চিহ্নিত করি, তাহলে আমাদের জাতীয় ঐক্য সংহত করা খুব জরুরি। এই যে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ফলাফল এল এবং সেটা গ্রহণ করা হলো, এটা জাতীয় ঐক্য সংহত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ। এগোনোর পথে প্রতিযোগিতা থাকবে, বিতর্ক থাকবে, আলোচনা থাকবে, কিন্তু জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করার যেকোনো ধরনের প্রবণতাকে পরিহার করা খুবই জরুরি। এখানে অবশ্যই প্রতিহিংসা পরিহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর আমি অগ্রাধিকার হিসেবে বলব, আমাদের অর্থনীতি খুবই সঙিন অবস্থায় আছে। অন্তর্বর্তী সরকার একধরনের সামাল দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। কিন্তু তারা বড় ধরনের তৈরি করা অর্থনীতি দিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উচ্চতর আকাঙ্ক্ষা যেগুলো ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজন এখনই দেখা দিচ্ছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম—এগুলো তো হবেই ধাপে ধাপে। সেই সঙ্গে নতুন সরকারের প্রথম দিকেই অর্থনৈতিক ‘সিগন্যালিং’ (সংকেত দেওয়া) দেওয়াটা খুব জরুরি। ব্যবসায়িক পরিবেশে আস্থার জায়গায় তৈরি হবে কি না, সেটার চাহিদা থাকবে। মন্ত্রিসভা এবং যাঁরা চালাবেন রাষ্ট্র—তাঁদের বাস্তবভিত্তিক দক্ষতার বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ ‘সিগন্যালিং’ বিষয় হবে।
অনেক গোষ্ঠী থাকে যারা চাপ দেওয়ার চেষ্টা করে। তা ছাড়া এখন এই অর্থনীতি পুনর্নির্মাণের বিষয় আছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। আরেকটা দিক হলো ঋণের বোঝা। এটা বড় ধরনের অর্থনীতির বাস্তবতা হিসেবে দেখতে হবে। সঠিকভাবে সম্মিলিত শক্তিটা জড়ো করা গেলে এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে এগুলো সবই অতিক্রম করা সম্ভব। এখানে ‘ম্যাজিকের’ খোঁজ করাটা সঠিক হবে না। আসলে ম্যাজিক করে বাস্তবে সমাধান হয় না। বাস্তবতা বুঝে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—অর্থনৈতিক সিগন্যালিংয়ের মাধ্যমে সেই ধারণা দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি।
কার্যকর সংসদও দরকার। অনেক সময় আমরা সংসদের গুরুত্ব ভুলে যাই। ‘স্টাইল অব গভর্ন্যান্স’কেও (রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন) অগ্রাধিকার দিতে হবে। মানুষের কথা শুনতে হবে। আবার সংকীর্ণ কোনো গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। প্রশাসন যন্ত্রকে নিজের সুবিধার জন্য সব সময় না রেখে জনগণের চাহিদা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা। প্রশাসন যন্ত্রের দক্ষতা, উন্নতিও গুরুত্বপূর্ণ। ভালো নীতি নিলাম, সেটা বাস্তবায়ন হলো না—এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষের আছে।
দুই-তৃতীয়াংশ জেতাটা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটা বড় ধরনের বোঝাও হয়ে যায় অনেক সময়। কারণ, এর সঙ্গে আত্মতুষ্টির মধ্যে ঢুকে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। তোষামোদির সংস্কৃতি গেড়ে বসার আশঙ্কাও থাকে। সেখানে সতর্ক থাকা খুব জরুরি। আশা করি, যাঁরা জিতেছেন, তাঁরা এগুলো পরিহার করে সুষ্ঠুভাবে, দক্ষতার সঙ্গে এগোবেন। যাঁরা জেতেননি, তাঁরা প্রথমেই দায়িত্বশীলতার একটা পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেননি। এ জন্য তাঁরা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। তাঁদের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো অভিনন্দনযোগ্য ও স্বস্তিদায়ক।
আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা হচ্ছে যাঁরা প্রশাসনিক ক্ষমতার দায়িত্বে আছেন, তাঁরাই সর্বেসর্বা। আমাদের একটা সুযোগ এসেছে কার্যকর সংসদের বাস্তবতা তৈরি করা। এখানে যাঁরা সরকার গঠন করেননি, কিন্তু সংসদে যাবেন, তাঁরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
- হোসেন জিল্লুর রহমান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা