পবিত্র রমজান মাসে ব্যাংকিং কার্যক্রমের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, রমজান মাসে ব্যাংকের দাপ্তরিক কার্যক্রম চলবে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। লেনদেন চলবে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বলা হয়েছে, জোহরের নামাজের জন্য বেলা ১টা ১৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতি থাকবে। বিরতির সময় লেনদেন বন্ধ থাকলেও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রম চলবে।

রমজান মাস শেষ হওয়ার পর যথারীতি ব্যাংকের দাপ্তরিক কার্যক্রম ও লেনদেনের সময়সূচি আগের অবস্থায় (রমজান–পূর্ব অবস্থায়) ফিরে যাবে। সাধারণত সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ব্যাংকিং লেনদেন করা যায়, ব্যাংক খোলা থাকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।

দেশের অর্থনৈতিক খাতে এক স্বস্তির সুবাতাস বইছে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ১৬ দিনেই দেশে ১৮০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের বিশাল রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের আয় ২১ শতাংশ বেশি।

প্রবাসী আয়ের এই উল্লম্ফন সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে মোট রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রবাসী আয় এসেছিল ১৪৯ কোটি ডলার। সেই তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে তা ৩১ কোটি ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই দেশে এসেছে ১৫ কোটি ২০ লাখ ডলার।

রিজার্ভের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট মজুত ৩৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম ৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী এর পরিমাণ ২৯ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিপিএম ৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিট রিজার্ভেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই প্রবাসী আয়ে এই জোয়ার এসেছে। চলতি মাসে প্রতিদিন গড়ে ১১ কোটি ২৫ লাখ ডলার করে দেশে পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এর আগে জানুয়ারি মাসে ৩১৭ কোটি ডলার এবং গত ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল।

বড় উত্থানের পর বিক্রির চাপে আজ সোমবার কিছুটা মূল্য সংশোধন হয়েছে শেয়ারবাজারে। তাতে এদিন শেয়ারবাজারে সূচক কিছুটা কমেছে। বাজারের এই প্রবণতাকে স্বাভাবিক আচরণই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আজ দিন শেষে ১১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৯০ পয়েন্টে। গতকাল রোববার এই সূচক ২০১ পয়েন্ট বা পৌনে ৪ শতাংশ বেড়েছিল। সূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে আজ লেনদেনও কিছুটা কমেছে। এদিন ঢাকার বাজারে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ১৮ কোটি টাকা কম। ঢাকার বাজারে সূচক কমলেও অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচকটি এদিন ৭ পয়েন্ট বেড়েছে। তবে লেনদেন কমে নেমে এসেছে ১৪ কোটি টাকায়, যা আগের দিনের চেয়ে ১১ কোটি টাকা কম।

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে গতকাল রোববার ব্যাংকসহ ভালো মৌলভিত্তির বেশির ভাগ শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছিল। তাতে সূচকের বড় উত্থান হয়। তার বিপরীতে আজ ব্যাংকসহ মৌলভিত্তির বেশির ভাগ শেয়ারের দাম কমেছে। গত কয়েক দিনের শেয়ারের দামের উত্থানের পর এদিন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছিল। এ কারণে বিক্রির চাপ বেশি থাকায় শেয়ারের দাম কমে। এদিন ঢাকার বাজারে লেনদেন হওয়া ৩৯৭ কোম্পানির মধ্যে ২১৮টির দাম কমেছে, বেড়েছে ১৫৩টির আর অপরিবর্তিত ছিল ২৬টির দাম।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউস লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে সূচকের পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল গ্রামীণফোন, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, রেনাটা, ব্র্যাক ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মা, ইসলামী ব্যাংক, ওয়ালটন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের। এই ১০ কোম্পানির শেয়ারের সম্মিলিত দরপতনে ডিএসইএক্স সূচকটি কমেছে ১৯ পয়েন্টের বেশি। ভালো মৌলভিত্তির এসব কোম্পানির দরপতনের বিপরীতে স্কয়ার ফার্মা, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এবি ব্যাংক, এক্‌মি ল্যাবরেটরিজ, শাহজিবাজার পাওয়ার, সোনালী পেপার, ঢাকা ব্যাংক ও লঙ্কাবাংলা ফিন্যান্সের মূল্যবৃদ্ধি সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই ১০ কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি ডিএসইএক্স সূচকটি বেড়েছে প্রায় ২১ পয়েন্ট।

বড় উত্থানের পরদিন বাজারের এই দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, আগের দিনের বড় উত্থানের পর আজ শেয়ারের দামের কিছুটা মূল্য সংশোধন হয়েছে। কারণ, অনেকে মুনাফা তুলে নিয়ে এক শেয়ার থেকে অন্য শেয়ারে বিনিয়োগ স্থানান্তর করেছেন। এটি বাজারের স্বাভাবিক আচরণ। বেশির ভাগ শেয়ারের দাম কমলেও লেনদেন ছিল ইতিবাচক। বাজারের স্বাভাবিক গতি ফিরতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। নতুন কিছু বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি পুরোনো নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হতে শুরু করেছেন। বাজারের জন্যও এটি ইতিবাচক।

রোববার ডিএসইতে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কোম্পানি লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল। আর দাম কমেছিল জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্টদের মালিকানা থাকা কোম্পানির শেয়ারদর। আজকের বাজারে এই ধারার কিছুটা বদল হয়। বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন কোম্পানির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী নেতাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কোম্পানিরও দর বেড়েছে। আগের দিনের মতো আজও ঢাকার বাজারে লেনদেনের দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা ব্যাংক। এদিন কোম্পানিটির প্রায় ৪১ কোটি টাকার শেয়ারের হাতবদল হয়। আর দাম কমেছে ৩০ পয়সা বা ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকায়। পাশাপাশি বেড়েছে আবদুল আউয়াল মিন্টুর মালিকানাধীন ন্যাশনাল ব্যাংক, কেঅ্যান্ডকিউ ও দুলামিয়া কটনের শেয়ারের দাম। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ, কেঅ্যান্ডকিউর দাম ৫ শতাংশ ও দুলামিয়া কটনের দাম বেড়েছে ৫০ পয়সা। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ইবনে সিনা ফার্মার শেয়ারের দাম এদিন ২ শতাংশ বা ৬ টাকা বেড়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দাম ৩০ পয়সা কমেছে।

নতুন সরকার গঠনের আগের দিন তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে আজ সোমবার সকালে তারা পর্ষদ সভা স্থগিতের দাবি জানায়।

দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা হলেও ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন হয়নি। শেষ মুহূর্তে সভার কার্যসূচি বদলে পর্ষদ সভায় জানানো হয়, ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কে কত নম্বর পেয়েছে।

ফলে প্রতিবাদের মুখে আটকে যায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স বা অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ। এ নিয়ে আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের দিনভর উত্তেজনা চলে।

সকালে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল সংবাদ সম্মেলন করার পর বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিস আদেশে জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে বা ঘরোয়া বৈঠকে, জনসভায়, সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকসংক্রান্ত বা নীতিমালার বিষয়ে বক্তব্য রাখতে পারবেন না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, পর্ষদের জরুরি সভায় ডিজিটাল ব্যাংকের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সকালে প্রতিবাদ

আজ সকালে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যখন নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক সেই সময় মাত্র এক দিনের নোটিশে ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি জরুরি পর্ষদ সভা ডাকা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সভার মূল উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া, যা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যাকে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বর্তমান গভর্নর অতীতে সেই গোষ্ঠীর একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। কাউন্সিলের মতে, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এ ছাড়া গভর্নরের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সূত্রে যোগ্যতাহীন ব্যক্তিদের পরামর্শক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। এমনকি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই বহিরাগত ব্যক্তিকে কার্ড ইস্যু ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

কাউন্সিল আরও জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হতে পারে না। পাশাপাশি ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বর্তমান রাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সময়ে এমন বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া আইন ও প্রথা—উভয়েরই লঙ্ঘন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে একটি একচেটিয়া বাজার তৈরির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা আর্থিক ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।

কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক ও অসংখ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে (সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত)। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা গভীর ও স্বচ্ছ পর্যালোচনার দাবি রাখে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে কাউন্সিলের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়—বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ, ১৬ ফেব্রুয়ারির জরুরি পর্ষদ সভা স্থগিত, স্বার্থের সংঘাত ও স্বজনপ্রীতির নিরপেক্ষ তদন্ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও পেশাদারত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনে নেতৃত্বে পরিবর্তনের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা।

অনুমোদন হয়নি ডিজিটাল ব্যাংক

এদিকে গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভা গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য যারা আবেদন করেছে, তাদের বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

জানা যায়, প্রথমে ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদনের জন্য কার্যসূচি উপস্থাপন করতে বলা হলেও সভার আগমুহুর্তে তা বদলে ফেলা হয়। তখন কর্মকর্তাদের জানানো হয়, আবেদনকারী কোনো প্রতিষ্ঠান কত নম্বর পেয়েছে, সেই নথিপত্র উপস্থাপন করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য এই বিষয়ে জরুরি সভা ডাকায় ক্ষুব্ধ হন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করে।

কারা ডিজিটাল ব্যাংক চায়

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য আবেদন করেছে। এগুলো হলো ব্রিটিশ বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি। আরও চায় ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান, এর উদ্যোক্তা ভুটানের ডিকে ব্যাংক; আমার ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা ২২টি ক্ষুদ্রঋণ দাতা সংস্থা; ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসির উদ্যোক্তা ১৬ ব্যক্তি; বুস্টের উদ্যোক্তা রবি আজিয়াটা লিমিটেড; আমার ব্যাংকের উদ্যোক্তা কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা; অ্যাপ ব্যাংকের উদ্যোক্তা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী কয়েক ব্যক্তি।

এ ছাড়া নোভা ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যাক্তা বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার; মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসির উদ্যোক্তা ক্ষুদ্রঋণ দাতা সংস্থা আশা; জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যেক্তা ডিবিএল গ্রুপ; মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা আকিজ রিসোর্স; বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা বিকাশের শেয়ারধারীরা এবং উপকারী ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা আইটি সলিউশন লিমিটেড।

নতুন সরকারের সামনে সব সময়ই কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকে। এবার তো অবস্থা আগের চেয়ে অনেক সঙ্গিন। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে আর্থিক খাতে চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের দেওয়া মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের। তাই নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে নিয়মের মধ্যে এনে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিতে হবে, যাতে নতুন করে আর কোনো অনিয়ম না হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক কোম্পানি ও অর্থ ঋণ আদালত আইন পাস করে যাওয়া। কিন্তু তারা সেটা করতে পারল না। নতুন সরকারের উচিত হবে, শুরুতেই আইনি ভিত্তির মাধ্যমে খাতটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে আর কোনো আর্থিক অপরাধ না ঘটে। যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা চলমান রাখতে হবে। এ ছাড়া যাঁরা আর্থিক অপরাধ করেছেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সব মিলিয়ে আর্থিক খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সরকারের কাজ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

নতুন সরকারের উচিত হবে, শুরুতেই আইনি ভিত্তির মাধ্যমে খাতটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে আর কোনো আর্থিক অপরাধ না ঘটে। যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা চলমান রাখতে হবে। এ ছাড়া যাঁরা আর্থিক অপরাধ করেছেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সব মিলিয়ে আর্থিক খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সরকারের কাজ শুরু করতে হবে।মইনুল ইসলাম, সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে দেশের আর্থিক খাতে চরম বিপর্যয় ঘটে। দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে লুটপাট চালান আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ব্যবসায়ীরা। তাঁরা এসব অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার করেন। ফলে দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন অচল হয়ে পড়েছে, তেমনি অনেক আমানতকারী তাঁদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। সে জন্য এ রকম পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

এস আলম, বেক্সিমকো গ্রুপসহ যারা খাতটিকে দুর্বল করে দিয়েছে, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপরই নির্ভর করবে খাতটির যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা টেকসই হবে কি না। এ ছাড়া আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে একাধিক আইন পাস করতে হবে বলে মনে করছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ভঙ্গুর ব্যাংক খাত ও খেলাপি ঋণের রেকর্ড

এখন অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো ব্যাংকিং খাত। নাজুক পরিস্থিতিতে পড়া দেশের পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা নানা দাবিতে আন্দোলন করছেন। চাকরি হারানো কর্মকর্তারাও আন্দোলনে রয়েছেন। ব্যাংক পাঁচটিতে রয়েছেন ৭৫ লাখ হিসাবধারী ও ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার আমানত। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংককে অধিগ্রহণ গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’–এর কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।

এ ছাড়া ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে। এই দুই উদ্যোগ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাটা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংক একীভূতকরণ ও পাচার করা অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, এমডি, এমটিবি ও সাবেক চেয়ারম্যান, এবিবি

এদিকে গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। তাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায়ে তৎপরতা জোরদার করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কারণ, নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো সময়সাপেক্ষ বিষয়।

ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। এ ছাড়া অনেকে পালিয়ে যাওয়ায় তাঁদের ঋণ খারাপ হয়ে গেছে। ফলে কোন উপায়ে এসব ঋণ আদায় হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।

প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি ভিত্তি

অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকগুলোকে নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালকদের লাগাম টানা ও জবাবদিহির আওতার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। খেলাপিদের বিচারের আওতায় আনতে ও অর্থ উদ্ধারে নেওয়া হয় অর্থ ঋণ আদালত আইন সংস্কারের উদ্যোগ। তবে শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। এসব আইন পাস করে সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সহায়তা করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া ব্যবসা–বাণিজ্য চাঙা করতে সুদহার কমানো, ঋণ প্রাপ্তি সহজ করাসহ নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের সূচকগুলোর উন্নতি হয়েছে। এ জন্য বিএনপি সরকারকে অবশ্য ডলার নিয়ে চাপে পড়তে হবে না।

আরও যত সমস্যা

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান নতুন সরকারের উদ্দেশে একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন সরকারের প্রধান কাজ হবে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি সাধন। মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি, কর্মসংস্থানও হচ্ছে না। এ জন্য ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি করতে হবে। কর আদায় বাড়িয়ে ঋণ কমাতে হবে। তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণ ও পাচার করা অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। এটা নির্ভর করবে কারা আর্থিক খাতের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তাঁদের ওপর।

শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। স্পট মার্কেটে আউন্সপ্রতি সোনার দাম ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪১ দশমিক ৮০ ডলার।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (যুক্তরাষ্ট্রের সময় অনুযায়ী শুক্রবার) সোনার দাম আউন্সপ্রতি বেড়েছে ১১৪ দশমিক ৮৩ ডলার। গত এক মাসে সোনার দাম বেড়েছে ৩০৭ দশমিক ৫৯ ডলার।

এপ্রিল মাসে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সোনার আগাম দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৪৬ দশমিক ৩০ ডলারে উঠেছে।

তবে বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারের চিত্র ছিল ভিন্ন। মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় পতনের পর বিক্রির চাপ বাড়ায় সোনার দর প্রায় ৩ শতাংশ কমে যায়। সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। ফলে সোনার দাম এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। খবর ইকোনমিক টাইমস।

এদিকে রুপাও অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। স্পট মার্কেটে রুপার দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ৭৮ দশমিক ৫৯ ডলারে পৌঁছায়। যদিও তার আগের দিন রুপার দরপতন হয় ১১ শতাংশ। এত বড় দরপতনের পর রুপার এই ঘুরে দাঁড়ানো উল্লেখযোগ্য। তার পরও দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহ শেষে রুপার মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ।

রুপার সঙ্গে প্লাটিনামের দামও শুক্রবার বেড়েছে। পশ্চিমা পৃথিবীর সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শুক্রবার প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ২ হাজার ৩৩ দশমিক ৯৯ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬৬১ দশমিক ৯৭ ডলারে দাঁড়ায়। তবে সাপ্তাহিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত সপ্তাহে উভয় ধাতুর দামই কমেছে।

এদিকে গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গতি ফিরেছে। প্রতাশ্যার চেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে। এতে বেকারত্বের হার কমেছে। সেই সঙ্গে জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির হারও কমেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, শ্রমবাজার শক্তিশালী ও মূল্যস্ফীতি কমছে—উভয়ই ইতিবাচক। তবে নীতি সুদহার দ্রুত কমানো হলে চাহিদা বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা নীতি সুদহার কমানোর আশা করলেও ফেড সম্ভবত আরও ধৈর্য ধরবে।

তবে বাজারে ধারণা, চলতি বছর ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট করে দুই দফায় সুদহার কমানো হতে পারে। প্রথমবার কমানো হবে জুন মাসে। সাধারণত সুদের হার কম থাকলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে সোনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়ে যায়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার একধরনের ‘মানসিক সীমা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সীমা ভেঙে গেলে দামের দ্রুত উত্থান–পতন হয়, বিশেষ করে যখন অস্থিরতা বেশি থাকে। সম্প্রতি শেয়ারবাজারের পতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সোনার দাম কমেছে, তেমন কোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রণোদনা তখন ছিল না।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, চলতি বছরে সোনার দাম ছয় হাজার ডলার স্পর্শ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কোন দিকে যায়, মূল্যস্ফীতির গতি কেমন থাকে বা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কতটা অনিশ্চয়তা থাকে—এসবের ওপর নির্ভর করছে সোনার দাম কতটা দ্রুত ছয় হাজার ডলার স্পর্শ করবে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সোনা কেবল মুনাফাভিত্তিক সম্পদ নয়; অনেক দেশের জন্য এটি কৌশলগত রিজার্ভ। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে সোনা ক্রয় অব্যাহত রাখে, তাহলে সোনার দাম ছয় হাজার ডলার পেরিয়ে যেতেই পারে।

এদিকে লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলএমবিএ) বার্ষিক পূর্বাভাস জরিপে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৬ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

ভারতে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি (সিপিআই) এখন ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। দেশটির পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয় গতকাল বৃহস্পতিবার জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির এ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, দেশটিতে গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর সর্বভারতীয় ভোক্তা খাদ্য মূল্যসূচক (সিএফপিআই) অনুযায়ী জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি গ্রামে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ ও শহরে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। খবর দ্য বিজনেস লাইন–এর।

এদিকে বাংলাদেশে একই মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত রোববার এই তথ্য প্রকাশ করে, যা ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে ভারতের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। জানুয়ারির আগের দুই মাস ডিসেম্বর আর নভেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। যেমন জানুয়ারি মাসে ভারতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ ও ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। এক বছর আগেও এই দুটি দেশে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি ছিল। এ ছাড়া নেপাল ও মালদ্বীপে যথাক্রমে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ ও দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি চলছে।

বর্তমান বছরের একটি নির্দিষ্ট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জিনিসপত্রের দাম কত বাড়ল সেটাই হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, যা শতকরা হারে প্রকাশ করা হয়। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাজার থেকে পণ্য ও সেবা কিনতে আপনার খরচ হলো ১০০ টাকা। এক বছর পর, অর্থাৎ এ বছরের একই মাসে একই পণ্য ও সেবা কিনতে আপনার খরচ হয়েছে ১০৮ টাকা ৫৮ পয়সা। এর মানে এক বছরে আপনার ১০০ টাকায় ৮ টাকা ৫৮ পয়সা বেশি খরচ হয়েছে। আর এটাই, মানে ৮ দশমিক ৫৮ পয়সা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি।

বিজনেস লাইন–এর খবর অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ভারতের আবাসন খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২ দশমিক ০৫ শতাংশ।

ভারতের ৪৩৪টি শহর, ১ হাজার ৪৬৫টি গ্রামীণ বাজার ও ১ হাজার ৩৯৫টি শহুরে বাজার থেকে পণ্যের দাম সংগ্রহ করে মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে দামের ওঠানামা ধরতে ২৫ লাখের বেশি জনসংখ্যার ১২টি অনলাইন বাজার/শহরকে নতুন ভোক্তা মূল্যসূচকে (সিপিআই) হিসাবে যুক্ত করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্যের দাম সংগ্রহ করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেভাবে মূল্যস্ফীতি কমিয়েছে, তা করতে পারেনি বাংলাদেশ। আট মাসে ধরেই মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। এতে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ বিপাকে আছেন। কারণ, প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তাঁদের বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনতে কষ্ট হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ সময়ের ব্যাপার। এই সরকারকে সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। যদিও তা কঠিনই বৈকি।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। গত দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে মূল্যস্ফীতি কখনো সাড়ে ৭ শতাংশ, কখনো–বা ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা সেই লক্ষ্যে কখনোই পৌঁছাতে পারেননি।

বাজারে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে কাঁচা মরিচের দাম। তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচে ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এর পাশাপাশি লেবু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁপে, লাউয়ের দামও আগের তুলনায় বেড়েছে। বাজারে শাকসবজির জোগানও তুলনামূলক কম। আবার ক্রেতাও কম।

আজ রাত পার হলেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে ভোট দিতে বিপুলসংখ্যক লোক ঢাকা ছেড়েছেন। এ সময়ে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকামুখী যানবাহন চলাচলেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকায় মরিচসহ বিভিন্ন সবজির সরবরাহ কমেছে। এ কারণে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আজ বুধবার রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ান বাজার— এই তিন জায়গায় খোঁজ নিয়ে ও ক্রেতা–বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহাখালী কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, ওই সময় বাজারটিতে সবজির সব দোকান খোলা ছিল। তবে প্রায় অর্ধেকসংখ্যক মাছের দোকান ও কয়েকটি মুদির দোকান বন্ধ দেখা যায়। জানা গেছে, বন্ধ থাকা দোকানের বিক্রেতারা ভোট দিতে বাড়িতে গেছেন।

নির্বাচনের সময়ে পণ্যের দরদামে কোনো পরিবর্তন আছে কি না, জানতে চাইলে বাজারের সবজি বিক্রেতা আবু বকর বলেন, ‘বাজারে ক্রেতা উপস্থিতি কম। এক–দুই দিন আগে যেসব সবজি এনেছিলাম, সেগুলোই এখনো বিক্রি করছি।’

ওই সময় মহাখালী কাঁচাবাজারে হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি পণ্য কিনতে গেছেন। এঁদের একজন সামিউল আলম। তিনি মহাখালীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সামিউল বলেন, ‘আমি এ আসনেরই (ঢাকা–১৭) ভোটার। জরুরি কিছু বাজার করার প্রয়োজন ছিল। পাড়ার দোকান বন্ধ পেয়েছি। এ কারণে বাজারে এলাম।’

মহাখালী কাঁচা বাজারে সবজির বিক্রেতা সবজি নিয়ে বসে আছেন, ক্রেতা নেই বললেই চলে
মহাখালী কাঁচা বাজারে সবজির বিক্রেতা সবজি নিয়ে বসে আছেন, ক্রেতা নেই বললেই চলে
 

মহাখালী থেকে গেলাম মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে। সেখানে গিয়ে অবশ্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্রেতার উপস্থিতি দেখা গেল। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের আশপাশের এলাকায় স্থানীয় ভোটার অনেক বেশি। তাঁরা ভোটের আগের দিন বাজার করতে আসছেন। এ জন্য স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতা উপস্থিতি তেমন একটা কমেনি। তবে আগামীকাল ভোটের দিন বাজারের বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ থাকবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

অবশ্য কারওয়ান বাজারে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। অন্যান্য দিনের তুলনায় এখানে কমসংখ্যক সবজির দোকান খোলা দেখা গেছে। কম ছিল ক্রেতাদের উপস্থিতিও। কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মাহবুব আলম বলেন, ‘মানুষজন তো বেশির ভাগই বাড়ি গেছে। নতুন কোনো সবজিও বাজারে আসেনি। আগে যা কেনা ছিল, সেগুলো বিক্রি করছি।’

দাম বাড়তি যেসব পণ্যের

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত তিন দিনের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। তাতে এক কেজি কাঁচা মরিচ এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায়। তিনদিন আগে প্রতি কেজি মরিচ ১০০–১২০ টাকায় কেনা যেত।

কয়েক দিন ধরেই বাজারে লেবুর দাম চড়া। বিক্রেতারা জানান, লেবুর মৌসুম শেষ হওয়ায় সরবরাহ কমেছে এবং দাম বেড়েছে। পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই বাজারে লেবুর দাম চড়া রয়েছে। ফলে রোজায় লেবুর দাম আরও কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানান বিক্রেতারা।

কয়েক দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো লেবু (হালি) বিক্রি হচ্ছে না। ধরনভেদে প্রতি হালি লেবু ৮০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। তিন সপ্তাহ আগে লেবুর হালি ছিল ৩০–৫০ টাকা।

এ ছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁপে, লাউয়ের দামও আগের তুলনায় ১০–১৫ টাকার মতো বেড়েছে। অন্যান্য সবজির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

চট্টগ্রাম

মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসায় নীতি সুদহার (পলিসি রেট) অপরিবর্তিত রেখে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না নামা পর্যন্ত এই সংকোচনমূলক অবস্থান বজায় রাখা হবে।

আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে।

ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ও মুদ্রা সরবরাহ

নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। জুন নাগাদ এই প্রাক্কলন ধরা হয়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ৮ শতাংশ। তবে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খাতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

একনজরে মুদ্রানীতি

• নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। • মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য: ৭ শতাংশে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক নীতি চলবে। • বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে সাড়ে ৮ শতাংশ। • মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা জুন নাগাদ সাড়ে ১১ শতাংশ।

অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা জুন নাগাদ ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানি বৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ। মূলত বাজার থেকে ৪৩০ কোটি ডলার কেনার বিপরীতে ৫০ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছাড়ায় মুদ্রা সরবরাহ কিছুটা বাড়তির দিকে রয়েছে বলে জানানো হয়।

আক্ষেপ ও সংস্কারের প্রশ্ন

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, গভর্নর হিসেবে এই সরকারের আমলে আমি পূর্ণ পেশাদার স্বাধীনতা ভোগ করেছি, কোনো চাপ ছিল না। তবে কিছু আইন সংশোধন না হওয়ায় আমার আক্ষেপ রয়ে গেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।

পরবর্তী সরকারের সময় সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে না পারলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর হেসেই বলেন, সেটা তখন বোঝা যাবে। সেতুর কাছে গিয়ে বলা যাবে সেতু পার হব কি না। তবে যে সরকারই আসুক, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ পরিস্থিতি

দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ২০২৪ সালের আগস্টের পর তিন দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল। গত নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে উঠলেও পরে তা কিছুটা কমে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে এবং সংস্থাটির সব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।

একনজরে মুদ্রানীতি

• নীতি সুদহার ১০ শতাংশ।

• মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য: ৭ শতাংশে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক নীতি চলবে।

• বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে সাড়ে ৮ শতাংশ।

• মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা জুন নাগাদ সাড়ে ১১ শতাংশ।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

আজ রোববার রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান আশিক চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

সংবাদ সম্মেলনে আশিক চৌধুরী জানান, আজ রোববার ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে একটি চিঠি পাওয়া গেছে। সকালে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ওই চিঠি এসেছে। চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড ইজারা চুক্তি নিয়ে চলমান দর–কষাকষির (নেগোসিয়েশন) অগ্রগতির প্রশংসা করেছে এবং এটা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারা আশা প্রকাশ করেছে, এই নেগোসিয়েশন ভবিষ্যতে আরও এগোবে এবং সঠিক দিকেই যাবে। নেগোসিয়েশনের অগ্রগতি প্রশংসার পাশাপাশি ডিপি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, শেয়ার করা খসড়া কনসেশন চুক্তি তারা গ্রহণ করেছে এবং বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছে। তবে তারা এটি আরও পুনর্মূল্যায়ন (রিভিউ) করার জন্য কিছু সময় চেয়েছে।

আশিক চৌধুরী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক মেয়াদ রয়েছে আর দুই কার্যদিবস। যেহেতু তারা (ডিপি ওয়ার্ল্ড) সময় চেয়েছে, সে কারণে বিষয়টি বর্তমান সরকারের আমল পেরিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে গিয়ে নেগোসিয়েশনটি আবারও কন্টিনিউ হতে পারে।’

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আশিক চৌধুরী বলেন, ‘এই সরকারের সময়ে চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছে না, আমার মনে হয়, এটা নিশ্চয়তার মাত্রা বিবেচনায় বলা যায়। কারণ আর দুই কার্যদিবস আছে। এর মধ্যে ওনারা (ডিপি ওয়ার্ল্ড) ফেরত আসবে, তারপর আমরা আমাদের ক্যাবিনেটে নিয়ে এটাকে অনুমোদন করিয়ে স্বাক্ষর করব, সময়ের বিবেচনায় এই প্রক্রিয়াটা খুব কঠিন হবে।’

আশিক চৌধুরী জানান, নিউমুরিং টার্মিনালকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়া নিয়ে ২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়েছিল। গত এক মাসে প্রকল্পটির চূড়ান্ত ধাপের দর–কষাকষি শুরু হয়েছিল।

আশিক চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন স্তরে বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ চলমান রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত আছে এবং এ আলোচনা ও দর–কষাকষি প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। তবে পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় প্রয়োজন হতে পারে।’

বড় ধরনের দরপতনের পর সম্প্রতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সোনার বাজার। তবে, সেই পুনরুদ্ধার স্থায়ী হলো না বেশিদিন। দুই দিনের ব্যবধানে এবার বড় ধরনের পতন ঘটতে দেখা গেছে।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভালো মানের; অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের সোনার দাম ভরি প্রতি ৭ হাজার ৬৪০ টাকা কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনকে (বাজুস)।

এদিন সকাল ১০টার দিকে নতুন করে সোনার দাম সমন্বয় করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। নতুন করে সমন্বয়ের পর দেশের বাজারে এখন ভরি প্রতি ২২ ক্যারেটের সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫০ টাকা।

বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের সোনার দাম এখন ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫০ টাকা। এছাড়া, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৪২ হাজার ৯০৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৮ হাজার ২০২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনা দাম ১ লাখ ৭০ হাজার ৪১১ টাকা পড়বে।

এর আগে, মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুই দফায় সোনার দাম ভরিতে ১৬ হাজার ৩৩০ টাকা বাড়িয়েছিল বাজুস। এতে দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের সোনার দাম দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। এছাড়া, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৪৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে আজ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টার আগ পর্যন্ত দেশের বাজারে এ দামেই বিক্রি হয়েছে সোনা।

সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত (৩৭ দিন) ২৫ বার সোনার দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এর মধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে ১৬ দফা; কমানো হয়েছে ৯ দফা। আর গত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল সোনার দাম; যেখানে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল, আর কমানো হয়েছিল ২৯ বার।

বাজুসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সোনার বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে সরকার-নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট ও বাজুস-নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ৬ শতাংশ যুক্ত করতে হবে। তবে, গহনার ডিজাইন ও মানভেদে মজুরির তারতম্য হতে পারে।